বিকালে ভোরের আলো

কতটা পেলে পূর্ণতা আসে? মিটে যায় সব চাওয়া, উঠে যায় বাঁধার দেওয়াল। আদি থেকে অন্ত খুঁজে খুঁজে কি একটাও মিলবে এমন সাজানো ডালা যার সব ফুল সবার জন্য মনোহর। সবাই মাতোয়ারা গন্ধে। সব ফুল পুজায় লাগে। লাগে না তো! সব ফুলে দেবতা তুষ্ট হয় না। যেমন তুষ্ট না রমিজ উদ্দিন। দ্বিতীয় বউয়ের ডাক্তারি রিপোর্ট যেদিন হাতে আসলো ঠিকাদার রমিজ সেদিন রাতেই পাশের বাড়ির মুন্নুজান কে ঘরে নিয়ে আসলো। মুন্নুজানের পাঁচ ছেলের বাপ ইমারত যক্ষ্মায় ভুগে মারা গেছে মাস ছয়েক হলো। রিক্সাওয়ালা ইমারতের ঘরে পাঁচ পাঁচটা ছেলে কাপড়ের অভাবে তাদের লজ্জাস্থান ঢাকতে জড়াজড়ি করে থাকে একে অপরের সাথে সাপের বাচ্চার মতো লিকলিকে অপুষ্টিতে ভোগে খাবারের স্বল্পতায়।

প্রচণ্ড ধার্মিক রমিজের টাকা বলো, জমিজিরাত বলো খাওয়ার মানুষ নেই। বিঘার পর বিঘা যতোদুর চোখ যায় সবটা রমিজের। বড়ো বউ বন্ধা জানার পরে ছোট শালি’কে বউ করে ঘরে তোলে। ছোটো বউকে নিয়ে বিয়ের পরের দিন আজমির শরীফ আল্লাহ্‌’র পাক দরবারে ছুটে গেছে একটা সন্তানের আর্জি জানাতে। গরু ছাগল মেনেছে, মসজিদে মসজিদে টাকা দিয়েছে। হুজুর’কে টানা আট মাস যাবতীয় খরচ বাদে দশ হাজার করে টাকা দিয়েছে দোয়া করার জন্য। উপরওয়ালা’কে ডাকার মতো ডাকলে নাকি ডাক শোনে? আর কেমন করে ডাকলে তবে উনি ডাক শুনবেন? যত ভাবে ডাকা সম্ভব সব ভাবে চেষ্টা চলতে লাগলো।

বছর ঘুরে যায় বউয়ের গর্ভবতীর হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। ডাক্তার কবিরাজ বেটে খাওয়া হয়ে গেছে দুই বউ নিয়ে। মন উঠে গেছে রমিজের সে আর ডাক্তার কবিরাজ দেখাতে চায় না। বাচ্চা যখন চাই-ই চাই তখন দত্তক নিয়ে নিলেই হবে। বউয়েরা রাজী হয় না। তাদের পিড়াপীড়িতে ডাক্তার দেখায় রমিজ ছোট বউ’কে নিয়ে। শতেক খানিক টেস্টের নামে ফুটার পরে ফুটা করে সিরিঞ্জকে সিরিঞ্জ রক্ত নিয়ে, খুচাখুচি করে বলল বিশ দিন পর রিপোর্ট দিবে।

রমিজের ভাই বোন দূরে থাক তিন কুলে কেউ নেউ। সু বা দুর্বুদ্ধি কোনোটা-ই দেওয়ার যেমন কেউ নেই, তেমন নেই কেউ তার সম্পত্তি ভোগ করার। বন্ধু বান্ধব বলেও কেউ নেই। সখ্যতা বলতে মসজিদের ইমামের সাথে। কাজের বাহিরে কোনো কথা রমিজ বলে না। শ্রমিকদের সাথে সম্পর্ক এতো ভালো যেটা উদাহরণের মতো। গরীব দুঃখীর জন্য ভীষণ মায়া এর পিছনে অবশ্য কারন আছে। রমিজ ছিলো এক ঠিকাদারের চা বয়। সেইখান থেকে এখন জেলার এক নাম্বার ঠিকাদার। নিরলস পরিশ্রম তাকে এখানে টেনে এনেছে। নিজে জানে খুদার কষ্ট কি তাই সে অন্যের কষ্টে কাতর হয়। তার উদারতার শুধু দেখানোর জন্য না। সে ধারন করে মনে।সে কারনেই হয়তো গ্রামের মোড়ের একজন মুদি দোকানদার এর মেয়ে সে বিয়ে করে।

আমারা চাই সব কিছুতেই নিজের একটা আধিপত্য বিস্তার করতে। কেনো চাই জানি না হয়তো জিন গতো কারনে। হঠাৎ করে রমিজের মনে হচ্ছে না আর আধিপত্য বিস্তার না। আমার নিজের রক্তের সন্তান লাগবে কেনো? এই ধন সম্পত্তি রক্ষার জন্য লোক দরকার সে যার রক্তেই জন্মাক না কেনো সে কার পরিচয়ে বেড়ে উঠছে সেইটা আসল।ধন সম্পত্তি রক্ষা করার-ই বা কি আছে? আজ যা আমার কাল সেটা অন্যের। আজ যা কিছুর মালিকানা তার কাল সেটা অন্যের। প্রতি মুহূর্ত হাত থেকে হাতে বদল হচ্ছে মাকিলানা। নিজের পরিচয় বহনের জন্য সন্তান লাগবে কেনো? কিসের পরিচয় কি-ই বা পরিচয়? কিসের মায়ায়?

তার নিজের রক্তে কোনোদিন সন্তান আসবে না। সন্তান যদি মুখ্য বিষয় হয় তবে কেনো নিজের বা অন্যের রক্তের প্রশ্ন আসবে। সন্তান তো সন্তান। যেমন আমরা সবাই প্রকৃতির সন্তান। রমিজ সিধান্ত নেয় আজ থেকে সে তার সাধ্যমতো বাপহীন এতিমদের পাশে থাকবে। সেই সিধান্ত থেকেই ইমারতের বাচ্চাদের ঘরে নিয়ে আসে। সকাল হলেই উকিলের কাছে যাবে তার সম্পত্তির উইল করতে। এই পাঁচ বাচ্চার সব দায় দায়িত্ব আজ থেকে তার এবং সকল সম্পত্তির উত্তারধিকারি হবে এই পাঁচ জন। তবে উইলে অবশ্যই একটা বড়ো অংশ ব্যয় হবে অনাথদের স্বাবলম্বী করার জন্য। বউদের বলে দিয়েছে তারা ইচ্ছে করলে অন্যত্র বিবাহ করতে পারে যে পরিমাণ টাকা পয়সা চায় সেটা পুরন করা হবে।

ভাবতে ভাবতে রাত কখন পাড় হয়ে গেছে বুঝতে পারেনি রমিজ উদ্দিন। ফজরের আজান শুনে বাহিরে বের হয়ে আসে। অন্য দিন আজানের সাথে সাথে ভক্তি ভরে উঠে ওজু করে নামাজ পড়তে মসজিদের দিকে যায়। আজ মুখ জুড়ে কেমন কি এক তুচ্ছ তাছিল্যের হাসির রাজ্যে প্রশ্নের চিহ্ন ঝুলে আছে। সৃষ্টিকর্তা সে কে? কামুক ঈশ্বর যে সকল ক্ষমতার আধার। যে তার আধিপত্য বিস্তারে মগ্ন সারাক্ষণ। তার ইচ্ছে যদি সর্বশ হয়; চোর-ডাকাত, সাধু-সন্যাসি, নামাজি-বেনামাজি, ধার্মিক-নাস্তিক সবই তার কৃপায় তবে কেনো শেষ বিচার নামক ঘটনা। বেহেশতে বা দোজখ কেনো? কার কোথায় জন্ম হবে তাতে যদি তার হাত না থাকে তবে কেনো সোয়াব পাপের হিসাব? কপাল লিখন যে লিখে থাকে সে নাকি পরম করুণাময়! তার করুণার ধারায় ইমারতদের লজ্জা ঢাকার বস্ত্র থাকে না, থাকে না পেটে ভাত। জীবন আমার চলতে হবে কেনো তার মনস্কামনা পুরন করতে? বান্দার কষ্টে মোমের মতো গলে যায়; বিভেদের দেয়ালে শ্রেণীবিন্যাস করে পাপা পুন্যের সংজ্ঞা দেওয়া কেনো? তার হাতের খেলনা হয়ে খেলে শাস্তি পাবো আমারা? শাস্তি মাথা পেতে যখন নিতেই হবে; নিবো, নিজের ইচ্ছে স্বাধীন ভাবে চলেই নেই।

কতোটা হারালে নির্লিপ্ততা আসে? নিরহ ভালবাসা, সুন্দর মমতাময় মানবতা অথবা ঘৃণার লিকলিকে কালো সাপের দংশনে কতটা জ্বালা থাকে। আজ রমিজের কোনো জ্বালা নেই। মোহ মুক্তির খুশিতে তার মন সকালের শান্ত আলোর মতো শান্ত। নরম আলো ফুরফুরে মেজাজে বস্তির দিকে এগিয়ে যায় রমিজ মিয়া। আগামি পরশু থেকে রোজা শুরু কার কি লাগবে দেখতে হবে। তারাতারি পা চালায়ে যেতে থাকে রমিজ আলি।

১২ thoughts on “বিকালে ভোরের আলো

  1. ভালো লাগলো।আপনার কথাগুলি
    ভালো লাগলো।আপনার কথাগুলি মর্মস্পর্শী।আর শুরুটা চমত্‍কার।কিছু কিছু জায়গায় হয়তো বানানে ত্রুটি আছে।যাই হোক।ভালো।

    1. বানান ভুল এ জীবনে যাবে না।
      :মনখারাপ: বানান ভুল এ জীবনে যাবে না। কষ্ট করে পড়েছেন সেইটাই আমার প্রাপ্তি। কৃতজ্ঞতা রইলো…

  2. আহ!যদি সবার মন রমিজের মত হত
    আহ!যদি সবার মন রমিজের মত হত তবে পৃথিবীতে অশান্তি কোন ছায়া অবশিষ্ট থাকত না ।কিন্তু হায়!রমিজরা শুধু গল্পেই সৃষ্টি হয়, শুধু গল্পেই অবস্থান করে।

    অসাধারন লিখেছেন ।ভাল লাগলো ।

    1. শুধু গল্পে সৃষ্টি হয় না
      শুধু গল্পে সৃষ্টি হয় না বাস্তবে ও থাকে তবে পরিমাণে অনেক অল্প। তারা আছে বলে এখনো পাখি গান গায়, ফুল ফোটে, কুয়াশা আসে, আসে বৃষ্টি…

  3. আপনার লিখা দেখেই পড়তে ক্লিক
    আপনার লিখা দেখেই পড়তে ক্লিক করলাম। পুরোটা পড়েছি। ভাল লেগেছে তবে অন্য গুলোর চেয়ে দুর্বল। আপনার আগের পোস্ট গুলো এর চেয়ে বেশি শৈল্পিক ও লেখার ধরণ আরোও ভাল।

    আর আপনার এই অংশ টুকুর উত্তর আমি দেব

    ভাবতে ভাবতে রাত কখন পাড় হয়ে গেছে বুঝতে পারেনি রমিজ উদ্দিন। ফজরের আজান শুনে বাহিরে বের হয়ে আসে। অন্য দিন আজানের সাথে সাথে ভক্তি ভরে উঠে ওজু করে নামাজ পড়তে মসজিদের দিকে যায়। আজ মুখ জুড়ে কেমন কি এক তুচ্ছ তাছিল্যের হাসির রাজ্যে প্রশ্নের চিহ্ন ঝুলে আছে। সৃষ্টিকর্তা সে কে? কামুক ঈশ্বর যে সকল ক্ষমতার আধার। যে তার আধিপত্য বিস্তারে মগ্ন সারাক্ষণ। তার ইচ্ছে যদি সর্বশ হয়; চোর-ডাকাত, সাধু-সন্যাসি, নামাজি-বেনামাজি, ধার্মিক-নাস্তিক সবই তার কৃপায় তবে কেনো শেষ বিচার নামক ঘটনা। বেহেশতে বা দোজখ কেনো? কার কোথায় জন্ম হবে তাতে যদি তার হাত না থাকে তবে কেনো সোয়াব পাপের হিসাব? কপাল লিখন যে লিখে থাকে সে নাকি পরম করুণাময়! তার করুণার ধারায় ইমারতদের লজ্জা ঢাকার বস্ত্র থাকে না, থাকে না পেটে ভাত। জীবন আমার চলতে হবে কেনো তার মনস্কামনা পুরন করতে? বান্দার কষ্টে মোমের মতো গলে যায়; বিভেদের দেয়ালে শ্রেণীবিন্যাস করে পাপা পুন্যের সংজ্ঞা দেওয়া কেনো? তার হাতের খেলনা হয়ে খেলে শাস্তি পাবো আমারা? শাস্তি মাথা পেতে যখন নিতেই হবে; নিবো, নিজের ইচ্ছে স্বাধীন ভাবে চলেই নেই

    যদি রমিজ মিয়ার সন্তান থাকত তবে কি তিনি এমন উদার হতেন? নিশ্চই না?
    আর ইমারতদের জন্য ই বিধাতা রমিজ মিয়াদের সৃষ্টি করেছেন। এ এক দায় বদ্ধতা, বিধাতার প্রতি, সমাজের প্রতি, মানবতার প্রতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *