বই মেলায় হুমায়ুন ভক্তদের হায় হুম্যান, হায় হুম্যান রব – ১

বরাবরের মত এবারের বই মেলায় তৃতীয় দিন অন্যপ্রকাশ স্টলে প্রথমে ‘ঢু’ মারলাম। রাশিয়ার পেরোস্ত্রয়কা ও গ্লাসনস্তযুগের ন্যয় অন্যপ্রকাশ স্টলের সামনে লম্বা লাইন। আর অনেক মানুষের জটলা। জটলা থেকে হায় হুম্যান, হায় হুম্যান জিকিরের শব্দ ভেসে আসছে। উৎসুক মনটা ঠেলে জটলার কাছাকাছি নিয়ে গেল। জটলায় দেখি পুরা হলুদু, আধা হলুদ, সিকি হলুদ কিছু পোলাপাল হায় হুম্যান! হায় হুম্যান!! জিকিরে মশগুল। জিকিরের কারণ জিজ্ঞাসা করতেই হোমরা টাইপের এক ছোকরা ধমক দিয়ে বলল- হুম্যান স্যারের জন্য জিকির করতে কোন কারণ লাগে নাকি গর্দভ? কোথ্‌থিকা আইচোস তুই? নিষ্ক্রমন হ এক্ষুনি। আর না হয় প্রশ্নবিহীন জিকিরে নিমজ্জিত হ।

অবস্থা বেগতিক দেখে পৈতৃক সুত্রে প্রাপ্ত জীবন বাঁচাতে বললাম, হুম্যান মানে যে তিনি এটা আমি জানতাম না। জিকিররত আরেক হাফ হলুদ হুংকার ছেড়ে বলল, শর্ট মেসেজের যুগে আন্নে হুম্যান মানি বুঝেন না? হাগলনি কোন? আরেক সিকি হলুদ তেড়ে এসে বলল, ধর শালারে। এ শালা ফেইজবুকের দালাল। হুম্যান পীরকে যে চিনে না তার বেঁচে থাকার অধিকার নাই। অগত্য ধড়ে মস্তক অক্ষত রাখার নিমিত্তে আমিও হায় হুম্যান, হায় হুম্যান জিকির শুরু করলাম। জিকিরের সাথে আমার বানর নৃত্য দেখে হুম্যান মুরীদগন আশ্বস্ত হল আমি ফেইজবুকের হুম্যান বিরোধী দালাল গোত্রীয় কেউ নয়। এ যাত্রা বেঁচে গেলাম।

নৃত্য করতে করতে এক পর্যায়ে স্টলের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। বুঝলাম, হুম্যান পীরের বই কেনার লাইনে দাঁড়ানোর যোগ্যতা প্রমাণ করার জন্য হায় হুম্যান, হায় হুম্যান জিকির করার রেয়াজ এবার থেকে চালু করা হয়েছে। আমি ফেবুতে হুম্যান পীরের বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দাতাদের একজন। কিন্তু কসম কেঁটে বলতে পারি, হুম্যান পীরের সব বই আমার পড়া। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমি হুম্যান পীরের বিরুদ্ধে ফেবুতে আন্দোলন করছি। কিন্তু আমার ঘরের বইয়ের তাকে আশি ভাগ হুম্যানের বই কেন? আমি তাদের বলি, ওনার বই পড়ি বলেইতো আন্দোলন করার অনুপ্রেরণা পাই। কিন্তু আসল ঘটনা অন্য জায়গায়। স্ট্যাটাস আর পোষ্ট হিট খাওয়ানোর জন্য হুম্যান পীরের বিরোধীতা করি। জনপ্রিয় পীরের সমালোচনায় নিজের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সমুহ সম্ভবনা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার মনোবাসনা কেমনে পোষন করি? তাই ভক্ত বলে হুম্যান পীরের বই পড়ি। আর জনপ্রিয়তা প্রত্যাশি বলে বিরোধীতা করি। এটা আমার অধিকার। এই অধিকার থেকে আম্রেরিকার সরকারও আমাদের বঞ্চিত করতে পারে নাই। আর হলুদরা কোন ছাই!

যাই হোক, আমার লাইন ধীরে ধীরে স্টলের বিক্রেতার কাছাকাছি চলে আসল। দেখলাম সবাই পকেট থেকে টাকা বাহির করে অন্যপ্রকাশ স্টলের সেলসম্যানকে দিচ্ছে। আর সেলসম্যান মেলায় প্রথমদিন প্রকাশিত হুম্যান পীরের একমাত্র প্রকাশিত বই ‘মেঘের উপর বাড়ি’ প্যাকেট করে দিচ্ছে। বই পেয়ে ক্রেতারা খুশীতে মালটোভা মার্কা হাসি উপহার দিচ্ছে। আমিও যথারীতি টাকা দিয়ে বইটি হাতে নিয়ে হরলিকস মার্কা (আমার হাসিটি আরো দামী বুঝানোর জন্য) হাসি দিয়ে বললাম, বইটির নাম ‘মেঘের উপর বাড়ি’ রেখেছেন কেন? সেলসম্যান ধমক দিয়ে বলল, স্যারের ইচ্ছা হইছে রাখছে। আপনার কোন সমস্যা আছে? বললাম, না ভাই আমার কোন সমস্যা নাই। তবে নামকরণের স্বার্থকতা বুঝার জন্য জিগাইলাম। ঘোড়ার মত চিঁ চিঁ করে উঠল সেলসম্যান। বলল, হুম্যান স্যারের ইচ্ছে হইছে সেন্টমার্টিনে বাড়ী করছে। এখন আবার ইচ্ছে হইছে মেঘের উপর বাড়ী করার। তাই সেটা নিয়ে লেখছে। হলুদদের জটলা দেখিয়ে সেলসম্যান বলল, আর কিছু জানার থাকলে ঐখানে যান। মাইরের নাম বাবাজী! আমি বললাম, নারে ভাই আমার কিছু জানার নাই। উনি যদি চান্দের উপর বাড়ী করে তাতেও আমার আপত্তি নাই। জানার কিছুই নাই।

‘মেঘের উপর বাড়ি’ বইটি বগলদাবা করে অন্যপ্রকাশ স্টলের এক কোনায় চলে আসলাম। হায় হুম্যান…. হায় হুম্যান জিকিরে ক্লান্ত এক হলুদ দেখি বিড়ি টানতেছে। তার কাছে গিয়ে বললাম, ভাই বইটা পড়েছেন? কেমন লাগল?

হলুদ এক নিশ্বাসে তোতা পাখির মত বলল, “মেঘের ওপর বাড়ির উপস্থাপনা এবং গল্প দুটোর জন্যই পাঠক একটু আলাদা রকমের স্বাদ পাবে। একজন মৃত ব্যক্তি তার মৃত্যুকে ঘিরে মৃত্যু পরবর্তী নানা কর্মকাণ্ড দেখতে পাচ্ছে, তার বর্ণনা রয়েছে এই উপন্যাসটিতে।”

আরেক হলুদকে জিজ্ঞাসা করলাম, সেও একই কথা বলে। আরেক জনকে, অন্য জনকে। সবাই দেখি একই কথা বলে। বার বার শুনতে আমার কথাগুলো মুখস্ত হয়ে গেল।

মেলার হ্যালোজেন লাইটের আলোয় ‘মেঘের উপর বাড়ি’ বইটিতে হুম্যান পীরের লেখা ভুমিকায় চোখ বুলালাম। উপন্যাসটির ভূমিকায় হুম্যান লিখেছেন, “যখন আমি এই উপন্যাস লিখি, তখন ক্যান্সার নামক জটিল ব্যাধি আমার শরীরে বাসা বেঁধেছে, কিন্তু এই খবরটা আমি জানি না। ক্যান্সার সংসার পেতেছে কোলনে। সেখান থেকে রক্তের ভেতর দিয়ে সারা শরীরে ছড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।” ………. ‘মেঘের ওপর বাড়ি’র কাহিনী এক নারীকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, যিনি কোলন ক্যান্সারে মারা যান।’

পরিচিত একজন ডেকে বলল, ভাই কি বই কিনেছেন? বললাম, ‘মেঘের উপর বাড়ি’।
তিনি বললেন, কেমন লিখেছেন?
বললাম, “মেঘের ওপর বাড়ির উপস্থাপনা এবং গল্প দুটোর জন্যই পাঠক একটু আলাদা রকমের স্বাদ পাবে। একজন মৃত ব্যক্তি তার মৃত্যুকে ঘিরে মৃত্যু পরবর্তী নানা কর্মকাণ্ড দেখতে পাচ্ছে, তার বর্ণনা রয়েছে এই উপন্যাসটিতে।”

বলেই আমি হতবাক হয়ে গেলাম। আরে আমিও দেখি হলুদদের মত বলছি…….।

…..চলবে

৮ thoughts on “বই মেলায় হুমায়ুন ভক্তদের হায় হুম্যান, হায় হুম্যান রব – ১

  1. খুব ইচ্ছে ছিল হুমায়ুন আহমেদকে
    খুব ইচ্ছে ছিল হুমায়ুন আহমেদকে কাছ থেকে একবার দেখার. ইচ্ছে পূরণ হয়নি. এত গম্ভীর একজন মানুষের ভিতর এরকম অস্বাভাবিক রসবোধ কি করে থাকতে পারে কে জানে? নিজের মরণ ব্যাধির মাঝেও এমন রসবোধ এবং প্রাণ শক্তির পরিচয় কজন দিতে পারে? আমার আরেকটা ইচ্ছে ছিল অন্তত একদিন তার ওল্ড ফুলস ক্লাবের আড্ডায় শরিক হওয়ার. ওনার প্রতিটা ছোট গল্প অন্য মাত্রার অসাধারণ. উপন্যাস বা নাটক নিয়ে এই পরিসরে নাই বা বললাম. এই অদ্ভূত অহংকারী মানুষটাকে নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু আমার বিচারে হুমায়ুন আহমেদের তুলনা শুধু তিনি নিজেই. যে যতই অপছন্দ করুক, হিংসা করুক আর সমালোচনা করুক, আর “অপন্যাস” বলুক, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে গেলে এর একটা বিশেষ অংশ জুড়ে থাকবেন হুমায়ুন আহমেদ.

  2. হা হা হা …… লেখাটা পড়ে একটা
    হা হা হা …… লেখাটা পড়ে একটা কথা মনে পড়ে গেলো …… এক মনীষী বলেছিলেন , আমরা এমন মানুষ দ্বারা সমালোচিত হই যারা আমাদের আলোচনা করার যোগ্যতাও রাখে না ……… হুম্যান … দু:খিত হুমায়ুন আহমেদকে যারা পীর ভাবে তাদের তো আমি পাঠক হিসেবে গণ্য করি না । তবে যারা তার জনপ্রিয়তায় হিংসা করে সমালোচনার সাহস দেখায় তাদের মধ্যেও অনেকে আবার একটা দুইটা বই পড়ে জনপ্রিতা পাবার আসায় সমালোচনা লিখতে চলে আসে ……… আমার দৃষ্টিতে এই দুই পক্ষই অন্ধ আর বেকার …………

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *