২৪৩: তাবুক যুদ্ধ-১৬: মুমিনদের শাস্তি ও ভণ্ডদের মুক্তি -কারণ?

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

‘কুরআন’ ও আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের ‘সিরাত ও হাদিস’ গ্রন্থের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, তাবুক অভিযানের প্রাক্কালে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) একদল ভণ্ড (মুনাফিক) অনুসারীদের ক্ষমা প্রদর্শন ও তিনজন মুমিন অনুসারী-কে শাস্তি প্রদান করেছিলেন। এই ভণ্ড ও মুমিন উভয় অনুসারীদেরই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল অভিন্ন। আর তা হলো, “নবী মুহাম্মদের রোষ থেকে পরিত্রাণের প্রচেষ্টা!”

আদি উৎসে মুসলিম ঐতিহাসিকরা তাঁদের নিজ নিজ  ‘সিরাত ও হাদিস’ গ্রন্থে এই ঘটনাটির সবিস্তার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন মূলত: ‘কাব বিন মালিক’ নামের এক বিশিষ্ট মুহাম্মদ অনুসারীর বর্ণনার পরিপ্রেক্ষিতে, যিনি ছিলেন এই তিনজন মুমিন শাস্তি-ভোগকারীদের একজন। কী কারণে মুহাম্মদের এই বিশিষ্ট অনুসারী কাব বিন মালিক ‘তাবুক অভিযানে’ অংশগ্রহণ করেন নাই, তার বিস্তারিত আলোচনা ‘মুমিনদের গাফিলতি ও অনুপস্থিতি‘ পর্বে (পর্ব: ২৩১) করা হয়েছে। ঘটনার ধারাবাহিকতা ও গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁর সেই উপাখ্যান-টি আবারও সন্নিবেশিত করা হয়েছে এই উপাখ্যানটিতে, যাতে পাঠকরা অতি সহজেই বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেন। ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (ও আল-তাবারীর) বর্ণনা: [1] [2] [3] [4] [5]

(আল-ওয়াকিদি ও ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিমের বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনার অনুরূপ।)

পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৪২) পর:

‘নবীজী মদিনায় আসার পর দেখতে পান যে কিছু আনুগত্যহীন (মুনাফিক) লোকেরা পিছনে থেকে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিল তিন জন মুসলমান যাদের পিছনে থাকাটি কোন সন্দেহ বা আনুগত্য-হীনতার কারণে ছিল না; তারা হলো:

[১] কাব বিন মালিক,

[২] মুরারা বিন আল-রাবি, ও

[৩] হিলাল বিন উমাইয়া।

নবীজী তার অনুসারীদের বলেন যে তারা যেন এই তিন জনের সাথে কথা না বলে। যে আনুগত্য-হীন লোকেরা পিছনে পড়ে ছিল, তারা এসে শপথ করে তাদের অজুহাত পেশ করে ও তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন, কিন্তু আল্লাহ বা তার রসূল কেউই তাদের অজুহাত মেনে নেই নাই। মুসলমানরা এই তিন জনের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও তারা তাদের সাথে কথা বলতো না (তাবারী: ‘যতক্ষণে না আল্লাহ তাদের বিষয়ে তার বাণী নাজিল করে’)। (কুরআন: ৯:১১৮-১১৯)।

মুহাম্মদ বিন মুসলিম বিন শিহাব আল-যুহরি হইতে বর্ণিত: আবদুল-রহমান বিন আবদুল্লাহ বিন কাব বিন মালিক তাকে বলেছে যে তার পিতা [আবদুল্লাহ বিন কাব] যখন অন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন সে তাকে দেখাশোনা করতো। সে বলেছে যে, “তাবুক অভিযানের প্রাক্কালে আমার পিতা কা’ব কীভাবে নবীজির এই অভিযানে পিছনে পড়ে ছিল তা, ও তার দুই সঙ্গীর উপাখ্যানটি আমি তাকে যে ভাবে বলতে শুনেছি তা হলো:

‘আমি বদরের ‘গাজওয়া’-টি ছাড়া অন্য কোন ঘাজওয়াতেই অংশগ্রহণে পিছপা হই নাই যেখানে আল্লাহর নবী লড়াই করেছিলেন। আর সেটি ছিল এমন এক লড়াই যাতে অংশগ্রহণ করে নাই এমন কাউকেই আল্লাহ ও তার রসুল তিরস্কার করে নাই, এই কারণে যে, আল্লাহর নবী শুধুমাত্র কুরাইশদের কাফেলার সন্ধানে বের হয়েছিলেন; যদিও আল্লাহ তাঁকে ও তাঁর শত্রুদের সমবেত করেছিল কোনরূপ পূর্ব-পরিকল্পনা ব্যতিরেকেই। [6] [7] [8]

আমি ‘আল-আকাবার (শপথ)’ রাত্রি-তে আল্লাহর নবীর সাথে ছিলাম, যেখানে আমরা ইসলামের প্রতি আমাদের বিশ্বাসের অঙ্গীকার করেছিলাম। আমি সেখানে উপস্থিত না থেকে বদর যুদ্ধে উপস্থিত থাকাকে শ্রেয় মনে করি না, এমনটি বদর যুদ্ধটি যদি জনগণের কাছে বেশি প্রসিদ্ধ হয় তথাপিও। [8] [9]

সত্য হলো, আমি এমন সম্পদশালী ও শক্তিশালী কখনো ছিলাম না, যেমনটি আমি ছিলাম তাবুক অভিযানের প্রাক্কালে; যখন আমি পিছনে থেকে গিয়েছিলাম। এর আগে আমার কাছে কখনই দুটি মাদী-উট ছিল না। আল্লাহর নবী যখন কোন অভিযানে যাওয়া মনস্থ করতেন তখন তিনি অন্য কোন উদ্দেশ্যের ভান না করে কদাচিৎ রওনা হতেন, যার ব্যতিক্রম ছিল এই ঘটনাটি। এই অভিযানটি তিনি সম্পন্ন করেছিলেন প্রখর উত্তাপের সময় ও তিনি মরুভূমির দীর্ঘ যাত্রা ও শক্তিশালী শত্রুর মুখোমুখি হয়েছিলেন। আর তিনি লোকদের কী করতে হবে তা বলে দিয়েছিলেন, যাতে তারা যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারে। আর তিনি কোন রাস্তাটি দিয়ে যাওয়া মনস্থ করেছেন তা তিনি তাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন। [10]

যে মুসলমানরা তাঁকে অনুসরণ করেছিল তাদের সংখ্যা ছিল অনেক। তিনি তাদের-কে কোন খাতায় নথিভুক্ত করেন নাই। (তিনি এটিকে রেজিস্টার-খাতা বোঝাতে চেয়েছেন; তিনি তাদের-কে লিখিতরূপে নথিভুক্ত করেন নাই)। কিছু লোক ছিল যারা নিজেরাই অনুপস্থিত থাকতে চেয়েছিল ও ভেবেছিল যে আল্লাহর কাছ থেকে এ বিশয়ে কোন ওহী নাজিল না হওয়া পর্যন্ত তারা এটি তাঁর কাছ থেকে গোপন রাখতে পারবে। আল্লাহর নবী এই অভিযানটি সংঘটিত করেছিলেন ঐ সময়টিতে যখন ফলগুলি ছিল পরিপক্ব ও ছায়া বিশিষ্ট স্থানগুলো ছিল আকাঙ্ক্ষিত। যে কারণে লোকেরা এর বিরোধী ছিল [পর্ব-২২৮]। আল্লাহর নবী প্রস্তুতি গ্রহণ করে ও মুসলমানরাও তাই করে। আর আমি প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তাদের সাথে রওনা হতাম ও যা প্রয়োজন তা সম্পন্ন না করেই ফিরে আসতাম এবং নিজেকে বলতাম, “আমি যখন চাইবো, তখনই তা করতে পারবো।” আমি আমার গড়িমসি অব্যাহত রাখি। লোকেরা পূর্ণ শক্তি দিয়ে তাদের কাজ সম্পন্ন করে ও প্রত্যুষে আল্লাহর নবীর সাথে রওনা হয়, যেখানে আমার কোন প্রস্তুতিই সম্পন্ন হয় না। আমি ভাবি যে, আমি এক বা দু’দিন পর প্রস্তুত হতে পারবো ও অতঃপর তাদের সাথে যোগদান করতে পারবো। দিনের পর দিন কেটে যায়, আমি কিছুই করি না যতক্ষণ না হামলাকারীরা অনেক দূর এগিয়ে যায়। আমি তখনও আমার রওনা হওয়া ও তাদের নাগাল ধরে ফেলার বিষয়টি ভাবি; তারপর ও আমি যদি তা করতাম, কিন্তু আমি তা করি নাই।

আল্লাহর নবীর প্রস্থানের পর আমি যখন লোকদের সাথে বাইরে যেতাম, আমি কষ্ট পেতাম এই কারণে যে আমি কেবল ঐ লোকদেরকে দেখতাম যারা ছিল ঘৃণ্য ভণ্ড-প্রকৃতির। কিংবা দেখতাম এমন লোককে যাকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছে, এই কারণে যে তার সাথে আছে কোন অসহায় নারী। তাবুকে পৌঁছানোর পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর নবী আমাকে স্মরণ করেন নাই, যেখানে তিনি লোকদের সাথে উপবিষ্ট থাকাকালীন সময়ে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। বানু সালিমা গোত্রের এক লোক বলেছিল যে আমার সুন্দর পোশাক ও চেহারার অহংকার আমাকে বাড়িতে রেখে এসেছে। কিন্তু মুয়াধ বিন জাবাল বলেছিল যে এই মন্তব্য খুবই খারাপ, তারা আমার সম্পর্কে ভাল ছাড়া আর কিছুই জানে না। কিন্তু আল্লাহর নবী নীরব ছিলেন। [পর্ব: ২৩১]

আমি যখন শুনতে পাই যে নবিজী তাবুক থেকে ফেরার পথে, অনুশোচনা আমাকে পেয়ে বশে ও আমি ভাবতে থাকি যে তাঁর রোষ থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে আমি মিথ্যা বলবো ও কিছু লোক সংগ্রহ করবো যারা এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবে। কিন্তু আমি যখন শুনতে পাই যে তিনি এখন নিকটে উপস্থিত, আমি মিথ্যাকে পরিত্যাগ করি ও নিশ্চিত হই যে শুধুমাত্র সত্য বলার মাধ্যমেই আমি পরিত্রাণ পেতে পারি, তাই আমি তা করার সিদ্ধান্ত নিই। প্রত্যুষে নবিজী মদিনায় প্রবেশ করেন ও মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করার পর সেখানে উপবিষ্ট হোন ও লোকদের জন্য অপেক্ষা করেন। যারা পিছনে থেকে গিয়েছিল তারা এসে শপথ করে তাদের অজুহাতগুলো পেশ করে। সেখানে ছিল তাদের প্রায় আশি জন লোক।

নবীজী তাদের প্রকাশ্য ঘোষণা ও শপথ মনজুর করেন ও তাদের জন্য ঐশ্বরিক ক্ষমা প্রার্থনা করেন, ও তাদের গোপন অভিসন্ধির বিশয়টি আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর ন্যস্ত করেন।

পরিশেষে আমি এসে তাঁকে সালাম করি, তিনি রাগান্বিত ব্যক্তির মত হাস্য করেন। তিনি আমাকে কাছে আসতে বলেন। আমি যখন তাঁর সামনে গিয়ে বসি, তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন যে কী কারণে আমি পিছনে থেকে গিয়েছিলাম ও কেন আমি আমার বাহন ক্রয় করি নাই। আমি বলি, “হে আল্লাহর নবী, আমি যদি পৃথিবীর অন্য কারো সাথে বসতাম তবে আমি অবশ্যই অজুহাত প্রয়োগ করে তার ক্রোধ এড়ানো যথোপযুক্ত মনে করতাম, কারণ আমি যুক্তিতে অভিজ্ঞ। কিন্তু আমি জানি যে যদি আমি আজ আপনাকে মিথ্যা বলি তবে আপনি তা মেনে নেবেন, কিন্তু সে কারণে আল্লাহ আপনার মনে আমার বিরুদ্ধে ক্রোধের সঞ্চার করবে। আর আমি যদি আপনাকে সত্য বলি তবে তা আপনাকে আমার বিরুদ্ধে রাগান্বিত করলেও আমি আশা করি যে সে কারণে আল্লাহ শেষ পর্যন্ত আমাকে পুরস্কৃত করবে। সত্যিই আমার কোন অজুহাত নেই। আমি আমার  পিছনে পড়ে থাকার সময়টিতে যেমন শক্তিশালী ও সম্পদশালী ছিলাম, তার চেয়ে বেশী আমি আর কখনোই ছিলাম না।”

নবিজী বলেন, “এ পর্যন্ত তুমি যা বলেছ, সত্য বলেছ। কিন্তু আল্লাহ তোমার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত উঠে পড়।”

তাই আমি উঠে দাঁড়াই। বানু সালিমা গোত্রের কিছু লোক বিরক্তির সাথে উঠে আসে ও আমার পিছু নেই, বলে, “আমরা জানি না যে তুমি আগে কখনো অন্যায় করেছো। আর নবিজীর কাছে অন্যদের মতো, যারা পিছনে রয়ে গিয়েছিল, অজুহাত পেশ করতে তুমি অক্ষম; এটিই যথেষ্ট হতো যে নবীজী তোমার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।” তারা আমার সাথে লেগে থাকে যে পর্যন্ত না আমার আকাঙ্ক্ষা হয় যে আমি নবীজীর কাছে ফিরে যাই ও নিজের জন্য অজুহাত পেশ করি। (আল-ওয়াকিদি: ‘–তারা আমার কাছে বারংবার আসা বন্ধ করে না, যতক্ষণে না আমি নবীর কাছে ফিরে গিয়ে মিথ্যা বলা মনস্থ করি। কিন্তু আমি মুয়াধ বিন জাবাল ও আবু কাতাদার সাক্ষাৎ পাই। তারা উভয়েই আমাকে বলে, “তুমি তোমার সঙ্গীদের মান্য করো না, বরং তুমি সত্যের উপর থাকো। নিশ্চিতই যদি আল্লাহ চায়, সে তোমার জন্য সান্ত্বনা ও মুক্তির কোন একটি উপায় বের করবে! যারা অজুহাত পেশ করেছে, তারা যদি সত্য বলে তবে আল্লাহ তাতে সন্তুষ্ট হবে ও অতঃপর সে তা তার নবীকে অবহিত করাবে। আর যদি তা না হয়, তবে সে [আল্লাহ] তাদের-কে সবচেয়ে কঠিন দণ্ডে দণ্ডিত করবে ও তিনি তাদের গল্পগুগুলো অবিশ্বাস করবেন।”)। অতঃপর আমি তাদের জিজ্ঞাসা করি যে অন্য কারো এরূপ ঘটনা ঘটেছে কিনা। তারা বলে যে অন্য দু’জন লোক ছিল, যারা আমি যা বলেছি তাই বলেছে ও অনুরূপ জবাব পেয়েছে। তারা হলো বানু আমর বিন আউফ গোত্রের মুরারা বিন আল-রাবি আল-আমরি ও হিলাল বিন আবু উমাইয়া আল-ওয়াকিফি, দু’জন সৎ মানুষ যাদের চরিত্র অনুকরণীয়। তারা যখন তাদের নাম উল্লেখ করে, আমি নীরব থাকি।

যারা পিছনে রয়ে গিয়েছিল তাদের মধ্যে আমাদের তিন-জনের সাথে নবীজী সবাইকে কথা বলতে নিষেধ করেন। তাই লোকেরা আমাদের এমনভাবে এড়িয়ে চলে ও এমন আচরণ প্রদর্শন করে যে আমি নিজেকে ও পুরো বিশ্বকে ঘৃণা করতে থাকি, যা আমি আগে কখনও করি নাই।

আমরা পঞ্চাশ রাত্রি যাবত এমনটি সহ্য করি। দুর্ভাগ্যক্রমে আমার দুই সঙ্গী অপমানিত হয়েছিল ও তারা তাদের বাড়িতেই থাকতো। কিন্তু আমি ছিলাম তাদের তুলনায় কনিষ্ঠ ও বলিষ্ঠ। তাই আমি বাইরে যেতাম ও নামাজে উপস্থিত হতাম, আর নিজেকে জিজ্ঞাসা করতাম যে আমার সালামের জবাবে তাঁর ঠোঁটগুলো নড়াচড়া করেছে কি না; অতঃপর আমি তাঁর নিকটে গিয়ে নামাজ আদায় করতাম ও চুপিসারে তাঁর দিকে তাকাতাম। আমি যখন আমার নামাজ আদায় করতাম, তিনি আমার দিকে তাকাতেন; আর আমি যখন তাঁর দিকে ফিরতাম, তিনি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। [11]

মুসলমানদের এমন কঠোরতা সহ্য করার সময় আমি হেঁটে গিয়ে আবু কাতাদার বাগানের দেয়ালে টপকে [তার কাছে] আসি। সে ছিল আমার চাচাতো ভাই ও আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। আমি তাকে সালাম দিই। আল্লাহর কসম, সে আমার সালামের জবাব দেয় না। তাই আমি বলি, “হে আবু কাতাদা, আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তুমি কি জানো না যে আমি আল্লাহ ও তার রসূলকে ভালোবাসি?” কিন্তু সে আমার কথার একটি জবাব ও দেয় না। আবার আমি তাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করে বলি, সে নীরব থাকে। আবারও; সে বলে, “আল্লাহ ও তার রসূলই ভালো জানেন।” সেই মুহূর্তে আমার চোখদুটো অশ্রু-প্লাবিত হতে থাকে ও আমি লাফ দিয়ে দেয়াল টপকে ফিরে আসি।

একদিন সকালে আমি বাজারে হাঁটছিলাম। সেখান সিরিয়া থেকে এক নাবাতি ব্যবসায়ী খাবার বিক্রি করতে এসে আমার খোঁজ করছিল। সে যখন আমর কথা জিজ্ঞাসা করে, লোকেরা তাকে আমার দিকে ইশারা করে। সে আমার কাছে আসে ও আমাকে ঘাসানিদ বাদশাহ (আল-ওয়াকিদি: ‘আল-হারিথ বিন আবি শামির’) এর এক চিঠি দেয়, যা সে লিখেছিল সিল্কের এক টুকরো কাপড়ে। তাতে যা লেখা ছিল তা ছিল নিম্নরূপ:

“আমরা শুনতে পেয়েছি যে তোমার নেতা তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। ঈশ্বর তোমাকে লাঞ্জনা ও অবমাননাকর অবস্থায় রাখে নাই। অতএব, তুমি আমাদের কাছে চলে এসো, আমরা তোমার সংস্থান করবো।”

আমি যখন এটি পড়ি, আমি ভাবি যে এটিও এই কঠোর পরীক্ষার এক অংশ। আমার অবস্থা এমন যে একজন মুশরিক আমাকে অর্জন করার আশা করেছে। তাই আমি চিঠিটি চুলার কাছে নিয়ে যাই ও তা পুড়িয়ে ফেলি। এভাবেই আমরা চলতে থাকি ও পঞ্চাশ রাত্রির মধ্যে চল্লিশ রাত অতিবাহিত হয়। অতঃপর, আল্লাহর নবীর দূত আমার কাছে এসে আমাকে জানায় যে, আল্লাহর নবী এই নির্দেশ জারী করেছেন যে আমি যেন অবশ্যই আমার স্ত্রীর কাছ থেকে নিজেকে আলাদা করি।

আমি জিজ্ঞেস করি, এর মানে কি এই যে তাকে আমার তালাক দিতে হবে। তিনি বলেন, না; আমার নিজেকে আলাদা করতে হবে ও তার সান্নিধ্যে আমার আসা যাবে না। আমার দুই সঙ্গী অনুরূপ নির্দেশ পায়। আমি আমার স্ত্রীকে তার পরিবারের কাছে গিয়ে থাকতে বলি যতক্ষণে না আল্লাহ এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত দেয়।

হিলালের স্ত্রী আল্লাহর নবীর কাছে আসে ও তাঁকে বলে যে, সে [তার স্বামী] একজন বৃদ্ধ লোক, চাকর ছাড়া যে একদম অসহায়, যদি সে তার [স্বামীর] সেবা করে তবে কোনো আপত্তি আছে কি? তিনি বলেন যে তা নেই, তবে শর্ত এই যে সে [হিলাল] যেন তার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে না আসে। সে আল্লাহর নবীকে বলে যে সে [তার স্বামী] তার দিকে এমন তৎপরতা কখনোই চালায় নাই। আর ঘটনা এই যে, সে এত বেশী সময় কান্নাকাটি করেছে যে তার ভয় এই যে সে হয়তো তার দৃষ্টিশক্তি হারাবে। আমার পরিবারের একজন আমাকে পরামর্শ দেয় যে আমার জন্যও আল্লাহর নবীর কাছে অনুরূপ অনুমতি চাওয়া উচিত। কিন্তু আমি তা করতে অস্বীকৃতি জানায়, এই কারণে যে, আমি ছিলাম যুবক ও আমি জানতাম যে এর জবাবে তিনি আমাকে কী বলতে পারেন।

আরও দশ রাত্রি অতিবাহিত হওয়ার পর, আল্লাহর নবী সবাইকে আমাদের সাথে কথা বলা নিষেধ করার পঞ্চাশ রাত সম্পূর্ণ হয়। পঞ্চাশতম রাতের সকালের নামাজটি আমি আমাদের বাড়িগুলোর একটির চূড়ার উপর আদায় করি, যেমনটি আল্লাহ নির্দেশ করেছে। পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্বেও আমাদের জন্য তা সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছিল ও আমার জীবন দূর্বিসহ হয়ে উঠেছিল। (এই ভাষাটি সুরা ৯:১১৮ থেকে ধার করা হয়েছে)। আমি এক খাড়া পাহাড়ের (আল-ওয়াকিদি: ‘সা’ল পর্বত’) চূড়ায় এক তাঁবু স্থাপন করেছিলাম ও সেখানেই থাকতাম। আমি হঠাৎ শুনতে পাই যে এক ঘোষক পাহাড়টির চুড়ায় আসার সময় তার কণ্ঠের সবটুকু শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলছে, “সুসংবাদ, কা’ব বিন মালিক!” অবশেষে স্বস্তি এসেছে জেনে আমি সেজদায় পড়ে যাই।

আল্লাহর নবী তাঁর সকালের নামাজ আদায়ের প্রাক্কালে ক্ষমা ঘোষণা করেন। লোকেরা সেই সুসংবাদ-টি আমাদের জানানোর জন্য রওনা হয়। তারা খবরটি নিয়ে আমার দুই সঙ্গীর কাছে যায়। আর এক লোক ঘোড়ায় চড়ে আমার দিকে ছুটে আসে। আসলাম গোত্রের এক দৌড়বিদ পাহাড়ের উপরে আসার পূর্ব পর্যন্ত দৌড়ে ছুটে আসে। গলার আওয়াজ ঘোড়ার গতির চেয়ে দ্রুততর। আমি যে সংবাদ প্রদানকারীর চিৎকার শুনেছিলাম, সে যখন আমার কাছে আসে, সংবাদটি জানানোর জন্য আমি তাকে পুরস্কার স্বরূপ আমার পরিধানের কাপড় দান করি (আল-ওয়াকিদি: ‘আমি আমার দুটি পরিধেয় পোশাক খুলে ফেলি ও তা তার গায়ে পরায়ে দিই’)। আল্লাহর কসম, সেই সময় আমার কাছে অন্য কোন পরিধেয় কাপড় ছিল না। আমাকে তা ধার করে পরিধান করতে হয়েছিল (আল-ওয়াকিদি: ‘আমি আবু কাতাদার কাছ থেকে দুটি পোশাক ধার নিয়ে তা পরিধান করি’)। অতঃপর আমি আল্লাহর নবীর অভিমুখে রওয়ানা হই। লোকেরা আমার সাথে দেখা করে, আমাকে সুসংবাদটি দেয় ও আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছে বলে আমাকে অভিনন্দন জানায়। আমি মসজিদে যাই। আল্লাহর নবী সেখানে ছিলেন লোকজন পরিবেষ্টিত অবস্থায়। তালহা বিন উবায়েদুল্লাহ উঠে দাঁড়ায়, আমাকে সালাম দেয় ও আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছে বলে আমাকে অভিনন্দন জানায়; কিন্তু অন্য কোন মুহাজির তা করে নাই। (কা’ব কখনও তালহার এই ব্যবহারটি ভুলে যায়নি)।

আমি যখন আল্লাহর নবীকে সালাম দিই, তাঁর মুখমণ্ডল আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠে ও তিনি বলেন, “এটি তোমার জীবনের সবচেয়ে সেরা দিন। তোমার জন্য সুখবর!” আমি বলি, ‘আপনার পক্ষ থেকে, নাকি আল্লাহর পক্ষ থেকে?” তিনি বলেন, “অবশ্যই আল্লাহর কাছ থেকে।”‘ তিনি যখন কোন সুসংবাদ জানাতেন, তাঁর চেহারা চাঁদের মতো হয়ে যেতো আর আমরা তা চিনতে পারতাম। তাঁর সামনে বসার পর আমি তাঁকে বলি যে অনুশোচনা হিসাবে আমি আমার সম্পত্তি আল্লাহ ও তার রসূলের জন্য সদকা হিসাবে দান করতে চাই। তিনি আমাকে এটির কিছু অংশ রেখে দিতে বলেন, যেটি আমার জন্য ভাল হবে। আমি তাঁকে বলি যে আমি খায়বারের গনিমতের অংশটি রেখে দিতে পারি। [12]

অতঃপর আমি বলি, “আল্লাহ আমাকে আমার সত্যবাদিতার জন্য রক্ষা করেছে। আর আমার অনুতাপের একটি অংশ হলো এই যে, আমি যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন আমি সত্য ছাড়া আর কিছু বলবো না। আল্লাহর কসম, আল্লাহর নবীর কাছে সত্য বলার কারণে সেদিন থেকে আল্লাহ আমাকে যে অনুগ্রহ দান করেছে, তার চেয়ে অধিক অনুগ্রহ সে [আল্লাহ] অন্য কাউকে করেছে কি না তা আমার জানা নেই। সেই দিন আমি যা বলেছিলাম, তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আমি কোন উদ্দেশ্যেই কখনো মিথ্যা বলি নাই। আর আমি আশা করি যে জীবনের বাঁকি সময় আল্লাহ আমাকে রক্ষা করবে।” [13]

আল্লাহ নাজিল করেছে: [14]

[৯:১১৭] – “আল্লাহ দয়াশীল নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা কঠিন মহূর্তে নবীর সঙ্গে ছিল, যখন তাদের এক দলের অন্তর ফিরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি দয়াপরবশ হন তাদের প্রতি। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুনাময়।”

[৯:১১৮-১১৯] – “এবং অপর তিনজনকে যাদেরকে পেছনে রাখা হয়েছিল” – এখান থেকে “সত্যবাদীদের সাথে থাক” পর্যন্ত। [অর্থাৎ, “এবং অপর তিনজনকে যাদেরকে পেছনে রাখা হয়েছিল যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্বেও তাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দূর্বিসহ হয়ে উঠলো; আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন আশ্রয়স্থল নেই-অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াময় করুণাশীল। হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।”]

কা’ব বলেছে, “আল্লাহ আমাকে ইসলামের পথ দেখানোর পর এর চেয়ে বড় অনুগ্রহ সে আমাকে আর কখনও করে নাই। সেই দিন আমি আল্লাহর নবীকে সত্য বলেছিলাম যাতে আমি তাদের মতো ধ্বংস হয়ে না যাই, যারা মিথ্যা বলেছে। কারণ যারা তাঁকে মিথ্যা বলেছিল, আল্লাহ তাদের সম্পর্কে ওহী নাযিলের করেছে:

[কুরআন: ৯:৯৫-৯৬] – “এখন তারা তোমার সামনে আল্লাহর কসম খাবে, যখন তুমি তাদের কাছে ফিরে যাবে, যেন তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও। সুতরাং তুমি তাদের ক্ষমা কর, নিঃসন্দেহে এরা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের বদলা হিসাবে তাদের ঠিকানা হলো দোযখ। তারা তোমার সামনে কসম খাবে যাতে তুমি তাদের প্রতি রাযী হয়ে যাও। অতএব, তুমি যদি রাযী হয়ে যাও তাদের প্রতি তবু আল্লাহ তা’আলা রাযী হবেন না, এ নাফরমান লোকদের প্রতি।“’ —-

  • আল-ওয়াকিদির অতিরিক্ত বর্ণনা: [3]

‘তারা বলেছে; কা‛ব বিন মালিক বলেছে:

আমার কাছে যখন খবর আসে যে আল্লাহর নবী তাবুক থেকে বাড়ী ফিরছেন, তা আমাকে পেয়ে বসে ও আমি মিথ্যার চিন্তা করি। আমি বলি:

“আগামীকাল আমি কীভাবে আমার উপর থেকে আল্লাহর নবীর অসন্তুষ্টি দূর করবো? আমার পরিবারের মধ্যে যারা অভিমত পেশ করে, আমি তাদের সবার সহযোগিতা চাই। এমনকি, সম্ভবত আমি এটি ভৃত্যদের কাছেও উল্লেখ করি এই আশায় যে আমার কাছে হয়তো এমন কিছু [অভিমত] আসবে যা আমাকে স্বস্তি দেবে। যখন বলা হলো যে আল্লাহর নবী মদিনার খুব কাছাকাছি, তখন মিথ্যা আমাকে ছেড়ে যায় ও আমি নিশ্চিত হই যে, সত্য বলা ছাড়া আমি রক্ষা পাব না।”

সেদিন সকালে আল্লাহর নবী মদিনায় হাজির হন। কোন সফর থেকে ফিরে আসার পর তিনি মসজিদ থেকে আরম্ভ করতেন, দুই রাকাত নামাজ পড়তেন ও অতঃপর লোকদের সাথে বসতেন। যখন তিনি তা সমাধা করেন, যারা পিছনে থেকে গিয়েছিল তারা তাঁর কাছে আসা শুরু করে ও তাঁর কাছে অজুহাত ও শপথ করতে থাকে। সেখানে ছিল প্রায় আশি জন লোক। আল্লাহর নবী তাদের বিবৃতি ও শপথ গ্রহণ করেন ও তাদের গোপন বিষয়গুলো আল্লাহর উপর ন্যস্ত করেন।

কাব হইতে বর্ণিত অন্য এক রেওয়াতে বলা হয়েছে:

প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহর নবী যখন ‘ধু আওয়ান’ অবতরণ করেন, সাধারণ মুনাফিকরা যারা পিছনে পড়েছিল তারা বের হয়ে আসে। আল্লাহর নবী বলেন, “যারা আমাদের কাছ থেকে পিছনে পড়েছিল তাদের কারও সাথে কথা বলবে না ও তাদের সাথে বসবে না, যতক্ষণে না আমি তোমাদের অনুমতি দিই।” তাই তারা তাদের সাথে কথা বলে নাই। তিনি যখন মদিনায় আসেন, যাদের অজুহাত ছিল তারা শপথ নিয়ে তাঁর কাছে আসে। কিন্তু তিনি তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। মুমিনরাও তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যতক্ষণে না সত্যিই লোকটির কাছ থেকে তার পিতা, তার ভাই ও তার চাচারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারা নবীর কাছে আসতে থাকে ও তাঁর কাছে তাদের জ্বর ও অসুস্থতার অজুহাত পেশ করা শুরু করে। আল্লাহর নবী তাদের প্রতি সদয় ছিলেন। তিনি তাদের বিবৃতি ও শপথ মঞ্জুর করেন। তারা কসম খায়, তিনি তাদেরকে বিশ্বাস করেন ও তাদের ক্ষমা করে দেন ও তদের গোপন বিষয়গুলো মহান আল্লাহর উপর ন্যস্ত করেন। ——-

আল্লাহর নবীর পত্নী উম্মে সালামা যা বলতো, তা হলো:

‘সেই রাতে আল্লাহর নবী আমাকে বলেছিল, “হে উম্মে সালামা, কা’ব বিন মালিক ও তার দুই সঙ্গীর ক্ষমা প্রকাশ করা হয়েছে।” অতঃপর আমি বলি, “হে আল্লাহর নবী, আমি কি তাদের কাছে বার্তাটি পৌঁছে দিয়ে তাদের আনন্দ দিতে পারি না?” আল্লাহর নবী জবাবে বলেন, “তোমার শেষ রাতের ঘুম ব্যাহত হবে। আর তারা সকালে ঘুম থেকে উঠার পূর্ব পর্যন্ত তাদের দেখা পাওয়া যাবে না।” সে বলেছে: সকালের নামাজ আদায় করার পর আল্লাহর নবী লোকদের-কে ঐ লোকগুলোর প্রতি, কাব বিন মালিক ও মুরারা বিন আল-রাবি ও হিলাল বিন উমাইয়া, আল্লাহর ক্ষমা প্রদর্শনের খবরটি জানিয়ে দেন। [15]

আবু বকর সা’ল পর্বতের উপর আরোহণ করে ও চিৎকার করে বলে: “আল্লাহ কাবকে ক্ষমা করে দিয়েছে!” তার এই ব্যাপারটি তাকে আনন্দিত করে! আল যুবায়ের তার ঘোড়ায় চড়ে বাতেন আল-ওয়াদিতে রওনা হয় ও আল-যুবাইয়ের পৌঁছানোর আগেই সে আবু বকরের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়।

আবুল আওয়ার সাঈদ বিন যায়েদ বিন আমর বিন নুফায়েল, বানু ওয়াকিফ গোত্রের হিলাল-কে সুসংবাদটি দেওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। সে যখন তাকে তা জানায়, সে [হিলাল] সেজদায় পতিত হয়। সাঈদ বলেছে: আমি ভেবেছিলাম যে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত সে তার মাথা উঠাবে না। তার আনন্দ তার দুঃখের চেয়ে এতটায় বেশী অশ্রুসিক্ত ছিল যে লোকেরা তাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। যে লোকেরা তার সাথে দেখা করেছে, তারা তাকে অভিনন্দন জানায়।

দুর্বলতা, দুঃখ ও কান্নাকাটির কারণে আল্লাহর নবীর কাছে তার হেঁটে আসার ক্ষমতা ছিল না, সে এক গাধার উপর চড়ে আসে।

যারা মুরারা বিন আল রাবি-কে সুসংবাদটি দেয়, তারা হলো, সিলকান বিন সালামা আবু নাইলা ও সালামা বিন সালামা বিন ওয়াকাশ। তারা দু’জনেই বানু আশহাল গোত্রের লোকদের সাথে আল্লাহর নবীর সাথে সকালের নামাজ আদায় করে; অতঃপর তারা মুরারার কাছে রওনা হয় ও তাকে খবরটি জানায়। মুরারা নিকটে আসে ও তারা তাকে আল্লাহর নবীর কাছে রেখে আসে।’ ——

তারা বলেছে: আল্লাহর নবী নবম [হিজরি] বছরের রমজান মাসে মদিনায় আগমন করেন ও বলেন: “প্রশংসা আল্লাহর, যিনি এই যাত্রার সময় আমাদের কে ও আমাদের পরে আমাদের অংশীদারগুলো কে উত্তম পুরস্কার প্রদান করেছে।” আয়েশা বলে: “হে আল্লাহর নবী, আপনি সফরে গিয়েছিলেন ও এটি ছিল এক কষ্টকর সফর। এর মধ্যে আপনার পরে আপনার অংশীদারগুলো কারা?” আল্লাহর নবী বলেন: “নিশ্চিতই মদিনায় এমন লোক রয়ে গিয়েছিল, যারা যখনই আমরা অগ্রসর হতাম বা উপত্যকায় নামতাম, তখনই তারা আমাদের সাথেই অবস্থান করছিল। অসুস্থতা তাদের-কে আটকে রেখেছিল। আল্লাহ কী তার কিতাবে বলে নাই: “আর সমস্ত মুমিনের অভিযানে বের হওয়া সঙ্গত নয়।–” (কুরআন: ৯:১২২) । আমরা তাদের পক্ষে আক্রমণকারী, আর তারা হলো অবস্থানকারী। যার হাতে আমার আত্মা তার কসম, নিশ্চিতই শত্রুর বিপক্ষে তাদের প্রার্থনা আমাদের অস্ত্রের চেয়ে বেশি কার্যকর। মুসলমানরা তাদের অস্ত্র বিক্রি করা শুরু করে ও বলতে থাকে: “নিশ্চয়ই যুদ্ধ থেমে গেছে!” শক্তিমানরা তাদের শক্তিমত্তা বৃদ্ধির জন্য সেগুলো কিনতে শুরু করে। বিষয়টি আল্লাহর নবীর কাছে পৌঁছে ও তা তিনি তাদের নিষেধ করেন। তিনি বলেন, “আমার উম্মতের একটি দল দজ্জাল না আসা পর্যন্ত সত্যের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।”‘ — [16]

আল-তাবারীর অতিরিক্ত বর্ণনা:

‘আল্লাহর নবী রমজান মাসে তাবুক থেকে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। সেই মাসে, তাঁর কাছে থাকিফ গোত্রের এক প্রতিনিধি দলের আগমন ঘটে।’

  • – অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

>>> কে এই কা’ব বিন মালিক? কা’ব বিন মালিক ছিলেন নবী মুহাম্মদের সেই সত্তর জন বিশিষ্ট আনসার (আদি মদিনা-বাসী) অনুসারীদের একজন, যিনি মুহাম্মদের মদিনা হিজরতের পূর্বে মক্কায় গিয়ে “দ্বিতীয় আকাবা শপথ (The second pledge of Aqaba)” কর্ম সম্পন্ন করেছিলেন। অতঃপর মুহাম্মদের মদিনা হিজরত (সেপ্টেম্বর, ৬২২ সাল); অতঃপর তাঁর মদিনা জীবনের আট বছরের ও বেশী সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর এই ‘তাবুক অভিযান’। । [9]

আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যা সুস্পষ্ট, তা হলো, শুরুতে কা’ব বিন মালিক “মুহাম্মদের ক্রোধ” থেকে বাঁচার প্রচেষ্টায় অন্যান্য অনুসারীদের মতই মিথ্যার আশ্রয় নিতে চেয়েছিলেন। অতঃপর তিনি মুয়াধ বিন জাবাল ও আবু কাতাদা নামের দু’জন মুহাম্মদ অনুসারীর পরামর্শে (আল-ওয়াকিদির বর্ণনা) উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, “একমাত্র সত্য” বলার মাধ্যমেই তিনি মুহাম্মদের ক্রোধ থেকে পরিত্রাণ পেতে পারেন। সে কারণেই তিনি সত্য বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর এই ধারণাটি ছিল ভুল! তিনি তাঁর উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়েছিলেন! অন্যদিকে, মুহাম্মদের যে অনুসারীরা (মুহাম্মদের ভাষায় ভণ্ড বা মুনাফিক) উপলব্ধি করেছিলেন যে “মিথ্যা অজুহাত” এর মাধ্যমে তাঁরা মুহাম্মদের ক্রোধ থেকে মুক্তি পেতে পারেন, তাঁরা নিয়েছিলেন “মিথ্যার আশ্রয়।” তাঁদের সেই সিদ্ধান্তটি ছিল সঠিক। তাঁরা তাঁদের উদ্দেশ্যে সফলকাম হয়েছিলেন। কী কারণে মুহাম্মদের এ সকল অনুসারীরা মুহাম্মদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলেন তা মুহাম্মদের মদিনা জীবনের গত আট বছরের কর্ম-কাণ্ডে অত্যন্ত সুস্পষ্ট।

আদি উৎসের উপরে বর্ণিত বর্ণনায় আর যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো: নবী মুহাম্মদ জানতেও পারেন নাই যে তাঁর এই অনুসারীদের “অজুহাতগুলো ছিল মিথ্যা!” সে কারণেই তিনি তাঁদের এই মিথ্যাচারগুলো-কে সত্য জ্ঞানে ক্ষমা করেছিলেন; আর তাদের গোপন অভিসন্ধির, যদি কিছু থাকে, সিদ্ধান্তের ভার তাঁর “আল্লাহর উপর” ন্যস্ত করেছিলেন।

অন্যদিকে, মুহাম্মদ তাঁর সত্যবাদী অনুসারীদের শাস্তি প্রদান করেছিলেন, “নিজেই”; ওহী মারফত তাঁর আল্লাহর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ নির্দেশ পাওয়ার পূর্বেই।

অতঃপর, তিনি এ বিশয়ে চিন্তা ভাবনা ও এই অনুসারীদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ-কল্পে সময় নিয়েছিলেন সুদীর্ঘ পঞ্চাশ দিন! এই সুদীর্ঘ সময়টিতে তিনি নিশ্চিতরূপেই অনুধাবন করেছিলেন যে, যাদের-কে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন তাঁদের অজুহাত-গুলো ছিল মিথ্যা! অতঃপর তিনি মিথ্যাবাদীদের প্রতি বিষোদগার ও সত্যবাদীদের প্রতি সুসংবাদের এই ঘোষণাগুলো দিয়েছিলেন, “তাঁর আল্লাহর নামে!” ওহী নাজিল পদ্ধতি-তে। নবী মুহাম্মদের এই “ওহী নাজিল” প্রক্রিয়া যে তাঁর চরম মিথ্যাবাদিতার পরিচয়, তা অবিশ্বাসীরা নিশ্চিত জানতেন; যার সাক্ষী ধারণ করে আছে তাঁরই স্বরচিত ব্যক্তি-মানস জীবনী গ্রন্থ ‘কুরআন’। অবিশ্বাসীরা তাঁকে অভিযুক্ত করেছিলেন এক ভণ্ড মিথ্যাবাদী রূপে (কুরআন: ২২:৪২; ২৯:১৮; ৩৪:৪৩; ৩৫:৪; ৩৮:৪; ইত্যাদি)। এ বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা ‘এ সেই কিতাব যাতে কোনোই সন্দেহ নেই’ পর্বে (পর্ব: ১৮) করা হয়েছে।

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *