বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে (২য় পর্ব)


বঙ্গবন্ধু কেন নিহত হলেন,ঐ সময়ের প্রেক্ষপট কি ছিল,সেই সময় তাঁর সম্পর্কে যে কথা গুলো শোনা যায় তা কতটুকু বাস্তব।নিছক আগ্রহ থেকে বিভিন্ন বই-পত্র থেকে আমি সেগুলো জানার চেষ্টা করেছি।এই জানার পথেই পেয়েছি ঐ সময়ের বংবন্ধুকে খুব কাছ থেকে দেখা একজন মানুষ আবদুল গাফফার চৌধুরী(আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানের লেখক) এর লেখা ‘ইতিহাসের রক্ত পলাশ পনেরই আগস্ট পচাত্তর’-নামের বইটি।বইটি কেন বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রামাণ্য দলীল সেটা আমি আগের লেখায় বলেছি।যারা আগের লেখাটি পড়েন নি তারা এখান থেকে পড়ে নিতে পারেন।

http://istishon.blog/node/4162

গত লেখায় আমি বলেছিলাম তৎকালীন উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাধ্য হয়ে পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য সাময়িক ভাবে বঙ্গবন্ধু কেন একনায়ক তন্ত্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা ভাবনা করছিলেন এবং সে সংক্রান্ত কি কথোপকথন চৌধুরীর সাথে তাঁর হয়েছিল।বইটির একটি জায়গায় খন্দকার মুশতাক আহমেদের ভূমিকা,বঙ্গবন্ধুর সাথে তার সম্পর্ক এবং তাজউদ্দীন আহমেদের ভূমিকা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।বলেছিলাম সেটা নিয়ে আজকের লেখা।

খন্দকার মুশতাক আহমেদের সাথে ইতিহাসের মির জাফরের তুলনা হয়।তাদের কাজ কর্ম তো বটেই লেখক বলেছেন দুজনের শারীরিক গড়নেও নাকি সাদৃশ্য ছিল ! মুশতাক পল্টিবাজ রাজনীতিবিদ ছিল (ইচ্ছা করেই আমি ‘ছিলেন’ ব্যবহার করছি না)।
সুবিধাবাদী হিসিবে রাজনৈতিক জিবনের শুরু থেকেই দল বদল করেছে সে।নীতি ও আদর্শের দিক থেকে সে ছিল ডান পন্থি,সাম্প্রদায়িক ও মার্কিন ঘেষা।

লেখক বইয়ের ১৩ তম পরিচ্ছেদে বলেছেন মশতাক সম্পর্কে।সেখান থেকে হুবহু তুলে দিচ্ছি।

“মুজিব জননি বেগম সাহেরা খাতুন মারা গেলেন ৩১ মে বিকালে।সেদিন সন্ধ্যায় আমাকে খবর টা জানালেন এম,আর আখতার মুকুল।শেখ মুজিব গেলেন টুংগি পাড়ায় মাকে দেখার জন্য।শেষ দেখা।সঙ্গে জুটলেন দুই মন্ত্রি-খন্দকার মুশতাক আহমেদ ও তাহের উদ্দিন ঠাকুর।
শেখ মুজিব তাঁর মায়ের জন্য যত কাঁদলেন না,তার থেকে বেশি কাঁদলেন মুশতাক।সেই দৃশ্য দেখে আমি প্রথমে ভুল বুঝেছিলাম।ভেবেছিলাম মুশতাকের কেউ সম্ভবত মারা গেছে।শেখ মুজিবের একজন দেহরক্ষি কে কথাটা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেনঃনা না উনি বঙ্গবন্ধুর মায়ের মৃত্যুতে কাদছেন।
শুধু কেঁদেই মুশতাক ক্ষান্ত হলেন না।শেখ মুজিবের সঙ্গে গেলেন টুংগি পাড়ায়,সারা পথ নিজেই কাঁদলেন।
শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে মুশতাক ছিলেন তাঁর একেবারে ছায়া সহচর।তার মনে যাই থাকুক ,মুজিবের সামনে তিনি থাকতেন বান্দা হাজির মনভাব নিয়ে।মন ভেজানো কথা বলতেন।
একবার দৈনিক ‘জনপদ’এ আমার একটা লেখায় মুজিব চটে গিয়ে আমাকে গণভবনে ডেকে পাঠালেন।গিয়ে দেখি মুশতাক বসে আছে।’জনপদের’ বিরূদ্ধে দু-একটা কথা বললেন মুজিব কে খুশি করার জন্য।আবার এই মুশতাক ই বাইরে দেখা হলে আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন।মুজিবের কোন কোন কাজের সমালোচনা করার জন্য আমার প্রশংসা করেছেন।বিচিত্র এই মুশতাক চরিত্র।
মুশতাকের রাজনৈতিক চরিত্রেও স্থিরতা বলে কিছু নেই।১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নোমিনেশন না পেয়ে প্রথম হক ভাসানীর নেতৃত্বের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন।আওয়ামি লীগ কে যখন অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান রূপে পুনর্গঠন করার জন্য মুজিব-ভাসানী এক যোগে কাজ করছেন,তখন তিনি আওয়ামি লীগ থেকে ত্যাগ করেন এবং আওয়ামি লীগের ডানপন্থি ও সাম্প্রদায়িক অংশের সাথে হাত মিলিয়ে আওয়ামি মুসলিম লীগ গঠনের চেষ্টা করেন।
আইন পরিষদে সরকারি হুইপ হবার লোভে আবার তিনি আওয়ামি পার্লামেন্টারি পার্টির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন এবং কৃষক শ্রমিক পার্টির সরকারে গিয়ে ঢোকেন।
সারা জীবন তিনি প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থি ও সাম্প্রদায়িকতাবাদ কে সমর্থন জানিয়েছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত সমর্থন লাভের জন্য আওয়ামি লীগের প্রগতিশীল অংশের সাথে থেকেছেন।প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠি তাকে ট্রয়ের ঘোড়ার মত প্রগতিশীল অংশে ব্যবহার করেছে।”

উপরের অংশ থেকে আমরা মুশতাকের রাজনৈতিক চরিত্র বুঝতে পারলাম।এবার মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকা নিয়ে আলোকপাত করছি।

“মুশতাকের সব থেকে বড় বিশ্বাস ঘাতকতা ১৯৭১ এ।তিনি মুজিব নগরে বসে মাহবুব আলম চাষী,তাহের উদ্দিন ঠাকুর প্রমুখকে সঙ্গে নিয়ে একটি চক্র তৈরি করেন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেন।মুক্তিযুদ্ধ বানচাল করে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন গঠন করাই ছিল তাদের লক্ষ।
মুক্তিযুদ্ধ যখন পূর্ণাংগ রূপ নিতে চলেছে তখন মুশতাক গ্রুপ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্য একটি প্রচারপত্র বিলি করে।এই প্রচার পত্র টির শিরোনাম ছিল ইন্ডিপেন্ডেন্স অর মুজিব? মুজিব না স্বাধীনতা? এই প্রচার পত্র টির মূল বক্তব্য ছিল

আমরা যদি পাকিস্তানের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধ করি তাহলে পাকিস্তানীরা কারাগারে মুজিব কে হত্যা করবে।শেখ মুজিব ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে।সুতরাং স্বাধীনতার আগে মুজিবের মুক্তি দরকার এবং মুক্তির পর পাকিস্তানের সাথে আলোচনা দরকার।

এই প্রচার পত্রের মাধ্যমে মুশতাক এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিলেন।তারা প্রচার করছিল যে তাজউদ্দিন চাইছেন না মুজিবের মুক্তি হোক।তিনি চান মুজিব কে সড়িয়ে নিজেই রাষ্ট্রপ্রধান হতে।”

তাজউদ্দীনের বিরূদ্ধে প্রচারণা তখন থেকেই শুরু।এই প্রচার পত্রে মুক্তিযোদ্ধা দের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।এই প্রচারণায় মুজিব পরিবারের অনেকে বিভ্রান্ত হন।এমন কি মুজিব দেশে ফেরার পর ও তাঁকে বলা হয় যে তাজ-উদ্দীন তাঁকে সড়িয়ে,পাকিস্তানে তার মৃত্যু ঘটিয়ে দেশের ভাগ্যবিধাতা হতে চেয়েছিলান।লেখক বলেছেন,
“বঙ্গবন্ধু এই অপপ্রচার বিশ্বাস করেছিলেন কিনা,আমার জানা নেই।”

মুশতাকের আরো অপকর্ম আছে।ঐ সময় সে বিদেশে যুদ্ধ বিরোধী প্রচারণা চালায়।বিভিন্ন পত্রিকায় বিভ্রান্তি কর বিজ্ঞপ্তি পাঠায়।বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর মশতাক গ্রুপের বিচার হওয়ার কথা ছিল কিন্তু তাজ-উদ্দীন তাকে ক্ষমা করে।
আবার বই এ ফিরে যাই।

“১৯৭২ সালে মুজিব দেশে ফিরে এসে মুশতাক ও তার সাঙ্গোপাঙ্গো দের ক্ষমা করে দেন।১৯৫৫ থেকে একবার নয়,বারবার মুজিব ক্ষমা করেছেন মুশতাক কে,ভুলে গেছেন বিশ্বাস ঘাতকতা…।
শেখ মুজিবের মায়ের মৃত্যুতে যিনি কেঁদে চোখ ফুলিয়েছিলেন,মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই মুজিবের এবং তাঁর স্ত্রী-পুত্র পরিবারের নৃশংস হত্যা কান্ডে উল্লাস প্রকাশ করে হত্যাকারি দের খেতাব দিলেন ‘সূর্য সন্তান’ এবং এই বর্বরতা কে আখ্যা দিলেন ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা বলে।
আরো বিস্ময়ের কথা যে ঢাকায় যে বাড়িতে বসে মুজিব হত্যার ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত ঠিক সেই এলাকার খুব কাছের একটি বাড়িতে বসে আড়াইশো বছর আগে সিরাজ হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়।”

এখানে হয়তো অনেকের প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক,মুজিব কেন বারবার মুশতাক কে ক্ষমা করেছেন?শুধু মুশতাক কে না আরো অনেক কেই তিনি ক্ষমা করেছেন।এটাই হল মুজিবের সব থেকে বড় দুর্বলতা।যার চরম বিনিময় তাঁকে দিতে হয়েছে।মুজিবের এই ক্ষমা করার ঘটনা লিখব এর পরের পর্বে।

তাজ-উদ্দীন আহমেদ ছিলেন মুজিবের যোগ্য সেনাপতি।তিনি না থাকলে মুজিব বিহীন ৭১ এ বাংলাদেশ সৃষ্টি হত না।তিনি কখনই মুজিব কে সড়িয়ে নেতা হতে চাননি।ছায়ার মত বঙ্গবন্ধুর সাথে থেকে কাজ করে গেছেন।তাজউদ্দীন কে পাকিস্তানি শাসকেরাও ভয় পেতেন।তার একটি ঘটনা লেখক আমাদের জানাবেন।

“১৯৭১ সালে মুজিব ইয়াহিয়ার বৈঠকের রূদ্ধশ্বাস দিন গুলোর কথা।ভুট্টো এসেছেন ঢাকায়।আমরা কজন সাংবাদিক তাঁর সাথে দেখা করার অনুমতি পেয়েছি।আমাদের বেশি কিছু বলতে চাইলেন না।আমাদের উপস্থিতি ভুলে গিয়ে তাঁর এক সহকর্মীকে উর্দুতে বলে উঠলেনঃ আলোচনা বৈঠকে আমি মুজিব কে ভয় পাইনা।ইমোশনাল এপ্রোচে মুজিব কে কাবু করা যায়।কিন্তু তাঁর পিছনে ফাইল-বগলে চুপচাপ যে ‘নটরিয়াস’ লোকটি দাঁড়িয়ে থাকে তাকে কাবু করা শক্ত।দিস তাজুদ্দীন,আই টেল ইউ,উইল মাইট বি ইউর মেইন প্রবলেম।
আমি সঙ্গে সঙ্গে কথাটি নোট বুকে টুকে নিলাম।তখন বুঝতে পারিনি,কথাটি একদিন কত বড় ঐতিহাসিক সত্য হয়ে দাঁড়াবে।”

তাজুদ্দীন কে ভুট্টো ক্ষমা করেন নি।১৯৭১ এ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানি দের পক্ষ থেকে ঢাকায় একটি প্রচারপত্র বিলি করা হয়।তাতে বলা হয়,

তাজুদ্দিন আসলে ভারতীয় ব্রাহ্মন।মুসলমান নাম গ্রহণ করে তিনি আওয়ামি লীগে ঢুকেছেন পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় ষড়যন্ত্র সফল করার জন্য।”

১৯৭৫ সালে তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে জেলে হত্যা করা হল।রটানো হল-তিনি জেলে বসে ভারতীয় কমিশনার কে গোপনে চিঠি পাঠিয়েছিলেন ভারতীয় সেনা বাহিনি আনার জন্য।

আজ আর দীর্ঘ করবনা।আজকে আমি মূলত তুলে ধরতে চেয়েছি মুশতাকের মত মির জাফরের ভূমিকা ও মুজিবের যোগ্য সেনাপতি তাজ-উদ্দিনের কিছু কথা।ঘটনা ক্রমে এদের দুজন ই আরো আসবেন সামনে।এরপরের লেখায় আমি তুলে ধরতে চেষ্টা করব মুজিবের ক্ষমা শীলতার কিছু উদাহরণ যা ছিল তাঁর বড় বড় ভুল এবং তাঁর বিরূদ্ধে কিছু অপপ্রচার এর জবাব দেয়ার চেষ্টা করব।

অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাই।
আজ আমি যেসব অপপ্রচারের কথা তুলে ধরেছি সেগুলো কি খুব পরিচিত না?
আজো এই ধরণের প্রচারণা চালিয়েই জামাত-শিবির ও তাদের দোসর রা আমাদের সাধারন মানুষ কে বিভ্রান্ত করে চলেছে না?
আগের অপপ্রচার গুলো রোধ করা গেলে হয়তো মুজিব-তাজুদ্দিনের এই পরিণতি ভোগ করতে হতনা।
আমরা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি চাইনা।
তাই এখন যে অপপ্রচার গুলো চলছে তা রোধ করা ও এর জবাব দেয়া আমাদের সবার নাগরিক দায়িত্ব।

জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু…

৫ thoughts on “বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে (২য় পর্ব)

  1. চমৎকার লিখেছেন। খুব সহজ
    চমৎকার লিখেছেন। খুব সহজ কিন্তু অত্যন্ত মজবুত তথ্য দিয়ে ইতিহাস তুলে ধরেছেন। অনেকেই এসব ইতিহাস জানে না। সবার জানা থাকা উচিৎ। আপনাকে ধন্যবাদ। আগ্রহ সহকারে পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

  2. কিছু গরু ছাগল আছে যারা
    কিছু গরু ছাগল আছে যারা মুজিবের অবদান অস্বীকার করে।
    এমন ব্যক্তিকে যে অস্বীকার করে তার জন্মের বৈধতা নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *