শিল্প এবং সৌন্দর্য ( ১ম পর্ব )

কোন দেশে যে বাসা তোমার
কে জানে ঠিকানা,
কোন গানের সুরের পারে, তার
পথের নাই নিশানা।

রবীন্দ্রনাথ শিল্পের সন্ধান খুজেছিলেন আমৃত্যু। তার হাজার কবিতা গান সবই যেন শিল্পের প্রতিক্ষায় কাতর প্রাণ।
Art is not a pleasure trip, it’s a battle, a mill that grinds – MILLET

তাই শিল্পকে সংজ্ঞায়িত করাতা অবশই আমার জন্য দুঃসাহস মাত্র।তবু কিছু একটা করার প্রয়াস যখন মাথায় ভুত হয়ে চেপে বসে তখন না করে আর যাই কোথা।

কোন দেশে যে বাসা তোমার
কে জানে ঠিকানা,
কোন গানের সুরের পারে, তার
পথের নাই নিশানা।

রবীন্দ্রনাথ শিল্পের সন্ধান খুজেছিলেন আমৃত্যু। তার হাজার কবিতা গান সবই যেন শিল্পের প্রতিক্ষায় কাতর প্রাণ।
Art is not a pleasure trip, it’s a battle, a mill that grinds – MILLET

তাই শিল্পকে সংজ্ঞায়িত করাতা অবশই আমার জন্য দুঃসাহস মাত্র।তবু কিছু একটা করার প্রয়াস যখন মাথায় ভুত হয়ে চেপে বসে তখন না করে আর যাই কোথা।
শিল্প যতটা না সুনির্দিষ্ট তার থেকে বেশি আপেক্ষিক। একটা ছকে বাঁধা ছাঁচে একে বন্দী করাটা খুবই দুঃসাধ্য।
শিল্প মূলত মানুষের একটা কাজ যা বিভিন্ন পরিসীমায় বিভিন্ন ভঙ্গিতে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক কিংবা অস্বাভাবিক সমস্ত কাজই কি শিল্পের মধ্যে পড়ে? না, এটা হচ্ছে সেই কাজ যেটা পুরপুরি মানুষের আবেগ এবং চেতনার সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু সেটা কিভাবে?
ব্যাপারটা আরও সহজ করে বলার চেষ্টা করি। আমরা স্বপ্ন দেখি। রাতের বেলায় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে না দিনের আলয় জেগে জেগে। আসলে স্বপ্ন গুলি আমরা দেখি না, আমরা সাজাই কিংবা গড়ে তুলি। মানে আমরা সৃষ্টি করি। কিন্তু আমাদের এই সৃষ্টি টা কেউ দেখতে পারেনা আমরা নিজেরা ছাড়া। তখন আমরা কেউ কেউ চেষ্টা করি এই স্বপ্নের একটা রূপরেখা তৈরি করতে। এই রূপরেখাটাই শিল্প। তাই বলা যায় শিল্প হল মানুষের বাস্তবতার বাইরে নির্মিত একটা প্রতিকল্প। আর তাই বাস্তবতা যতটুকু পালটাবে শিল্পের আচরণও ততটাই পাল্টে যাবে। হয়ত এই পাল্টে যাওয়া আচরণে আজ এসে শিল্প হয়েছে শুধুই শিল্পের জন্য। যদিও কথাটার ষোল আনাই মিছে, শিল্প কখনই শিল্পের জন্য নয়, যাইহোক এসব নিয়ে পরে কথা হবে।
প্রতিকল্প এর ধারনাটা আগে পরিস্কার করি। আমাদের বাস্তব জীবনে অনেক কিছুরই অভাব থাকে যেটাকে আমরা বলব ভারসাম্যহীনতা। সেই ভারসাম্যহীন অবস্থাকে কাটিয়ে উঠার একটা এবং একমাত্র পথ হল একটা ভার্চুয়াল (virtual) অবস্থান তৈরি করা। এই নতুন ধরনের অবস্থান আমাদের জীবনের ভারসাম্যহীন অবস্থানকে ভারসাম্য করে তুলছে। তাই বলা যাচ্ছে শিল্প হল একটা ভারসাম্যাবস্থার একটা virtual অবস্থান যেখানে আমাদের বাস্তব জগতে ঠিক ওই পরিমান ভারসাম্যহীনতা রয়েছে এবং অবশ্যই জীবনের সবরকম মাত্রায় ভারসাম্য অর্জনের মাধ্যমেই শিল্পের আবির্ভাব ঘটবে, একই সাথে ঘটবে শিল্পের অন্তর্ধান।
Piet Mondrian শিল্পের এই অন্তর্ধান এর ব্যাপারটা পরিষ্কার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন বাস্তবতা ক্রমশই শিল্পকে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে তাড়িয়ে বেরাবে। কিন্তু এর মানে কি এই যে একসময় শিল্প কর্পূরের মত উবে যাবে? না, যেহেতু শিল্প মানুষের পারিপার্শ্বিক জগতের সাথে মানুষের একটি ভারসাম্য সেতু তৈরি করে দিচ্ছে প্রতিকল্প বা substitution হিসেবে। তাই আমরা শিল্পহীন পৃথিবী কল্পনা করতে পারিনা। কারন মানুষের মাঝে স্থায়ী এবং পরিপূর্ণ (permanent and perfect balance) ভারসাম্য আমরা সভ্যতার চরম অবস্থায় ও চিন্তা করতে পারিনা। তাই এই ধারনা সুস্পষ্ট ভাবে আমাদেরবলে দেয় যে শিল্প চিরস্থায়ী।
তাহলে ব্যাপারটা কি শুধুই এরকম যে শিল্প মানেই substituition? আমরা এই প্রশ্নের উত্তর আরেকটু পরে খুঁজব।
প্লেটো শিল্প সম্পর্কে একটা চমকপ্রদ কথা বলে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন আর্ট হচ্ছে ইমিটিশন(imitition) অর্থাৎ অনুবর্তন। এবং সে কারনেই এর অবস্থান বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। এরিস্টটল এই কথাটাকে আরও সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, যেহেতু অনুবর্তন এর মধ্যে দিয়েই ধীরে ধীরে এই পৃথিবীতে মানুষের টিকে থাকা এবং বেঁচে থাকা। তাই শিল্প অনুবর্তন হওয়ার কারনেই এটি বাস্তব জীবনের চেয়েও বেশি বাস্তব। একটি বস্তু তার উপযোগিতা শেষ হলে নিঃশেষিত হলেও শিল্প সেই শেষ অনুভুতিটুকু নিয়ে জীবন্ত হয়।
Leo Tolstoy, তার “What Is Art?” বইয়ে বলেন,
Art is not, as the metaphysicians say, the manifestation of some mysterious idea of beauty or God; it is not, as the aesthetical physiologists say, a game in which man lets off his excess of stored-up energy; it is not the expression of man’s emotions by external signs; it is not the production of pleasing objects; and, above all, it is not pleasure; but it is a means of union among men, joining them together in the same feelings, and indispensable for the life and progress toward well-being of individuals and of humanity.

অর্থাৎ তার কাছে শিল্প মানেই জীবন। জীবন মানেই শিল্প। যাকে আমরা বলতে পারি জীবনের চতুর্থ মাত্রা(যদি আমরা একটা ত্রি-মাত্রিক বিশ্বে অবস্থান করে থাকি)।
আমরা কিন্তু এতক্ষণ ধরে ঠিক এরকমই একটা কথা খুঁজছিলাম। কার্ল মার্কস ও কিন্তু বলছেন, মানুষের মনের মধ্যে প্রতিনিয়ত যে সক্রিয়তা কাজ করছে সেটা থেকেই মানুষের মনে হয় সমাজবোধ, চেতনা। যে চেতনার কথা আমরা একদম শুরুতে বলে এসেছি। সেই চেতনা থেকেই মানুষ তার ভারসাম্যহীনতা খুজে পায়, তারপর সেখানে সৃষ্টি করে নান্দনিকতা আর আমরা বলি শিল্প।
আর ঠিক কি কারনে বা কিভাবে এর সৃষ্টিটা নিশ্চয়ই কারও দুর্বোধ্য নয়। মানুষের নিজের অজান্তেই শিল্পের সৃষ্টি তার বেঁচে থাকার জন্যেই। আর সম্ভবত এর শুরুটা সেদিন থেকেই হয়েছিল যেদিন থেকে মানুষ আলাদা করেছিল নিজেকে পশুদের থেকে।
তাই ধরে নেয়া যেতেই পারে যে অরণ্যচারী জীবনেই এসেছিল সুর, এসেছিল রঙ, এসেছিল সুন্দরবোধ।

১২ thoughts on “শিল্প এবং সৌন্দর্য ( ১ম পর্ব )

  1. ভালো লিখেছেন। শিল্প মানুষকে
    ভালো লিখেছেন। শিল্প মানুষকে যান্ত্রিকতা থেকে রিলিফ দেয়। শিল্প মানুষের সেই জায়গা যেখানে অনেকসময় বাস্তবক্ষেত্রে মানুষ বিচরণ করতে চেয়েও ব্যর্থ হয়। তাই অপূর্ণ জীবনকে পূর্ণতা দেয় শিল্প।

  2. শিল্প মানেই জীবন। জীবন মানেই
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    শিল্প মানেই জীবন। জীবন মানেই শিল্প। যাকে আমরা বলতে পারি জীবনের চতুর্থ মাত্রা

    অত্যন্ত ভালো পোস্ট।
    কিন্তু আফসোস, পাঠক সংখ্যা আর মন্তব্যের পরিমাণ খুবই কম…

    1. অবাস্তব স্বপ্নচারী আপনাকে
      অবাস্তব স্বপ্নচারী আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আপনার মতামতের জন্য। অনেক পাঠক তৈরি হবে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে ভাল কিছু লিখতে পারি। আর আপনাদের মত পাঠক আমাদের জন্য অনন্য অনুপ্রেরণা।

      1. ধন্যবাদ।
        কিন্তু সমস্যা কি

        ধন্যবাদ।
        কিন্তু সমস্যা কি জানেন, ভালো লেখা মানুষ খায় কম।
        আপনি এখন সোজা সাফটা কিছু লিখে দেন, যেখানে চিন্তার কোন অবকাশ নেই, সেই লেখায় মানুষ উপচে পড়বে।
        যেই আপনি এমন কিছু লিখবেন যেখানে পড়তে একটু মাথা খাটাতে হয় সেখানেই পাঠক সংখ্যা গুটিকয়েক হয়ে যাবে।
        যা হোক, এর জন্য লেখা থেমে থাকবে না।
        লিখুন…

        1. হুম, কিন্তু লেখাটা খাওয়াতে
          হুম, কিন্তু লেখাটা খাওয়াতে চাচ্ছিনা, লেখাতো আরা খাদ্যদ্রব্য নয়। আর মানুষ তো আজকাল খুব ব্যাস্ত মাথা খাটানোর সময় কই? তবু কিছু লোক ভাবে, চিন্তা করে। এইতো অনেক। যেখানে বেঁচে থাকাটাই স্বার্থকতা সেখানে চিন্তা করাটা বিলাসিতার বাইরে কিছু না।

  3. বেশ কিছুদিন নেটের বাইরে
    বেশ কিছুদিন নেটের বাইরে ছিলাম, পুরনো লেখা খুঁজতে খুঁজতে এই শিরোনামের লেখায় চোখ আঁটকে গেল । অনেকদিনপর বেশ মাথা খাটিয়ে বুঝে পড়ার মতো কোন লেখা পেলাম । আপনাকে ধন্যবাদ, দ্বিতীয় পর্ব কবে পাচ্ছি ? লেখাটি প্রিয়তে নিয়ে রাখলাম আবার পড়ার জন্য ।

    1. লিখাটি লিখছি রাহাত মুস্তাফিজ
      লিখাটি লিখছি রাহাত মুস্তাফিজ ভাই কিন্তু মন মত হচ্ছেনা বলে এখন কাটাকুটি করে যেতে হচ্ছে। হয়ত দু একদিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *