ভারতবর্ষে ভ্রাতৃঘাতি মুসলিম শাসন

সপ্তম শতকের প্রথম ভাগে ইসলামের অভ্যুদয় আরবদের জীবনে মহা বিপ্লব আনে এবং অচিরেই আরব মুসলমানরা ধর্ম, রাজনীতি, বানিজ্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসাবে পরিগনিত হয়। ধর্মীয় মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা, নীতিবোধ, আধুনিকতা সর্বোপরী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর জীবনাচার ইসলামকে দ্রুত প্রসারমান ধর্মে পরিনত করে। মক্কা-মদিনা বিজয়ের পর ইসলামের সুবাতাস পৃথিবীর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। উম্মীয় খলিফা অলীদের সিংহাসন আরোহনের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের দিগি¦জয়ের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। অলীদের সেনাপত মুসা বিন নুসায়ের সমগ্র উত্তর আফ্রিকা অধিকার করেন। তদীয় সেনাপতি তারিখ স্পেন অধিকার করেন। পূর্বদিকে কুতাইবা মধ্যে এশিয়ায় ইসলামের অর্ধচন্দ্র তারকা খচিত উড্ডীন করেন। পারস্য অধিকৃত হয়েছিল এবং আরবসাম্রাজ্য আমসা নদীর তীরবর্তী ভূ-ভাগ পর্যন্ত করেন হয়েছিলো। খলিফা হযরত উমর (রাঃ) এর আমলে (৬৩৬-৬৩৭ খ্রীঃ) ওমানের গভর্নর উসমান সাকিফী কর্তৃক ভারতে উপকূলে প্রথম অভিযান প্রেরিত হয়েছিল। খলিফা উসমান (রাঃ) এর আমলে (৬৪৩-৪৪ খ্রীঃ) দ্বিতীয় অভিযান প্রেরিত হয়েছিল সেনাপতি আবদুল্লাহ বিন আমর বিন রাবির অধীনে। আরবগণ কিরমান অধিকার করে সিস্তান অবরোধ করে এবং পশ্চিম ভারতের অন্তর্গত মাকরানের দিকে অগ্রসর হয়। প্রথম উম্মীয় খলিফা মাবিয়ার আমলে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চল আরব সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। মূহাল্লিব বিন আবু সুফিয়া সাময়িক ভাবে সিন্ধু প্রদেশ ও সিন্ধুু নদের নিু উপত্যাকা অধিকার করেন। সিংহলরাজ কর্তৃক প্রেরিত উপঢৌকন লুন্ঠনকে কেন্দ্র করে খলিফা ওয়ালিদের অনুমতিক্রমে পারস্যের শাসনকর্তা হাজ্জাজ নিজ জামাতা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সেনাপতি নিযুক্ত করে যুদ্ধে প্রেরণ করেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম ৭১২ ইং খ্রীঃ দেবলে জয় করে “নিরুন” ব্রহ্মনাবাদ ও সর্বশেষ মুলতান অধিকার করেন।

গজনী বংশ, ঘোর বংশ, তুর্কি রাজ বংশ, খালযী বংশ, তুঘলুক বংশ, সৈয়দ বংশ এবং লোদী বংশ সর্বশেষ মুঘল রাজাদের শাসন আমল মুসলিম শাসন আমল বলে পরিচিত। গজনী বংশের রাজত্বের পতন তরান্বিত হয়েছিল ঘোর বংশের উত্থানের মধ্যে দিয়ে। ভারতে মুসলিম সম্রাজ্যের গোড়াপত্তনকারী মুহাম্মদ ঘোর নিঃসন্তান মারা যাওয়ার মধ্যে দিয়ে দিল্লী সুলতান এবং তুর্কি রাজ বংশের উত্থান হয়। উত্তরাধিকারী নিয়ে দ্বন্দ্বের পথ ধরে ক্ষমতার আসীন হয় খালযী বংশ। আলা উদ্দিন খালযীর সুযোগ্য নেতৃত্ব ও রনকৌশলে ভারতবর্ষে মুসলিম সম্রাজ্যের অধীনে আসলেও বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রী সন্তানদের অবহেলার পাত্র হয়ে তার মৃত্যু হয়। সুলতান গিয়াস উদ্দীন তুঘলকের সিংহাসন আরোহনের সাথে সাথে খালযী শাসনের অবসান হয় ও তুঘলক অধ্যায়ের সূচনা হয়। প্রায় শতাধিক বৎসর তুঘলক বংশ রাজত্বের পর উত্তরাধিকারীদের অযোগ্যতা ও তৈমুরলঙ্গের ভারত আক্রমনের মধ্যে দিয়ে তুঘলক বংশের পতন ঘটে। পরবর্তীতে সৈয়দ বংশ এবং লোদী বংশও শতাধিক বৎসর ভারত শাসনের পর পানি পথের যুদ্ধে বাবরের নিকট ১৫২৬ সালে পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্থান হয়। এই সাম্রাজ্য ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ভারতে মুসলিম শাসন বজায় রেখেছিলো। এই সময়ের মধ্যে শুধুমাত্র ইংরেজদের মধ্যে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ছাড়া অন্যান্য ক্ষমতা দখল, পতন-উত্থান ছিলো মুসলমানদের নিজেদের ভিতর।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এই শাসনামলে যারা কিছুটা নৈতিক, ধার্মিক ও ধর্মান্ধতা বিরোধী ছিল তাদের ভাগ্য ছিল সবচেয়ে করুন!সিন্ধু অভিযানের মূল নায়ক মোহাম্মদ বিন কাসিম খলিফা ওয়ালিদের রাজ দরবারে শত্র“দের ষড়যন্ত্রে শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। স্বয়ং খলিফা ক্রুদ্ধ হয়ে মোহাম্মদ বিন কাসিমকে গো-চামড়ার থলেতে পুরে দরবারে প্রেরণের আদেশ দেন। এই নিষ্ঠুর আদেশ প্রতিপালিত হয় এবং কাসিমের মৃত দেহ খলিফার নিকট প্রেরণ করা হয়! তুর্কি রাজ বংশের সর্বাধিক সফল সুলতান ইলতূতমিশ। তার মৃত্যু শয্যায় কন্যা রাজিয়াকে সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু আমীরগণ একজন মহিলার নিকট মস্তক অবনত করা অপমান মনে করে সুলতান ইলতূতমিশের ইচ্ছা অগ্রাহ্য করে। পরবর্তীতে তিনি সিংহাসন আরোহন করলেও প্রচলিত পর্দাপ্রথা পরিত্যাগ করে পুরুষদের পোশাক পরিধান করায় তিনি গোড়া মুসলমানদের বিরাগভাজন হন এবং প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে দিল্লীর একমাত্র নারী সুলতানের পতন হয়! তাজমহল খ্যাত সম্রাজ শাহজাহান ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মা এবং খসরুর শিশু পুত্রকে ব্যবহার করলেও তার পতন হয় স্বীয় পুত্র আওরঙ্গজেবের নির্দেশে। বন্দী অবস্থায় কারাগারে পিতাকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঢেলে দেওয়ার আগে আওরঙ্গজেব নিজ ভ্রাতা দারা, সুজা ও মুরাদকে হত্যা করে!

৭১২ খ্রীঃ মোহাম্মদ বিন কাসিম ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের যে বীজ রোপন করেছিলেন তা শেষ হয় ১৮৫৭ সালে বাহাদুর শাহ এর ইংরেজদের নিকট পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে। এই সুদীর্ঘ সময় ভারতবর্ষ নিয়মিত-অনিয়মিত ভাবে মুসলিম শাসকদের শাসনাধীনে থাকলেও আর্থসামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে ইসলাম ও তার শ্বাশ্বত বানী এদেশে কতটুকু পৌছাতে পেরেছে তা আজকের মুসলমানদের দেখলে অনুধাবন করা যায়। প্রায় হাজার বছর মুসলিম শাসন ব্যবস্থা আপাদমস্তক শান্তির বাতায়ন কেন প্রতিষ্ঠিত করতে পারে নি তার ইতিহাস পাঠ আমাদের মুসলিম বা ইসলাম ধর্মালম্বী হিসাবে লজ্জিতই করবে।
গজনী বংশ, ঘোর বংশ, তুর্কি রাজ বংশ, খালযী বংশ, তুঘলুক বংশ, সৈয়দ বংশ এবং লোদী বংশ সর্বশেষ মুঘল রাজাদের শাসন আমল মুসলিম শাসন আমল বলে পরিচিত হলেও ধর্ম, ধার্মিকতা, মানবতা, নৈতিকতার প্রাধান্য খুব একটা খুজে পাওয়া যায় না। “ক্ষমতা” “রাজ্যে” “শাসন” বিষয়গুলিই মূল ছিল ভিন্ন ধর্মালম্বী রাজাদের মত। যে শ্বাশ্বত বানী নিয়ে ইসলাম তার যাত্রা শুরু করেছিলো তা একটা সময় ভ্রাতৃঘাতি, ক্ষমতা আর হোলিখেলার ধারক বাহকদের ক্ষমতায়নের সিড়ি হয়েছিলো।

১১ thoughts on “ভারতবর্ষে ভ্রাতৃঘাতি মুসলিম শাসন

    1. আমারও একই অবস্থা। এমনেই এই
      আমারও একই অবস্থা। এমনেই এই বিষয়ে জানার অভাব আছে। তাই শুধু ধন্যবাদ বলা ছাড়া আর কিছু লিখতে পারছি না।

  1. ভালো লাগলো না আপনার লেখা।
    ভালো লাগলো না আপনার লেখা। আমাদের দেশে ইতিহাস পড়ানো হয় আপনার এই লেখাটার মতন করে। আর তাই, আমাদের দেশে মানুষ ইতিহাস পড়তে ভয় পায়। ইতিহাস শুধু দিন-তারিখ আর নাম-বংশের হিসাব নয়, এটা গল্পও। ইতিহাস লিখতেও হয় তেমনি গল্পের মতন করে। আর ইতিহাসের ব্যাখ্যা বলেও একটা কথা আছে। দিন-তারিখ যেমন একটা সময়কে নির্দেশ করে, তেমনি ঐ সময়ের ব্যাখাটাও দাবী করে, যা এখানে অনুপস্থিত। আশা করি বুঝতে পারলেন…

  2. ইতিহাস আমার বরাবরই ভালো লাগে।
    ইতিহাস আমার বরাবরই ভালো লাগে। তবে প্রাঞ্জল ভাষায় লিখলে পাঠক পড়ে আরাম পায়। পিয়াল ভাইয়ের মতামতের সাথে একমত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *