আমার বন্ধু এবং তাহরিমা তন্নী

ধুত্‍ ছাই!আবার বৃষ্টি শুরু হচ্ছে।এই তো বেশ ছিল।সুন্দর বিকেল।বৃষ্টিটা আসতে হবে কেন?বৃষ্টি আমার তেমন একটা ভালো লাগেনা।শুধুমাত্র ছুটির দিন ছাড়া।ছুটিরদিনে ঘরে পড়ে পড়ে তাও ঘুমানো যায়।আজ যদিও ছুটির দিন কিন্তু তবু…..আসলে বৃষ্টিতে ভিজতেই আমার ভালো লাগেনা।কবি সাহিত্যিকরা যে কেন বৃষ্টি নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করেন বুঝিনা।বৃষ্টিবাদলা ছাড়া সুন্দর এই বিকেলে পার্কের বেঞ্চিতে বসে থাকতে ভালোই লাগছিল।মেয়েটা যে কেন এত দেরী করছে কে জানে?আসার কথা ছিল চারটায় অথচ এখন বাজে পৌনে পাঁচটা।সাড়ে পাঁচটায় আবার শেষ বাসটাও ছেড়ে যাবে।যদি ঐ বাসটা না ধরতে পারি বিশাল বিপদে পড়ে যাব।দেখি একবার ফোন করি।নাহ্ ফোনটাও বন্ধ।যাক ঝিরিঝিরি বৃষ্টিটা বন্ধ হয়েছে।খুব সিগারেট তেষ্টা পেয়েছে।কাছে সিগারেটও নেই।দোকানে গিয়ে যে কিনবো তাও মন চাচ্ছে না।মেয়েটা যদি এসে দেখে আমি নেই তবে খুব রাগ করবে।অবশ্য কথা ছিল যে,তার সামনে সিগারেট খেতে হবে।সে ও নাকি দুই একটা টান দিয়ে দেখবে।

মেয়েটার সাথে প্রথম কথা ফেসবুকে।হঠাত্‍ একদিন ‘অঝরে শ্রাবণে’ নাম দেখে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাই।একসেপ্টও করে।প্রথম থেকেই সে আমাকে তুমি বলে ডাকে।কিন্তু আমি ডাকতাম আপনি বলে।আমি কাউকেই পরিচয়ের ১ম ধাপে তুমি বলতে পারিনা।কেন পারিনা?পারলে হয়তো বেশ হতো।তারপর সে-ই একদিন বলল,আমি কেন তাকে আপনি সম্বোধন করি?বন্ধুকে কেউ আপনি বলে? তাইতো,তারপর থেকে তুমি শুরু।যখন বন্ধু হয়েছিল তখন জানতামই না আমার বন্ধুটিও একই ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে।আমি যে ভাসিটিতে শুধু তাই না একই ডিপার্টমেন্টে।তার সাথে প্রায়ই চ্যাট হত।এরপর ভার্সিটিও শুরু হয়ে গেল।মেয়েটিকে,না না ভুল বললাম,বন্ধুটিকে আমি ১ম দেখলাম।যেদিন ১ম দেখলাম সেদিন আমি কথা বলতে পারিনি।কেন পারিনা?জানিনা।শুধু এটুকু জানি,আমি পারিনা।আবার আরেকদিন ফেসবুক চ্যাটে সে বলল,’ভালো বন্ধুত্বের অভিধানে তুমি নেই।চলো তুই বলি’।
আমি আশ্চর্য হলাম,কথাটা আমার বলা উচিত ছিল।কিন্তু আমি পারিনি।এভাবেই আমার বন্ধু হল তাহরিমা তন্নী।হয়তো শুধু বন্ধু না,আরো কিছু।বন্ধুর থেকে একটু বেশি কিছু।প্রায় সারাদিনই তার সাথে চ্যাট করা,ফোনে কথা বলা এখন আমার নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।কিন্তু আমি কখনো তাকে বলতে পারিনি সে আমার বন্ধুর চেয়ে একটু বেশি কিছু।অথচ সেদিন সে অবলীলায় কথাটি বলে দিল।আমি পারিনি।কেন পারিনি?কেন পারিনা?জীবনটা বদলে যাচ্ছে তা আমি বুঝতে পারি।বদলে গেলে আমার কী করার?আমি তো জীবন বদলাতে পারিনা।জীবন যদি নিজে থেকে বদলে যায় আমি বাঁধা দেব কেন?

ওহ্ এতক্ষণ যে কোথায় ছিলাম?এত কিছু ভাবার কী আছে?বাসটা বোধ হয় ছেড়েই গেছে।নাহ্ বাঁচা গেছে।কেবল ৫ মিনিট পেরিয়েছে,মাত্র ৫ মিনিট।অথচ এই ৫ মিনিটে হয়তো কত জীবন বদলে যাচ্ছে।এই তো তন্নী ফোন করেছে।খুব খুব ঝাড়ি দিতে হবে।কিন্তু আমি যে পারিনা।
– হ্যা বল।
– তুই কি এসেছিস?
– হ্যা।তুই কোথায়?
– বাড়িতে।
– কেন?আমি টাঙ্গাইল থেকে বগুড়া এসে পার্কে বসে আছি।আর তুই বাড়ি থেকে পার্কে আসতে পারছিস না?
– নারে।প্লিজ রাগ করিস না।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চলেছে এখন আর আসতে পারবো না।
– মানে?
– মানে আর কী?তুই আজ রাতটা কোনো গেস্টহাউজে কাটিয়ে দে না।কাল সকালে দেখা করি।
– সরি রে।আমার বাস সাড়ে ৫টায়।টিকিট কাটা হয়ে গেছে।ভার্সিটি খুললে তখন দেখা হবে। যাই।
– আচ্ছা।গুড বাই।টা টা!আচ্ছা শোন তুই আজ কী পড়ে এসেছিস?
– কেন?
– এমনি জিজ্ঞেস করলাম।
– কালো পাঞ্জাবী।
– ওহ আল্লা।মিস হয়ে গেল।তোকে তো তাহলে নায়ক নায়ক দেখাচ্ছে হয়তো।দেখিস আজ ১টা গার্লফ্রেন্ড পেয়েই যাবি।
– ফাজলামি বন্ধ কর।রাখলাম।বাই।
– ওকে…গুড বাই।
মনটা কেমন বিষন্ন লাগছে।এত বিষন্ন লাগছে কেন?আমি প্রতিবার বিষন্ন হয়েছি।এ আমার অভ্যাসে দাড়িয়েছে।কিন্তু আজ বড় বেশি।কেন এত বিষন্নতা আমার?তন্নী আমাকে আসতে বলেছিল।এসেছি।সে না দেখা করেই চলে যেতে বলছে।চলে যাবো।তাতে তো বিষন্নতার কিছু নেই।শুধু কষ্টের কিছু টাকা গেল।তা তো যাবেই।এখানে না গেলে অন্য কোনো খানে হয়তো খরচ হত।কী আবোল তাবোল ভাবছি?কেন ভাবছি এসব?ওহ ৫টা বেজে গেছে।যাই বাসটা ধরতে হবে।
বিকেলটা সত্যিই সুন্দর।নীল আকাশের সাথে রক্তাক্ত সূর্যটা কী সুন্দর খেলা করছে!প্রকৃতির কেমন কবি কবি ভাব ধরেছে।হঠাত্‍ পার্কের গেটে চোখ আটকে গেল।লাল পাড় সাদা শাড়ি পড়া একটি তরুণী দাড়িয়ে আছে উল্টোমুখ করে।হয়তো কারো অপেক্ষা করছে।তন্নীকেও আমি বলেছিলাম এমন একটি স্নিগ্ধ শাড়ি পড়ে আসতে।কিন্তু সে প্রস্তাবটা নাকচ করে দিয়েছিল।তরুণীটিকে যে কী স্নিগ্ধ লাগছে!তাকে কি কেউ বলবে না যে,সে কত সুন্দর!আমি হয়তো বলতে পারতাম,তাকে কতটা স্নিগ্ধ লাগছে। কিন্তু তা আমি কোনোদিন পারিনি।তরুণীটি যদি তন্নী হত তবু পারতাম না।আমি পারিনা।এসব ভাবতে ভাবতেই গেটের সামনে যেতেই তরুণীটি হঠাত্‍ বলল,
– কীরে আরণ্যক চলে যাচ্ছিস যে?
আমি তো হতবাক।এ যে তন্নী।বেঞ্চে বসে থাকার সময় থেকেই একে দেখেছিলাম।পিছন থেকে দেখে আমার দুর্বল চোখে চিনতেই পারিনি।তাই মনোযোগ দেইনি এর দিকে।
সে আবার বলল,দেখা না করে যেতে চাচ্ছিলি কেন?
আমি কিছুই বললাম না।
তন্নীই রাগ রাগ ভাবে বলল,কোনো নতুন বান্ধবী জুটিয়েছিস?
আমি তবুও চুপ।আমি এমন পরিবেশে কিছু বলতে পারিনা।কোনোদিন পারবোও না।
সে তবুও বলে যাচ্ছে,কী সিগারেট খাওয়ানোর কথা ছিল না?আচ্ছা বাদ দে সব।চল বাদাম খাওয়াবি আমায়।নাকি চটপাটি ফুচকা?না থাক চল বাদামই খাই।অল্প কয়েকটা বাদাম খেতে খেতে অনেক কথা বলা যাবে।
এতগুলো কথা বলে চলেছে।আমি নিশ্চুপ।এখনো আমার বিষ্ময় কাটেনি।হয়তো নিজে থেকেই আমার কথাগুলো বুঝে নিচ্ছে।কিন্তু তন্নী অনর্গল কথা বলে গেলেও একবারও আমার চোখে তাকায়নি।তাকালে হয়তো দেখতো আমার চোখে আজ কত সুখ।অথবা হয়তো সে চোখ না দেখেই বুঝতে পারছে আমার চোখের সামুদ্রিক সুখ।
হঠাত্‍ করেই এখন আমার সমস্ত সত্ত্বা পেতে চাচ্ছে বৃষ্টিভেজা সুখ।

উত্‍সর্গঃ আমার বন্ধু এবং তাহরিমা তন্নী।

১১ thoughts on “আমার বন্ধু এবং তাহরিমা তন্নী

  1. পরবর্তি পর্বের অপেক্ষায়
    পরবর্তি পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
    তবে আগের মত মেরে ফালাইয়েন না ।

    আর এদের যে পরিচয় নিয়ে তাড়াহুড়া করেছেন সেটাই এক পর্ব হলে ভাল হত । আরও দীর্ঘ আলোচনা …

    যাই হোক এটা কি সত্য ঘটনা?

  2. হ্যা জয় ভাই।একটা অনুগল্প
    হ্যা জয় ভাই।একটা অনুগল্প লেখার চেষ্টা নিয়েছিলাম।হয়তো হয় নাই।লিখেছিলাম তাও আবার এক দেড় মাস আগে।মূলভাবটা হয়তো ঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারি নাই।

      1. ভাবছিলাম কাহিনীটাকে আরো একটু
        ভাবছিলাম কাহিনীটাকে আরো একটু ইলাবোরেট করবো।কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম যে না এটুকুতেই হয়তো অনেকটা বলে ফেলেছি।কাহিনী টানতে গিয়ে যদি আবার অন্যরকম হয়ে যায় তবে মূল বিষয়বস্তু নষ্ট হয়ে যাবে।দুঃখিত আর বড় করতে পারলাম না বলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *