ভয়ংকর এক ঈদের ছুটি

একটা টক শো দেখছিলাম। আলোচনার বিষয় ছিল, ক্রিকেটে রেসিজম। প্রশ্নকর্তা একজন অতিথিকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কি মনে করেন ক্রিকেটে রেসিজম আছে? উত্তরদাতা বললেন, অফিশিয়ালি নো বাট আনফিশিয়ালি ইয়েস। আমাদের জীবনেও এমন অনেক ঘটনা থাকে যেখানে আনফিশিয়াল উত্তরটা এতোটাই দৃষ্টিকটু যে কখনই তা স্বীকার করি না। ছোটবেলায় গুরুজনদের সালাম করতাম ‘সালামী’র লোভে, মনে পড়ে না কখনও এই সত্যকে স্বীকার করেছি কিনা। সবাই জানে, সবাই বোঝে তারপরও কেন যেন কিছু সত্য মুখে আনি না।

একটা টক শো দেখছিলাম। আলোচনার বিষয় ছিল, ক্রিকেটে রেসিজম। প্রশ্নকর্তা একজন অতিথিকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কি মনে করেন ক্রিকেটে রেসিজম আছে? উত্তরদাতা বললেন, অফিশিয়ালি নো বাট আনফিশিয়ালি ইয়েস। আমাদের জীবনেও এমন অনেক ঘটনা থাকে যেখানে আনফিশিয়াল উত্তরটা এতোটাই দৃষ্টিকটু যে কখনই তা স্বীকার করি না। ছোটবেলায় গুরুজনদের সালাম করতাম ‘সালামী’র লোভে, মনে পড়ে না কখনও এই সত্যকে স্বীকার করেছি কিনা। সবাই জানে, সবাই বোঝে তারপরও কেন যেন কিছু সত্য মুখে আনি না।
আমাদের দেশে হরতালের ও এমনই কিছু আনফিশিয়াল সত্য আছে। কখনই শনিবারে কিংবা শুক্রবারে হরতাল দেয়া হয় না। বৃহস্পতিবারে কোন অঘটন ঘটলেও রবিবারেই হরতাল ডাকা হয়। বুধবারে ঘটলে কিন্তু হরতালটা ডাকা হবে বৃহস্পতিবারে। সপ্তাহের বাকী দিনগুলোতে হরতাল ডাকবার তেমন কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা। চেষ্টা থাকে বৃহস্পতিবার কিংবা রবিবারে ডাকবার। তবে ঘটনা গুরুতর হলে, সঙ্গে সঙ্গে একটা ডেকে দেয়া হয়। পরে বিক্ষোভ, মানব বন্ধন করে আরও একটা হরতাল, এবারেরটা অবশ্যই সাপ্তাহিক ছুটির দিন ঘেঁষে।
অর্ধদিবসের বাজার বেশ মন্দা। আনফিশিয়াল সত্য হচ্ছে, এমন হরতাল ডাকা মানেই নিজের প্রেস্টিজ ডোবানো। পুচকি কোন দল ডাকলে ঠিক আছে, ‘পূর্ণ দিবস ডাকবার সাহস নেই’। বড় দল ডাকলে, ধরেই নেয়া হবে, ভয় পেয়েছে কিংবা হরতাল করার জন্য কর্মী নেই। তবে ছত্রিশ ঘণ্টাতে অনেকে আপত্তি করে না। পরের দিনের অরধদিবস কে তখন আর অর্ধদিবস ধরা হয় না। বাৎসরিক কোন ছুটি থাকলে, ফর্মুলা একটু পাল্টায়। সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে যোগ করে দেয়া সম্ভব হলে, সেভাবেই হরতাল ডাকা নিয়ম। বুধবার কোন ছুটি পড়লে, বৃহস্পতিবারে হরতাল ডাকাই নিয়ম। আর সোমবার ছুটি হলে রবিবারে। মঙ্গলবার ছুটি হলে, আর একটু গুরুতর ঘটনা ঘটলে, রবি-সোম কিংবা বুধ- বৃহস্পতি যেটা সুবিধা হয়। ব্যাস সাপ্তাহিক ছুটির দিন পর্যন্ত টেনে দেয়া জরুরী।
রাজনৈতিক দলগুলো যে কেবল নিজের প্রয়োজনে হরতাল ডাকে, এমনটা না। আনফিশিয়াল তথ্য হচ্ছে আমাদেরও অনেকের ইচ্ছা থাকে। যেসব অফিসে, হরতালে ফাঁকি দেয়া ‘জায়েজ’ সেসব অফিসে এমন হরতাল বেশ কাঙ্খিত। কড়া বস, প্রাইভেট চাকরী কিংবা উপরি আয় আছে এমন সরকারী অফিস অবশ্য বাদ। এমন অফিসে অনেকেতো নিজের প্রাপ্য ছুটিও নেয় না। হরতাল নিয়ে এসব আনফিশিয়াল তথ্য যদিও কোন দলই স্বীকার করবেন না, তারপরও আমরা সবাই জানি, জনগণকে একটু এক্সট্রা ছুটি উপহার দেয়াই তাঁদের উদ্দেশ্য।
ঈদের ছুটিরও এমন কিছু আনফিশিয়াল সত্য আছে। মঙ্গলবারে ঈদ হওয়া মানে সবাই চেষ্টায় লেগে পরে বৃহস্পতিবারে কোনভাবে অফিস ম্যানেজ করতে। সফল কর্মকর্তারা তখন একেবারে রবিবারে অফিসে ঢোকেন। রবি সোম এ ঈদ হলে বেজায় সমস্যা। দুইদিন ম্যানেজ একটু কষ্টকর হয়ে যায়। শুক্রবার কিংবা বৃহস্পতিবার ঈদ হলে মনটা আরও বেজার হয়ে যায়, একটা ছুটি মারা গেল। ঈদ আরবী মাস অনুযায়ী হওয়ায় অনেক বাৎসরিক ছুটির সঙ্গে মিশে যায়। তেমনটা হলে একটু বাড়তি আনন্দ জুটে যায়।
এবারের ঈদে চেষ্টা হোল, দুই দিনের আনফিশিয়াল ছুটি দেয়ার। ঈদের পরে আরও দুইদিন প্রিয়জনের কাছে থাকা। তাই এমনভাবে দেয়া হোল, যেন এই হরতালের বাহানায় কেউ কর্মস্থলে ফিরতে না পারে। বস কে মোক্ষম বাহানা দেয়া যাবে, স্যার টিকিট কাটা ছিল কিন্তু হরতালের জন্য গাড়ী চলেনি। বস বেশী কড়া হলে অন্য কথা, তা না হলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেনে নেয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। মনের কোনে আশা ছিল, জনতা দারুণ খুশী হবে।
আদালতের সিদ্ধান্তের পরে হরতাল ডাকবে কি না, তা নিয়ে মনে হয় না কোন দ্বিধা ছিল। আদালত অবমাননা হচ্ছে কি না, তা খুব একটা মুখ্য ব্যাপার না। তারা যে ক্ষিপ্ত তা বোঝানোর জন্য এদেশের মোক্ষম অস্ত্র ‘হরতাল’ না দিলে জাত যেত। রোজার মাস হওয়ায়, সেসময় ভাংচুর করতে বোধহয় বিবেকে নাড়া দিচ্ছিল। খুব ভালো মিডিয়া কাভারেজও জুটে না, সমালোচনা তো হয়ই। আগের দুটো রায়ে হরতাল বেশ দায়সারা গোছের হওয়ায় এবার তাই রোজার পরেই ‘হরতালীয় ছুটি’ দেয়ার সিদ্ধান্ত। ছুটির দিন ঘেঁষে দেয়া গেলে দারুণ জনপ্রিয় হতে পারে ভেবে প্রথমে ঘোষণা আসে বার, তের।
এরপরে কাহিনীতে পরিবর্তন হয়। তের চোদ্দ। কারণ নিয়ে অনেক গল্প বাজারে চালু আছে, নেতার কন্যার বিয়ে, সমালোচনা, মানুষের ভোগান্তি কথা চিন্তা করা, এমন অনেক গল্প। তবে হরতালের মুলনীতি থেকে খুব একটা বিচ্যুত হয় নি। পনের ছুটি, ষোল শুক্রবার। ফলে দুইদিনের হরতাল মিলিয়ে পাঁচদিনের একটা ছুটি। মন্দ না। এখন কাজ শুধু এগারো কিংবা বারোর ভিতর কর্মস্থলে ফেরা। যারা একটু দূরে গিয়েছেন, এবার তাঁদের কাজ, হাতে পায়ে ধরে, পরিচিতি ব্যবহার করে কিংবা বেশী দাম দিয়ে টিকিট ম্যানেজ করা। অনেকে দুই ধাপে কাজটা সারছেন। সঙ্গের আণ্ডা বাচ্চাকে রেখে যাচ্ছেন, আবার শুক্রের ছুটিতে এসে নিয়ে যাবেন।
এমন সৌভাগ্য অবশ্য অনেকের হয় নি। কেউ বাসের শেষ সিট কিংবা ট্রেনের ছাদ। পরিবারকে পরে নিয়ে যাওয়ার খরচ যোগাতে না পারা গ্রুপটাকে এই কষ্ট মেনে নিতে হচ্ছে। টিকিট ম্যানেজ না করা পর্যন্ত রোজার শেষের দিনগুলো হয়ে উঠেছিল অনেকের জন্য ভয়ংকর। বিশেষ করে একদিন পরে পৌছলে যাদের চাকরী নিয়ে টানাটানি পরে যাবে, সেসব জনতার জন্য। যারা টিকিট ম্যানেজ করতে পারে নি তাঁদের অনেকের জন্য ছিল একটি ভয়ংকর ঈদের ছুটি। অনেকেরই একটু কষ্ট হোল ঠিকই। কি আর করা। হরতাল তো আর কোন রাজনৈতিক দল নিজের জন্য ডাকে না। জনগণের ভালোর জন্যই তো হরতাল ডাকা হয়। আর নিজেদের ভালোর এই একটু কষ্ট করবে না? হোলই না হয় ঈদের ছুটি একটু ভয়ংকর।

৪ thoughts on “ভয়ংকর এক ঈদের ছুটি

  1. সরকারী চাকরীতে এখন হরতালে
    সরকারী চাকরীতে এখন হরতালে কর্মস্থলে থাকা মোটামুটি বাধ্যতামূলক। হরতালে অনুপস্থিত মানে ধরে নেওয়া হয় আপনি বিরোধী দলের বা হরতাল আহ্বানকারীদের সাপোর্টার। রীতিমত গোয়েন্দা সংস্থার লোক এসে অফিসে খোঁজ নেয় কে কে অনুপস্থিত। তাই যতোই ঝামেলা হোক জান হাতে নিয়ে হলেও হরতালে অফিস যেতেই হবে।

  2. হরতাল তো এখন নিত্যনৈমিত্তিক
    হরতাল তো এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।রাজনৈতিক নেতার চায়ে একটু চিনি কম হলেও আজকাল হরতাল ডাকা হয়।কারণ হিসেবে দেখানো হয় সরকারের চিনির বানিজ্যে দুর্নীতি।তবে যত যাই হোক এতে করে একটা উপকার হয়েছে তা হল,জনসাধারণের হরতাল ভীতি একটু কমেছে।

  3. আপনার লেখায় মনে হলো
    আপনার লেখায় মনে হলো চাকরীজীবিদের সম্পর্কে আপনার ধারণা খুব একটা নাই। হরতালে চাকরীজীবিদের বিশেষ করে সরকারি চাকরীজীবিদের সমস্যা হয় সবচেয়ে বেশী। ডা. আতিক এ সম্পর্কে বলেছেন তাই আর বেশী বললাম না…..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *