বাংলাস্তান

শহীদ- কি ব্যাপার গাজী তুমারে এতো উদাসীন আর ত্যাক্ত লাগতাছে কেনো?

গাজী- হুজুর বড়ই যন্ত্রণায় আছি।

শহীদ- কি নিয়া এতো বেচেইন তুমি? স্ত্রীর সাথে কি কুনু সমেইস্যা?

গাজী- না হুজুর….

শহীদ- তাইলে কি হইছে তুমার? তুমি না জেহাদী! এইরাম দিল খারাপ করে থাকলে তো হবে না।

গাজী- হুজুর সেদিন মিশনে যদি আমারে দিতেন, তাইলে কইলাম আইজ এই দিন দেখা লাগত না।

শহীদ- (উনার অদ্বিতীয় সানগ্লাসটা একটু ঠিক করে নিয়ে) কুন মিশনের কথা কইতাছো গাজী?


শহীদ- কি ব্যাপার গাজী তুমারে এতো উদাসীন আর ত্যাক্ত লাগতাছে কেনো?

গাজী- হুজুর বড়ই যন্ত্রণায় আছি।

শহীদ- কি নিয়া এতো বেচেইন তুমি? স্ত্রীর সাথে কি কুনু সমেইস্যা?

গাজী- না হুজুর….

শহীদ- তাইলে কি হইছে তুমার? তুমি না জেহাদী! এইরাম দিল খারাপ করে থাকলে তো হবে না।

গাজী- হুজুর সেদিন মিশনে যদি আমারে দিতেন, তাইলে কইলাম আইজ এই দিন দেখা লাগত না।

শহীদ- (উনার অদ্বিতীয় সানগ্লাসটা একটু ঠিক করে নিয়ে) কুন মিশনের কথা কইতাছো গাজী?

গাজী- হুজুর একুইশে আগস্টের কথা, সেইদিন যদি আমারে দিতেন আইজকা নাস্তিকগুলান এই দেশের মসনদে থাকতে পারতো না। এই দেশটা বাংলাদেশ নামে থাকতো না, এইটা হইতো বাংলাস্তান।

শহীদ- কি ব্যাপার!!! তুমি পাক-ই-স্তান না বইলা বাংলাস্তান কইতাছো ক্যান?

গাজী- হুজুর ম্যালাদিন উর্দুতে বাত নেহি করতে করতে ভুল গেয়া হেয় উর্দু। অউর সব লুক বাংলা কো পসন্দ করনে লাগা। জামানা বাদাল গেয়া হুজুর এর লাইগ্যা বাংলাস্তান বোলনা পরতা হেয়।

শহীদ- হুম বুঝলাম…(কিছু বলতে যাবে তার আগেই কথা ধরলো গাজী)

গাজী- হুজুর সেইদিন যদি মিশনে আমি যাইতাম তাইলে আইজ গাজী না হইয়া শহীদ হইতাম। নাস্তিক কতল কইরা আইজ সকলের আঁখো মে হিরো হইতাম, বেহস্ত পাইতাম।

শহীদ- তাইলে তুমার ইস্ত্রীদের কি হইতো!!!

গাজী- (মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে) হুজুর কি যে কন…. বেহেস্তে কত হুর আছে শহীদগো লাইগ্যা।

শহীদ- ঠিক আছে আগেরবার করো নাই এইবার না হয় করবা। এইবার তুমারেই দায়িত্ব দিতে কমুনে।

গাজী- হুজুর আপনের ঐ কালা সানগেলাসের ভিতর দিয়া আমারে কি আসলেই দ্যাখতে পাইতেছেন?

শহীদ- (রাগান্বিত স্বরে)হোয়াট দ্য ফাকিং হেল ইউ আর টকিং এবাউট??? এই চশমা নিয়া সেই কখন থেইক্যা তুমি আউ ফাউ কথা বইলা যাইতাসো মানেটা কি?

গাজী- গুস্তাখি মাফ করবেন হুজুর (ভীত কন্ঠে)… আসলে চ্যাংড়া পুলাপাইন ফেসবুকে নানান কথা লিখে তো তাই বেচেইন হইয়া কি কইতে কি কইয়া ফালাইছি… (আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই শহীদ বলা শুরু করলো)

শহীদ- “ফেসবুক”!!!! এটা আবার কি? কে লিখেছে এই বই?

গাজী- (খানিকটা হাস্যোজ্জ্বল মুখে) হুজুর এইটা বই না হুজুর, এইটা ফেসবুক। এখানে ব্যবাকে লিকে। যার যা মুঞ্চায় তাই লিকে!

শহীদ- মানে? জিনিসটা কি?

গাজী- খাড়ান হুজুর আপনেরে নগদে দেখাইয়া দেই। (এই বলে ল্যাপটপটা অন করে ফেসবুকে লগিন করে দেখালো ফেসবুক জিনিসটা কি)

শহীদ- (বড় বড় বিস্ফারিত চোখে কালোচশমা দিয়ে ফেসবুক দেখতে লাগল) বাহ এই বানশেরকেল্লার লেখাগুলোতো বড়ই আনন্দদায়ক!!! মনের গুপন কথাগুলো ভালোই লিখে তারা।

গাজী- হ হুজুর পুরাই মনের কথা আর জেহাদী জোশের কথা।

শহীদ- তুমি তো মেয়া ভালো জিনিশের সাথেই আছ.. এইসব জিনিশ দেখলে দিলতো খুশ থাকবার কথা… তা না তুমি উদাসীন হইয়া বইসা আছো।

গাজী- হুজুর খালি এইসব দেখলেন!!! আসেন তাইলে অন্যকিছু দেখাই (এইবলে সে খুলে ধরলো অমি রহমান পিয়ালের ওয়াল, খুলে ধরলো রাসেল রহমানের ওয়াল, খুলে ধরলো তাপস সরকারের ওয়াল, খুলে ধরলো আরো কয়েকটি মুক্তিযুদ্ধের পেইজ… এইসব দেখে রাগে কটমট করতে করতে)

শহীদ- ধুর মিয়া কি বালছাল দেখো এইসব!!! এইসব বাকশালীদের বন্ধে কি করি নাই? কাদের লাগাই নাই? তারপরেও এরা বাঁইচা রইলো কেমনে?

গাজী- হুজুর এদের জন্যেই তো বেচেইন হইয়া রইছি….(আরো কিছু বলবে তার আগেই)

শহীদ- এসব বাকশালী, নাস্তিকদের লেখা দেখা বন্ধ করো। আমি একটা ইম্পোর্টেন্ট ব্যাপারে বাতচিত করতে আসছি। আর দুইদিন পরেই সেই ২১ শে আগস্ট, তুমি যখন নিজ থেকেই চাইতেছো এবার দায়িত্বটা তোমারেই দেয়ার কথা ভাবতেছি। তুমি কি পারবা করতে?

গাজী- কি কইলেন হুজুর!!! এবার দায়িত্ব পামু আমি!!! (আনন্দে তার দুইচোখ বেয়ে অশ্রুধারা বইতে লাগলো)

শহীদ- হ্যাঁ তুমিই পাবে। পারবা করতে? তোমারেই এবার দেয়া হবে দায়িত্ব। ওরা যখন শোক পালন করবে সেই সময়েই তুমি শহীদের মর্যাদা লাভের চেষ্টা করবা। তোমার সাথে আরো তিনজন থাকবে তাদের সাথে সব ঠিকঠাক হয়েছে এবার তোমার পালা। তুমিই নেতৃত্ব দিবা তাদের।

গাজী- (উৎফুল্ল কন্ঠে) পারুম মানে হুজুর আলবৎ পারুম। এইবার কইরা দেখামুই।

শহীদ- ঠিক আছে, (এই বলে হাতে একটা নকশা দিয়ে) ধরো এইডা হইলো ব্লু প্রিন্ট কিভাবে করবা, কেমনে করবা সব দেয়া আছে। সময়মতো জিনিসপত্রও হাতে আইসা পড়বে। ভালো থাইকো আমার যাওনের সময় হইছে। আমি উপরে বইসা সব দেখুম্নে।

এই বলে চলে গেলো শহীদ। সবকিছু প্ল্যানিং হয়ে গেছে আগামীকালকেই হামলা হবে, জেহাদ হবে, বাংলাস্তান কায়েমে আরেকধাপ এগিয়ে যাবে তারা। এইসকল ভাবতে ভাবতেই উল্লসিত হয়ে একবার ফেসবুকে ঢুকলো সবাইকে বিদায় জানাতে। গাজী জানেনা আর ঢুকতে পারবে কিনা, তাই শেষবারের জন্য ফেসবুকে লগিন করলো। পাতা লোড হতেই দেখলো অনেকেই কভার ফটো কালো করে আছে, ২১ শে আগস্ট স্মরণে নানান ধরনের লেখায় ভরে গেছে তার ওয়াল। অনেক অনেক ভিডিও শেয়ার করেছে অনেকে। কারো কারো লেখা পড়ে মনে দুঃখ জাগছে। হঠাৎ তার মনে হলো না এইসব দেখা নিষেধ, সেইদিনই তো শহীদ হুজুর না করে গেলো এসবের জন্য। হঠাৎ একটি ভিডিও দেখে তার খুব দেখতে মন চাইলো, ক্লিক করতেই মানুষের হাহাকার-কান্না এসবে ভারী হয়ে গেলো তার কান। ধুমধাম বোমার শব্দে মানুষ মারা পড়ছে, কেউ কাতরাচ্ছে, কেউ ছটফট ছটফট করছে, রক্তাক্ত আর বীভৎস দেহে আহাজারি করছে সকলে। এইসব দেখে সহ্য হচ্ছিলো না তাই একটানে ল্যাপটপএর ডালা নামিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

………একটা বাচ্চা মেয়ে হাসছে, কি সুন্দর তার হাসি। পুরো রাস্তা ফাঁকা আর ফাঁকা রাস্তায় বাচ্চাটি একা হাসছে আর খুশিতে ঘুরছে। গাজীর দিকে চোখ পড়তেই আরো খুশি হয়ে হেসে দৌঁড়াচ্ছে বাচ্চাটি, ছুটে আসছে গাজীর দিকেই। বাচ্চাটি আধো আধো কন্ঠে বলছে “আব্বু, আব্বু”। গাজী হাত বাড়িয়ে মেয়েটিকে কোলে নিতে যাবে এমসময়ে কোথা থেকে যেন একটা গ্রেনেড এসে পড়লো বাচ্চাটির সামনে, মুহুর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো বাচ্চাটির দেহ। থোপ থোপ রক্ত পড়ে আছে, পড়ে আছে ছিন্নভিন্ন দেহ….. আচমকাই শোয়া থেকে উঠে বসলো গাজী। ঘেমে একাকার হয়ে গেছে পুরো শরীর। শুনতে পেলো ফজরের আযান দিচ্ছে। মুখ হাত ধুয়ে অজু সেরে নামায আদায় করলো। এরপর প্রস্তুত হতে থাকলো গাজী কিন্তু বারবার মনে পড়ছে তার স্বপ্নের কথা। নিজ মনে মনেই বললো “ধুর কি ছাইপাশ ভাবতাছি…”

বাকী তিনজনের সাথে যোগাযোগ করে পৌঁছে গেলো যথাস্থানে। আর অল্পকিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে অনুষ্ঠান এরপর সেখানে আসবে প্রধানমন্ত্রী আর প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে উঠা মাত্রই কাজ সারতে হবে। একবার উপরের দিকে তাকালো শহীদ হুজুরকে দেখা যায় কিনা কিন্তু না মেঘে ঢাকা আকাশ ছাড়া কিছুই নেই। তারপর নিচে চোখ ফেরাতেই দেখতো স্বপ্নে দেখা বাচ্চাটির মতো একটি মেয়ে হুইল চেয়ারে বসে থাকা এক পুরুষের কোলে বসে আসছিলো। আরে এই লোকটাতো সেই লোক যাকে সে ফেসবুকের ভিডিওতে রক্তাক্ত অবস্থায় হাজারি করতে দেখেছিলো। মাথা ঘুরতে থাকে গাজীর আচমকাই কোথায় যেন হারিয়ে যায়। বাচ্চাটি মেয়েটি তার সামনে চলে গেলেও পেছন ফিরে তার দিকে তাকাচ্ছিলো। না সে আর সহ্য করতে পারছে না, মনে হচ্ছে বাচ্চাটি যেন তার দিকেই ছুটে আসবে দু’হাত বাড়িয়ে। আব্বু আব্বু বলে ডাকবে আর তখনই বাকী তিনজনের কেউ একজন গ্রেনেড ছুঁড়ে মারবে আর তাতেই বাচ্চাটির দেহ ছিন্নভিন্ন হবে।

আচমকাই গগনবিদারী চিৎকার শুরু করলো গাজী “না…..” আর সাথে সাথেই তাকে ঘিরে ফেললো প্রশাসনের লোক। প্রশাসনের লোক দেখেই বলতে লাগলো তার কাছে বোমা আছে, আছে আরো তিনজনের কাছে। বলে দিলো বাকি তিনজনের অবস্থান।

উপর থেকে এইসব দেখে শহীদ হুজুর নিজের সেই অদ্বিতীয় কালো সানগ্লাসটি খুলে নিয়ে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙ্গে ফেললো।


ভয়াল,রক্তাক্ত একুশে আগস্ট স্মরণে

পূর্বে এখানে প্রকাশিত

১৭ thoughts on “বাংলাস্তান

  1. স্বীকার না করাটাই বরং খারাপ
    স্বীকার না করাটাই বরং খারাপ হবে, তাই স্বীকার করে নিলাম এই লেখাটি শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আযাদ স্যারের “পাক সার জমিন সাদ বাদ” লেখা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েই লেখা। ভাবছিলাম ২১ শে আগস্ট নিয়ে কি লিখবো তাই কল্পনাপ্রসুত এই লেখা লিখে দিলাম।

    এইখানে যেসকল ব্যক্তিদের নাম উল্ল্যেখ করেছি, মূলত তাদের থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছি অনলাইনের এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে। তাই তাদের নাম না নিয়ে পারলাম না গল্পের প্রয়োজনে। যে ভিডিওটি দিয়েছি সেটি এই মুহুর্তে দেখা একুশে আগস্ট নিয়ে মোটামুটি ধারণা সম্পন্ন একটি ভিডিও।

    1. স্বীকার না করাটাই বরং খারাপ

      স্বীকার না করাটাই বরং খারাপ হবে, তাই স্বীকার করে নিলাম এই লেখাটি শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আযাদ স্যারের “পাক সার জমিন সাদ বাদ” লেখা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েই লেখা

      প্রথমে কিছুটা ফানি ফানি লেগেছে।
      পরে গাম্ভীর্য এসেছে।

  2. লিখাটা ভাল হয়েছে তা বলার
    লিখাটা ভাল হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না … এর চেয়ে বড় কথা আপনি আবার ইস্টিশনে এসেছেন .। আপনার হাত ধরেই তো আমি ইস্টিশনে আসি ……… আপনাকে স্বাগতম এখন থেকে নিয়মিত থাকবেন আশা করি

    1. উনি আপনার কথায় আসবেন না, আবার
      উনি আপনার কথায় আসবেন না, আবার কারো কথায় যাবেনও না। যে তিনজন পীরের কথা পোস্টে উল্লেখ করেছেন, সেই তিনজন গালিবাজ অনলাইন ধর্ষকের আঙ্গুলের ঈশারায় উনি চলেন। তারা যদি চায় তাহলে উনি আসবেন, তারা না চাইলে আসবেন না।

      উনার পোস্ট পড়তে হইলে কষ্ট করে উনার ব্যক্তিগত ব্লগে যাইতে পারেন, যেটার বিজ্ঞাপন পোস্টের নীচে দিয়েছেন। আরো বেশী ঘনিষ্ট হইতে চাইলে উনার ‘ফিরে দেখা’ নামক আওয়ামী গুনকীর্তন গাওয়া গ্রুপেও নিয়মিত পদদুলি দিতে পারেন।

    2. আমিও ব্লগ জগতে ঢুকেছিলাম
      আমিও ব্লগ জগতে ঢুকেছিলাম সুলতান মির্জার হাত ধরে কিন্তু সুলতান দাদা আর আমি এখন আলাদা ব্লগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *