শিল্প এবং সৌন্দর্য ( ২য় পর্ব )

গত পর্বে আমরা একটি প্রশ্ন খুজে পেয়েছিলাম। শিল্প মানেই কি substitution ? এবং আমরা একটা উত্তর ও খুজে পেয়েছিলাম, জীবন মানেই শিল্প, শিল্প মানেই জীবন। আবার আমরা এটাও নিশ্চিত হয়েছিলাম যে, “শিল্প ছিল, আছে এবং থাকবে। এটি বাস্তবের চেয়েও অতি বাস্তব।” কিন্তু ব্যাপারটার সত্যতা ঠিক কতোখানি?

আমি এবারে কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিতে চাই। আমরা কমবেশি সবাই গান শুনি। গান ভাল লাগেনা এমন একটা মানুষ খুজে পাওয়া হয়তো ভয়াবহ ভাবে অসম্ভব হবে। আবার সবাই একই রকম গান শুনছেনা।



গত পর্বে আমরা একটি প্রশ্ন খুজে পেয়েছিলাম। শিল্প মানেই কি substitution ? এবং আমরা একটা উত্তর ও খুজে পেয়েছিলাম, জীবন মানেই শিল্প, শিল্প মানেই জীবন। আবার আমরা এটাও নিশ্চিত হয়েছিলাম যে, “শিল্প ছিল, আছে এবং থাকবে। এটি বাস্তবের চেয়েও অতি বাস্তব।” কিন্তু ব্যাপারটার সত্যতা ঠিক কতোখানি?

আমি এবারে কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিতে চাই। আমরা কমবেশি সবাই গান শুনি। গান ভাল লাগেনা এমন একটা মানুষ খুজে পাওয়া হয়তো ভয়াবহ ভাবে অসম্ভব হবে। আবার সবাই একই রকম গান শুনছেনা। কেউ রবীন্দ্রসংগীত, কেউ বাউল গান, কেউ রাগ নির্ভর, কেউ কেউ হেভি ডেথ মেটাল, কেউ ধর্মীয় গান শুনছে। কিন্তু কেন? কেন কোটি কোটি মানুষ গান শুনছে, কিন্তু কেউ কার মত নয়?

আমরা মন খারাপ থাকলে গান শুনছি আবার মন ভাল থাকলেও গান শুনছি। ব্যাপারটা অনেকটা অই হোজ্জার গল্পের মত হয়ে গেল না? ওই যে একলোক এসেছিল হোজ্জার কাছে কিছু শেখার আসায়। কিন্তু হোজ্জা তাকে শেখাল ফুঁ দিয়ে হাতের তালু গরম হয় আবার ফুঁ দিয়ে গরম দুধও ঠাণ্ডা হয়। লোকটি পালিয়ে বেঁচেছিল কিন্তু আমরা জানি এটাই ধ্রুব সত্য।
আসলে সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে ব্যাক্তির ব্যাক্তিগত জীবন দর্শন এবং আকাঙ্ক্ষা এর উপর। নইলে কেন কোটি কোটি মানুষ গান শুনবে, বই পড়বে, নাটক দেখবে? কেন মানুষ বই পড়ে, গান শুনে, সিনেমা দেখে কিংবা একটা কাগজে আকা ছবি দেখে হাসবে, কাঁদবে ? কেন তারা এই অবাস্তব জীবনের ডাকে এমনটি সাড়া দিচ্ছে যেন এটি এক পরিপূর্ণ বাস্তবতা?

আমরা মানুষ কখনই পরিপূর্ণ নই। তাই আকাশ ভেঙে যখন বৃষ্টি নামে কিম্বা সমস্ত রাতের আকাশ যখন ছেয়ে যায় রুপালী আলোয়, তখন আমাদের ভিতরে তৈরি হয় এক প্রগাড় অপূর্ণতা। আরা তাই বৃষ্টি কিম্বা জোছনা দেখলে আমাদের মন খারাপ হয়ে যায়।

আমাদের সীমাবদ্ধ শক্তিই আমাদের তাড়িত করে বেড়ায় আজীবন। এই সীমাবদ্ধ শক্তি, ক্ষমতা ধারণা থেকে ঠিক যেমন ঈশ্বর এর জন্ম ঠিক তেমনি শিল্পের। কেউ ঈশ্বর ধারণা নিয়ে জীবনের অপূর্ণতাকে মেনে নেয় আর কেউ নতুন জীবনের সৃষ্টি সন্ধান করে। এদের একজনকে আমরা বলি ধার্মিক আরেকজনকে বলি শিল্পী।

প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ শিল্পস্রস্টা। কারন মানুষ সবসময়ই চায় তার নিজের অস্তিত্বকে অতিক্রম করতে। মানুষ দু ধরনের। ব্যাক্তি মানুষ এবং সামগ্রিক মানুষ। সে সবসময়ই চায় একজন সামগ্রিক মানুষ হয়ে উঠতে। সে প্রতিনিয়ত ছুটে যেতে থাকে পূর্ণতার দিকে, তাই সে বিদ্রোহ করে নিজের সত্ত্বার বিরুদ্ধে। আর এটাই হল আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে স্বপ্ন দেখায় নতুন কিছুর ভাবতে শেখায় নতুন গল্প। আর আকাঙ্ক্ষাগুলো তৈরি হয় তার অভাব এবং অপূর্ণতা থেকেই। কিন্তু ক্রমশই সে বুঝতে পারে বাস্তব জগতে পূর্ণতা বলে কোন শব্দ নেই। অনেক কিছু করা গেলেও পুরপুরি পূর্ণতা কোনদিনও পাওয়া যাবেনা। তাই তখন সে মিছিলের নগরীতে দাঁড়িয়ে গান গায়, ছবি আঁকে, কিংবা কালি আর কলমে ঠেসে দেয় নিজের স্বপ্নগুলো কাগজের ভেতরে। আর এগুলো সে করে নিজের টিকে থাকার জন্যই। তার কাছে এটা যতটা না নান্দনিক তার চেয়ে বেশী বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।

এজন্যেই গুহা চিত্রগুলো যতটা না নান্দনিকতা বহন করে তার চেয়ে বেশী বহন করে তাদের জীবন সংগ্রাম, বেঁচে থাকার আকুলতা। জীবনের এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠ গুলোর কারনেই মানুষ অন্ধকার অডিটোরিয়াম থেকে অপলক চেয়ে থাকে আলোকোজ্জ্বল মঞ্চের দিকে।

তাই শিল্প যে substitution of reality এটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আর তাই মানবতার মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত শিল্পের মৃত্যু ও নেই।

বাস্তবিক জীবনবোধ এবং দ্বান্দিকতার মধ্যে যার জন্ম তার মৃত্যু অসম্ভব। কারন যে বাস্তব তীব্র আয়োজনে শিল্প শুধু জন্ম নেয় তা না বরং বিনির্মিত হয়। শিল্প হল একটা শক্তি যার কোন ধ্বংস নেই আছে কেবল পরিবর্তন। প্রথমে জা থাকে একজনের টিকে থাকার অনুপ্রেরণা পড়ে তা হয় সবার টিকে থাকার অনুপ্রেরণা, আরও পরে শিল্পের জন্মই হয় শুধু সবার টিকে থাকার জন্য।
সে জন্যেই Elbert Hubbard বলেছেন,
Art is not a thing, it is a way.

আবার André Gide বলছেন,
Art begins with resistance, at the point where resistance is overcome. No human masterpiece has ever been created without great labor.

আর তাই শিল্পের উদ্দেশ্য কখনই একরকম থাকেনা। এটা নির্ভর করে সময়, সমাজ এবং সমাজের শ্রেণীর উপর। তারপরও শিল্পে এমন কিছু থাকে জা অপরিবর্তনীয় সত্যকে প্রকাশ করে। অর্থাৎ শিল্প মানে সত্যও বটে। কিন্তু কি সেই সত্যতা?
আর তাহলে শিল্পে নান্দনিকতার স্থান কতটুকু? কারন সত্য তো আর সবসময় সুন্দর নয়।
আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব আগামী পর্বে।

৬ thoughts on “শিল্প এবং সৌন্দর্য ( ২য় পর্ব )

  1. রুদ্র,
    আপনার নন্দনতাত্ত্বিক

    রুদ্র,
    আপনার নন্দনতাত্ত্বিক আলোচনা বেশ জমে উঠেছে, অন্তত আমার কাছে । এই ব্লগে আরও একজন ভালো লেখক কে পেলাম বলে মনে হচ্ছে । :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: পরের পর্ব দিতে বেশি দেরি করেন না ।

    1. রাহাত মুস্তাফিজ ভাই
      ধন্যবাদ।

      রাহাত মুস্তাফিজ ভাই
      ধন্যবাদ। আমি আসলে একটানা লিখতে পারিনা। মাথায় যতটুকু আসে ততটুকু লিখি। আর এর মাঝে অন্যান্য কাজ বিশেষ করে অন্নসংস্থান তো বিশাল বড় কাজ। হা হা হা। যাই হোক। আশা করছি খুব দ্রুত পেয়ে যাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *