নেতা ও বিপ্লবী

সদ্যস্বাধীন ছোট্ট একটি দেশ। এক নেতার এক দেশ। দেশের আপামর জনসাধারণ নেতার কথায় জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে হায়েনার খপ্পর থেকে দেশকে মুক্ত করেছে। বাড়ির ছাদে দাড়িয়ে নেতা তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে, সেখানে অজস্র তারার ছড়াছড়ি, এই আকাশটা একসময় স্বাধীন ছিল না। নেতার শরীর ছুয়ে যায় ফুরফুরে অদ্ভুত শীতল একটা দমকা বাতাস। ‘এই দুস্টু বাতাসটা একসময় মুক্ত ছিল না। ছিল না তার এইভাবে ছুটে বেড়ানোর অধিকার। একটি ফুলকে বাচাতে আমার দেশের মানুষ তাদের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধ করেছে, আজ স্বাধীন আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি সে তো আমার দেশের মানুষের জন্যই’- নেতা নিজেকেই নিজে বললেন। দেশের মানুষকে অসম্ভব বিশ্বাস করেন নেতা। তারা তাকে জাতির পিতা ডাকে, তারা তার কথায় লাখে লাখে জীবন বিলিয়ে দেয়, তারা কখনও তার কথা অমান্য করেনা।
নেতার শরীর ছুয়ে গেল একঝাক শীতল বাতাস, খোলা শরীরে ছড়িয়ে দিয়ে গেল অদ্ভুত শীরশীরে অনুভূতি, মনে ছড়িয়ে দিয়ে গেল কিছুটা বিস্বাদ। একসময় যারা নেতার পাশে ছিলেন, তাদের অনেকে এখন নেতা থেকে দূরে সরে গেছেন। নেতা জানেন না কেন মানুষগুলো তাকে বুঝতে পারেনি, যেমন তিনি জানেন না তিনি কখনো মানুষগুলোকে বুঝতে পেরেছেন কিনা। নেতা শুধু জানেন, নুতন দেশটার জন্মের আগে, মুক্তির সংগ্রামের সময় মানুষগুলো তার অনেক কাছের ছিল। একসাথে কাঁধে কাধ মিলিয়ে, একসাথে হাতে হাত রেখে তার কথায় যুদ্ধে শামিল হয়েছিল। মানুষগুলো এখন অনেক দূরে। আশপাশে দূষিত পরিবেশ, মানুষগুলো কেমন অদ্ভুত রকমের স্বার্থপর। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, স্বাধীন দেশে নেতার চারপাশের বিশ্বস্ত ভালোবাসার লোকগুলো সরে গিয়ে সেই স্থানে এসেছে সব দুর্নীতিবাজ, চাটুকার লোকজন। নেতা সব বুঝতে পারেন। তবু নেতা অবিশ্বাস করতে পারেন না তার মানুষকে। প্রতিবেশী বন্ধুদেশের গোয়েন্দা সংস্থা তাকে জানাতে এসেছিল তার আশপাশের আপাত ঘনিস্ট লোকগুলো তার ক্ষতির কারন হতে পারে, তিনি নির্বিকারভাবে তাদের জানিয়ে দিয়েছেন, তার লোকেরা তার ক্ষতি করতে পারেনা। উলটো প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থাকে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা যেন তাকে নিয়ে না ভেবে নিজ দেশের নেতার নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেন!
নেতা জানেন, তার দেশের লোকেরা তাকে ভালোবাসে অসম্ভবরকম। তারা কোনভাবেই তার ক্ষতি করতে পারে না। আকাশের চাদটার দিকে তাকিয়ে নেতার মনে হয়, চাদটা যেন তাকে ইর্ষাভরে দেখছে। ইশ্বর নেতাকে যা দিয়েছেন, চাদকে তা দেননি। ছাদের কার্নিশ থেকে নেতা ফিরে আসেন তার বৈঠকখানায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও নেতা তার পুরনো বাড়িতেই থাকেন। দেশের মানুষকে অসম্ভব বিশ্বাস করেন বলেই তেমন কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই এই বাড়িতে।
এমন সময় আকাশে বিদ্যুৎ চমকালো, নেতা কিছুটা চমকে উঠলেন, একটু আগে তিনি পরিস্কার আকাশ দেখে এসেছেন। দেশের মানুষকে বিশ্বাস করলেও দেশের আবহাওয়াকে বিশ্বাস করার কারণ নেই। ইজিচেয়ারে বসে নেতা তবু আজ দেখবেন ঝড়ের স্বরূপ। জানালা খোলা, ঝাকে ঝাকে ধুলা বয়ে নিয়ে এসে ঘরে প্রবেশ করছে অশান্ত বাতাস, কাচের জানালা বাড়ি খাচ্ছে, টেবিল ল্যাম্পটা নিভিয়ে নেতা অন্ধকারে তাকিয়ে থাকলেন ঘরের পেছনের দরজাটার দিকে। একটু আনন্দ, একটু গৌরব, একটু বিমর্ষতা নেতার মনটাতেও প্রচন্ড ঝড় সৃস্টি করেছে। এমন সময় হঠাত নেতার চোখে পড়ল একটা ছায়ামূর্তি। তার চেহারাটা অদ্ভুত, বড় গোঁফ, প্রচন্ড ব্যক্তিত্ব। ছায়ামুর্তির চেহারায় একইসাথে ধ্বংসকামীতা আর সৃস্টিশীলতার সংমিশ্রণ। রাস্তার আলোয় একদৃষ্টিতে ছায়ামুর্তিটাকে দেখতে দেখতে হঠাত নেতা খেয়াল করলেন, ছায়ামুর্তি যেন তার দিকে কিছুটা এগিয়ে এল। ‘কে তুমি? কি চাও?’ নেতা জিজ্ঞেস করলেন ছায়ামূর্তিটাকে। ‘আমাকে চেনেননি নেতা? আমার দুইটা নাম আছে, একটা নাম বিপ্লবী, অন্যটা ডাকাত। আপনি আমাকে দ্বিতীয় নামটাতে ডাকতেন’। নেতার মনে পড়ল, সাত মাস আগের সে দিনটার কথা, যেইদিন নেতার নির্দেশে তার বাহিনীর লোকেরা একটা মানুষকে হত্যা করেছিল, নেতার সামনে দাঁড়ানো ছায়ামূর্তিটা সেই মানুষটাই। সমগ্র দেশে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়েছিল লোকটা, স্বাধীন দেশে শুরু করেছিল খুন খারাপি,লুটপাটের রাজনীতি। নেতার আর কোন উপায় ছিল না লোকটাকে না হত্যা করে।
‘তা এতদিন পর তুমি কেন এলে? বলো তুমি কি চাও?’ নেতা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন লোকটার দিকে। ‘আমার তো এখন জীবন নেই, আমার আপনার কাছে চাওয়ার কিছু নেই। বেঁচে থাকতে যা চেয়েছিলাম তা আপনি দেননাই আমাকে। এখন আপনার কাছে আমি কিছু চাই না’।
‘তুমি ভুল করেছিলে। সদ্যস্বাধীন একটা দেশে আমি গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্র আনতে চেয়েছিলাম। তুমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও সেই দেশটাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলে। ‘
‘নেতা আমি দেশটাকে ধ্বংস করতে চাইনি। আমি শুধু রাষ্ট্রটাকে ধ্বংস করতে চেয়েছি,দেশ আর রাষ্ট্র কখনোই এক নয়। যেই রাষ্ট্রটা কখনোই আমার দেশের মেহনতী মানুষের স্বার্থে পরিচালিত হয়না, যে রাষ্ট্র তার সব নাগরিকের সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনা, যে রাষ্ট্রে মাথা উঁচু করে বাচতে চাওয়ার অপরাধে অনেক স্বপ্নবাজ মানুষের মাথা কাটা যায়, যেই রাষ্ট্র তরুণদের স্বপ্ন দেখতে ভুলিয়ে দেন, আমি সেই রাষ্ট্র ভাংতে চেয়েছিলাম।’
‘তুমি যেটা করেছ সেইটাকে বলে নির্বুদ্ধিতা, হঠকারিতা। তোমার আর তোমার পার্টির লোকের অসংখ্য নিরাপরাধ মানুষকে খুন করেছে।’নেতা কিছুটা উত্তেজিত।
‘না নেতা। আমরা যাদের মেরেছি তারা আপনার রাষ্ট্রে, আপনার আইনে নিরাপরাধ হতে পারে। আমাদের আইনে তারা অপরাধী, গণদুশমন। যুগযুগ ধরে এই ভূখন্ডে জমিদার-জোতদাররা কৃষকদের উপর যে অমানুষিক শোষন-নিপীড়ন চালিয়েছে, সেইগুলো আপনার চোখে, আপনার রাষ্ট্রের আইনে অপরাধ না হতে পারে। আমাদের আইনে অপরাধ।’
‘তুমি বরাবর ফ্যান্টাসির জগতে থেকেছ যুবক। রোম্যান্টিসিজম দিয়ে সব করা যায়, দেশকে বদলে দেওয়া যায় না। তুমি সৃস্টিশীলতার পথে ছিলে না যুবক, তোমরা ধ্বংস করেছ দেশের সম্পত্তি, দেশে কায়েম করেছ অরাজকতা। তোমরা দেশের স্বাধীনতাকে মানো নাই। তোমরা পুরো দেশটাকে কসাইখানায় পরিণত করেছ।’
‘নেতা, আপনি বললেন আমরা স্বাধীনতা মানি নাই। আপনি জানেন এই ভূখন্ডের স্বাধীনতা নিয়ে আমরা তখন থেকেই ভাবছি যখন আপনি স্বায়ত্তশাসন নিয়ে দরকষাকষি করে চলেছেন? আমার সৈন্যরাও যুদ্ধের ময়দানে আপনার সৈন্যদের মতো জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু যেভাবে স্বাধীনতাটা এসেছে এটাকে স্বাধীনতা আসা বলে না। আপনারা দেশটাকে একটা দেশের কবল থেকে মুক্ত করতে গিয়ে অন্য একটা দেশের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন নেতা।’
‘তোমার সাথে কথা বলার কোন ইচ্ছে আমার নেই আর এইগুলো নিয়ে। তুমি আমার জীবনে অতীত, আমার দেশের জন্য তুমি অতীত ইতিহাস। তুমি কিজন্য এসেছ বল, বলে চলে যাও।
‘নেতা, আমি এসেছি আপনার পতন দেখতে, আপনার মৃত্যু দেখতে। আপনার রাষ্ট্রে আপনি যে শোষকবান্ধব আইন সাজিয়েছেন, সেই আইনেও আমার বিচার করার সৎ সাহস আপনার ছিল না। সারাদেশে অসংখ্য গুপ্তহত্যা আপনার পোষা গুন্ডাবাহিনী আর আপনার আইন শৃঙ্খলা রক্ষী বাহিনী দিয়ে আপনি করিয়েছেন। তার পরিণাম ভোগ করতেই হবে আপনাকে।’
নেতা কথাটা শুনে চমকে উঠলেন। তার মনে পড়ে গেল প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের কথা। তবুও নেতা বিশ্বাস করেন নিজের লোককে।’ তুমি বড্ড বোকার মত কথা বলছ যুবক। আমার দেশের মানুষ আমাকে ভালোবাসে। তারা আমাকে জাতির পিতা বলে। তারা কেন আমাকে হত্যা করতে আসবে??’
ছায়ামূর্তিটা আসতে আসতে অস্পস্ট হতে চলেছে, ফজরের আজানের আর একটু সময় বাকি। এমন সময় নেতার কানে রাস্তা দিয়ে ভেসে এল একটি অস্পস্ট অথচ চেনা শব্দ। ট্যাঙ্কের চাকার আওয়াজ। নেতার বাড়িতে বাড়তি নিরাপত্তা নাই, নেতা ভাবলেন বোধহয় তার বাড়িতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছে ডিফেন্সের লোক। নেতাকে কেউ হত্যা করতে কেউ আসছে- এটা নেতা ভাবতেই পারেন না। তার দেশের লোক তাকে ভালোবাসে। তিনি তাদের পিতা…

এমন সময় একঝাক গুলি ছুটে এসে বিচুর্ণ করে দিল নেতার জানালার একটা কাচের কপাট। কাচ ভাঙার শব্দ ছড়িয়ে পড়ল স্বাধীন দেশের স্বাধীন আকাশে, মুক্ত স্বাধীন দুষ্টু বাতাসগুলো বয়ে নিয়ে গেল বারুদের গন্ধ…

৫ thoughts on “নেতা ও বিপ্লবী

  1. আপনার কথাগুলো রীতিমত জাতির
    আপনার কথাগুলো রীতিমত জাতির পিতাকে অপমান করার শামিল।
    আপনি পরোক্ষভাবে বঙ্গবন্ধুকে খুনি হিসেবেই চিত্রায়িত করার প্রয়াস চালিয়েছেন।আপনার পোস্টটি ঘৃনাভরে প্রত্যাখান করছি।

    1. আপনি পরোক্ষভাবে বঙ্গবন্ধুকে

      আপনি পরোক্ষভাবে বঙ্গবন্ধুকে খুনি হিসেবেই চিত্রায়িত করার প্রয়াস চালিয়েছেন।

      :চিন্তায়আছি:

  2. (Y)
    (Y) :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  3. আলোর বাতি জ্বালানো সেই
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
    :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:
    আলোর বাতি জ্বালানো সেই ক্ষ্যাপার ধনুকভাঙ্গা পণ

    যে করেই হোক নেভাবে সব আলোর বিলাসিতা।

    অন্ধের দেশে আলোর উপযোগিতা

    নেই কোন। খামাখাই কেন ডেকে আনা

    পতঙ্গের সর্বনাশ? আলো বধে নেমেছে যে,

    তারে বধে কোন বিষ্ণু কোন অবতারের বেশে?

    বদ্যির হাটে যেখানে খুনীদের মেলা,

    যেখানে স্বাধীনতার বাজারে হয় দাসেদের কেনাবেচা,

    আলোর সন্ধানী সেখানে রাক্ষসের অবতার।

    ভাঙ্গা লঞ্চে ডুবিয়ে মারো তাকে, মারো ভবন ধ্বসিয়ে,

    মারো হরতালে, মারো কারখানাতে আগুনে পুড়িয়ে,

    দেশদ্রোহী আর যুদ্ধাপরাধীর সাথে জোট বেঁধে

    তাকে মারো গলা-হাত-পায়ের রগ কেটে,

    মারো ক্রসফায়ারে, করো সংসদে বসে আস্ফালন;-

    ‘আজ কোথায় সিরাজ শিকদার!’

    ………………………………………
    :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *