অধিকারের আদিল শুভ্র ও স্বার্থসিদ্ধির মানবাধিকার প্রতিবেদন:ফিরে দেখা ২০০৫

বিতর্কটা উঠেছিল অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান শুভ্র’র বক্তব্যে। তিনি বিরোধীদলের হরতালের নামে ধ্বংসাত্মক কর্মসূচীর কঠোর সমালোচনা করে বললেন, এই ধ্বংসযজ্ঞ মানবাধিকার কর্মীদের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুইা করার নেই, কারন এই ধ্বংসাত্মক কর্মসূচীতে যারা অংশ নিচ্ছেন তারা রাজনৈতিক কর্মী এবং তাদের উপর বল প্রয়োগ করা হলে সবার আগে পুলিশের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ তুলতে হয় মানবাধিকার কর্মীদের, এটাই এখন প্রথ ‘…তার বক্তব্য শেষ হলে আমি প্রশ্ন তুললাম, ‘অধিকারে’র অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্য নিয়ে। আমার প্রশ্নটি ছিল, ‘অধিকারে’র সাম্প্রতি রিপোর্ট এবং আপনার বক্তব্যে দেশে ভয়াবহ জঙ্গীবাদের উত্থান এবং ধারাবাহিক বোমাবাজির ঘটনা’র এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। র‌্যাবের ক্রসফায়ার নিয়ে শুধু ক্রসফায়ারের সংখ্যা উল্লেখ ছাড়া কোন অনুসন্ধানও দেখা যাচ্ছে না, এর কারন কি?’

অ্যাডভোকেট আদিল জবাব দেওয়ার আগেই ফরহাদ মজহার বললেন, ১৭ আগস্ট সারাদেশে যে বোমাবাজি হয়েছে কিংবা এর আগে যে সব বোমাবাজি’র ঘটনা ঘটেছে সেগুলো বিছিন্ন সন্ত্রাসের ঘটনা, এগুলোকে রাষ্ট্রের মানবাধিকার লংঘন বলার সুযোগ নেই। এরপরই তিনি আমার নাম পরিচয় আরও একবার জিজ্ঞ্যেস করলেন। এবার অ্যাডভোকেট আদিল বললেন,বোমাবাগি, গ্রেনেড হামলার প্রতিটি ঘটনার পর ‘অধিকার’ উদ্বেগ প্রকাশ করে বক্তব্য দিয়েছে, ‘ক্রসফায়ারে’রও নিন্দা জানানো হয়েছে, এসব ঘটনায় মানবাধিকার লংঘনের বিষয়টি আরও বিস্তারিত অনুসন্ধানের পরিকল্পনা আছে, তবে সেটা ‘অধিকার’ তার সময় সুযোগমত করবে…..তার বক্তব্যের পর আমি বললাম, দেশে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্র ছাড়া অন্য সংগঠনগুলোর কাজ কর্মে রাজনৈতিক পক্ষ-পাতিত্ব দেখা যাচ্ছে, আইন ও সালিশ কেন্দ্র তো ঠিকই ক্রসফায়ার নিয়ে অনুসন্ধান করেছে, বিস্তারিত প্রতিবেদন দিয়েছে, দেশে ধারাবাহিক বোমাবাজি, গ্রেনেড হামলার বিরুদ্ধে তারা বিভাগে, জেলায় জেলায় কর্মসূচীও পালন করেছে, কই আইন-সালিশ কেন্দ্র তো শুধু হরতালে বিরোধীদলের কর্মসূচীর সমালোচনা করে মানবাধিকার রক্ষা আন্দোলনে তাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রাখেনি, তাহলে অধিকার কেন সীমাবদ্ধ? এর কারন কি এটাই যে অধিকারের যিনি নেতৃত্ব দেন রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হিসবে তিনি ডেপুটি এটর্ণী জেনারেল হয়েছেন এবং রাজনৈতিক আনুগেত্যরে মাপকাঠিতেই মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাগুলো বিচার করেন?…

আমার বক্তব্যের পর অ্যাডভোকেট আদিল প্রায় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন এবং বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো ভূমিদস্যু, কালো টাকার মালিকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বলে বাংলা-ইংরেজীতে এলোমেলোভাবে বক্তব্য দিলেন..ফরহাদ মজহার স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে এদিক সেদিক ঈষৎ শরীর বাঁকিয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পকে ‘কালো টাকার শিল্প’ বলে ফতোয়া দিলেন এবং লম্বা ব্যাখাও দিলেন, তাদের বক্তব্য শেষ হলে আমি শুধু বললাম সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে অধিকার কর্তা সোচ্চার হলেও ‘অধিকাররে’র প্রতিবেদন তৈরি হয় বিভিন্ন পত্রিকার নিউজ কাটিং থেকে, নিজস্ব অনুসন্ধান বলে কিছু সেখানে পাওয়া যায় না, উবিনীগ প্রধানও সংবাদপত্রের তথ্য নিয়ে নিবন্ধ লেখেন ওই সংবাদপত্রেই, সংবাদপত্রের আয়-ব্যয় সহ অন্যসব কিছুর হিসেব-নিকেষ, রাজনৈতিক মত জনগণ বুঝতে পারে। কিন্তু অধিকার কিংবা উবিনীগের মত সংস্থাগুলো দলীয় অন্ধ আনুগত্যকে মিষ্টি কথার ধোঁয়ায় ঢেকে রেখে সাধারন মানুষকে ধোকা দেয়, সংস্থাগুলোর আয়ের উৎস, ব্যয়ের হিসেব সব সময় অন্তরালে থাকে, সে হিসেব জনগণ চাইলে সেটাও সম্ভবত মানবাধিকারের উপর হস্তক্ষেপ উল্লেখ করে বিশাল ব্যয়ে আরনও একটি গোলটেবিলের আয়োজন করা হবে!’

আমার বক্তব্য শেষ হলে অ্যাডভোকেট আদিল বললেন, ‘আপনারা মামলার শিকার হলে লইয়ারের কাছে আসেন না?’ আমি হেসে বললাম, ‘মামলা হলে তো আইনজীবীর কাছেই যাব, এটাই স্বাভাবিক। আপনারা যে ভাবে সংবাদপত্রকে আক্রমণ করে গালিগালাজ করেলেন, আমি কিন্তু সেভাবে আইন পেশা কে আক্রমণ করিনি, কারন এই পেশাকে আমি সম্মান করি, একজন ব্যক্তি আইনজীবীর অনভিপ্রেত কর্মকান্ডের কারনে পুরো আইন পেশাকে আক্রমণ করাকে অন্যায় বলেই মনে করি..এ পর্যায়ে উবিনীগ প্রধান ফরহাদ মজহার বললেন, সাংবাদিকদের নিয়ে দেশে-বিদেশে তার অনেক অভিজ্ঞতা, কি দেশে, কি বিদেশে,সবখানেই সাংবাদিকরা বিতর্ক তুলে কিছু সময় নষ্ট করেন, এখন্ও নষ্ট হল এবং দুপুরের খাওয়ার সময়ও হয়ে গেল, অতএব বিরতি’…এ ঘটনা ছিল ২০০৫ সালের অক্টোবর অথবা নভেম্বর মাসে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে উবিনীগ সেন্টারে আয়েজিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। সেখানে সে সময় দু’দিন থেকে সম্মেলনের সংবাদ পরিবেশন করেছিলাম আমার তৎকালীন কর্মস্থল দৈনিক জনকন্ঠে, টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি অনুপমও আমার সঙ্গে ছিলেন…..

এর প্রায় সাড়ে তিন বছর পর গুলশানে অধিকার কার্যালয়ে সাক্ষাতকার নিতে গিয়েছিলাম অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান শুভ্র’র(তখন আমি একুশে টিভিতে কাজ করছি)। র‌্যাবের মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় সমালোচনা করে সাক্ষাতকার দিলেন অ্যাডভোকেট আদিল। সাক্ষাতকার নেওয়া শেষ হলে তাকে ২০০৫ সালে উবিনীগের সম্মেলনে তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বিষয়টি মনে করিয়ে দিলাম। মনভোলানো মিস্টি হাসিতে তিনি বললেন, হ্যা মনে পড়েছে, দারুন সাহসী বক্তব্য দিয়েছিলেন, আমার মনে হয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো নিয়ে এ ধরনের পশ্ন মাঝে মধ্যে ওঠা ভাল, তাহলে সংগঠনগুলো আরও কার্যকর হবে, আর এখন এই দু:সময়ে আপনাদের সোচ্চার কন্ঠ আরও বেশী প্রয়োজন, সংবাদপত্র, সংবাদ মাধ্যমই এখন মানুষের রক্ষা পাওয়ার প্রধান ভরসাস্থল….

অ্যাডভোকেট আদিল কে এখন ‘যে প্রক্রিয়ায় গ্রেফতার করা হয়েছে তা ঠিক হয়নি’-এ অনুভূতির সঙ্গে একমত হলেও একটা কথা স্পষ্ট করেই বলতে হবে, সরেজমিন অনুসন্ধাণের বর্ণনা, ‍বিশ্বাসযোগ্য তথ্যসূত্র ছাড়া শুধুমাত্র দলীয় আনুগত্যরে পরিচয় দিয়ে হেফাজতের সমাবেশে পুলিশী অভিযান ঘিরে যে ‘মনগড়া’ অবাস্তব তথ্য ‘অধিকারে’র প্রতিবেদনে উঠে আসা এবং এই তথ্যের প্রতি অবিচল থাকার ভন্ডামিই অ্যাডভোকেট আদিলকে এভাবে গ্রেফতারের সুযোগ দিয়েছে সরকারকে, সরকারের সে সুযোগ নেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়, কিন্তু অধিকারের প্রতিবেদনে দলীয় আনুগত্যের চরম প্রকাশ মানবাধিবার সংগঠনগুলোর কর্মকান্ডকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, এটাও বিবেচনার বাইরে রাখা সুবিবেচনাপ্রসূত হবে কি…….?

৮ thoughts on “অধিকারের আদিল শুভ্র ও স্বার্থসিদ্ধির মানবাধিকার প্রতিবেদন:ফিরে দেখা ২০০৫

  1. অনবদ্য এই পোস্টটি ইস্টিশনে
    অনবদ্য এই পোস্টটি ইস্টিশনে লিখার জন্য আপনাকে অজস্র ধন্যবাদ জানাই।

    মানবাধিকারের নামে অধিকারের মত কিছু সংগঠনের ভূমিকা সত্যিই প্রকৃত মানবধিকার সংগঠনগুলিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।এসব সংগঠন কতৃক নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রপাগান্ডা চালানো ও এদের পক্ষে বিশ্বমোড়লদের সাফাই গাওয়াটা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য একটা অশনিসংকেত হিসেবেই প্রতীয়মান হয় ।সরকারকে এই ধরনের সংগঠন গুলির উপর আরো নজরদারি বাড়ানো ও সংযমের মাধ্যমে এদেরকে মোকাবেলা করা উচিৎ।

  2. মানবাধিকার শব্দটিকে এরা ধর্ষন
    মানবাধিকার শব্দটিকে এরা ধর্ষন করে করে আর কিছু বাকী রাখেনি। আপনার সাহসী প্রশ্নগুলো দেখে ভালো লাগল। সাংবাদিকতা এমনই হওয়া উচিৎ। :bow: :bow: :bow:

  3. অনবদ্য আর অসাধারণ পোস্ট…
    অনবদ্য আর অসাধারণ পোস্ট… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :bow: :bow: :bow:
    অথচ এই পোস্টের পাঠকের সংখ্যা দেখে মর্মাহত হলাম!!
    এইসব মানবাধিকার ব্যবসায়ীদের এইভাবেই মুখোশ খুলে দেয়া উচিৎ…

  4. সহমত পোষণ করা ছাড়া আর কিছু
    :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: সহমত পোষণ করা ছাড়া আর কিছু বলার নেই। :থাম্বসআপ:

  5. সরেজমিন অনুসন্ধাণের বর্ণনা,

    সরেজমিন অনুসন্ধাণের বর্ণনা, ‍বিশ্বাসযোগ্য তথ্যসূত্র ছাড়া শুধুমাত্র দলীয় আনুগত্যরে পরিচয় দিয়ে হেফাজতের সমাবেশে পুলিশী অভিযান ঘিরে যে ‘মনগড়া’ অবাস্তব তথ্য ‘অধিকারে’র প্রতিবেদনে উঠে আসা এবং এই তথ্যের প্রতি অবিচল থাকার ভন্ডামিই অ্যাডভোকেট আদিলকে এভাবে গ্রেফতারের সুযোগ দিয়েছে সরকারকে

    —- যখন অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয় ৬১ জন মারা গেছে । তাহলে এই তথ্য’র সত্যতা প্রমানের ভার নিতেই হবে । মনগড়া কথা বলা অধিকার হতে পারেনা । আপনার চমৎকার পোস্টের জন্য ধন্যবাদ !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *