চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ – গীতিকার তারেক মাসুদ


তারেক মাসুদ । একজন চলচ্চিত্রকারের নাম । আমি বলি বাংলাদেশের সত্যজিৎ রায় । তিনি আমাদের মধ্যে নেই, আবার আছেন । তাঁর সৃষ্টির বিপুল বৈভব নিয়ে প্রচণ্ডভাবে এই বাংলায় বিরাজ করছেন তিনি । সৃষ্টিশীলের কখনো মৃত্যু হয় না । তিনি বেঁচে থাকেন মানুষের মনে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ।



তারেক মাসুদ । একজন চলচ্চিত্রকারের নাম । আমি বলি বাংলাদেশের সত্যজিৎ রায় । তিনি আমাদের মধ্যে নেই, আবার আছেন । তাঁর সৃষ্টির বিপুল বৈভব নিয়ে প্রচণ্ডভাবে এই বাংলায় বিরাজ করছেন তিনি । সৃষ্টিশীলের কখনো মৃত্যু হয় না । তিনি বেঁচে থাকেন মানুষের মনে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ।

আজকে একটু অন্যভাবে খুঁজবো বাংলার বিরল প্রতিভা তারেক মাসুদ কে । গীতিকার তারেক মাসুদ বা আ তা মাসুদ । আ তা মাসুদ নামের আড়ালে তিনি রচনা করেছেন বাংলার লোক সঙ্গীতের বাউল ঘরানার সুফী দর্শন ও কাব্যময়তার গান । আর এভাবেই তিনি ভিন্ন সত্তার পরিচয় দিয়ে হয়ে উঠেছেন মৃত্তিকার খুব আপন একজন ।
মাটির ময়না চলচ্চিত্রের ‘ যদি বেহেশতে যাইতে চাও ’, ‘ পাখিটা বন্দি আছে ’ এই গানগুলো শুনে দারুণ আলোড়িত হয়েছিলাম একসময় । তখন অতো খুঁজে দেখিনি কে এই গান সমূহের স্রষ্টা । সম্প্রতি মাটির ময়না ছবিটা আবার দেখার পর একটু সিরিয়াসলি খুঁজে আবিস্কার করলাম আমার প্রিয় ওই গান গুলোর নেপথ্যের মানুষটির নাম আর কেউ নয়, স্বয়ং তারেক মাসুদ ।

তাঁর বন্ধু, সহরচর বা স্বপ্নসঙ্গী ক্যাথরিন মাসুদ বলেন, ‘‘ একজন চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তারেক মাসুদকে সবাই কমবেশি চেনেন । কিন্তু খুব কম মানুষই হয়তো জানেন যে সে শুধু একজন পরিচালকই ছিলেন না, বরং একজন গীতিকার হিসেবেও তাঁর প্রতিভা ছিল সমীহ করার মতো । তাছাড়া চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য যে ধরনের আয়োজন ও ব্যবস্থাপনার ঝক্কি পোহাতে হতো গান লেখার ক্ষেত্রে সেটি ছিলো না বলেই বিষয়টিকে সবসময়ই ভীষণ উপভোগ করতো তারেক । ‘ শ্যাম চাচা গেল কোথায়’ শিরোনামে প্রথম গানটি সে লিখে ‘ মুক্তির গান ’ চলচ্চিত্রের জন্য । মূলত ‘ মুক্তির গান ’ এর পোস্টারের সাথে মানানসই করে তোলার জন্যই চমৎকার এই গানটির কৌশলী প্রয়োগ ঘটিয়েছিলো তারেক, যেখানে গানটি লেখারও প্রায় বছর বিশেক আগে ১৯৭১ সালের পটভূমিতে একটি সাংস্কৃতিক দলের মুখে তারেকের এই গানটির চিত্রায়ন আমরা দেখেছিলাম । এখানে গানের মূল ফুটেজটিতে শিল্পীদের কণ্ঠে ছিল একটি প্রচলিত কীর্তন গাইবার দৃশ্য । অথচ ‘মুক্তির গান ’ চলচ্চিত্রে এখানেই তারেক মাসুদ শিল্পীদের মুখে তুলে দেন আত্মসমর্পণের আগে ভীতসন্ত্রস্ত পাকিস্তানী সামরিক নেতাদের বিদ্রূপ করে লেখা ‘ শ্যাম চাচা গেল কোথায়’ গানটি । এজন্য তারেক যে শুধু সাদামাটাভাবে একটা গান লিখেছিলো তা নয়, বরং মূল ফুটেজের শিল্পীদের ঠোঁট নাড়ানোর প্রতি খেয়াল রেখেই পুরো গানের কথা মানানসই ভাবে তৈরি করে তারেক। ’’

তাঁর লেখা কয়েকটি গানের কিছু বিশেষ লাইন –
গান – ‘ যদি বেহেশতে যাইতে চাও ’

অখণ্ডনীয়, অপরিবর্তনীয় শরীয়ত ও যুক্তিবাদী মারফতের দ্বন্দ্ব নির্ভর অসাধারণ গান এটি । শরীয়তপন্থী মহিলা বয়াতির সওয়াল ও সুফীবাদী মারফতপন্থী করিম বয়াতির জবাবের মধ্য দিয়ে গানটি পরিণতি পায় । মাটির ময়না চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহার করা হয় । শিল্পী আয়নাল মিয়া ও মমতাজের অপূর্ব গায়কীতে যেন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় প্রথা ও সংস্কারের দেয়াল । কিছু লাইন এমন –

– মহিলা বয়াতি
ফকিরেরা জিকির করে নামাজ ফাঁকি দিয়া
রোজার দিনে গাঁজা টানে ধ্যানের নাম নিয়া

কোন তরিকা মতে বলেন
জায়েজ এমনতর গো …
অন্তরে রাইখো আল্লার ডর

– করিম বয়াতি
লোক দ্যাখানো সেজদা দিলে সালাত কি আর হয়
নামাজ হইলো এবাদত, কায়েমের বিষয়,
রোজার অর্থ আন্তসংযম কয়জন মানে তায় ?
দিনের বেলা না খাইয়া রাইতে ডবল খায় ।

বেহেস্তের লোভ করি না হায়
নাই দোজখের ডর গো …
প্রেম রাইখো অন্তরের ভিতর

– মহিলা বয়াতি
হজ্ব জাকাত করেন না, না হয় নিলাম মানি
কী প্রবলেম করছে আপনার বলেন কুরবানি
রক্ত দেখলে কাঁপবে কেন
মুসলিমের অন্তর গো
অন্তরে রাইখো আল্লার ডর

– করিম বয়াতি
কুরবানি করিতে হুকুম প্রাণপ্রিয় ধন,
গরু – ছাগল হইলো কি তোর এতই প্রিয়জন ?
নিজের থেকে প্রিয় বস্তু আর কিছু যে নাই
আত্মত্যাগই আসল কুরবান জেনে নিও ভাই

দশ ইন্দ্রিয় ছয়টি রিপু
পারলে দমন কর গো …
প্রেম রাইখো অন্তরের ভিতর

গান- ‘‘ প্রজন্ম ৭১ ’’

সৃষ্টিশীল মানুষেরা যে প্রচণ্ড দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হয় তা এই গানটি শুনলে স্পষ্ট বুঝা যায় । ২০১৩ সালের ঐতিহাসিক শাহাবাগ আন্দোলনের আগেই গানটি লেখা হয়েছে । আমার বারবার মনে হয়েছে আমাদের প্রাণের এবং আবেগের বিস্ফোরণ কেন্দ্র ‘ প্রজন্ম চত্বর ’ উনি যদি দেখে যেতে পারতেন !

প্রজন্ম আজ ফেটে পড়ছে প্রচণ্ড প্রতিবাদে
হত্যাকারীর হবে কি বিচার যুদ্ধাপরাধে ?

… তোমার যুদ্ধ শেষ হয়নি সেই একাত্তর সনে
সংশপ্তক মানে তোমার শমী জন্ম থেকেই জানে
আলবদরের গাড়িতে ফ্ল্যাগ
তোমার চোখে বাঁধে । …
……………………
সূত্র – ‘ তারেক মাসুদের গান ’ (সিডি), লেজার ভিসন লিমিটেড ।

১৪ thoughts on “চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ – গীতিকার তারেক মাসুদ

  1. ৩/৪ বার চেষ্টা করলাম । পিকচার
    ৩/৪ বার চেষ্টা করলাম । পিকচার আপলোড হলোনা !!!
    সমস্যা কোথায় হলো বুঝলাম না :ভাঙামন: :মাথানষ্ট: :কানতেছি:

    1. image url কপি করার সময় সম্ভবত
      image url কপি করার সময় সম্ভবত “copy image location” কপি না করে “copy link location” কপি মারছিলেন। এইজন্যই ছবি আসে নাই। নিজে ঠেকে ঠেকে শিখছি। আপনারে ফ্রি সলিউশন দিয়া দিলাম। :ভেংচি:

      1. ধন্যবাদ আতিক ভাই,
        কপি ইমেজ

        ধন্যবাদ আতিক ভাই,
        কপি ইমেজ লোকেশন ই দিয়েছিলাম । আপনি কি আমায় বলবেন ছবি আপলোড হতে কতো সময় লাগে ? এখন তো দেখছি ঠিকই আপলোড হয়ে গেছে ! :ভাবতেছি:

  2. শুধু গান নয় তারেক মাসুদ যদি
    শুধু গান নয় তারেক মাসুদ যদি শুধু লেখালেখিই করতেন একজন ভালো লেখকও হতে পারতেন। সেই যোগ্যতা উনার ভালমতোই ছিল। এসব চিন্তা করলে আফসোস আরও বাড়ে।

    1. ডাঃ আতিক,
      আপনি ঠিকই বলেছেন ।

      ডাঃ আতিক,
      আপনি ঠিকই বলেছেন । ওনার ‘ চলচ্চিত্র যাত্রা ‘ বইটি পড়তে পড়তে অনেকবার ভেবেছি
      এতো চমৎকার গদ্যশৈলী একজন ভালো লেখক না হলে থাকতে পারেনা ।

      1. সহমত… একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম
        সহমত… একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম তাঁর!!
        চমৎকার তাঁর রচনাশৈলী… কিন্তু বইটা কালেক্ট করতে হবে!
        পড়া হয়নি!! এইটাই ব্লগে লিখা-লিখি করার মজা… অনেক কিছু জানা যায়!!
        রাহাত ভাই আজ তারেক মাসুদকে নতুন করে চিনালেন তাঁর গীতিকার পরিচয় আমার জানা ছিল না!! তারেক মাসুদকে :salute: :salute: :salute: :salute: এবং আপনাকে ধইন্যা :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: আর :থাম্বসআপ:

  3. যখনই তারেক মাসুদকে স্মরণ করি
    যখনই তারেক মাসুদকে স্মরণ করি তখনই মনের অজান্তে চোখের কোণ দিয়ে জল বের হয় , অশ্রু সংবরণ করতে পারিনা । আমার এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তিনি আমাদেরকে এতিম করে না ফেরার দেশে চলে গেছেন ! স্যালুট তোমায় তারেক মাসুদ ! তোমায় কোনদিন ভুলবোনা । যুগ যুগ বেঁচে থাকো তুমি আমাদের হৃদয়ে , আমাদের কর্মে , আমাদের চেতনায় ।

    1. ভালো ছবির ভালো দর্শক সৃষ্টিতে
      ভালো ছবির ভালো দর্শক সৃষ্টিতে তারেক মাসুদের ভূমিকা অনস্বীকার্য । অন্যান্য স্বাধীন চলচ্চিত্রকার তথা তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলামরা যখন কেবল ভালো ছবি নির্মাণ করে নিরব নিস্তব্ধ হয়ে যেতেন তারেক মাসুদ তখন তাঁর ছবি নিয়ে সারা দেশ চষে বেড়াতেন। তিনি আন্তরিকভাবে চাইতেন ভালো ছবির ভালো দর্শক তৈরি হোক । তিনি অনেকটাই সফল হয়েছিলেন । দেশে ভালো ছবির দর্শক ধিরে ধিরে তৈরি হচ্ছিল । হ্যাঁ, সেই দর্শক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল । তবু বলবো, সত্যজিৎ রায় ও অপরাপর বিখ্যাত ফিল্ম মেকারদের মতো তারেক মাসুদ পেরেছিলেন তার নিজেদের ছবি বানাতে । তাঁর ছবি পরিচিতি পেয়েছে তাঁর নামে – শাকিব খান, শাহরুখ, মাধুরী র নামে যেমন ছবির পরিচিতি ছড়ায় তেমন হয়নি । এ কারণেই মাটির ময়না, রানওয়ে, নরসুন্দর তারেক মাসুদের ছবি ।

  4. আপনার পোস্ট থেকে তারেক
    আপনার পোস্ট থেকে তারেক মাসুদের আরেকটি গুনের কথা আরেকবার জানলাম ।আতিক ভাই ঠিকই বলেছেন, উনি যদি লিখালিখি করতেন তবে ভাল একজন লেখক ও হতে পারতেন ।আসলে কিংবদন্তিরা যে বিভাগেই যাবেন সে বিভাগটাতেই জন্য নাম কুড়াতে পারেন।

    1. ধন্যবাদ শাহিন ভাই,
      একজন

      ধন্যবাদ শাহিন ভাই,
      একজন শক্তিশালী পরিচালককে চলচ্চিত্রের প্রতিটি বিভাগেই দক্ষ হতে হয় । অর্থাৎ ‘ জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ ‘ জানতে হয় ফিল্ম মেকার কে । তাঁর গদ্য লেখার হাতও ছিল অসাধারণ । আমাদের দুর্ভাগ্য অকালে তাকে হারাতে হল । আমার মনে হয় আর দশটি বছর তিনি বেঁচে থাকলে বাংলা চলচ্চিত্রে সত্যজিতের পরে আবার বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলতেন । সেই ক্ষমতা ও যোগ্যতা তিনি অর্জন করেছিলেন ।

  5. সুন্দর তথ্যবহুল পোস্টের জন্য
    সুন্দর তথ্যবহুল পোস্টের জন্য ধন্যবাদ , তারেক মাসুদের তুলনা তারেক মাসুদ

    1. রাফিউজ্জামান সিফাত,
      হুম,

      রাফিউজ্জামান সিফাত,
      হুম, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাঁর তুলনা একমাত্র তিনি নিজে ।

  6. তারেক মাসুদের এই গুনের কথা
    তারেক মাসুদের এই গুনের কথা জানতাম না। এমন বিষয় তুলে ধরার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ রাহাত ভাই।
    বাংলাদেশের চ্চলচিত্র যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবে যায় সেটা আমাদের শিখিয়েছেন তারেক মাসুদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *