বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে(৪র্থ পর্ব)




বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সপরিবারে নিহত হওয়াটা কোন স্বাভাবিক ঘটনা নয়।বহুদিনের দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফল এই জঘন্য ঘটনা।সেই সব ঘটনা জানার আগ্রহ থেকে আমি এই সংক্রান্ত নানা বই,দলিল,পত্রিকার কাটিং এগুলো জোগাড় করতে থাকি।আমি এর আগে অনেক অপপ্রচারের জবাব দিতে পারতাম না,না জানার কারণে;এখন পারি।আমি জানি আমার মত আরো অনেকেই এই সমস্যায় পড়েছেন।আমি চেয়েছি আমি যতটা জেনেছি সেটা সবাইকে জানাতে কারণ সত্যের কোন বিকল্প নেই আর যাবতিয় অপপ্রচারের জবাব দিতে এগুলো জানতেই হবে।সেই তাড়না থেকে ধারাবাহিক ভাবে আমি এই বিষয়ে ফেসবুক ও ব্লগে লিখে যাচ্ছি।

আমি এর আগে আরো ৩ টি পর্ব লিখেছিলাম।যারা সেগুলো পড়েন নি তাদের জন্য-
http://istishon.blog/node/4162
http://istishon.blog/node/4182
http://istishon.blog/node/4202

শেষ লেখায় বলেছিলাম আজ বলব মুজিব হত্যাকান্ডে জিয়াউর রহমানের কি ভূমিকা ছিল সেটা।চলুন তাহলে তথ্যের আলোকে দেখা যাক জিয়ার সংশ্লিষ্টতা কতটুকু ছিল।

জিয়ার সাথে ঠিক মির জাফরের না জগৎশেঠের তুলনা করা যায়।জিয়াউর রহমানের প্রচারণা ও মিথ্যাকে সত্য বানানোর ক্ষমতা প্রশংসা(!) করার মত।
যদি কোন বাচ্চাকে প্রশ্ন করা হয়,মুক্তিযুদ্ধের একজন নেতার নাম বলতো যে না থাকলে দেশ স্বাধিন হতনা?বাচ্চারা প্রথমে বঙ্গবন্ধুর কথাই বলবে।কিন্তু যদি বলি আরেকজনের নাম বল,তাহলে উত্তর দিবে জিয়াউর রহমান।
অথচ মুজিবের পর কারো নাম আসলে সেটা হবে তাজুদ্দিন আহমেদ।জিয়ার নাম আসবে আরো অনেক পরে,তাও নেতা হিসেবে না একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে।

কিন্তু তিনি ও পরে তাঁর দল বিএনপি তাকে যেভাবে স্বাধীনতার ঘোষক বানিয়ে দিয়েছে তাতে মনে হয়েছে জিয়ার বক্তব্য শুনে সবাই যুদ্ধে লাফিয়ে পড়েছে!

এবার দেখে আসি সে সময়ের প্রত্যক্ষ দর্শীরা এ ব্যাপারে কি বলেন-

আমি মূলত যে বইটি অনুসরণ করে এই লেখাগুলো লিখছি সেই বই থেকেই প্রথমে উদ্ধৃত করছি।

লেখক আমাদের বলছেন-
“১৯৭১ এ যদি আমার মুক্তিযুদ্ধে সামান্য ভূমিকা না থাকত কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকত তাহলে আমিও এই অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হতাম।৭১ এ মুজিব যখন বন্দি এবং মুক্তিযোদ্ধারা চারিদিকে বিশৃংখল ও অসংগঠিত;সেই সুযোগে জিয়া চেয়েছিলেন বেতার মারফত নিজেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষনা করে ক্ষমতা দখল করতে।স্বাধীনতা তিনি ঘোষনা করেননি।আওয়ামি লীগের কর্মী ও মুক্তিযোদ্ধা দের চাপে তিনি প্রথম ঘোষনার পর বঙ্গবন্ধুর নাম যোগ করে দ্বিতীয় ঘোষনা প্রচার করেন,সেখানেও তাঁর ভূমিকা একজন পাঠক মাত্র।”
৭১ এ স্বাধীন বাংলা বেতারে ‘চরম পত্র’ নামে একটি অতি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রচারিত হত।এর লেখক ও পাঠক ছিলেন এম আর আখতার মুকুল।তিনি তাঁর ‘আমি বিজয় দেখেছি’-বইয়ে বলেছেন একই কথা।তার বই থেকে আমরা জানতে পারি ২৫ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমনের পর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনা পত্র টি টেলিফোনে সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসে জানান।সেখান থেকে এটি চট্টগ্রামের এম এ হান্নান এর কাছে পৌছায় যা তিনি বেতারে পাঠ করেন।
স্টাফ আর্টিস্ট বেলাল মোহাম্মদ (সম্প্রতি প্রয়াত) এর নেতৃত্বে একদল বেতার কর্মী কালুরঘাটে ট্রান্সমিটার স্থাপন করে সন্ধ্যা ৭ টা ৪০ মিনিটে অল্প সময়ের প্রচারণায় ঘোষনা পত্রটি প্রচারের ব্যবস্থা করেন,এটি পাঠ করেন অধ্যাপক আবুল কাশেম।পরদিন ২৭ মার্চ মেজর জিয়া ঐ ঘোষনা টি পাঠ করেন।
যেহেতু যুদ্ধ টি সামরিক তাই একজন সামরিক অফিসারের দ্বারা ঘোষনাটি প্রচারের আলাদা গুরুত্ব ছিল।তবে ঐ সময় জিয়ার বদলে অন্য কোন অফিসার ওখানে থাকলে তিনি ঐ ঘোষনা পাঠ করতেন।

এখন ফিরে আসি স্বাধীন বাংলাদেশে।

‘ইতিহাসের রক্তপলাশ পনেরই আগস্ট পচাত্তর’-বই এ লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন।
লেখকের মতে,৭১ এর আগে দেশে যে আমলা,এলিট শ্রেণী ও বাঙালি সামরিক অফিসার ছিল তাদের বেশির ভাগই দেশপ্রেম থেকে নয়,ব্যক্তিগত লাভের জন্য মুজিব কে সমর্থন করেছেন।কারণ শুধু মাত্র বাঙালি হওয়ার কারণে তারা পাকিস্তানে পদোন্নতি ও অন্যান্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল।
এটা কোন সমস্যা নয়।সমস্যা হয় স্বাধীনতার পরে।
এই শ্রেনিটি একটি নতুন দেশে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে।আগেও তারা ক্ষমতার স্বাদ কিছুটা পেয়েছে বলে সদ্য স্বাধীন নতুন দেশেও তারা এই ক্ষমতার পূর্ণতা পেতে চাইল।স্বাধীনতার পর প্রথমে তাজুদ্দিন এবং পরে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের আমলাতন্ত্র বহাল রাখে।সাধারন মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহনকারী ও অংশ না নেয়া সামরিক অফিসার দের নিয়েই সামরিক বাহিনী গঠন করা হয়।ফলে সামরিক বাহিনী তেও স্পষ্ট বিভক্তি সৃষ্টি হয়।

তো এই অস্থির অবস্থায় মেজর জিয়া অনেক সাবধানতা ও ধূর্ততার সাথে নিজেকে ধীরে ধীরে ক্ষমতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
মুজিব নিহত হলেন।ঘটনার খানিক পর কর্ণেল রশীদের ফোন পান সেনানিবাসে অবস্থানরত ব্রিগেডিয়ার শাফায়াত জামিল। ঘটনায় হতভম্ব ও উদভ্রান্ত অবস্থায় তিনি ছুটে যান কাছেই উপ সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের বাসায়। উত্তেজিত অবস্থায় দরজা ধাক্কাতে থাকেন তিনি, বেরিয়ে আসেন জিয়া। পরনে স্লিপিং ড্রেসের পায়জামা ও স্যান্ডো গেঞ্জি। এক গালে শেভিং ক্রিম লাগানো। শাফায়াত উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, দ্য প্রেসিডেন্ট ইজ কিল্ড। শুনে জিয়া অবিচলিত। তার শান্ত প্রতিক্রিয়া- প্রেসিডেন্ট ইজ ডেড সো হোয়াট? ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার। গেট ইউর ট্রুপস রেডি। আপহোল্ড দ্য কনস্টিটিউশন। এই সংবিধান সমুন্নত রাখার নির্দেশনা মানে এই নয় যে খুনেদের গ্রেপ্তার, বরং তাদের সার্বিক সহায়তা- যার প্রমাণ মিলেছে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে।

বিবিসির সৈয়দ মাহমুদ আলী তাঁর UNDERSTANDING BANGLADESH বইয়ের ১১১ পৃষ্ঠায় বলেছেন-

মূল ষড়যন্ত্র কারী মেজর ফারুক জিয়াউর রহমানের কাছে ২০ মার্চ,১৯৭৫ অভিযানের নেতৃত্ব কামনা করেন।তিনি তাতে অসম্মত হন কিন্তু মেজর দের থামানোর চেষ্টা তিনি করেন নি।

অর্থাৎ জিয়া পুরো পরিকল্পনা জানতেন কিন্তু এতে সরাসরি জড়াতে চাননি কারন তিনি জানতেন এতে পরবর্তীতে তিনি বিপদে পড়তে পারেন।তার লক্ষ ছিল আরো দূরে এবং সে জন্য তিনি খুব সাবধানে আগাতে আগ্রহি ছিলেন।

মুজিব হত্যাকান্ড সম্পর্কে জিয়া আসলে কতখানি জানতেন তার একটি বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায় লরেন্স লিফশুলজের ‘এনাটমি অব আ ক্যু’নামের প্রতিবেদনটিতে। সেখানেও উল্লেখ আছে ১৯৭৬ সালের আগস্টে সানডে টাইমসের সাংবাদিক মাসকারেনহাসের নেওয়া সাক্ষাতকারটির। আর এতে ফারুক ও রশীদ স্পষ্টই বলেছেন অভুত্থানের মাসছয়েক আগে থেকেই মোশতাক এবং জিয়ার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হচ্ছিল। শেখ মুজিবের সম্ভাব্য হত্যাকান্ড সম্পর্কে তাদের মধ্যে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। লিফশুলজ জানাচ্ছেন ফারুকের বর্ণিত ২০ মার্চের অনেক আগেই জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিলো ঘাতকদের।
জিয়া তাদের বলেছিলেন-

‘একজন সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে এতে আমার যোগ দেওয়ার সম্ভব নয়, তবে তোমরা জুনিয়র অফিসাররা যদি কিছু করতে চাও, করো। আমি বাধা দেবো না।’

এই যে সবুজ সংকেত, এটাই ছিল ফারুক-রশীদদের জন্য আশীর্বাদ। লিফশুলজ তার সেই সোর্সের বরাতে এও জানিয়েছেন যে মোশতাক নয়, ফারুক রশীদদের ই্চ্ছে ছিলো অভ্যুত্থানের একটা পূর্ণাঙ্গ সামরিক রূপ দিতে। অর্থাৎ মুজিব হত্যার পর একটি মিলিটারি কাউন্সিল গঠন করে দেশ শাসন। আর এর নেতৃত্বে জিয়াই ছিলো তাদের একমাত্র এবং গ্রহনযোগ্য পছন্দ।

জিয়া তার সত্যিকার অভ্যুত্থানটি ঘটিয়েছিলেন ২৩ নভেম্বর, ১৯৭৫।
সম্ভাব্য শেষ প্রতিপক্ষ কর্ণেল তাহের। গ্রেপ্তার হন তিনি। ফাসির মঞ্চে ওঠার আগে জিয়াকে বিশ্বাসঘাতক বলে প্রকাশ্যেই জবানবন্দী দিয়ে গেছেন তাহের। বঙ্গবন্ধু সে ঘোষণার সুযোগ পাননি। তবে আমরা এখন জানি, মৃত্যুর আগে জেনে গিয়েছিলেন তিনিও।

যে তাহের জিয়া কে বাচিয়ে ছিল সেই তাহের কে হত্যা করতে বিন্দু মাত্র কাপেনি জিয়া।

তবে স্বয়ং ঘাতক দের বিবরণ থেকেই জানা যায় জিয়া হত্যা কান্ডের সাথে জড়িত ছিলেন।
বাংলাদেশে মরণোত্তর বিচারের ব্যবস্থা নেই,থাকলে মোশতাকের সাথে জিয়ার ও বিচার হতে পারত।

জিয়ার ভূমিকা জানার জন্য এই ভিডিও টি দেখার অনুরোধ রইল,এতে আরো অনেক কিছু পরিষ্কার হবে-

এটি লে.কর্ণেল (অব.) নুরুন্নবী বীরবিক্রমের এক সাক্ষাতকার।

৭৫ পরবর্তী রাজনীতি আমার আলোচনার বিষয় বস্তু না।নাহলে আরো কিছু অপকর্ম তুলে ধরতাম।
তো তাঁর দল বিএনপি যে জামাতের সংগ ছাড়তে পারছেনা এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই।

আশা করি জিয়ার ভূমিকা নিয়ে সবাই পরিষ্কার(যারা ইচ্ছা করে অপরিষ্কার থাকতে চায় তাদের জন্য আমার কিছু করার নাই)।

এর পরের পর্ব লিখব মুজিব হত্যায় বিদেশি শক্তির ভূমিকা নিয়ে।
সত্য জানুন,অন্যকে জানান।অপপ্রচারের দাঁত ভাঙা জবাব দিন।

জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু…

২ thoughts on “বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে(৪র্থ পর্ব)

  1. যেখানে যুদ্ধ করে মৃত্যুবরন না
    যেখানে যুদ্ধ করে মৃত্যুবরন না করে খুন হয়ে মরার পর ও বিএনপি জিয়ার নামের আগে শহীদ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানে ঘোষক তো মামুলি ব্যাপার! দেখেন না, আগামীতে জিয়ার নামের সাথে ‘বাংলাদেশের বাবা’ শব্দটিও যোগ হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *