পথিকের আত্নকথন (Soliloquy of a traveler)

ঈদের দিন সকালে চুল আঁচড়াতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম আরো কয়েকটা নবীন ধূসর চুল উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। এমনিতে আমার মাথায় ধূসর চুলের সংখ্যা নগন্য, বরং মিহি করে ছাঁটা ছাগ-দাড়িতে (যাকে ইংরেজিতে বলে “ফ্রেঞ্চ কাট”) গত এক-দেড় বছর ধরেই বেশ পাকাপাকির উৎসব শুরু হয়ে গেছে। আমি বরং এতে বেশ খুশিই আছি। কারন আমার চেহারা নাকি পোলাপান টাইপ। সাদা দাড়ির সৌজন্যে যদি একটু ব্যাটাপান ভাব আসে তবে সেটা ভালই। আর কার কাছ থেকে শুনেছিলাম দাড়ির যৌবন নাকি ক্ষনস্থায়ী। সুতরাং দাড়ি দিয়ে বয়স মাপার বোকামি করতে যাইনি কখনো। সত্যি বলতে কি, বয়স নিয়ে আমার তেমন মাথা ব্যাথা ছিল না কখনোই। বরং আমি বিশ্বাস করি Every age has its own beauty. কিন্তু গত কয়দিনের মধ্যে নিঃশ্বব্দে বেড়ে উঠা কটা চুল আমার ভাবনাকে আকস্মাৎ কিছু সময়ের জন্য দখল করে নিল। মনে হল, নিজেরই অজান্তে অনেকটা পথ কি হেঁটে এসেছি? ৩৮ বছরে কতটা পথ পাড়ি দেয়া যায়? সামনে আর কতটা পথ বাকী?

“How many roads must a man walk down
Before you call him a man?”

কতটা পথ পেরুলে তবে পথিক বলা যায়?

হাওয়ায় কান পাতি উত্তরের আশায়। উত্তর খুঁজে পাই না। নিজেকেই প্রশ্ন করি, হতে পেরেছি কি সেই কাঙ্ক্ষিত পথিক কিংবা মানুষ? নাকি এখনও আসলে পথ খুঁজে ফিরছি? কোথায় কবে যেন পড়েছিলাম মনে নেই, একদিন নিদ্রা বিভোর এক রাজাকে রাজকন্যা হঠাৎ জাগিয়ে বলল “বাবা ওঠো, বেলা যায়।” সেই ডাকে রাজার ভেতর কি যেন একটা জেগে উঠলো। তৎক্ষনাৎ তিনি শয্যা ছেড়ে উঠে এক বস্ত্রে সেই যে নিরুদ্দিষ্ট হলেন, আর ফিরে আসেন নি। কি জেগে উঠেছিল সেই সংসার ত্যাগী রাজার মনের ভেতর? পরম প্রাপ্তির অপার্থিব আলো, নাকি এক জীবনকে হেলায় হারানোর তীব্র হাহাকার? বড্ড জানতে ইচ্ছে হচ্ছিল সেই মূহুর্তে। আর তখনই আমার ছোট্ট ন’বছর একমাত্র রাজকন্যা এসে হাজির। বেড়াতে যাওয়ার জন্য সাজুগুজু করে একেবারে তৈরী। কোমর জড়িয়ে ধরে তৈরী হওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছে। আর আমি অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে আছি আয়নায় বাপ-বেটির প্রতিবিম্বের দিকে। আরে, এইতো সেদিন আমার পরীটা কোমর সমান ছিল! কবে কোন মন্ত্রবলে গুটু গুটু করে আমার কনুই সমান লম্বা হয়ে গেল, আমি টেরই পেলাম না! ক’দিন পর ছুঁয়ে দিবে আমার কাঁধ। আহা, আমার ছোট্ট পাখিটা একদিন উড়তে শিখবে। হয়তো কোন স্বপ্ন-রাজপুত্তুরের হাত ধরে একদিন চলে যাবে বহু দূর, নতুন বসত গড়বে। আর আমরা দুই অপ্রয়োজনীর ধূসর বুড়োবুড়ি কোন এক প্রানহীন বাড়ীর বারান্দায় জুবুথুবু হয়ে বসে থাকবো। আর অপেক্ষা করবো। সমাপ্তির ক্লান্তিকর অপেক্ষা। তারপর অন্যকে অন্তহীন একাকিত্ব আর হাহাকারের নির্বাসনে পাঠিয়ে যে কোন একজন আগে আগে পাড়ি দেব না ফেরার অচীন দেশে।

এক মূহুর্তের বিচ্ছিন্ন ভাবনা যে ডালপালা ছড়িয়ে কোত্থেকে কোথায় যে নিয়ে যায়, হদিশ পাওয়া দায়। কি কারনে যেন বুকের ভেতর ভীষন অভিমান জেগে উঠে বিশ্ব-সংসার নিয়ে খেলতে থাকা পরম কারিগরের উপর। জন্ম, জীবন, মৃত্যু এই সরল সমীকরনের মধ্যে তুমি কেন এক টুকরো হাহাকার জুড়ে দিলে গো? এক জীবনে কত পেলাম, কত দেখলাম, কত ভোগ করলাম, তবু কেন শুধু পেয়ে হারানোর হিসাব করি? সারাদিন, মাস, বছর ছুটতে থাকি, ছুটতে থাকি, ছুটতে থাকি। সৃষ্টিকূলের সেরা আমি হিসেব কষা আর ছুটতে থাকার মাঝে বুঝি আবার পশু হয়ে যাই। আড়ালে কালের ঘড়ির অমোঘ কাঁটা চলতে থাকে টিক্‌ টিক্‌ টিক্‌। কিন্তু নিজেকে আর সময় দেয়া হয়ে উঠে না। আমার দেখা হয় না অনেক কিছুই। শ্বেত বরফের চাদর ঢাকা মেরু প্রান্তর, ঠিকানাহীন দুরন্ত বেদুইনের মত সাহারা মরুর বুক ছুঁয়ে যাওয়া হাওয়ার ঝাপ্টা, গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের রহস্যময় গভীরতা কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরের নির্লিপ্ত সুনীল জলরাশি, এদের কারো সাথে বুঝি আর এ জনমে দেখা হবে না। দানিয়ুবের শান্ত জলে ভেজানো হবে না পায়ের পাতা। একটা জীবন গুছাতে গুছাতেই কেটে যাচ্ছে প্রতিদিন। আর এভাবেই হঠাৎ একদিন আবার লক্ষ্য করব, আমাদের দুটি মানুষের ভালোবাসাবাসির প্রাপ্তি, আমাদের ছোট্ট পাখিটাও বুঝি তৈরী হয়ে গেছে ডানা মেলে উড়াল দেবার জন্যে। পেছনে পরে থাকবে ধূসর ক্লান্ত পথিক, যার আর এগুবার ইচ্ছে বা ক্ষমতা কোনটাই নেই, আছে শুধু জুবুথুবু হয়ে অপেক্ষা করার মত একটা ক্লান্ত বারান্দা। তাই তারা শংকরের কবি উপন্যাসের নায়কের কাছ থেকে প্রশ্ন ধার করে সেই পরম সত্ত্বার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে “হায়, জীবন এত ছোট কেনে?”

৫ thoughts on “পথিকের আত্নকথন (Soliloquy of a traveler)

  1. “How many roads must a man
    “How many roads must a man walk down
    Before you call him a man?”

    কি সুন্দর একটা কথা

    আপনার লেখায় একটা দুঃখের আবেদন আছে , সাথে আছে আকাঙ্ক্ষার উপহার
    :তালিয়া:

  2. বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি।আপনার লেখা
    বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি।আপনার লেখা পড়তে পড়তে আমিও হারিয়ে গিয়েছিলাম আমার এই ১৮ বছরের ছোট্ট জীবনের কিছু কিছু মুহূর্তের মাঝে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *