পিতা তোমায় শ্রদ্ধাঞ্জলি…


বেদনা বিধুর ও কলঙ্কের কালিমায় কলুষিত বিভীষিকাময় ইতিহাসের এক ভয়াল দিন। যেদিন ঘাতকের নখর দেখে থমকে যায় বাতাস। নীলাভ আকাশ হয়ে ওঠে বর্ণহীন ফ্যাকাশে। বন্ধ হয়ে যায় বৃক্ষপত্রের নড়াচড়া। পাখি ভুলে যায় গান। আজ সেই শোকের দিন। কান্নার দিন।



বেদনা বিধুর ও কলঙ্কের কালিমায় কলুষিত বিভীষিকাময় ইতিহাসের এক ভয়াল দিন। যেদিন ঘাতকের নখর দেখে থমকে যায় বাতাস। নীলাভ আকাশ হয়ে ওঠে বর্ণহীন ফ্যাকাশে। বন্ধ হয়ে যায় বৃক্ষপত্রের নড়াচড়া। পাখি ভুলে যায় গান। আজ সেই শোকের দিন। কান্নার দিন।

বাংলা ও বাঙ্গালির ইতিহাসে রক্তের অক্ষরে লেখা পঁচাত্তরের রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট। এই দিনে কতিপয় ক্ষমতালোভী, কাপুরুষ, অকৃতজ্ঞ আর্মি অফিসার মেতে উঠেছিল তাঁজা প্রাণ বিনাশের ঘৃন্য এক নিষ্ঠুর খেলায়। খুন করেছিল বাঙ্গালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার-স্বজনদের। রেহাই পায়নি নারী। কেঁদেও বেঁচে থাকার অনুমতি পায়নি বঙ্গবন্ধুপুত্র শিশু রাসেল।

কাঁদো, বাঙালী কাঁদো। সেদিনের সেই শোক হয়ে গেছে চিরদিনের। সেই শোক জেগে আছে রক্তরাঙ্গা ওই পতাকায়। সেই শোক অনির্বাণ এখনও বাংলায়। নদীর স্রোতের মতো চির বহমান এই শোকপ্রবাহ। বাংলাদেশ ও বাঙালীর জন্য গভীর মর্মস্পর্শী শোকের দিন।

বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম সেই পুরুষ তিনি, একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার মানুষের অবিসংবাদিত নেতা মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে (১৯২০-১৯৭৫) স্বদেশের মাটি আর মানুষকে এমন গভীর ভালবাসার বন্ধনে বেঁধেছিলেন, যে বন্ধন নয় কোনদিনও ছিন্ন হওয়ার।

আজীবন ঔপনিবেশিক শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে, দরিদ্র-নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে এমন এক অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন, যার তুলনা বিরল। একজন প্রকৃত নেতার যেসব গুণাবলী থাকা প্রয়োজন, তার সব গুণ নিয়েই জন্মেছিলেন ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ। যাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল বহুবর্ণিল, যাঁর কণ্ঠে ছিল জাদু। যিনি রচনা করেছিলেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিজয় ইতিহাস।

এতকিছুর পরও শেষ পর্যন্ত তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে ঘাতকের হাতে। নারী-শিশুরাও সেদিন রেহাই পায়নি ঘৃণ্য ঘাতকচক্রের হাত থেকে। বিদেশে থাকার জন্য প্রাণে বেঁচে যান কেবল বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা।

তাই তো ১৫ আগস্ট হয়ে আছে বাঙালীর ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত দিন। বাংলাদেশের ইতিহাসের অত্যন্ত মর্মস্পর্শী করুণ এক অধ্যায়।

সেদিন নরপিশাচরা রাতের অন্ধকারে হামলা চালায় স্বাধীনতার স্থপতির বাসভবনে। কাপুরুষোচিত আক্রমণ চালিয়ে পৈশাচিক পন্থায় ঘাতক দল বঙ্গবন্ধুকে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে হত্যা করে। শুধু বঙ্গবন্ধুকেই নির্মমভাবে হত্যা করেনি, মেতে উঠেছিল অদম্য রক্তপিপাসায়।

নিষ্ঠুর কায়দায় একে একে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, তিন ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশুপুত্র শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল, বঙ্গবন্ধুর অনুজ পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা শেখ নাসের, ভগ্নিপতি পানি সম্পদমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর ছেলে আরিফ ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু, ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, সেরনিয়াবাতের কন্যা বেবি সেরনিয়াবত, আবদুর নঈম খান রিন্টু, বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলসহ কয়েক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মচারী।

লুঙ্গিতে জড়ানো শিশু রাসেলের রক্তভেজা লাশ দেখে খুনীদের প্রতি চরম ঘৃণা-ধিক্কার জানানোর ভাষা পায়নি মানবতাবাদী বিশ্বের কোন মানুষ।

১৯৭৫ সালের সে ১৫ আগস্টে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাসভবনসহ তিনটি বাড়িতে সংঘটিত খুনীদের নারকীয় পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের ভয়াল বীভৎসতার হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর আলাউদ্দিন আহমেদ পিএসসি।

সে বর্ণনা ছিল এরকম : ‘কী বীভৎসতা! রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল বাড়িটির প্রতিটি তলার দেয়াল, জানালার কাঁচ, মেঝে ও ছাদে। রীতিমতো রক্তগঙ্গা বয়ে যায় বাড়িটিতে। গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। চারপাশে রক্তের সাগরের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ঘরের জিনিসপত্র।

প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানে নিথর পড়ে আছেন ঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া চেক লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পরা স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু। তলপেট ও বুক ছিল বুলেটে ঝাঁঝরা। নিথর দেহের পাশেই তাঁর ভাঙ্গা চশমা ও অতিপ্রিয় তামাকের পাইপটি।

অভ্যর্থনা কক্ষে শেখ কামাল, টেলিফোন অপারেটর, মূল বেডরুমের সামনে বেগম মুজিব, বেডরুমে সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামাল, নিচ তলার সিঁড়িসংলগ্ন বাথরুমে শেখ নাসের এবং মূল বেডরুমে দুই ভাবির ঠিক মাঝখানে বুলেটে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলের লাশ।’

ভয়াবহ সেই হত্যাযজ্ঞের বিচার পেতে, পিতা হত্যার দায় থেকে মুক্তি পেতে বাঙ্গালি অপেক্ষা করেছে যুগের পর যুগ। অবশেষে সেই বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে অবশেষে বিচারের বাণীর নিভৃত কান্নার অবসান ঘটল ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি মধ্যরাতের পর।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির রায় কার্যকর হয় বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত পাঁচ খুনীর। কলঙ্কমুক্তির আনন্দে উদ্বেল হয় গোটা দেশ। তবে এখনও বিদেশের মাটিতে পলাতক রয়েছে আরও ছয় খুনী। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত এই ছয় খুনী পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

এসব পলাতক খুনীদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, কার্যকর করা হবে মৃত্যুদন্ডাদেশ- এই প্রত্যয় আর অঙ্গীকারের মধ্য দিয়েই এবার এলো শোকাবহ ১৫ আগস্ট।

যিনি ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকদের মেশিনগানের মুখেও ছিলেন অকুতোভয়, প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?- সেই অনির্বাণ সূর্যের প্রখর ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধুর দৈহিক বিনাশ ঘটলেও তাঁর আদর্শের মৃত্যু হতে পারে না।

মানুষ মরে যায়, আদর্শ মরে না। বঙ্গবন্ধু কোন ব্যক্তিমাত্র নন, তিনি অবিনশ্বর এক আদর্শ ও প্রেরণার নাম। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে সেই প্রেরণাতেই।

৪ thoughts on “পিতা তোমায় শ্রদ্ধাঞ্জলি…

  1. আজকের এই ব্যাথাভরা দিনে,
    আজকের এই ব্যাথাভরা দিনে, বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেসা মুজিব, মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, মুক্তযোদ্ধা শেখ জামাল, শেখ রাসেল সহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্যান্য সকল সদস্যদেরকে।
    যেখানেই থাকুন যেভাবেই থাকুন মহান সৃষ্টিকর্তা যেন উনাদের ভাল রাখেন।

  2. নর পিশাচ খন্দকার মোস্তাক ‘
    নর পিশাচ খন্দকার মোস্তাক ‘ ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স ‘ জারি করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল, পারেনি । সত্যের জয় হবেই । ৭৫ পরবর্তী অল্প সময়ের মধ্যে কারা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে রুপান্তর করেছিলো, কারা ১৯২২ সালে রচিত নজরুলের ভাঙ্গার গানে ব্যবহৃত জয় বাংলা শ্লোগান কে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বানিয়েছিল,

    কারা বলেছিল জয় বাংলা শ্লোগান হিন্দুর, কারা মুক্তি যুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধর্ষণ করে মৌলবাদী অপ দর্শনে দেশকে পরিচালিত করেছিলো, কারা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশি দূতাবাসে, মিশনে চাকুরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলো, কারা ইতিহাস বিকৃত করে কয়েকটি প্রজন্মেকে বিভ্রান্ত করেছিলো তাদের আমরা চিনি ।

    এ দেশ, এ জাতির দুর্ভাগ্য একাত্তরের পরাজিত সংখ্যালঘু শকুনরা স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও প্রবল প্রতাপে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ক্ষমতার সহায়তায় । তারাই আজ কেক কেটে তথাকথিত দেশনেতৃর ৬৯ তম জন্ম উৎসব পালন করছে জাতীয় শোক দিবসে । বিভ্রান্ত, আত্মঘাতী বাঙালি তবু ঘুমিয়ে থাকবে ! জেগে ওঠার দারুণ সময় আজ । ঘাতকের প্রতি ক্ষমাহীন হবার অগ্নি সময় আজ …

  3. বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু বাংলাদেশের
    বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু বাংলাদেশের বাংলাদেশ হয়ে ওঠা থেকে অনেক বছর পিছিয়ে দিয়েছে। এই ক্ষতির মাসুল আজো দিয়ে যেতে হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *