যান্ত্রিক দাবাড়ুঃ দ্য তুর্ক

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকের এক হেমন্তের বিকেল। সালটা ছিল ১৭৬৯, হাঙ্গেরিয়ান অভিজাত শ্রেণীর এক ব্যক্তিকে হাঙ্গেরির সম্রাজ্ঞীর কোর্টে বিনোদনমূলক শো দেখাতে ডাকা হল। সেই ব্যক্তির নাম ওয়লফগ্যাং ভন কেম্পেলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তার শো দেখে জনগণ এবং সম্রাজ্ঞী তেমন আনন্দ পেল না। কিন্তু কেম্পেলেন অত্যন্ত আত্মসম্মানবোধ ধারণ করতেন। তিনি ছয় মাসের সময় চাইলেন এক অভিনব শো উপহার দেওয়ার জন্য। তার আবেদন মঞ্জুরও হল। পরের বছরের শুরুতেই কেম্পেলেন সবাইকে চমকে দিলেন তার আশ্চর্যজনক সৃষ্টি দ্বারা। তিনি যা বানালেন তা হল একটা যন্ত্রমানব যার সামনে ছিল কাঠের তৈরি কেবিনেট। তবে এর বিস্ময়কর ক্ষমতা ছিল যে এটা দাবা খেলতে পারত। কেম্পেলেন এর নাম দিলেন ”দ্য তুর্ক” এবং তুর্কি পোশাকেই তাকে সজ্জিত করলেন। এই নামকরণ অবশ্য তৎকালীন সময়ে হাঙ্গেরির সাথে অটোম্যান খিলাফতের সুসম্পর্কেরও একটি নিদর্শন।

দ্য তুর্ক এবার সমগ্র ইউরোপের টুরে বের হল। প্রত্যেক শো এর আগে কেম্পেলেন তুর্কের কেবিনেটের ড্রয়ারগুলো খুলে জনগণকে তা পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ দিতেন। কিন্তু তুর্ক সর্বদাই সাদা গুটি নিয়ে খেলবে এবং নিয়ম অনুযায়ী প্রথম চালও দিবে এমন শর্ত দেওয়া থাকত। তুর্কের বাম হাত থাকত কেবিনেটের উপর এবং ডান হাত দিয়ে সে গুটির চাল দিত। প্রতিপক্ষ অবৈধ চাল দিলে সে মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি প্রকাশ করত। সাধারণভাবে ৩০ মিনিটের ভেতরেই প্রতিপক্ষ ধরাশায়ী হত এবং প্রায় সব খেলাই তুর্ক জিতে যেত।

‘দ্য তুর্ক’ নিয়ে এসময় ইউরোপ জুড়ে নানা জল্পনা কল্পনা শুরু হয়। এমনকি বইও লেখা হল এর উপর। কেউ বললেন যে কোন বামন বা বানর দ্বারা এটা নিয়ন্ত্রিত হত। কেউ বললেন এটা ছিল বেশ বড়সড় একটা পাপেট, আবার কেউ বললেন ম্যাগনেটের কারবার। কেউ কেউ তো বলে বসলেন কেম্পেলেন ‘থিংকিং মেশিন’ বানিয়ে ফেলেছেন। এমনকি নামী-দামী সব বিজ্ঞানিরাও ধাঁধায় পড়ে গেলেন।

কেম্পেলেনের জীবনকালে তুর্কের আসল রহস্য কেউ ভেদ কোর্টে পারেনি। রহস্যের জাল খোলা শুরু করে অনেক পরে। কেম্পেলেনের মৃত্যুর দীর্ঘদিন পর ১৮৫৪ সালে এক অগ্নিকান্ডে ‘দ্য তুর্ক’ ধ্বংস হয়ে যায়। ১৮৫৭ থেকেই শুরু হল এর রহস্যভেদ করার প্রয়াস। ১৮৫৯ সালে ফিলাডেলফিয়ার এক সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশ পায় যে তুর্কের কেবিনেটের ভেতর মোমবাতি থাকত। ১৮৯৯ সালে আমেরিকান চেস ম্যাগাজিন নেপোলিয়ানের সাথে তুর্কের খেলা হয়েছিল বলে জানায়। অবশেষে ১৯৪৭ সালে হারকনেস এবং ব্যাটেলের চেস রিভিউ তে রহস্যভেদ করেন এবং জানান তুর্কের কেবিনেটের ভেতর মানুষ বসে খেলা পরিচালনা করত। ১৯৬০ সালে আমেরিকান হেরিটেজ আর্টিকেলে তুর্কের বিস্তারিত বর্ণনা ও কার্যপ্রণালীতে দেখানো হয় কিভাবে কেবিনেটের ভেতর মানুষ বসে তুর্কের মাধ্যমে খেলা নিয়ন্ত্রণ করত।

অনেক সুত্রমতে তুর্কের সাথে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনেরও খেলা হয়েছিল এবং যথারীতি তুর্ক জিতেছিল। তুর্ক যদিও নকল চেস মেশিন হিসেবে প্রমাণিত হয় কিন্তু অনিচ্ছাকৃতভাবেই তা অটোম্যাটিক মেশিন এবং কম্পিউটারের বিবর্তনে বৈপ্লবিক মোড় এনেছিল। পরবর্তীতে তুর্ককে ঘিরে অনেক গোয়েন্দা উপন্যাসও লেখা হয়। আমেরিকায় এর আদতে তৈরি হয় দ্য ইজিপশিয়ান। বর্তমানে ‘দ্য তুর্ক’ এর একটি পুনঃনির্মিত ভার্শন আছে যা ২০০৩ সালে লস এঞ্জেলসে প্রদর্শিত হয়। এটি বানিয়েছেন জন গগ্যান।

ইস্টিশনে এটাই আমার প্রথম পোস্ট। অনিচ্ছাকৃত ত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দরদৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি। দোয়া করবেন।

১০ thoughts on “যান্ত্রিক দাবাড়ুঃ দ্য তুর্ক

  1. ইস্টিশনে স্বাগতম । প্রথম
    ইস্টিশনে স্বাগতম । প্রথম পোস্টটাই অসাধারন লিখেছেন ।নতুন কিছু জানলাম ।
    ধন্যবাদ আপনাকে ।শুভকামনা থাকল ।

  2. ইস্টিশনে স্বাগতম। সুন্দর
    ইস্টিশনে স্বাগতম। সুন্দর পোস্ট। আর কয়েকটা বানান ভুল হয়েছে ঠিক করে নিয়েন।

    আপনার জন্য শুভকামনা :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  3. স্বাগতম। ভিন্নরকম পোস্ট দিয়ে
    স্বাগতম। ভিন্নরকম পোস্ট দিয়ে সবার নজর কেড়েছেন। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  4. ভালো লাগলো।নতুন বিষয়ে
    ভালো লাগলো।নতুন বিষয়ে জানলাম।

    রাজনৈতিক মতাদর্শ
    এন্টি-জায়োনিজম…

    হুমমম… ইন্টারেস্টিং…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *