আমার মা এবং মায়ের আমি!!

জীবনের অনেক বড় একটা অংশ জুড়ে তুমি আছো।তুমি ছাড়া আমার এই অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেত।সকল বাধা ভুলে তুমি আমার দিকে তাকিয়েছো।তুমি যদি তোমার ঐ ছোট্ট গর্ভে আমাকে মাসের পর মাস লালন না করতে তাহলে আমি আজ এই পৃথিবীর মুখ দেখতে পেতাম না।মা!তুমি আমার মা!আমার জননী!মমতায় ঘিরে আদরে আদরে আমাকে তুমি একটু একটু করে বড় করে তুলেছো।পরম আদরে দিয়েছ বটবৃক্ষের মত ছায়া তোমার ই আঁচলের তলায়।তোমার ভালবাসার মুহূর্তগুলো ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা।


জীবনের অনেক বড় একটা অংশ জুড়ে তুমি আছো।তুমি ছাড়া আমার এই অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেত।সকল বাধা ভুলে তুমি আমার দিকে তাকিয়েছো।তুমি যদি তোমার ঐ ছোট্ট গর্ভে আমাকে মাসের পর মাস লালন না করতে তাহলে আমি আজ এই পৃথিবীর মুখ দেখতে পেতাম না।মা!তুমি আমার মা!আমার জননী!মমতায় ঘিরে আদরে আদরে আমাকে তুমি একটু একটু করে বড় করে তুলেছো।পরম আদরে দিয়েছ বটবৃক্ষের মত ছায়া তোমার ই আঁচলের তলায়।তোমার ভালবাসার মুহূর্তগুলো ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা।

আমার মা এমন একজন মা যিনি জীবনে সবকিছু ত্যাগ করেছেন শুধু আমার জন্য।আমার মায়ের মা মারা যায় ছোটবেলায়।তাই নানা আর একটি বিয়ে করেন।আমার সৎ নানু মহিলাটা ভাল ছিলেন না।আমার মাকে দিয়ে সারাদিন কাজ করাতেন।ক্লাশ ৭ পর্যন্ত পড়িয়েই তাড়াতাড়ি আমার মাকে বিদায় করেন তিনি।মা পড়তে খুব আগ্রহী ছিলেন কিন্তু পড়তে পারেননি।

স্বামীর ঘরেও মা সুখ খুঁজে পাননি।মাকে ধরে মারধর করত বজ্জাত লোকটা।নেশা করা,জুয়া খেলা ছিল তার প্রতিদিনের অভ্যাস।মা কষ্ট সহ্য করে এই লোকটার সাথে সংসার করছিলেন।আমার একটা বড় ভাই ছিল।ভাইয়ার জন্মের ২ বছর পর আমার জন্ম হয়।মা যখন দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হয় তখন ঐ লোকটা আমার মাকে জোর করতে থাকে এবোরশন করে ফেলার জন্য।তার নাকি এখন আর সন্তানের প্রয়োজন নেই।৩,৪ বছর পরে ভেবে দেখবে।কিন্তু একজন মা জানেন তার গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানকে হত্যা করা কত ঘৃণার আর কষ্টকর কাজ।আমার মা খুনীর খাতায় নাম লিখাতে চাইলেন না।সেজন্য আমার মাকে অনেক লাঞ্ছিত ,নির্যাতিত হতে হয় তার স্বামীর কাছে।তবুও মা হার মানেন নি।আমি যখন আমার মায়ের গর্ভে ৫ মাসের মত বেড়ে উঠি তখন আমার ভাইয়া একদিন পানিতে ডুবে মারা যায়।সন্তানহারা মায়ের কান্নার আর্তনাদে পুরোবাড়িতে শোকের মাতম।মা তার আদরের ছেলেকে ভুলতে সময় লেগেছে।আমার কথা ভেবে মা দুঃখ ভুলে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে।এদিকে আমার নিষ্ঠুর বাবা আমার মাকে দায়ী করতে থাকে ছেলের মৃত্যুর জন্য।মা যখন ৮ মাসের অন্তঃস্বত্বা তখন ঐ পাষণ্ড লোকটা একদিন রাতে আমার মাকে বিনা অপরাধে মারধর করে।মা আমাকে বাঁচাতে নিজের পিঠ পেতে দিয়ে রাখেন।মাকে যখন মারছিল তখন মা চিৎকার করে কাঁদছিলেন।মারার পর নেশাগ্রস্ত লোকটা ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ে।মা ৪ দিন পিঠ উঁচু করে ঠিকভাবে দাঁড়াতে পারেন নি।যন্ত্রণায় কাতর ছিলেন।দেখতে দেখতে এক সময় আমি পৃথীবিতে এলাম।আমার মা আমাকে পেয়ে যেন আকাশের ঐ চাঁদ হাতে পেলেন।নিষ্ঠুর লোকটাকে মা খুশি করতে পারলেন না।কারণ ছিলাম আমি।আমি ছেলে না,আমি মেয়ে।আমার পাষাণ বাবা চেয়েছিল ছেলে।মাকে আমার জন্মের কদিন পরেই নানাবাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

নানাবাড়িতে অনেকদিন থাকি আমরা।কিন্তু পাষন্ড বাবাটা একদিনও নিতে আসল না আমাদের।মাস তিনেক পেরিয়ে গেলে আমার সৎ মামা আমাদের নিয়ে আসেন বাবার বাড়িতে।মা নতুন একটি মুখ দেখতে পায় সেই ঘরে।সুন্দর করে সেজেগুজে ছিল মুখটি,দেখে মনে হলো নববধু।মায়ের বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠল।আমার পাষাণ বাবা ঘরেই ছিল।মাকে জানালো সে নতুন বিয়ে করেছে।যৌতুক পেয়েছে অনেক কিছু।আমার মাকে বলে দেয় দাসী হয়ে সতীনের সাথে ঘর করতে।নতুবা এখন ই বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে।মা তার পায়ে ধরে বলে এগুলো কি বলছে সে।বাবা মাকে লাথি দিয়ে উঠোনে ফেলে দেয়।আমি ছিলাম মামার কোলে।মামা আমাকে মায়ের কোলে দিয়ে চলে যায়।মা তার ভাগ্যকে মেনে নিতে চেষ্টা করে।

একজন নারীর পক্ষে তার স্থানে অপর এক নারীকে মেনে নেওয়া খুব কষ্টকর।তেমনি আমার মায়ের ও খুব কষ্ট হত।

আমার মায়ের সাথে বাবা যে আচরণ করত তার নতুন বৌয়ের সাথে ঠিক উল্টো আচরণ করত।টাকার লোভে আমার বাবা বিক্রি হয়ে যায়।কিন্তু বেশি নেশা করলে তখন আর তার মাথা ঠিক থাকতনা।তখন আমার মায়ের উপর তার নতুন বৌয়ের উপর রেগে যাওয়ার উশুল তুলত।আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে এভাবেই জীবন ধারন করতে থাকেন মা।দিন এভাবে যেতে থাকলে তার এক পর্যায়ে বাবা আমাকেও মারতে চাইত।মার জন্য পারতোনা।বাবার দ্বিতীয় বৌ আমাকে আর মাকে সহ্য করতে পারতোনা।আমার বয়স যখন ৪ বছর হয় তখন মা সিদ্ধান্ত নেন এই নরকে থাকার চেয়ে চলে যাওয়াই ভাল।তাই আমাকে নিয়ে একদিন মা নানাবাড়ি চলে আসেন।
নানাবাড়ির সবাই যখন জানতে পারে আমরা একেবারে চলে এসেছি তখন তাদের চোখ উল্টে যায়।মাকে চলে যেতে বলা হলে আমার নানা মায়ের দুঃখের কথা ভেবে মাকে যেতে বাঁধা দেয়।মাথা গোঁজার ঠাঁই দেয়া হয় আমাদের।কিন্তু কতগুলো রক্তচক্ষুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আমাদের ক্রোধে গিলতে থাকে।
নানার ভয়ে কিছু না করতে পেরে মামা-মামী,বদ নানী এমনকি খালারাও মাকে দিয়ে দিনরাত কাজ করাতে থাকে।

একটু একটু করে আমি বড় হতে থাকি।কোন রকমে আমাদের দিন চলে যেত।এক সময় আমার নানাও মারা যান।তখন শুরু হয় আমাদের আসল দুর্দশা।আমার বয়স তখন সাত বছর।তখন প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলাম।মায়ের অনেক শখ ছিল আমাকে অনেক পড়াশোনা করাবেন।নানা মারা যাওয়ার পর নানাবাড়ি থেকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে আমরা চলে যেতে,তাদের অভাব অনটনের সংসারে নাকি আমরা বেশি খেয়ে ফেলি।
অপমান,লাঞ্ছনা,নির্যাতন সহ্য করে তবুও আমার থাকি সেখানে।নানা মৃত্যুর আগে মাকে ৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন।মা সেই টাকাটা দিয়ে সেলাই মেশিন কিনেন।দিনভর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর রাত জেগে জেগে মা কাপড় সেলাই করে আস্তে আস্তে উপার্যন করতে থাকেন।৬ মাস কেটে গেলে আমরা নানাবাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যাই।সেখানে মা এক রুমের ছোটো একটি বাসা ভাড়া নেন।ঐখানে আমাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়।

কষ্টের উপার্জন দিয়ে তিলে তিলে মা আমার
ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেন।মা ও বাবা দুজনের দায়িত্ব মা একাই পালন করেন সুষ্ঠুভাবে।তিনি দ্বিতীয় বিয়ের কথা কখনও ভাবেননি শুধু আমার কথা ভেবে।পুরুষবিহীন একাকি জীবন অনেক কষ্টকর।তবুও মা একাই থেকে যান।

প্রতি রাতে মা কাঁদতেন।তার মাঝে ছিল
চাপা কষ্টের সমাহার।সারাদিন
হেসে হেসে কথা বলতেন সবার সাথে।কেউ
বুঝতে পারতোনা মায়ের বুকে অসীম কষ্ট
লুকিয়ে আছে যা গভীর রাতের
অন্ধকারে চিৎকার হয়ে বেরিয়ে আসতে চায়।
মাঝে মাঝে মায়ের কান্নার আওয়াজে আমার
ঘুম ভেঙে যেত।মাকে জিজ্ঞেস
করলে তড়িঘড়ি করে কান্না থামাতেন আর
আমাকে মিথ্যে বলতেন তিনি কাঁদছেন না।
আমি ছোটো ছিলাম বলে বুঝতাম না।
আমি যখন থেকে জীবন সম্পর্কে একটু একটু
বুঝতে শিখি তখন মা তার জীবনের
ঘটে যাওয়া সবকিছু আমাকে জানান।এত কষ্ট
আমার মায়ের তা ভেবেই আমার
গা শিউরে ওঠে।আমাকে না বললে হয়ত
জানতাম ই না।আর বাস্তবতাকে বুঝতেই
হয়ত মা সবকিছু আমাকে জানান।আমি যখন
সব বুঝতে শিখি তখন
রাতে মা গোপনে কাঁদলে আমি চুপ করে ঘুমের
ভাণ করে পড়ে থাকতাম।বুঝতে দিতাম
না আমি জেগে গেছি।যেই মায়ের
মনে সীমাহীন দুঃখ সেই মা কাঁদুক,প্রাণ
খুলে কাঁদুক।আমার কষ্ট হলেও
আমি মাকে কাঁদতে দিতাম।কাঁদলে তার দুঃখের
বোঝা কমে যাবে কিছু সময়ের জন্য । সেই
কারণে অশ্রু ঝরাতে দিতাম।আমার চোখের
কোণে দু,এক ফোঁটা পানি জমত।কিন্তু
তা মায়ের অশ্রুজলের কাছে খুব ক্ষীণ ছিল।
মা কাপড় সেলাইয়ের
পাশাপাশি রোদে পুড়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাপড়
বিক্রি করতেন।মোটামুটি চলে যেত দিন।
আমার স্কুল-কলেজে আমার
সাথে সহজে কেউ মিশতে চাইতনা।আমার
দোষ আমি গরিব।তবুও দু একজন
বান্ধবী আমাকে ঘৃণার চোখে দেখতনা,আমার
সাথে খুব মিশত।আমি গরিব হলেও আমার
মায়ের সন্তান হিসেবে গর্ব বোধ করি।অনেক
সাধ-আহ্লাদ জাগত মনের
ভেতর,এটা কিনব,ওটা খাব,অমুক
করব,তমুকভাবে চলব।কিন্তু গরিবের সাধ
মাটি চাপা থাকলেই ভাল।তাই মায়ের
কাছে তেমন কিছু আবদার করতাম না।
মা চেষ্টা করতেন
সর্বদা আমাকে খুশি রাখতে।কলেজ জীবনের
শুরু থেকেই আমি টিউশানি করা শুরু করি।
মা রাজি ছিলেন না।তার ধারনা এতে আমার
পড়াশুনায় ব্যাঘাত ঘটবে।
মাকে বুঝিয়ে আমি টিউশানি করতাম।কারণ
আমি জানি আমার পড়ার খরচসহ সংসার
চালাতে মায়ের হিমশিম খেতে হবে।
সুখ-দুঃখ মিলিয়ে মা মেয়ে কোনোরকমে জীবন
যাপন করি।আমার মা ছিলেন আমার প্রিয়
বান্ধবী।কোনো কথা তার কাছে গোপন
রাখতাম না।

এখন আমি অনেক বড় হয়ে গেছি।অনার্স শেষ
করে ১টা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরীও
করছি।মায়ের সব সাধ পূরণে আমি ব্যস্ত
এখন।এমন অবস্থায় অফিসের একজন ভাল
মানুষের সাথে মনের অজান্তেই ভালবাসায়
জড়িয়ে যাই।মা তার পুরুষের ঘর করতে পারে
নি বলে আমার আক্ষেপ
আছে,তবে আমি যাকে ভালবাসি সেই পুরুষের
প্রতি আমার আক্ষেপ নেই।সে আমাকে খুব
ভালবাসে,কখনো করুণা করেনা।সব পুরুষ ঐ
খারাপ লোকটার মত হয়না।আমাদের সম্পর্কের
কথা জেনে মা খুশি হন।দুই পরিবারের
মতে আমাদের বিয়েও ঠিক হয়ে গেছে।আর
কটাদিন পর আমার প্রিয়
মাকে একা রেখে আমি স্বপ্নের
দেশে পাড়ি জমাবো।মাকে আমার
শ্বশুবাড়িতে রাখা সম্ভব নয়।এই
ব্যাপারটা কেউ মানবেনা,মানতে পারেনা।
মা তার পুরোটা জীবন আমার সেবায়
নিয়োজিত ছিলেন তাকেই আমি আমার
স্বার্থের জন্য ছেড়ে যাব….
আমি স্বার্থপর!!আমার নিজের সুখের
কথা ভেবে আমি স্বার্থপর।আমার কিছু করার
নেই।আমি পারবনা আমার মায়ের জন্য আমার
মায়ের মত হতে অথবা মাদার তেরেসা হতে।
আমার একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ আছে।মা আমার
জন্য যেভাবে আত্মত্যাগ
করেছেন,সেভাবে আমি পারবনা।
সন্তারনেরা হয়ত এমন ই হয়ে থাকে।
আমি যখন মা হবো তখন আমি জানব
মা কি !!মায়ের মমতা কি!!জননীর তাৎপর্য
কি!!
এখন আমার শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবার
সময়।দূর থেকে মাকে যতটুকু
দেখাশোনা করা যায় আমি করব।এর বেশি
চাইলেও করতে পারবনা।আমার
সোনালী দিনগুলি আমি মায়ের করণে নষ্ট
করতে পারবনা।আমি মাকে ছেড়ে চলে যাব।এটাই নিয়ম।শেষ সময়টায় তার কাছে থাকতে পারবোনা।আমি মা নই,আমি জননী নই।জননীর মর্ম অজানা।
আমাকে ক্ষমা করো মা।তোমার কষ্টের বিনিময়ে কিছু করতে পারবোনা তোমার জন্য।তবু তুমি আমাকে ভুল
বুঝো না……….কারণ তুমি আমার মা……।

(এটি শুধুই একটি গল্প।লেখিকার জীবনের কোন ঘটনা নয়।)

১৩ thoughts on “আমার মা এবং মায়ের আমি!!

  1. আমি মা নই,আমি জননী নই।জননীর

    আমি মা নই,আমি জননী নই।জননীর মর্ম অজানা।
    আমাকে ক্ষমা করো মা।তোমার কষ্টের বিনিময়ে কিছু করতে পারবোনা তোমার জন্য।তবু তুমি আমাকে ভুল
    বুঝো না……….কারণ তুমি আমার মা……।

    বড্ড নিষ্ঠুর কিন্তু বাস্তব।
    ঠিক গল্পের মত লাগে নি। কাহিনী বর্ণনা মনে হয়েছে। আর কাহিনী মর্মস্পর্শী ছিল।

  2. ভালোই তো লিখেছেন। এইটা কি
    ভালোই তো লিখেছেন। এইটা কি গল্প নাকি বাস্তব ঠিক মালুম হইলো না। :আমারকুনোদোষনাই:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *