নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা…


নীল-নির্মল নীলাকাশ। তাতে উড়ে চলা সাদা মেঘের আনাগোনা। দূরে দুধেল সাদা কাশের বনে পাগলা হাওয়ার মাতামাতি। এই হচ্ছে শরৎ। কবি সাহিত্যিক হওয়া লাগে না। মিষ্টি ঘ্রাণের শিউলি চুপি চুপি বলে দেয় আজ শরতের দিন।




নীল-নির্মল নীলাকাশ। তাতে উড়ে চলা সাদা মেঘের আনাগোনা। দূরে দুধেল সাদা কাশের বনে পাগলা হাওয়ার মাতামাতি। এই হচ্ছে শরৎ। কবি সাহিত্যিক হওয়া লাগে না। মিষ্টি ঘ্রাণের শিউলি চুপি চুপি বলে দেয় আজ শরতের দিন।

শরৎ বাঙ্গালির জীবনকে নানাভাবে আন্দোলিত করেছে। তাই শরৎকে নিয়ে আমাদের কবি কাজী নজরুল কিছু বলবে না সেও হয় নাকি! কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় আমরা শরতের যে চিত্র দেখি-
‘এল শারদশ্রী কাশ-কুসুম-বসনা
রসলোক বাসিনী
লয়ে ভাদরের নদী সম রূপের ঢেউ
মৃদু মধূহাসিনী।
যেনো কৃশাঙ্গী তপতী তপস্যা শেষে
সুন্দর বর পেয়ে হাসে প্রেমাবেশে’

এছাড়াও কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ রাতের বুকে ঐ’ ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক” প্রভৃতি অনেক গানে শরৎ প্রকৃতির সুন্দর রূপটি তুলে ধরেছেন।

এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে
এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ রথে।
দলি শাপলা শালুক শতদল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল
নীল লাল ঝরায়ে ঢল ঢল এসো অরণ্য পর্বতে।

এসো ভাদরের ভরা নদীতে ভাসায়ে কেতকী পাতায় তরণী
এসো বলাকার রঙ পালক কুড়ায়ে বহি ছায়াপথ সরণী।

তবে শরতের আসল সৌন্দর্য দেখতে হলে মাটির টানে যেতে হবে, সবুজের সমারোহে যেতে হবে। পল্লী মায়ের বুক ছাড়া আর কোথায় শরৎ নামে তার অপরূপ ঐশর্য নিয়ে। তাই শরৎকে ভালবেসে লিখতে ভুলেননি পল্লীকবি।
কবি জসীমউদ্দীন তাঁর কবিতায় এ রকম বিরহী চিত্র ব্যক্ত করেছেন-
‘গণিতে গণিতে শ্রাবণ কাটিল,
আসিল ভাদ্র মাস,
বিরহী নারীর নয়নের জলে
ভিজিল বুকের বাস’

এভাবেই কালে কালে অনেক কবি-সাহিত্যিকই শরৎকে নিয়ে লিখেছেন। তবে রবীন্দ্রনাথ শরৎ-কে স্বল্পায়ু বলেছেন। শরৎ-কে চেনা যায় প্রকৃতির মধ্যে তার স্বল্প আয়োজনের জন্য। ছোট ছোট ফসলের জন্যই পৃথিবীতে বার বার ঘুরে ঘুরে আসা। শরতের সম্ভার ঐ শিশিরাশ্রু শেফালিকা, কাশ-মেঘ, আর আগমনী উৎসবে তার সমাপ্তি।

বাংলা ঋতুতে শরৎ এক সমৃদ্ধ ঋতু। মন উদাস করা, হঠাৎ বৃষ্টির ফাঁকে কাঠফাটা রোদ, হাওয়ার আসা যাওয়া-এইত অপূর্ব শরৎ।

আবার রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শরৎ’ কবিতায় শরতের রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন,
‘আজি কি তোমার মধুর মুরতি
হেরিনু শারদ প্রভাতে!
হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ
ঝলিসে অমল শোভাতে।
পারে না বহিতে নদী জলধার,
মাঠে মাঠে ধার ধরে নাকো আর-
ডাকিছে দোয়েল গাহিছে কোয়েল
তোমার কাননসভাতে!
মাঝখানে তুমি দাঁড়ায়ে জননী,
শরৎকালের প্রভাতে।’

আহা! শরতের সে কি বর্ণনা-ব্যাঞ্জনা। আসলে শরৎ হচ্ছে আকাশ ও মাটির মিলন। এক দিকে নীলাকাশ, আরেক দিকে কচি ফসলের দুরন্তপনা; এক দিকে সোনা রোদ, আরেক দিকে সবুজের কচি মুখ; আর সাথে আকাশ ও মৃত্তিকার যে হৃদয়াবেগ, তা আমাদের হৃদয়কে নাড়া দিয়ে যায়। নাড়া না দিয়েই-বা পারে কিভাবে? তরতাজা শিউলির মৌ মৌ-এ মন তো ব্যাকুল হয়ে উঠবেই।

ভাদ্র মনকে উদ্বেলিত করে তোলে। প্রকৃতির সবুজ ছড়িয়ে পড়ে মাঠে-ঘাটে। এই স্নিগ্ধরূপ তারুণ্যেকে উচ্ছ্বসিত আনন্দে ভাসার উসকানি দেয়। প্রকৃতি তার ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নিতে চায় সকল মনকে। শরৎ সেই ভালোবাসার মনে দোলা দিয়ে যায়।

শরৎ তাই কখনও হয়ে উঠে প্রিয় মানুষের মন ভোলানোর আশ্রয়। এই যেমন মহাকবি কালিদাস শরৎ বর্ণনার শুরু করেছেন এভাবে- ‘প্রিয়তমে আমার, ঐ চেয়ে দেখ, নববধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎকাল সমাগত।’

ঋতুর পালাক্রমে, বর্ষার শেষ লগনে এসে হাজির হয় শরৎ। ভাদ্র-আশ্বিন মিলে শরতের জয় গান গায়। শরতের শুভ্রতাকে তুলে ধরতে প্রাণপণ লেগে থাকে তারা। মিলে-মিশে সবাই যেনো একাকার হয়ে প্রকৃতিকে আরো সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতে মুখরিত হয়ে ওঠে।

আগাম দায়িত্ব নিয়ে ভাদ্রই কিন্তু শরতের শেষের দিকে প্রথম প্রভাতে কুয়াশার বার্তা আনে। প্রকৃতি তার ভাঁজে ভাঁজে সৌন্দর্যের যে সুধা লুকিয়ে রেখেছে, ভাদ্রের শুরুতে তার কিছুটা ছড়িয়ে দেয়। ফুলের গন্ধ, ফসলের গন্ধ, আকাশের শুভ্র আলোময় হাসি, এ সবকিছু নিয়েই এক অপরূপ সাজে মেতে ওঠা প্রকৃতি সে দিকেই হাতছানি দেয় সবাইকে।

বাংলা সাহিত্যের আদি মধ্যযুগের কবি, চণ্ডীদাসের কবিতায় দেখা যায়,
‘ভাদর মাঁসে অহোনিশি আন্ধকারে
শিখি ভেক ডাহুক করে কোলাহল।
তাত না দেখিবোঁ যবেঁ কাহ্নাঞিঁর মুখ
চিনি-তে মোর ফুট জায়িবে বুক।’

এখানে কবি বলছেন, শিখি, মানে ময়ুর, ভেক ও ডাহুক পাখির কোলাহল এ সময় শোনা যায়। আসলেই, এ সময় নতুনভাবে সজীব হয়ে ওঠে প্রকৃতি। কলকাকলি মুখর পরিবেশে নতুন কিছু খুঁজে থাকে সে। নতুন কিছু পাবার আর নতুন কিছু দেবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়, ভাদ্র তার দান ভাণ্ডার খুলে বসে। প্রকৃতির কাছ থেকে তার অপার সৌন্দর্যকে নিয়ে, ভাদ্র বিলিয়ে দিতে চায় সবার কাছে। আর এই সময় সবাই মিলে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়।

কবি বিনয় মজুমদার শরতের একটি সুন্দর চিত্র এঁকেছেন-
‘শরতের দ্বিপ্রহরে সুধীর সমীর-পরে
জল-ঝরা শাদা শাদা মেঘ উড়ে যায়;
ভাবি, একদৃষ্টে চেয়ে, যদি উর্ধ্ব পথ বেয়ে
শুভ্র অনাসক্ত প্রাণ অভ্র ভেদি ধায়!
ঝরে যায় অশ্রুজল, বেদনার কল-কল
অধীর বিদ্যুৎ-দীপ্তি, দৃপ্ত গরজন
বাসনা-বন্ধন ছিঁড়ে, স্নিগ্ধ নীলিমার নীলে
ধীরে ধীরে শূন্য ঘিরে করি সন-রণ।’

অনুপম রূপ সৌন্দর্যমন্ডিত শরৎ ঋতু ‘শারদ লক্ষ্মী’ নামে পরিচিত। বর্ষণ-বিধৌত, মেঘমুক্ত আকাশের সুনীল রূপ-কান্তি, লঘুভার মেঘের অলস-মন্থর নিরুদ্দেশ যাত্রা, আলো-ছায়ার লুকোচুরি, শিউলি ফুলের মন উদাস করা গন্ধ, প্রভাতের তৃণ-পল্লবে নবো শিশিরের আল্পনা, তাতে প্রভাত-সূর্যের রশ্মিপাত ও শুভ্র জোছনা পুলকিত রাত্রি- এই অনুপম রূপ নিয়ে বাংলার বুকে ঘটে শারদ লক্ষ্মীর আনন্দময় আবির্ভাব।

শরৎকালের মধ্যেই যেনো বাংলাদেশের হৃদয়ের স্পর্শ পাওয়া যায়। তাই শরৎ যখন চলে যায়, তখন আমাদের হৃদয় সম্পূর্ণ শূন্য করে দিয়ে চলে যায়। তার বিদায়ী পথে পড়ে থাকে অশ্রুসিক্ত শিউলি ফুলের মালা, এবং বিগত আনন্দের বর্ণ-বিলসিত অজস্র স্মৃতি। সাদা সাদা মেঘগুলো যেনো নীলাকাশে পেঁজা তুলোর ন্যায় ইতস্তত ঘুরে বেড়ায়।

নদীর তীরে তীরে কাশফুলের সাদা হাসির প্লাবন। মাঠে মাঠে সবুজের মেলা। মোট কথা, এতো সবুজ, এতো নীল আর এতো সাদার একত্র সমাবেশ, এমনটা অন্য কোনো ঋতুতে দেখা যায় না।

রূপসী বাংলার রূপ বিচিত্র, ঋতুচক্রে নানা বর্ণে-গন্ধে গানের সমারোহে নিত্য আবর্তিত হয়ে চলে। কিন্তু অর্থদাস শহরবাসী, আজ আর তার অন্তরে শরতের সে নিমন্ত্রণ অনুভব করে না। প্রতিবারই শরৎ ঋতু সাজে অপরূপ সাজে। অথচ শহরের যান্ত্রিক জীবনে তার রূপ দেখার সময় নেই কারো।

তবুও বেঁচে থাকতে হবে। ইট পাথরের প্রাচীরেই ব্যবস্থা করতে হবে প্রকৃতি নিয়ে বেঁচে থাকবার। তার জন্য চাই আয়োজন। আর সে আয়োজন হতে পারে কবিগুরুর গানে। শরৎ নিয়ে লিখা রবি ঠাকুরের গানটা একবার গেয়ে দেখুন, কিংবা চোখ বন্ধ করে শুনে দেখুন-শরৎ আপনাকেও ছুঁয়ে যাবে তার সৌন্দর্যের মোহনীয়তায়-

আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়
লুকোচুরির খেলা।
নীল আকাশে কে ভাসালে
সাদা মেঘের ভেলা।
আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে,
উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে,
আজ কিসের তরে নদীর চরে
চখাচখির মেলা।

ওরে যাবো না আজ ঘরে রে ভাই,
যাবো না আজ ঘরে!
ওরে আকাশ ভেঙে বাহিরকে আজ
নেব রে লুঠ করে।
যেন জোয়ার জলে ফেনার রাশি
বাতাসে আজ ফুটেছে হাসি,
আজ বিনা কাজে বাজিয়ে বাঁশি
কাটবে সারা বেলা।

সবাইকে শুভ্র শরতের স্নিগ্ধ শুভেচ্ছা…

১ thought on “নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *