সিপিবির একজন নেতার জবানবন্দি

[সহিদুল্লাহ চৌধুরী। ৬০ দশকে শ্রমিক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন লতিফ বাওয়ানি জুটমিলে। সাধারণ শ্রমিক থেকে উঠে এসেছিলেন শ্রমিক নেতৃত্বের কাতারে। ভূমিকা রেখেছেন ৬০ দশক জুড়ে বাঙালির সব সংগ্রামের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে। খুব বেশি পড়ালেখা করতে পারেননি। প্রাইমারির পাঠ চুকানোর আগেই নেমেছিলেন যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচারণায়। অপেক্ষা করছিলেন ভাসানীকে দেখার। এরপর নিজেই একদিন দায়িত্ব নিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি হিসেবে। এ দেশের বাম রাজনীতির অগ্রগতির পথের বাধা নিয়ে সম্প্রতি এই প্রবীণ নেতা অনেক কিছু বলেছেন সাপ্তাহিককে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে। সেই দীর্ঘ সাক্ষাৎকার থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ এখানে তুলে দেয়া হলো।]

প্রশ্ন : কমিউনিস্ট পার্টিতে তখন তো মতাদর্শগত বিতর্ক চলছিল। পার্টি ভেঙে যাচ্ছিল। সে বিষয়ে কিছু বলুন
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
এটা আমাদের পার্টির ক্ষেত্রে একটা বিরাট ঘটনা। মতাদর্শগত বিতর্কটা নামাঙ্কিত হলো চীনপন্থি ও মস্কোপন্থি বলে। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিল তোয়াহা সাহেব, সুখেন্দু দস্তিদার- তারা চীনা পার্টির মতবাদিক দলিলের পক্ষে অবস্থান নিল। বারীন দত্ত, খোকা রায়, কমরেড আমজাদ হোসেন এই অংশটা মস্কোপন্থি হিসেবে পরিচিত হলো। এই বিরোধ থেকেই কিন্তু পার্টিতে ভাঙন হয়ে গেল। তোয়াহা, আব্দুল হক, মতিন সাহেব, আলাউদ্দিন সাহেব প্রমুখ নেতা পরিচিতি পেলেন পিকিংপন্থি হিসেবে। এরা সবাই ছিলেন আত্মগোপনে। ৬৭ সালে পার্টি ভাগের পর এদের ৪ জন ৬ দফার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে তোয়াহা সাহেবদের দীর্ঘদিন আন্দোলনের ভেতর দিয়ে যে প্রভাবটা গড়ে উঠেছিল সেটা নষ্ট হয়ে গেল। এদিকে, মোজাফফর সাহেব ভাসানী সাহেব থেকে আলাদা হয়ে রিকুইজিশন মিটিং ডেকে ন্যাপের কাউন্সিল সভা করেন। ফলে ন্যাপ বিভক্ত হয়ে গেল। এ বিভক্তির ফলে তাদের জাতীয় শক্তিটা খাটো হয়ে গেল। এ সুযোগে পূর্ব বাংলার আন্দোলনের নেতৃত্ব একচ্ছত্রভাবে তখন শেখ সাহেব এবং আওয়ামী লীগের হাতে সম্পূর্ণ চলে যায়। আমি মূল পার্টির সঙ্গেই রয়ে গেলাম।

প্রশ্ন : কমিউনিস্ট পার্টি ভাঙনের সুযোগে মুজিবের হাতে নেতৃত্ব যায় বলছিলেন। তখন আন্দোলনে কোন পার্টির ক্ষমতা কেমন ছিল?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সেই অর্থে কোনো শ্রমিক সংগঠন ছিল না। শ্রমিক সংগঠন বলতে বুঝাতো বামপন্থিদের। গণসংগঠনগুলো কমিউনিস্টদের দখলে ছিল। ন্যাপ তখন কমিউনিস্টদের প্রকাশ্য সংগঠন হিসেবে চলছিল। কমিউনিস্টদের তখন প্রধান দাবি ছিল গণতন্ত্র আর স্বায়ত্তশাসন। পূর্ব পাকিস্তানের চার কোটি লোকের প্রতিনিধি যে কয়জন হবে পশ্চিম পাকিস্তানের তিন কোটি লোকের প্রতিনিধি ততজন হবে- এটার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল। পূর্বে-পশ্চিমে সমান ভাগে ১৫০ জন করে সংসদ সদস্য হবে- এটা কমিউনিস্টরা মানেনি। দাবি ছিল জনসংখ্যার অনুপাতে সদস্যপদ ভাগ করা। তাহলে রাষ্ট্র কাঠামোতে আমরা বরাবর এগিয়ে থাকতাম। আরো দাবি ছিল পাকিস্তানের অধীনে থাকা পাঁচটা প্রদেশের প্রত্যেকের স্বায়ত্তশাসন থাকবে। অর্থাৎ ফেডারেল রাষ্ট্রর মতো হবে। এই স্বায়ত্তশাসনের দাবিটা একটানা কাজ করে জনপ্রিয় করে তুলেছিল কমিউনিস্টরা। মানুষও এই গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে অবস্থান নিল। তখন পরিস্থিতি বিবেচনা করে ৬৫ সালের যুদ্ধের পরে শেখ সাহেব ৬ দফা দাবি উত্থাপন করল।
৬৫ সালের যুদ্ধ থেকে বাংলার মানুষ বুঝল পূর্ব পাকিস্তান বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নাই। এটা যে কোনো সময় ভারতের আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে যেতে পারে। নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কটা শুধু কাগুজে। মানুষ তাই স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে দাঁড়াল। এই আন্দোলনটা কিন্তু বামপন্থিদের করার কথা ছিল। পার্টির ভাঙন না হলে এ স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে কমিউনিস্টদের বাদ রেখে আন্দোলনে যাওয়া আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্ভব হতো না। একটা ঐক্য হতো এবং ঐক্যের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হতো বাংলাদেশের নেতৃত্ব। জেল খাটল, নির্যাতিত হলো বামপন্থিরা কিন্তু ফলাফল নিয়ে চলে গেল আওয়ামী লীগ।

প্রশ্ন : ভাঙন, মেরুকরণ কমিউনিস্টদের ভেতর তখন কি প্রভাব ফেলেছিল?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
ওই সময় আমরা পার্টিটাকে রক্ষা করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। শ্রমিক সংগঠন আমাদের থাকল না। শ্রমিকদের প্রায় পুরোটাই চলে গেল চীনপন্থিদের হাতে। কৃষক সংগঠনের হাতেম আলী আমাদের সাথে ছিল আর বাকি অংশ চলে গেল চীনপন্থিদের সঙ্গে। তোয়াহা সাহেব তো পরে আলাদা পার্টি করলেন। আগে তিনি শ্রমিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। আর আব্দুল হক কৃষক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। পার্টি ভাঙনের আগ পর্যন্ত পূর্ব বাংলায় বিপ্লব প্রশ্নে কমিউনিস্ট কর্মীরা আশাবাদী ছিলেন। পার্টি ভাঙনের ফলে সেই আশাটা আর থাকল না।
আমার কাছে বার বারই মনে হয়েছে, এটা আমাদের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ভুল। যখন আমরা সর্বেসর্বা, সবখানে আমাদের জয়জয়কার, যখন ছাত্র ইউনিয়ন সবচেয়ে বড় সংগঠন, যখন শ্রমিক, কৃষক, সব ক্ষেত্রেই আমরা শক্তিশালী ঠিক তখনই নেতারা পার্টি ভাঙলেন। নেতারা তখন একগুঁয়েভাবে মতবাদিক বিতর্ক চালালেন। কিন্তু তারা জনগণের দুঃখ-দুর্দশার কথা বিবেচনা করলেন না। পার্টি না ভেঙে তখন উচিত ছিল পূর্ব বাংলা মুক্ত করার লড়াইটা এগিয়ে নেয়া। সেই লড়াই সম্পন্ন হলে মতবাদিক বিতর্ক শুরু করা যেত। জনগণ যেসব দাবিতে পার্টির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল এটার কোনো মূল্য কমিউনিস্ট নেতারা দিল না। এর ফল ভোগ করছেন সবাই আজ অবধি।

প্রশ্ন : কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেন। পার্টি ভাঙনের শিকার হলো। এই অবস্থায় দেশ তো উত্তাল। জাতীয় রাজনীতির মধ্যে কবে এলেন? কিভাবে?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
৬৮ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও অন্যান্য সংগঠন মিলে ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি (ডাক) গঠন করল। এটা ছিল ঐতিহাসিক এক রাজনৈতিক জোট। এর মধ্যে জামায়াত, নিজামে ইসলাম, ন্যাপ, আওয়ামী লীগ, সবই ছিল। দুটো দাবি ছিল এই জোটের। গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তি। এ দাবিতে তারা হরতাল আহ্বান করে পুরো পাকিস্তানে। তখন হরতালের সমর্থনে আমরা শ্রমিকরা মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিলাম। শ্রমিক বেল্টে সমস্ত দায়িত্বটা আমার কাঁধে এসে পড়ল। কারণ সভাপতি তো আন্দোলনের মানুষ না। আমরা হরতাল সমর্থন করে কারখানা বন্ধ করলাম। ১৪৪ ধারা ছিল। আমরা ভাঙলাম। বিপুল জনগণ আমাদের সঙ্গে আসল।
এ সময় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা ছিল। যখন সংগ্রাম কমিটির কার্যক্রম শ্রমিক এলাকায় সংগঠিত করার বিষয়ে মিটিংয়ে বসলাম কেউ কোনো দায়িত্ব নিতে চায় না। যদিও অনেক প্রবীণ নেতা সেখানে ছিল। সংগ্রাম কমিটিতে টেক্সটাইল মিলে আব্দুল আজিজ, করিম জুট মিলে ফটিক সর্দার প্রমুখ নেতা ছিল। নানান দলের লোকদের নিয়ে মিটিং হলো। কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার মানুষ রইল না। সব আমার ওপর চাপিয়ে দেয়া হলো। আমি দায়িত্ব নিলাম। এরপর শুরু হলো ১১ দফার আন্দোলন। কিন্তু নভেম্বরের হরতালের পর ডাক আর কোনো কর্মসূচি দিল না। তখন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সামনে চলে আসে।
১৯ তারিখ আসাদ শহীদ হলো। ২০ জানুয়ারি হরতাল ডাকা হলো। ২৪ জানুয়ারি আবার হরতাল ডাকা হলো। পল্টনে সেদিন সমাবেশও হবে। আমরা হরতাল করছিলাম। আদমজী থেকে খবর এলো তারা হেঁটে ঢাকা আসছে। আদমজী থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার লোক তারা হেঁটে ঢাকা আসল। এক দেড় ঘণ্টার রাস্তা হেঁটে শ্রমিকরা আসল। আমরাও তাদের সঙ্গে যুক্ত হলাম। শ্রমিকদের মিছিল ছিল সবচেয়ে বড়। সব মিল মিলে প্রায় এক থেকে সোয়া লাখ লোকের মিছিল হলো। শ্রমিকরা আসার পরই, সচিবালয়ের দক্ষিণের গেট ভেঙে ফেলল। আর্মি চার্জ শুরু করল। সমস্ত ঢাকা শহর মানুষের ঢল। দৈনিক বাংলা, রাজারবাগ প্রভৃতি এলাকা জনগণের দখলে চলে গেল। এসবকেই এখন বলা হয় ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান।
১১ দফায় পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলা হয়। ব্যাংক বীমা, জাতীয়করণসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার দাবিই তোলা হয়। জনসংখ্যার অনুপাতের ভিত্তিতে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। গণমুখী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। অনেক গণমুখী কর্মসূচি আসল। যেমন সর্বজনীন ভোটাধিকার, বন্দী মুক্তি, সিয়ার্টে সেন্টেন, পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শ্রমিক কৃষকের জন্য প্রগতিশীল একটা গণমুখী কর্মসূচি আসল। সেখানে শ্রমিক কৃষকদের দাবিও সুনির্দিষ্টভাবে উঠে আসে। জনগণও এতে সাড়া দেয়। মানুষ যখন একত্রিত হয় তার শক্তিটা যে কী পরিমাণে বেড়ে যায় তা আমাদের জীর্ণশীর্ণ শ্রমিক শ্রেণী বাস্তবে প্রমাণ করে দেখিয়েছিল। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস আসলে শ্রমিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস।
ছোট ছোট ৫-৬ হাত বাঁশের খুঁটি সকলের হাতে হাতে। হাতের কাছে যে যেভাবে পারছে গাছের ডাল ভেঙে অস্ত্র বানাচ্ছে। মিছিল যখন ডেমরা পার হলো তখন মিছিলে লাখ লাখ লোক। মিছিল ঢাকায় ঢুকতেই পারল না। একটা অংশ পল্টন এলাকায় আসার পরেই জায়গার অভাবে আর এগোতে পারেনি। টঙ্গী, তেজগাঁওর শ্রমিকরাও বের হয়ে আসল। ঢাকায় অভ্যুত্থান বা ওই সমাবেশে তখন শ্রমিকদেরই প্রাধান্য ছিল। কিন্তু নেতৃত্ব ছিল ছাত্র নেতাদের হাতে। পল্টনের পশ্চিম দেয়ালের কোণে এক জায়গায় বালির বস্তা দিয়ে আর্মিরা অবস্থান নিয়েছিল। এক ধাক্কায় সেটা কোথায় চলে গেল। বর্তমান শিক্ষা ভবনের নিকটবর্তী প্রাদেশিক রেলমন্ত্রী সুলতান আহমেদ এর বাসভবনে বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালাল। দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকা ভবনেও আগুন লাগানো হয়। পরবর্তীতে এটার নাম হয় দৈনিক বাংলা। ডেইলি অবজারভার ভবনেও আগুন লাগানোর চেষ্টা করা হয়।
অভ্যুত্থানে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে বেশি।
আইয়ুব খানের পতন হলো। এর মধ্যে দিয়ে শ্রমিকরা রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশীদার হয়ে গেল। ঢাকা শহরে তখন ছাত্র সংখ্যা ২০ হাজার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা ৫ হাজার। আর সারা শহরের জনসংখ্যা ১০ লাখ। শুধু ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে কিছু হয়নি। মূল শক্তি সমাবেশ করেছিল কিন্তু শ্রমিকরাই। সচিবালয়ের কর্মচারী, কর্মকর্তারা নেমে এসেছিল। অফিস আদালত থেকে কর্মচারীরা নেমে এসে মিছিলে শরিক হয়েছিল। পুরো প্রশাসন তখন স্থবির হয়ে পড়ল। আইয়ুব খান বাধ্য হয়ে নির্বাচন ঘোষণা করল।

প্রশ্ন : ৭ মার্চের ভাষণ শুনতে গিয়েছিলেন? পার্টির বক্তব্য তখন কী ছিল?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
আওয়ামী লীগ নিজেই তো তখন ঠিক বলতে পারছে না কি হবে। একটা অনিশ্চয়তা কাজ করছিল সবার মধ্যে। ইয়াহিয়া খান আসল সমাধানের জন্য। কিন্তু সমাধান হলো না। ৭ মার্চের ভাষণের সময় আমরা শ্রমিকদের নিয়ে হেঁটে চলে আসলাম উদ্যানে। পার্টিও যোগদান করার জন্য আমাদের বলল। ৭ মার্চের পর পার্টি বলল এটা আর কোনো শান্তিপূর্ণভাবে ফয়সালা হবে না। যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। সেই নির্দেশনার উপর ভিত্তি করে আমরা প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম। ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটি আমাদের ডেমরা-শিল্পাঞ্চল এলাকায় ট্রেনিং নেয়া শুরু করল। এগুলো এখন হাস্যকর ব্যাপার মনে হবে। মরিচের গুঁড়া কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, তীর ধনুক দিয়ে টার্গেট প্রাকটিস করেছি। তখনও আমরা বুঝে উঠতে পারিনি। যুদ্ধের বাস্তবতা কি।

প্রশ্ন : যুদ্ধের পরপর কি অনুভূতি হলো আপনার? স্বাধীন দেশ! কি পেলেন, কি পেলেন না?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
মুক্তিযুদ্ধের পর আমাদের মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত এরাই তো শাসক শ্রেণীতে পরিণত হলো। ধনী মালিকদের ব্যবস্থাপনার একটা রাষ্ট্র। কিন্তু সেই ধনী মালিক বা বুর্জোয়া নেই। মানুষ এই মধ্যবিত্তদের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন করল। কিন্তু সম্পূর্ণভাবে মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব বিশ্বাসঘাতকতা করল। আমাদের স্বাধীনতা যেমন বীরত্বের-গৌরবের, তেমনি স্বাধীনতা হলো বিশ্বাসঘাতকতারও। বিশ্বাসঘাতকতা হলো, শ্রেণী বিশ্বাসঘাতকতা। এখানকার মেহনতি মানুষ, কৃষক সমাজ, যারা এই যুদ্ধের মূল ভিত্তি, তাদের মুক্তিটা এলো না। সংবিধানে চারটা মূল রাষ্ট্রীয় নীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, এই কথাটা ছাড়া আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার কোনো সুফল পায়নি। যা পেয়েছে তা একটা বিশেষ শ্রেণী, বড় মালিকরা আর তাদের সহযোগীরা।

প্রশ্ন : দেশ গঠনের পর কমিউনিস্ট পার্টিতে আপনার ভূমিকা কি ছিল?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
আমি সে সময় পার্টির নীতিনির্ধারণীতে ছিলাম না। কিন্তু নীতি বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে ভূমিকা ছিল। দেশ স্বাধীনের পর পার্টির কাজের ধারা ও চিন্তা-চেতনার জায়গাটা পরিবর্তন হয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধের আগে পার্টি বলতো, পাকিস্তানি উপনিবেশ থেকে মুক্ত করা এবং ২২ পরিবারের হাত থেকে মুক্ত করা। কিন্তু ৭২ এ নতুন নীতি গ্রহণ করা হলো, দেশ পুনর্গঠনকেই পার্টি প্রধান কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করল। অর্থাৎ যে নীতিটাকে রাষ্ট্র গ্রহণ করছে সেটা ধরে পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের জন্য অগ্রসর হওয়া। ফলে যে মধ্যবিত্তরা ক্ষমতায় আসল, তাদের সহযোগিতার নীতি নিল পার্টি।
৭৩ এর কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে পার্টির কর্মসূচিতে পরিবর্তন আসল। এখন কর্তব্য হিসেবে ধরা হলো, জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা। অর্থাৎ বুর্জোয়া বিপ্লব সম্পন্ন করে এগোতে হবে। মস্কোপন্থি পার্টি যারা ছিল তারা সকলেই তখন এ নীতি গ্রহণ করে। প্রথমে ৭৩-এর কংগ্রেসে গৃহীত সিদ্ধান্তের মধ্যে বলা হলো যে বিপ্লবী প্রক্রিয়া আরম্ভ হচ্ছে। পরে আমরা এটা বলেছি যে, এটা আমাদের ভুল ধারণা ছিল। এটা বিপ্লবী প্রক্রিয়া নয়, এটা প্রগতিশীল প্রক্রিয়া। এরা অর্থাৎ আওয়ামী লীগ প্রগতিশীল ধারা ছিল। এই ৭৩ এর কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে আমি প্রথম পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হলাম।

প্রশ্ন : দেশ স্বাধীনের পর সিপিবির কর্মকাণ্ড নিয়ে তো বাম মহলে অনেক সমালোচনা। আপনি সেই পার্টির একজন? সিপিবির পুনঃপৌনিক ভুলের উৎস কি?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
একথা অনস্বীকার্য যে, দেশ স্বাধীনের পরেই আমাদের পার্টি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তার মধ্যে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তার মধ্যে ছিল পার্টি গোপন থেকে প্রকাশ্য করা আর পার্টিটাকে দ্রুত বড় করার যে সাধারণ লাইন। পার্টি দেশব্যাপী একটা বড় পার্টি হয়ে উঠবে এ লক্ষ্য থেকে এগুতে গিয়ে সাংগঠনিকভাবে লেনিনবাদী যে মূলনীতিগুলো পালন করার কথা ছিল, নীতিগতভাবে তা থাকলেও এগুলোর খুব কমই পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। মধ্যবিত্তের একটা অংশ শ্রেণীচ্যুত হয়ে পার্টিতে আসবে- এটা স্বাভাবিক। মণি সিং, বারীন দত্ত এরা মধ্যবিত্ত থাকে নাই। কারণ সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব স্বীকার করার মধ্য দিয়েই যখন একজন মানুষ কমিউনিস্ট পার্টিতে আসে তখন সে আর মধ্যবিত্ত থাকে না।
কিন্তু আমাদের যে নেতারা পরে বেরিয়ে আসল তখন পার্টি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। অর্থাৎ আদর্শ হিসেবে তারা কমিউনিজমকে গ্রহণ করে পার্টিতে আসল। কিন্তু তাদের স্বভাবের মধ্যে মধ্যবিত্ত ভাবধারা রয়ে গেল এবং ব্যক্তিজীবনে ওই স্বভাব বৈশিষ্ট্য বহাল থাকল। এগুলো তারা পরিত্যাগ করতে পারেনি। ফলে যখন পার্টি সঙ্কটে পড়ল তখন তারা পার্টি ছেড়ে চলে যেতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। ৭৩-এর কংগ্রেসে আমরা আওয়ামী লীগকে প্রতিক্রিয়াশীল বলি নাই, বলেছি মধ্যবিত্ত বুর্জোয়াদের দল। তখন জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবে আওয়ামী লীগের মধ্যে যে সম্ভাবনার জায়গাটা রয়ে গেছে সেটাকে চিহ্নিত করতে চাচ্চিলাম। তা না হলে আমরা আওয়ামী লীগকে সে সময় উচ্ছেদের লাইন নিতাম। আমরা তা করিনি। আমরা সহযোগিতার লাইন নিয়েছি। আওয়ামী লীগকে শ্রেণী হিসেবে প্রগতিশীল বুর্জোয়া হিসেবে আমরা দেখেছি। যেহেতু জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবে বুর্জোয়াদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে তাই লাইনগত কারণেই তাদের আমরা পাশে রাখতে চেয়েছিলাম। এ ছিল আমাদের মূল্যায়ন। আমরা তাদের জাতীয় বুর্জোয়া চরিত্রের দল হিসেবে দেখতাম।
পার্টিতে যে মূল সমস্যার জায়গাটা তা হলো, শ্রমিক থেকে আগত লোকজন অত্যন্ত কম। লেনিন বলেছিলেন, কমিউনিস্ট পার্টিতে শ্রমিকদের সংখ্যা সবসময় বেশি হবে। কিন্তু আমাদের এখানে শ্রমিক শ্রেণী সবসময় সংখ্যালঘিষ্ঠ। আর নেতৃত্ব সবসময় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হাতে ছিল। আমাদের শ্রমিকরা, শ্রেণী হিসেবে ও চিন্তা-চেতনার দিক থেকে এখনো সে রকম উন্নত না। এবং সাধারণভাবে যারা এখানে আসে তারা কাজকর্মের দিক থেকে অনেক অগ্রসর কিন্তু চিন্তা-চেতনার দিক থেকে তেমনটা না। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে, নীতিনির্ধারণী স্তরে গিয়ে ভুল করে। এসব কারণে তারা সামনে আসতে পারে না।
শ্রমিক কৃষকের মধ্য থেকে যারা আসছে তারা তো মার্কস লেনিন বুঝে বা আত্মস্থ করে যে পার্টিতে এসেছে তা তো নয়, একটা প্রত্যক্ষ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তারা পার্টিতে এসেছে। ফলে, তারা কমিউনিস্ট কিন্তু পরিস্থিতি বিশ্লেষণের জন্য যে ত্বত্তীয় জ্ঞান থাকার দরকার তা তাদের ছিল না বা নেই। আমাদের পার্টিতে এ রকম অনেক শ্রমিক নেতা ছিলেন, যেমন সুনীল রায়, মকবুল হোসেন শ্রমিক ছিলেন, সে অবস্থা থেকে তারা কেন্দ্রীয় কমিটিতে এসেছিলেন। এদের রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে, নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতা ছিল। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ শ্রমিক নেতারা পার্টিকে নেতৃত্ব দিতে পারেননি।

প্রশ্ন : পার্টি বিলুপ্ত করে দেয়ার বিষয়টা নিয়ে বলুন।
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
৫ম কংগ্রেসেই একটা কমিশন করা হয়, কমরেড অজয় রায় কমিশন। ঐ কমিশনে যারা বেরিয়ে গেল তারা মত দিল যে, ধর্মের উপর যে মানুষের প্রবল বিশ্বাস, এর ফলে কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে জনগণের আস্থা নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা কম। যদি ক্ষমতায় যেতে হয় তাহলে কর্মসূচি ভিত্তিক, নাম পরিবর্তন করে অন্য নাম দিয়ে বিপ্লবী ধরনের পার্টি অর্থাৎ মার্কসবাদ থাকবে তবে লেনিনীয় মূলনীতিগুলো থাকবে না। এ প্রস্তাবটা নিয়ে আসল আমাদের যে ৬ জন সংসদ সদস্য ছিল তারা। নেতা ছিল শামসুজ্জোহা। প্রথমে মানিক ভাইরা সাহস পায়নি। জোহা সাহেবই প্রস্তাব নিয়ে আসল যে বিকল্প একটা পার্টি করে আশু কর্মসূচি ভিত্তিক একটা পার্টি করা যায় কিনা। সাইফুদ্দিন মানিক তখনও কোনো অংশে যাননি। পার্টির অধিকাংশ মেম্বার তার দিকে তাকিয়ে ছিল যে, সে কোন দিকে অবস্থান নেয়। এ অবস্থান যতক্ষণ ছিল, জোহা সাহেবেরা মাইনরিটি ছিল পার্টির মধ্যে। মানিক ভাই যখন পার্টির বিপক্ষে অবস্থান নিল, তখন আমরা মাইনরিটি হয়ে গেলাম। শামসুজ্জোহারা ছিল সুবিধাবাদী। এরা কমিউনিজমের আদর্শ ছেড়ে দিয়ে সুবিধাবাদীদের দলে চলে গেল।
মানিক ভাই, তার সঙ্গে তো আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তিনি কিন্তু আমাকে কখনো পার্টি ছাড়তে বলেননি। আমার মনে হয় উনি ভয় পেয়েছিলেন। কারণ সে সময় রাশিয়ান পার্টি কোনো কোনো নেতাদের অর্থ সহায়তা করত। তার তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছিল বিশ্বজুড়ে। বিভিন্ন বিদেশি দেশি এজেন্সি এ নিয়ে অপপ্রচার চালায়। তৎকালীন রাশিয়ান পার্টির সাথে আমাদের একটা সম্পর্ক ছিল। তারা নানাভাবে আমাদের সাহায্যও করেছিল। যেমন ছাত্র টিউশন, ছাত্র বৃত্তি, কোটি কোটি টাকার বই ইত্যাদি সহযোগিতা পেতাম আমরা। টিইউসি সে সময় কোনো না কোনো ধরনে ৬ হাজার ডলার মাসিক সহযোগিতা পেত। এটা তো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানিক ভাই পার্টিতে এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলল। পরে বেরিয়ে যান।

প্রশ্ন : আপনি তো তখনই কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি হয়েছিলেন। আপনিও তো শ্রমিক। কিভাবে পারলেন?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
আমি ব্যক্তিগত জীবনে অর্থাৎ আমার রাজনৈতিক জীবনে, তত্ত্বীয়ভাবে পরিপক্ব হওয়ার কোনো সুযোগই পাইনি। ব্রিটিশ আমলে বা পাকিস্তান আমলে, শিক্ষাটা হতো জেলখানায়। কিন্তু আমি তো কখনোই একটানা জেলে থাকি নাই। ফলে, সে সুযোগটা হয়ে ওঠেনি কখনো। এ রকমও কমরেডরা ছিলেন যারা বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। কিন্তু আমার সংগ্রামী জীবনে ৪৬ দিন মাত্র হাজতবাস করেছিলাম।
১৯৯৩ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির মেম্বার ১৫ জন, ১৫ জনের মধ্যে ১০ জন প্রেসিডিয়াম মেম্বার বেরিয়ে গেলেন। তখন কিন্তু আমিই কমিউনিস্ট পার্টির দায়িত্বভার গ্রহণ করলাম। কঠিন অবস্থা ছিল সেই সময়। আমি আর কমরেড সেলিম ছিলেন আমাদের সঙ্গে। আমাদের সঙ্গে আরও ১১ জন ছিল। ৭৫-এর মধ্যে মাত্র ১৩ জন আমাদের সঙ্গে ছিল। এ রকম কঠিন সময়ে আমি পার্টির হাল ধরলাম। আবার মনজুরুল আহসান খান এবং জসীমউদ্দীন মণ্ডলকে অতিক্রম করে আমি পার্টির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হই। এটাও চ্যালেঞ্জের ছিল।
আমি কিন্তু পরে ধীরে ধীরে সরে যাই। আমার কোনো সমালোচনা ছিল না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করতে হয়, করা দরকার সে ভূমিকা আমি নিতে পারিনি। কারণ পার্টির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়ভার বহনের জন্য যে পারিবারিক অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকা দরকার সেটা আমার ছিল না। পরিবারের ন্যূনতম সামর্থ্য যদি না থাকে, তবে এ রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ এ দুর্বলতার কারণে একটা ভীতি কাজ করে। যেমন আজ একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার অনুভব করছি, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিলে সেটা পালন বা বাস্তবায়নের জন্য যে ন্যূনতম সম্পদ প্রয়োজন সেটা আমাদের হাতে নেই। তাহলে কিভাবে হবে? কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তাই নিজস্ব সামর্থ্য থাকতে হয়। এ সমস্যাটা একটা সময় পর্যন্ত আমাদের মতো দেশে থাকবেই। কথা হলো আমাদের পার্টিগুলো তো অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল না। এখন বাসদ গণমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্পদ সংগ্রহ করে- এটা একটা উপায়। কিন্তু তারপরও খুব প্রয়োজনীয় বিষয় মেনটেইন করা সম্ভব হয় না। তার মধ্যেও যাদের পারিবারিক বা সাংসারিক জীবন নেই তাদের বিষয়টা আলাদা। অনিল মুখার্জি, জ্ঞান চক্রবর্তী এরা তো আর ঘরসংসার করেন নাই। এদের বিষয়টা ভিন্ন। যেমন আমার সংসার আছে, আমি যে খুব ভালোভাবে সংসার করছি তা না। আবার পরিবারের সে সামর্থ্য নেই যে সেখান থেকে অর্থ নিয়ে পার্টিতে দেব।
৯৯ সালে আমি স্বেচ্ছায় সভাপতি পদ থেকে সরে দাঁড়ালাম। আমি মনে করি যে, পার্টিতে নতুন মানুষ, নতুন নেতৃত্ব আসা দরকার। আমি পরে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের দায়িত্ব নিলাম দেখলাম, এটাও শ্রমিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। আর আমি শ্রমিক আন্দোলন করে আসা মানুষ।

প্রশ্ন : শ্রমিক নেতৃত্ব পার্টিতে বিকশিত হওয়ার পথে তাহলে প্রধান বাধা হিসেবে কোনটাকে দেখলেন?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
এক নম্বর হলো, পার্টি শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল হলে এটা হতো না। শ্রমিকদের ফেডারেশন, ইউনিয়ন থাকে। অর্থ সঙ্কুলান কঠিন হয় না। কিন্তু এখন এই সমস্যাটা থাকবেই। একজন শ্রমিক চাকরি বাদ দিয়ে পার্টির দায়িত্ব পালন করলে তার পরিবার কে দেখবে? সে নেতা হতে পারবে না। এই সমস্যা আমাদের দেশে আরো কিছুকাল চলবে।

প্রশ্ন : পার্টির নেতৃত্বে যখন ছিলেন তখন কি পার্টির আওয়ামী ঘেঁষা নীতিতে পরিবর্তন আনার কোনো চেষ্টা করেছিলেন?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
একটু পেছন থেকে বলি। স্বাধীনতার পরপর ৭৩ সালে সম্ভবত, আওয়ামী লীগের সঙ্গে গণ ঐক্যজোট করলাম। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ আর আমরা ছিলাম জোটে। জোট মানেই তো সামষ্টিক কাজ ও সক্রিয়তা। জোট হলো একটা। কিন্তু কোনো কিছু হতো না। বছরে একটা মিটিং হতো- আর কিছু হতো না। এবং পুরো জোটে, সমস্ত সিদ্ধান্ত বুর্জোয়া পার্টি হিসেবে আওয়ামী লীগ তার মতো করে চালাত, এখানে কমিউনিস্ট পার্টি, জোটের যত বড় অংশীদারই হোক না কেন নীতি প্রণয়নে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। কোনো অবস্থাতেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সে সময় এ ধরনের জোটে যাওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না।
কমিউনিস্ট পার্টি যদি জোটে না গিয়ে স্বাধীন অবস্থানে থেকে আওয়ামী লীগের পজেটিভ কাজের সমর্থন, অন্যায় কাজের সমালোচনা অর্থাৎ বিরোধী দলের ভূমিকাটা নিতে পারত তবে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য রকম হতে পারত। এটা কমিউনিস্ট পার্টির একটা মারাত্মক ভুল ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। এটা দেশের গণতন্ত্রের জন্য এবং জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের জন্য একটা বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াল। সে সময় সিরাজ সিকদাররা যে আন্দোলনে ছিলেন বা হক, আলাউদ্দিনরা যে নকশাল বাড়ির লাইনে এগোচ্ছিলেন তাও সঠিক ছিল বলে আমরা মনে করতাম না। তা সত্ত্বেও সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে তাদের আন্দোলন ধ্বংস করার মতো কোনো লাইনে বা নীতিতে আমরা ছিলাম না।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থাকার ফলে, উভয় সঙ্কটে পড়ল পার্টি। তাদের যে কর্মকাণ্ড, সেটাকে সমর্থনও করা যায় না, আবার তারা যে নির্যাতন চালাচ্ছে এটার প্রতিবাদও করা যায়নি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে অনীল মুখার্জির প্রধান ও তাত্ত্বিক ভূমিকা ছিল। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সহযোগিতা ছিল দক্ষিণপন্থি বিচ্যুতি। ওই লাইন নিয়েই কিন্তু আমাদের এক সময়ে মূল্যায়ন দাঁড়ালো জিয়া দেশপ্রেমিক। এটাতো পরোক্ষভাবে জিয়াকে সমর্থন করা।

প্রশ্ন : পার্টির এই দক্ষিণপন্থি বিচ্যুতির কারণ কি ছিল?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
অনীল মুখার্জি ছিলেন জমিদার বাড়ির লোক। সেখান থেকে চির বিপ্লবী। তিনি এ ধরনের ঝোঁকের মধ্যে পড়ার কারণ হলো- রানদৌভের থিসিস। ১৯৪৭ সালে যে ভুলটা কমিউনিস্ট পার্টি করল, তাতে আমাদের অনেক কমরেডকে জীবন দিতে হয়েছিল। অনেককে জেলে যেতে হয়েছে। পার্টি নিষিদ্ধ হয়। এই উগ্রপন্থা থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে, পার্টিকে নিরাপদ করতে গিয়ে তিনি লড়াইয়ের লাইন থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। ৪৭ সালে অনেক নামকরা বিপ্লবী কোলকাতায় চলে গেল। ফলে ১২ হাজার পার্টি মেম্বারের মধ্যে থাকল মাত্র তিনশ। এখান থেকেই তৈরি হলো রক্ষণশীলতা। মা যেমন তার বাচ্চাকে কোলের মধ্যে রাখতে চায়, তেমনি কোন ধরনের বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে অনিল মুখার্জী তখন যেতে চাননি। ফলে দক্ষিণপন্থি বিচ্যুতির মধ্য দিয়ে পার্টি এগিয়েছে। আর এ কারণে পার্টি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আরো একটা দিক আছে। ’৬০-এর দশকে বিপ্লব করতে যারা মুসলিম ঘর থেকে আসল তারা চীনপন্থার নেতৃত্ব দিলেন। মুসলিম লিডারদের বড় অংশ বেরিয়ে গেল। থেকে গেল মাইনরিটি। অর্থাৎ সিপিবিতে ওই সময়ে হিন্দু পরিবার থেকে আসা বিপ্লবীদের বড় অংশ থেকে গেল। যেমন দীপন দত্ত, মুকুল বোস, মনি কৃষ্ণ সেন, পাবনায় আমিতাভ লাহীড়ি। ধারাটা হলো, বিপ্লবীবাদী আন্দোলন, তারপর আন্দামানের দ্বীপান্তর জেল থেকে বেরিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান সেখান থেকে ৪৭ সালে উগ্রলাইন। সেখানে আবার ধাক্কা খাওয়া। ঐ ধারারই নেতা ছিলেন অনিল মুখার্জি। আর হক বা তোয়াহা সাহেবরা তো অনেক পরে আসলেন। ফলে সিপিবির মধ্যে এই বিচ্যুতির বীজ ছিলই। এই দক্ষিণপন্থা নিয়ে, সঠিক বুঝাটা না নিয়ে ৯০ পর্যন্ত পার্টি এগিয়ে গেল। এর সাধারণ পরিণতিতে, ৯০-এ যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটল, কমিউনিস্ট পার্টির সামনের সারির নেতারা, যারা তিন দশকে গড়ে উঠল, যারা মূল নেতৃত্ব অর্থাৎ পরীক্ষিত নেতৃত্ব ছিল, তারা একযোগে নাই হয়ে গেল।

প্রশ্ন : দেশ স্বাধীনের পর পার্টির অগ্রসরতার পথে বাধা ছিল কি? কিছু নতুন দল ছিল, তাদের কিভাবে দেখতেন?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
জাসদকে আমরা সিপিবি জন্মলগ্ন থেকে নেগিটিভলি দেখি। জাসদের মধ্যে অনেক ত্যাগী নেতা ভালো লোক ছিল কিন্তু তার যে লিডারশিপ তার যে রাজনৈতিক বক্তব্য এটা কমিউনিস্ট আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য। এক সময় তারা যে স্লোগান দিয়েছিল, আজ তাদের উল্টো স্লোগান দিতে হচ্ছে। এটা নেগেটিভ ফোর্স ছিল। সিরাজ সিকদারের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।
৭৪ সালে বাকশাল হয়, গণঐক্য জোট ব্যর্থ হলে তখন কমিউনিস্ট পার্টি সিদ্ধান্ত নিল, এই ঐক্যে জোটের কোনো কার্যকারিতা নেই। সেই সময় যে পরিস্থিতি দাঁড়াল, দুর্ভিক্ষ-বাকশাল, সব মিলিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি সিদ্ধান্ত নিল প্রগতিশীল ধারাটাকে রক্ষা করতে হবে। এটা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কোনোভাবেই রক্ষা হবে না। এখন, নতুন একটা মৈত্রী জোট করে যে পার্টি যেখানে থাকুক না কেন! কিন্তু শেখ সাহেব বললেন, না মৈত্রী জোট করে হবে না এক দলে এসে পড়। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিন্তু বাকশালকে সমর্থন করেনি। মৈত্রীজোটের যে প্রস্তাব করেছিলাম সেটাকে তারা সমর্থন করেছিল। কমিউনিস্ট পার্টি স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে আলাদা একটা জোটে যাওয়ার পক্ষে ছিল তারা। বাকশাল নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। বাকশাল যারা সমর্থন করেছিল তারা কেউ কমিউনিস্ট পার্টিতে থাকল না।
এরপর মুজিবের হত্যাকে আমরা প্রতিবিপ্লব হিসেবে দেখি। এবং সে সময় স্বাভাবিকভাবেই এর বিপক্ষে অবস্থান নেই। আমরা তো এটার প্রতিরোধ করার চিন্তা করি। অনেকে বলেন যে খালেদ মোশাররফের সঙ্গে সিপিবির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মুজিব হত্যার পর আওয়ামী লীগ কিন্তু দাঁড়াতে পারেনি। আমরা কিন্তু মাঠে ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে মিছিল বের হলো, সেখানে খালেদ মেশাররফ এর মা যুক্ত হয়ে যান। এই প্রথম মিছিল হলো নভেম্বরের তিন তারিখে। ওই দিন রাতে খালেদ মোশাররফরা ক্যু করল।
মোশতাক যুদ্ধের সময় থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার জন্য প্রচুর মুভ করেছিল। এক সময় ভাসানীও তাই মনে করল। এই কনফেডারেশনের প্রশ্নে ভাসানীকে অন্তরীণ করা হয়। আওয়ামী লীগের ভেতরে মোস্তাকসহ অনেক লোকজন ছিল, যারা কনফেডারেশন চাইত। তাছাড়া আপসের লাইনে অনেকেই ছিল। ভাসানী অন্য আর একটা পক্ষ ছিল। মোস্তাক সরকারকে আমরা প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করি। জিয়া যখন আসল আমরা এটাকে একটা ব্যালেন্স মনে করলাম। ৩ মার্চ যে ঘটনাগুলো ঘটল, জিয়া আসার পর কিন্তু একটা ব্যালেন্স হলো। যদিও সে জামায়াতকে নিয়ে গেল রাজনৈতিক মঞ্চে। সে সময়ে মোস্তাক যে অবস্থানে চলে গিয়েছিল, মোস্তাক সরকারকে উচ্ছেদ করা ছিল আমাদের এক নম্বর টার্গেট।
জিয়া সম্পর্কে আমাদের অবজারভেশনটা খুব সঠিক প্রমাণিত হয়নি। আমাদের ধারণা ছিল, জিয়া মুক্তিযুদ্ধের ধারাটাকে ধারণ করবে। কিন্তু আপস করে তো সে অন্য পক্ষে চলে গেল। এবং এ ধারণাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে গেল। সে সময়ে কমিউনিস্ট পার্টি তার স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষা করতে ব্যস্ত থাকল। বামপন্থিরা আর সামনে আসতে পারল না।

প্রশ্ন : দীর্ঘ এই রাজনৈতিক জীবনে বড় কোনো বিশ্বাসঘাতকের দেখা পেয়েছেন?
সহিদুল্লাহ চৌধুরী :
রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি বার বার সিপিবিকে সতর্ক করেছিল এ বিষয়ে। তারা বলেছিল পার্টিতে সন্দেহভাজন লোক অবস্থান করে কি না। অর্থাৎ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত লোক পার্টিতে আছে কি না! নাম বলতে চাই না তবে পরে আমরা ধরতে পেরেছিলাম। সে তো কমিউনিস্ট পার্টি পুরোটাই তার ক্যাপচারে নিয়ে নিয়েছিল। ৫ম কংগ্রেসে, সে ফরহাদ ভাইকে আউট করে দেয়ার জন্য মুভ করেছিল। পরে আমরা এটা ধরতে পারলাম। পরে তাকে বহিষ্কার করা হয়। সিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। এখনও আছেন এদেশে। স্বনামধন্য ব্যক্তি তিনি। এখনো লোকে তাকে সিআইয়ের লোক হিসেবেই চেনে।

সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি এখানে পাবেন।

৩৬ thoughts on “সিপিবির একজন নেতার জবানবন্দি

  1. কমিউনিস্ট পার্টি যদি জোটে না

    কমিউনিস্ট পার্টি যদি জোটে না গিয়ে স্বাধীন অবস্থানে থেকে আওয়ামী লীগের পজেটিভ কাজের সমর্থন, অন্যায় কাজের সমালোচনা অর্থাৎ বিরোধী দলের ভূমিকাটা নিতে পারত তবে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য রকম হতে পারত। এটা কমিউনিস্ট পার্টির একটা মারাত্মক ভুল ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। এটা দেশের গণতন্ত্রের জন্য এবং জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের জন্য একটা বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াল।

    দালালি… দালালি এভ্রিহোয়্যার…

    প্রিয়াইলাম।

  2. দারুন একটা সাক্ষাৎকার শেয়ার
    দারুন একটা সাক্ষাৎকার শেয়ার করছেন। সত্যিই বাংলাদেশে যদি প্রধান বিরোধী দল হিসেবেও কমিউনিস্ট পার্টি দাঁড়াত তাহলে অন্তত পরগাছা জামাত কোন আশ্রয় পেতো না। আফসোস।

    1. আপনি বিরোধী দল না পেয়ে হা
      আপনি বিরোধী দল না পেয়ে হা হুতাশ করতেছেন মিয়া। আরেকটু পিছে যান। ৬০ এ পার্টি না ভাঙলে তো একটা বিপ্লবই হয়ে যায়

      1. কিন্তু দুঃখজনক যে পার্টি
        কিন্তু দুঃখজনক যে পার্টি সেসময় ভেঙে গেলো। এই ভাঙ্গন এদেশের কমিউনিষ্ট আন্দোলনকে পিছিয়ে দেয় অনেকটা। ……………………… ধন্যবাদ আনিস ভাই দারুণ একটা তথ্যসমৃদ্ধ পোস্ট দিয়েছেন। আমি চার দিন বাংলা লায়নের নির্যাতনের শিকার হয়ে বলা যায় নেট বিচ্ছিন্নই ছিলাম। তাই লেখাটা পড়তে দেরী হলো। আর এতো দীর্ঘ এবং ঐতিহাসিক তথ্য সমৃদ্ধ পোস্ট যে আরও দুই একবার পড়তে হবে। তাহলে মন্তব্য করা কিছুটা সহজ হবে।

  3. সবই ঐতিহাসিক ভুল। ঐতিহাসিক
    সবই ঐতিহাসিক ভুল। ঐতিহাসিক প্রাজ্ঞজন যদি দালালি করে তাহলে ঐতিহাসিক ভুল বলে কিছু থাকে না। স্রেফ দালালি হয়ে যায়।

    বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অনেক কিছু্ই জানা হল। অনেক ধন্যবাদ।

    তারপরও দৃপ্ত পায়ে হাঁটি। লাল পতাকা উড়াবো শক্তি হাতে ঐ মসনদে।

  4. মোশতাক যুদ্ধের সময় থেকে

    মোশতাক যুদ্ধের সময় থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার জন্য প্রচুর মুভ করেছিল। এক সময় ভাসানীও তাই মনে করল। এই কনফেডারেশনের প্রশ্নে ভাসানীকে অন্তরীণ করা হয়।

    ভাসানী এমন মনে করেছিলেন এর কোন রেফারেন্স আছে কি? থাকলে একটু দেখতে চাইতাম।

    জিয়া সম্পর্কে আমাদের অবজারভেশনটা খুব সঠিক প্রমাণিত হয়নি। আমাদের ধারণা ছিল, জিয়া মুক্তিযুদ্ধের ধারাটাকে ধারণ করবে। কিন্তু আপস করে তো সে অন্য পক্ষে চলে গেল।

    জিয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক না?তাহলে কি সাকা চৌধুরী/নিজামী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক??? :মাথানষ্ট:

    1. প্রথমটা ইতিহাসে খোঁজেন। ক্লু
      প্রথমটা ইতিহাসে খোঁজেন। ক্লু দেয়া হইছে। এবার দৌড় লাগান। আর কত বইসা খাবেন। জিয়া তো পরে জামাতরে প্রতিষ্ঠা করে বেইমানি করছে। এজন্য এটা বলছে।

      1. ভাসানীর ব্যাপারে যতটুকু পড়েছি
        ভাসানীর ব্যাপারে যতটুকু পড়েছি তাতে এমন কিছু পাইনি। আমার জানাতে ভুল বা ঘাটতি থাকতেই পারে যা খুবই স্বাভাবিক তাই রেফারেন্স চেয়েছিলাম।

        আর জিয়ার আমলে জামাত নির্বাচনে নিবন্ধন করতে পারে নাই বা অংশও নিতে পারে নাই। গোলাম আজমকেও কিন্তু জিয়া নাগরিকত্ব দেননি। জিয়া কেন জামাতকে আনব্যান করলেন তা বোঝার জন্য তার শাসন গ্রহণের সময় দেশের পরিস্থিতি জানা প্রয়োজন। তিনি শুধু জামাত নয় বরং সকল দলকেই রাজনীতি করার সুযোগ দেন মূলত দেশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের দিকে নিয়ে যেতে। এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। ছোট্ট একটা কমেন্টে বোঝানো কষ্টসাধ্য।

        1. শেখ মুজিব কেন ওআইসিতে যোগ
          শেখ মুজিব কেন ওআইসিতে যোগ দিলেন, কেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন বানালেন, এটা জিজ্ঞেস করলেও এই একই উত্তর আসে। এই সবই ফাসুকি আলাপ। বরং এটাই তাদের নীতি।

          1. আমি ঠিক বুঝলাম না। বঙ্গবন্ধুর
            আমি ঠিক বুঝলাম না। বঙ্গবন্ধুর ওআইসিতে যোগদান কিংবা ইসলামিক ফাউন্ডেশন বানানো কি আপনি নেগেটিভলি দেখেন? জাস্ট কিউরিয়াস মাইন্ড ওয়ান্টস টু নো

          2. জ্বি স্যার, আপনি তো জিয়া
            জ্বি স্যার, আপনি তো জিয়া ভক্ত। সূত্রমতে কিছুটা হলেও জামাত ভক্ত। কিন্তু আমি এই নাদান আবার মৌলবাদের তীব্র বিরোধী। তাই আমি মনে করি, মুজিব এদেশে মৌলবাদ চর্চ্চার ভিত্তি তৈরী করেছিলেন ওটা করেই। আর এটা ছিল একাত্তরের লড়াইয়ের মূলভাবটাকে বর্জন করা।

          3. কারো প্রশংসা করলেই তার ভক্ত
            কারো প্রশংসা করলেই তার ভক্ত হতে হবে এমন কি কোথাও লেখা আছে? আর আমি তো তার প্রশংসাও করিনি এখানে। সাথে আবার আন্দাজে জামাত ভক্ত ট্যাগও দিয়ে দিলেন। যাই হোক জিয়ার মত একজন প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধাকে যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী বলা হয় তখন আসলেই কিছু একটা বলতে ইচ্ছা করল। কেন ইচ্ছা করল তা আমার প্রতি কমেন্টের নিচের সিগনেচার লাইনটা খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন আশা করি।

            তাই আমি মনে করি, মুজিব এদেশে মৌলবাদ চর্চ্চার ভিত্তি তৈরী করেছিলেন ওটা করেই। আর এটা ছিল একাত্তরের লড়াইয়ের মূলভাবটাকে বর্জন করা।

            ভাগ্য ভালো কথাটা কোন লীগারকে বলেননি। বললে দেখতেন ফ্রিতে ছাগু/চিংকু টাইপ ট্যাগ পেতেন। কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। মুজিবেরও ভুল থাকতেই পারে। তবে মুজিব এদেশে মৌলবাদ চর্চার ভিত্তি তৈরি করেছিলেন কথাটা ডাহা মিথ্যা। :খুশি:

          4. আর একটা ৮৫ ভাগ মুসলমানের দেশে
            আর একটা ৮৫ ভাগ মুসলমানের দেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা কিংবা ওআইসি এর সদস্য হওয়াকে যদি আপনি মৌলবাদ বলেন তাহলে আমার ফিল হচ্ছে যে আপনি আসলে মৌলবাদের কথা তুলে ইসলামকেই বাংলার মাটি থেকে নির্মূল করতে চাচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল স্বাধীনতার চেতনা, অধিকার আদায়ের চেতনা; কখনোই ইসলামবিরোধী চেতনা নয়।

          5. একটু পরে তো মনে হয় ৮৫ ভাগের
            একটু পরে তো মনে হয় ৮৫ ভাগের যুক্তি দিয়া হেফাজতের মতো দেশে শরিয়া আইনও দাবি করে বসবেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সে যা বলছে আপনি বিষয়টাকে অন্য খাতে নেয়ার চেষ্টা করছেন।

          6. ওআইসির সদস্য হওয়া কিংবা
            ওআইসির সদস্য হওয়া কিংবা ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা নিতান্তই সাধারণ ব্যাপার। এগুলোর সাথে মৌলবাদের সম্পর্ক খোঁজা অনুচিত। ভারতের মত দেশও ওআইসি এর সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছে (যদিও তা বর্তমানে পাকিস্তান কর্তৃক ব্লকড) আর ভালো করে কমেন্টগুলো দেখুন কে প্রসঙ্গ পাল্টাবার চেষ্টা করছে। মৌলবাদের কথা আমি তুলেছি? অবশ্য আপনিও শরিয়া আইনের কথা তুলে বিষয়টাকে কোন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তা বোধগম্য নয়। আপনার কমেন্টের জবাব আপনার কমেন্টের ভেতরেই পাওয়া যাচ্ছে :খুশি:

          7. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাহলে
            মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাহলে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনা নয়? ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাষ্ট্রের গাঁটছড়া বাঁধাটা কি সেই চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়?

          8. অসাম্প্রদায়িকতা আর
            অসাম্প্রদায়িকতা আর ইসলামবিদ্বেষ যে সমার্থক শব্দ নয় তা কিছু হার্ডকোর লেফট উইঙ্গাররা প্রায়ই ভুলে যান। চরমপন্থা আসলে মানুষের মনকে অত্যন্ত স্টেরিওটিপিকাল করে তুলে। এনিওয়েজ থ্যাঙ্কস ফর দ্য আর্গুমেন্ট। চিয়ার্স

          9. তাহলে জিয়া একজন খাটি
            তাহলে জিয়া একজন খাটি মুক্তিযোদ্ধ!
            তা যুদ্ধটা কোথায় করেছিলেন? সঠিক ইতিহাসটা জানেন? নাকি রাস্তায় একটা বেরিকেডকে বিশাল একটা ব্যাপার মনে হচ্ছে।

  5. আনিস ভাই , কে সেই বিশ্বাসঘাতক
    আনিস ভাই , কে সেই বিশ্বাসঘাতক ? বৃহত্তর স্বার্থে তাদের নামগুলো জানা জরুরী । কমরেড সহিদুল্লাহকে অসংখ্য ধন্যবাদ সত্য প্রকাশ করার জন্য ।

  6. যুদ্ধের পুর্বাবস্থার বিভিন্ন
    যুদ্ধের পুর্বাবস্থার বিভিন্ন বই প​ড়ে যা মনে হ​য়েছে তা হল​- ওই সম​য়ে আওয়ামি লীগের চাইতে কমিউনিস্টরা বেশি ফেমাস ছিল​, তাদের কাজে এবং নীতিতে। কিছু মানুষের একগুয়েমী আর বোকামিতে অখন শুধু সমাজতন্ত্র কেন পুরো সমাজই হুমকির মুখে প​ড়েছে। কমিউনিস্টরা স্বাভাবিকভাবেই আলাদা থাকবে, তারা যেকোন গনতান্ত্রিক দলের সাথে কেন জোট বাধবে সেই প্রশ্ন আমি বাচ্চাকাল থেকে করে আসছি। শুধু আওয়ামি কেন আরো অনেক দল আছে, কিন্তু কমিউনিস্টদের ওইসব দলের সাথে জোট বাধা রীতিমত ভুল​। স্বতন্ত্র থেকে ঠিকমত কাজ করলে এখন দেশে দুই নেত্রীর তর্জন গর্জন ও চলতো না আর মানুষের ও অবস্থা এত খারাপ হত না।

  7. কম্যুনিস্ট আন্দোলনের ২ টি
    কম্যুনিস্ট আন্দোলনের ২ টি মহাভুল আমার কাছে চিহ্নিত হয়েছে –
    ১। ৬৫ তে রুশ – চীন পন্থায় বিভক্তি
    ২। ৭১ পরবর্তী সময়ে আওয়ামীলীগের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল হতে না পারার ব্যর্থতা
    — ঐতিহাসিক ভুল কতোটা পেছনে নিয়ে যেতে পারে তা আমারা এখন নিশ্চয়ই টের পাচ্ছি । ৪২ বছর পরেও মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, বাম বিচ্যুতি সহ এমন কিছু প্রশ্নের মোকাবেলা করতে হচ্ছে যে প্রশ্ন ওঠার কোন কথা ছিলোনা ।
    — চমৎকার একটা পোস্ট । খুব সংক্ষেপে অনেক কিছুর উত্তর পাওয়া গেল । অতীতের ভুল ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে । কারণ, সমাজতন্ত্র কোন আপ্ত বাক্য নয় । ঐতিহাসিক সত্য যে পৃথিবী সমাজতন্ত্র – সাম্যবাদ মুখিন । এক সোভিয়েতের পতন মানে সমাজতন্ত্রের পতন নয় এটি বোধে ও বুদ্ধিতে আনতে হবে ।
    — আর হ্যাঁ,

    সহিদুল্লাহ ভাই প্রথম সিপিবির আওয়ামী প্রীতি নিয়ে মুখ খুললেন। এর জন্য হয়তো পার্টিতে তাকে খুব দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

    যদি তাই হয় তাহলে বলবো, তারা অন্ধকারে সানগ্লাস লাগিয়ে আর কিছু নয় অন্ধকারকেই হাতড়ে বেড়াচ্ছে ।

  8. ‘হায় কমিউনিজম হায়
    ‘হায় কমিউনিজম হায় বিপ্লব’জাতীয় নামের একটি পুস্তিকায় পড়েছিলাম যে আনু মুহাম্মদ ডাকঘর প্রকাশনী থেকে ‘সিপিবির লেজুড়বৃত্তি’ নামক একটি বই লিখেছিলেন।কিন্তু পরে সিপিবির মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তাঁকে ফোন করে এই বইটি পুনরায় প্রকাশ করতে নিষেধ করেন।এরপর থেকে এই বইটি আর বের হয়নি।এখন আনু মুহাম্মদ আর সেলিমকে পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলন করতে দেখা যায়।

      1. আগে বসার পরে আনু মুহাম্মদ ভুল
        আগে বসার পরে আনু মুহাম্মদ ভুল বুঝতে পেরে বোধ হয় এই বই লিখেছিলেন। :খুশি: আবার ভুল বুঝতে পেরে আবার বসেছেন পাশে।
        এখন আর এই বইটি প্রকাশিত হচ্ছে না বলেই জানি।

        1. আমি যদ্দুর জানি তারা
          আমি যদ্দুর জানি তারা ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে ঐক্য হলে একসাথেই চলেন। এর বাইরে অন্যসব মতপার্থক্য থেকেই যায়।

  9. সাক্ষাৎকার না লিখে ” সিপিবির
    সাক্ষাৎকার না লিখে ” সিপিবির একজন নেতার জবানবন্দি ” এই শিরোনাম কেন দিলেন ? – জানতে মন চায় । সাক্ষাৎকার এবং জবানবন্দী শব্দ দুটোর আলাদা মানে আছে জানি । আপনার কাছে কোন ব্যাখ্যা আছে কি ?

    1. আমার কাছে সিপিবি বাংলাদেশের
      আমার কাছে সিপিবি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাদের অনেক ভূমিকা এখনকার নেতৃত্ব স্বীকার করতে চায় না, গোপন করে , এড়িয়ে যায় কিংবা ভুল তথ্য দেয়। সহিদুল্লাহ ভাই কেবল এই জবাবদিহিতার মুখোমুখি হলেন এবং সত্য প্রকাশ করলেন।

  10. সাক্ষাত্‍কারটা ভালো লেগেছে
    সাক্ষাত্‍কারটা ভালো লেগেছে ।ইতিহাসের অনেক সত্য প্রকাশিত হলো ।
    সেই সময় পার্টির এই ভুলগুলোর জন্য আজকে আমাদের এই প্রজন্ম সত্যিকার কমিউনিস্ট হয়ে উঠতে পারছে না ।তবে সময় এখনো আছে ,নতুন করে জাগার ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *