১৫ ই আগস্ট

আমি দূর হতেই খেয়াল করলাম কেয়া পুরুপুরি কালো রঙের সালোয়ার-কামিজ পড়ে পাবলিক লাইব্রেরির চত্বরে দেয়ালে বসে পা ঝুলিয়ে সবুজ আইস্ক্রিম খাচ্ছে। ঈদের আমেজ এখনো পুরপুরি কাটেনি। লাইব্রেরি চত্ত্বর ফাঁকা ফাঁকা । আমি কাছে গিয়ে বললাম ,
– ঘটনা কি? ঢাকা শহরে কি কাকের অভাব পড়ল? কাক সেজে বসে আছিস কেন?
আজকে জাতীয় শোক দিবস।
– আজকে যেন কয় তারিখ? ও হ্যাঁ, গতবছর এই দিনেই আমি তোকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম! কিন্তু সেটা যে জাতীয় একটা ব্যাপার হবে এটা ভাবিনি!
– গাধা! তুই কি বাংলাদেশে থাকিস? আজকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল।


আমি দূর হতেই খেয়াল করলাম কেয়া পুরুপুরি কালো রঙের সালোয়ার-কামিজ পড়ে পাবলিক লাইব্রেরির চত্বরে দেয়ালে বসে পা ঝুলিয়ে সবুজ আইস্ক্রিম খাচ্ছে। ঈদের আমেজ এখনো পুরপুরি কাটেনি। লাইব্রেরি চত্ত্বর ফাঁকা ফাঁকা । আমি কাছে গিয়ে বললাম ,
– ঘটনা কি? ঢাকা শহরে কি কাকের অভাব পড়ল? কাক সেজে বসে আছিস কেন?
আজকে জাতীয় শোক দিবস।
– আজকে যেন কয় তারিখ? ও হ্যাঁ, গতবছর এই দিনেই আমি তোকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম! কিন্তু সেটা যে জাতীয় একটা ব্যাপার হবে এটা ভাবিনি!
– গাধা! তুই কি বাংলাদেশে থাকিস? আজকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল।

আমি বাংলাদেশেই থাকি। আমার পরের প্রজন্ম থাকতে পারবে কিনা বুঝতে পারি না শুধু ।আজকেও সকালবেলা ঘুম ভেঙেছে ককটেলের শব্দে । রাস্তায় বের হয়ে দেখি চাপ চাপ রক্ত। কে বা কারা খুন হয়েছে । একটা গলা ডাস্টবিনে কুকুর মরে পচে আছে । গন্ধে বমি আসে। আমি নাক মুখ চেপে ধরে ডাস্টবিন পার হয়ে দেখি মাংসের একটা দলা যাতে জীবনের চিহ্ন প্রায় বিলীয়মান আমার পায়ের কাছে পড়ে আছে! এভাবে বেঁচে থেকে কি লাভ ভাবতে ভাবতে অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নেই!
গত কয়েকমাস যাবত আমার প্রত্যেকটি সকাল কমবেশি এভাবেই শুরু হয়। মাঝে মাঝে ভাবি বাংলাদেশে হয়তো একটা বছর জাতীয় শোক বছর ঘোষণা করা যেতে পারে! যে দেশে প্রতিদিন কেউ না কেউ মরে,ঈদের দিনে লঞ্চ ডুবে বা ট্রেন বগিচ্যুত হয় সে দেশে সত্যিই কি কোন ভোঁর শোক ছাড়া আসে?

আইস্ক্রিমের কাঠিটা ঢিল দিয়ে ফেলে দিয়ে কেয়া জিজ্ঞেস করে,
কি হল? চূপ মেরে গেলি কেন?
-চল কোথাও ঘুরে আসি?
রাস্তাঘাট তো কাদায় মাখামাখি,কই আর ঘুরব?
– ধানমণ্ডি লেকের ঐদিকে যাই চল ।
আচ্ছা তোর সমস্যা কি বলতো? আজকে আমাদের সিনেমা দেখার কথা না?!
-হুম…কথা ছিল। কিন্তু এখন আমার তোর হাত ধরে হাটতে ইচ্ছে করছে । তুই কি যাবি?
আমরা ধানমণ্ডি লেকের পাশ দিয়ে হাত হরাধরি করে হাটতে থাকি। বেশ শীতল হাওয়া দিচ্ছে। কেন যানি দীর্ঘস্বাসের সাথে এ হাওয়ায়ার অদ্ভুত মিল আছে। আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার মত করে বলি ,কেয়া!
কেয়া চমকে আমার দিকে তাকায়, কি হয়েছে রে?
আমি গতরাতে একটা কবিতা লিখেছি ।শুনবি?
কেয়া চোখের ইশারা করে বলে, হুম পড় ।
আমি মাঝের চার লাইন পড়ি।
“এভাবে আমাদের কেটেছিল ঘুমঘোর
এখানে আমাদের রটেছিল বদনাম
এখানে আমাকে মুজিব! মুজিব!
বলে তুমি দিয়েছিলে ডাকনাম!”
কেয়া কিছু বলে না। মুখ নিচু করে ওর হ্যান্ডব্যাগে কি জানি খুঁজে। হাতে তার স্পর্শ নিয়ে নিসচিন্ত হয়ে আবার লুকিয়ে ফেলে ।

হাটতে হাটতে পথ ও ফুরিয়ে আসে। উষ্ণ প্রেম একদিন তো জুড়িয়ে আসে। সব পথ শেষতক তো পিতার বাড়ির সামনেই এসে শেষ হয় । পথের যে গন্তব্য ঘরে পৌঁছান ।

আমরা এখন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে ঢুকব । এখানে একজন চিরজীবিত বৃদ্ধ বাস করেন । তার সাথে আমার ঈদের কোলাকুলিটা সারতে হবে । আমার বুকের দেশ নিয়ে অসংখ্য হতাশার পাথর জমে আছে। এই প্রৌঢ়ের চোখ দেখেই বুঝা যায় তার বুকেও জমা বেঁধেছে তার প্রিয় মানুষদের প্রতি অজস্র অভিমান । কোলাকুলি করলে শুধু বুকের সাথে বুকের মিল হবে তা না, পাথরের সাথে পাথরের ঘষা লাগবে। পাথরের সাথে পাথরের ঘষা লাগলেই তো আগুন জ্বলে। অজস্র আগুনের জ্বালানি বুকে নিয়েই একজন মুজিব ঘুমিয়ে থাকেন ।

আমার নাম সজিব । আমি এখন টি এস সির মোড়ে দাঁড়িয়ে ঝুমবৃষ্টিতে ভিজছি । এখন গোধূলি। আকাশটা লাল । একটু বেশিই লাল। বৃষ্টির ফোটাগুলকে রক্ত বলে ভুল হয়। কোন এক মায়াবী কণ্ঠ অনেক দূর থেকে বলছে “সজীব,জ্বর আসবে! উঠে আয়!” সজীব! সজীব! কেন জানি আমার মনে হয় কেউ একজন আমাকে ডাকছে মুজিব! মুজিব!! আমি উঠে আসি। কারো দুটি উষ্ণ হাত আমার মাথা মুছে আমার দিকে একটা পাঞ্জাবি, একটা কালো কোরতা আর একটা মোটা ফ্রেমের চশমা বাড়িয়ে দেয় ।আবছা আলতে মুখটা কেয়ার মত মনে হয়। আমি ওদিকে তাকাই না। রাস্তায় নামি ।

নিয়ন আলোতে একজন সজীব মুজিব রাস্তা ধরে হাটতে থাকেন । পিছনে কার চোখ থেকে জানি তখন দু ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে । হতে পারে বাংলাদেশের ।

২ thoughts on “১৫ ই আগস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *