আটলান্টিসের হারানো জগৎ এবং প্লেটোর দুরভিসন্ধি

আর্য তত্ত্বের উদ্ভবের পর থেকেই ”আটলান্টিস” নিয়ে মানুষের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। আদৌ আটলান্টিসের অস্তিত্ব ছিল কি? থাকলে কেমনই বা ছিল সেখানকার অধিবাসীরা? আর কি কারণেই বা তারা রীতিমত বিলুপ্ত হতে গেল? এরকম হাজার প্রশ্ন জেগেছে আমার মনেও।


আর্য তত্ত্বের উদ্ভবের পর থেকেই ”আটলান্টিস” নিয়ে মানুষের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। আদৌ আটলান্টিসের অস্তিত্ব ছিল কি? থাকলে কেমনই বা ছিল সেখানকার অধিবাসীরা? আর কি কারণেই বা তারা রীতিমত বিলুপ্ত হতে গেল? এরকম হাজার প্রশ্ন জেগেছে আমার মনেও।

আটলান্টিস সম্পর্কে প্রথম জানা যায় প্লেটোর ‘Timaeus’ এবং ‘Critias’ ডায়লগদ্বয়ে। প্লেটো আটলান্টিসকে একটা দ্বীপ হিসেবে চিহ্নিত করেন যা ”পিলারস অফ হারকিউলিস” এর পরে অবস্থিত ছিল। খ্রিস্টের জন্মের ১০০০০ বছর পূর্বেই এই দ্বীপের বাসিন্দারা পশ্চিম ইউরোপ এবং আফ্রিকার অনেক অংশই বিজয় করে। তবে রহস্যজনকভাবে একদিনের ভেতরে দ্বীপটি আটলান্টিকের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ সম্পর্কে একটু পরে আলোচনা করছি।


ছবিতে আটলান্টিসের যে ম্যাপটা দেখা যাচ্ছে তা ১৬৬৯ সালে জার্মান দার্শনিক কিরচারের অঙ্কন করা।

প্লেটো খ্রিস্টপূর্ব ৩৬০ অব্দে তার ‘Timaeus’ ডায়লগে এভাবে আটলান্টিসের পরিচয় দেনঃ

[Timaeus 24e–25a, R. G. Bury translation (Loeb Classical Library)]

এবার একটু ইতিহাস ঘাটা যাক। এই ডায়লগ লেখার ঠিক ২০ বছর আগে প্লেটো ‘Republic’ নামক ডায়লগ লেখেন এবং সেখানে একটি পারফেক্ট সোসাইটির কথা লিখেন। ‘Timaeus’ ডায়লগে চারজন ব্যক্তি সামনে আসেনঃ রাজনীতিবিদ ক্রিটিয়াস ও হারমোক্রেটিস এবং দার্শনিক সক্রেটিস এবং টাইমেয়াস। ডায়লগের ভূমিকায় সক্রেটিস একটি পারফেক্ট সমাজের কথা তুলেন এবং ক্রিটিয়াস প্রাচীন এথেন্সকে পারফেক্ট সোসাইটি হিসেবে উল্লেখ করেন। একইসাথে আটলান্টিসকে ঠিক এর বিপরিত সমাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ক্রিটিয়াসের মতে তার জীবনকালের ৯০০০ বছর পূর্বে স্ট্রেইট অফ জিব্রাল্টারে একটি যুদ্ধ হয়। যুদ্ধের একপক্ষ ছিল যারা পিলারস অফ হারকিউলিসের বাইরের লোক এবং অপরপক্ষ ছিল যারা এর ভেতরে বসবাস করত। যুদ্ধে আটলান্টিয়ানরা লিবিয়ার (আফ্রিকার উত্তরভাগকেই লিবিয়া বলা হয়েছে এখানে) মিশর পর্যন্ত দখল করে এবং ইউরোপের বড় অংশও তারা নিজেদের আওতায় আনে। সেখানকার মানুষদেরকে তারা দাসত্বে বন্দি করে। অবশেষে এথেনিয়ানরা প্রতিরোধ গড়ে তুলে এবং সমস্ত দখলকৃত দেশ মুক্ত করে। কিন্তু আটলান্টিয়ানরা পাল্টা আক্রমণ করল। এখানেই প্লেটো তার দুরভিসন্ধি খাটালেন। তিনি বললেন এথেন্স জয়ের এক ব্যর্থ অভিযান শেষে আটলান্টিস এক দিনের ভেতর আটলান্টিকের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল। প্লেটোর ভাষায়,“in a single day and night of misfortune.”

আরেকটু ইতিহাস দেখা যাক। খ্রিস্টপূর্ব ৪১৫-৪১৩ সালে এথেনিয়ানরা সিসিলি জয়ের এক ব্যর্থ অভিযান চালায়। যুদ্ধে এথেনিয়ান সেনাবাহিনী সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হয়। এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। শক্তিশালী এথেনিয়ান সেনাবাহিনীর পরাজিত হওয়ার খবর শুনে এথেন্সবাসীরা হতবাক হয়ে পড়ে। এথেন্সের রাজনৈতিক শক্তিও হ্রাস পায়। অনেক নিরপেক্ষ স্টেটও এথেন্সের পরাজয় আসন্ন ভেবে স্পার্টার সাথে যোগ দেয়। এথেন্সের অনেক মিত্রও মুখ ফিরিয়ে নেয়। এমতাবস্থায় খ্রিস্টপূর্ব ৪১১ সালে এথেনিয়ান গণতন্ত্রের পতন ঘটে এবং তা রিপাবলিক স্ট্যাটাস হারায়। অবশেষে ৪০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্পার্টা কর্তৃক এথেন্স বিজিত হয়।

প্লেটো ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী। তিনি আসলে এথেন্সকে পুনরায় রিপাবলিক হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন যা তার মতে ছিল পারফেক্ট সোসাইটি। আর তৎকালীন সমাজে প্লেটোর প্রভাব ছিল বেশ গভীর। উল্লেখ্য প্লেটো কিন্তু জিওসেন্ট্রিক ইউনিভার্সে বিশ্বাসী ছিলেন অর্থাৎ তিনি পৃথিবীকেই মহাজগতের কেন্দ্র মনে করতেন। এই ধারণা সুদীর্ঘকাল প্রতিষ্ঠিত ছিল । আর তাই প্লেটো তার দূরদর্শিতা খাটিয়ে এই ডায়লগে আটলান্টিস এর ধারনার অবতরন করেন। তিনি প্রাচীন এথেন্স রিপাবলিককে আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করে আটলান্টিসকে বললেন ঠিক তার বিপরীত। এবং এথেন্স জয় করার চেষ্টার ফলে তাদের অস্বাভাবিক ধ্বংসের কথা টেনে তিনি মূলত এথেন্সকে স্বর্গীয় আশীর্বাদ প্রাপ্ত কিছু একটা হিসাবে দাড় করাতে চাইলেন। আর রাতারাতি কোন নগরীর ধ্বংসের তত্ত্ব টানবার ক্ষেত্রে তিনি প্রাচীন গ্রিক নগরী হেলিকির ধ্বংস থেকে অনুপ্রাণিত হন। প্লেটো খুব ভালভাবেই জানতেন জনমনে তার লেখা অনেক বেশি প্রভাব ফেলবে তাই ইচ্ছাকৃতভাবেই তিনি কাজটি করেন।

পরবর্তী স্কলারাদের অধিকাংশই তাই আটলান্টিসকে নেহাতই প্লেটোর কল্পনাপ্রসূত হিসাবেই মেনে নেন। এমনকি অনেক সাহিত্যিক আটলান্টিস নিয়ে প্যারোডি লেখা শুরু করেন। দীর্ঘদিন পর যখন আর্য তত্ত্বের উদ্ভব ঘটে তখন আটলান্টিস নিয়ে পুনরায় মতভেদ শুরু হয় কারণ অনেক থিওরি মতে আটলান্টিসের অধিবাসীরাই ছিল প্রকৃত আর্য। ব্রিটিশ স্কলার ক্যামেরন তো সরাসরিই বলেন,“It is only in modern times that people have taken the Atlantis story seriously; no one did so in antiquity”. [Alan Cameron, Greek Mythography in the Roman World, Oxford University Press (2004) p. 124]। ঘটনা যাই হোক না কেন প্লেটোর চতুরতা এবং দূরদর্শিতা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

(বিঃদ্রঃ গত পোস্টে কয়েকজন প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে ঘটনাপ্রবাহ অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাই এখন থেকে সবাইকে শুধুমাত্র প্রাসঙ্গিক কমেন্ট করবার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হল)

১২ thoughts on “আটলান্টিসের হারানো জগৎ এবং প্লেটোর দুরভিসন্ধি

  1. আপনার লিখা বিষয়টি সম্পর্কে
    আপনার লিখা বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতি থাকায় আলোচনা থেকে দুরে থাকলাম ।

  2. আপনার উদ্দেশ্য বুঝতে ব্যর্থ
    আপনার উদ্দেশ্য বুঝতে ব্যর্থ হলাম। প্লেটোর মানসিকতার উপসংহার লিখলে ভালো হত।

    1. কারো মানসিকতা বিচার করা হয়নি
      কারো মানসিকতা বিচার করা হয়নি এখানে । একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে প্লেটোর মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাচেতনার হাইপোথিসিস দাঁড় করিয়েছি মাত্র।

  3. লেখাটা কেমন যেন এলোমেলো মনে
    লেখাটা কেমন যেন এলোমেলো মনে হল। হয়তো এই বিষয়ে আমার জ্ঞানের স্বল্পতার কারনে।
    গ্রীক মিথলজি অনেক ভাস্ট মনে হয় আমার কাছে। কোথা থেকে পড়া শুরু করা যায় বলেন তো? কোন বইয়ের কথা বলতে পারবেন?

  4. আপনি কি আর্যদের ইতিহাস তুলে
    আপনি কি আর্যদের ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করলেন নাকি প্লেটোর জীবনাচরণ।
    মিথলজির সাথে প্লেটোর সম্পরক কি?

    1. কোনটাই না। আটলান্টিস এর ধারণা
      কোনটাই না। আটলান্টিস এর ধারণা প্লেটো কেন এবং কিভাবে আনলেন শুধু এটাই পোস্টের আলোচ্য বিষয়। দ্বিতীয় প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *