সন্ত্রাস নির্ভর ছাত্র রাজনীতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাশের মিছিল – ০১

সেদিন ফেসবুকে দেখলাম একজন লিখেছেন “ছাত্রলীগ লিখে গুগলে সার্চ দেন, তারপরে দেখেন”! কৌতূহলী হয়ে দিলাম সার্চ, যা ভাবছিলাম ঠিক তাই, অর্থাৎ ছাত্রলীগের নানান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের খবর। আসলেই এখন ব্যাপারটা অনেকটা তেমনই দাঁড়িয়েছে। ছাত্রলীগ এবং সন্ত্রাস-খুন-টেন্ডার বাজি সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে প্রায়, যেমন হয়েছিল চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ছাত্রদল। প্রায় প্রতিটা দিন পত্রিকার পাতায় ছাত্রলীগের এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে নিউজ থাকেই। সাধারণ পাবলিকের একটা বিতৃষ্ণা এসে গেছে ছাত্র রাজনীতির উপরে। অথচ আমাদের প্রায় সব গৌরবজনক অর্জনের সাথে ছাত্র সমাজ বা ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা স্বর্ণালী অক্ষরে লেখা রয়েছে। কিছুদিন আগে ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে বিশ্বজিতকে যা মিডিয়ার কল্যাণে আমরা টিভিতে দেখেছি, দেশে বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এই ঘটনার পরে। এখন ছাত্রলীগ প্রসঙ্গে কিছু বলতে গেলেই প্রথমে চলে আসে বিশ্বজিত হত্যাকাণ্ডের কথা। কিন্তু আমি মনে করি সেদিনের ঐ হত্যাকাণ্ডের ভিডিও চিত্র ধারণ করা সম্ভব না হলে ঐ হত্যাকাণ্ড নিয়ে কারও কোন মাথা ব্যথা থাকতো না। দেশে আনাচে কানাচে এমন অনেক বিশ্বজিতদের প্রাণ দিতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কই সেসব নিয়ে তো তেমন কোন কথা হয় না।

যাই হোক, আমার লেখার উদ্দেশ্য ছাত্রলীগ বা বিশ্বজিত হত্যাকাণ্ড নয়, বর্তমানে ছাত্র রাজনীতির নেতিবাচক প্রচারণা প্রসঙ্গে। কখনও ছাত্রলীগ কখনও বা ছাত্রদলের কারণে সাধারণ পাবলিক যখন অতিষ্ঠ ছাত্র রাজনীতি প্রসঙ্গে, তখন ছাত্র রাজনীতির একজন প্রাক্তন কর্মী হিসেবে বর্তমান হাল হকিকত পর্যবেক্ষণ করে আমার কাছে মনে হয়, বর্তমানে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিগত তিনটি দশকের তুলনায় অনেক অনেক ভালো পরিবেশ রয়েছে। আগেই বলে রাখি এটা একান্তই আমার নিজের চিন্তা ভাবনা। তবে এই কথা বলার জন্য আমাকে পাগল ভাবলে সম্ভবত ভুল হবে। এই প্রসঙ্গে আশির দশকের জনপ্রিয় ব্যান্ডদল “চাইম” এর একটা গানের কথা মনে পড়লো, যেই গানে সেই সময়ের ছাত্র রাজনীতির একটা চিত্র ফুটে ওঠে। ঐ গানের কয়েকটা লাইন ছিল –

অনার্স কোর্স তিন বছর
লাগে মাত্র ছয় বছর
বাবার পকেটে লালবাতি জ্বলে
হায় মধুর পরিবেশ
হলের ডালে জীবন শেষ
পাস কোর্সে এ্যাটেন্ড করা ভালো
এ কেমন অভিশাপ বলো।

হ্যাঁ, এখনও সেশন জট রয়েছে, কিন্তু নির্দ্বিধায় বলা যায় আশি এবং নব্বইয়ের দশকের তুলনায় তা অনেকটা কম। অনির্ধারিত ছুটি এখনও দেয়া হয় তবে সেটাও ২০ বছর আগের মতো মহামারির আঁকার ধারণ করেনা। মনে করতে পারছি ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে ঐ বছর জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের শতাধিক শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ছাত্র সংঘর্ষের জের ধরে। সেই সময়ের সংঘর্ষগুলো হতো বর্তমানের চাইতে অনেক অনেক বেশী ভয়াবহ। দেশের প্রধান দুই বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক দিনেই যথাক্রমে ৪০০ এবং ১০০০ রাউন্ড গুলি বর্ষণের মতো ঘটনাও অতীতে ঘটেছে। এখন মিডিয়ার কল্যাণে অনেক স্থিরচিত্র বা ভিডিও আমরা দেখছি এবং শিউরে উঠছি। কোন ঘটনায় ছোড়া হাতে থাকা কোন যুবকের ছবি বৃত্ত এঁকে মার্ক করে দেয়া হচ্ছে পত্রিকার পাতায়। পাইপ গান বা পিস্তল বিভলবার হলে তো কথাই নেই। কিন্তু আজ থেকে ২৫ বছর আগে মিডিয়ার এতো সুযোগ সুবিধা থাকলে ছোড়া-রিভলবার-নাইন এমএম এর বদলে কাঁটা রাইফেল, কাঁটা বন্দুক, এলএমজি, শটগান, চাইনিজ রাইফেল বা জি থ্রি রাইফেলধারীদের ছবি হর হামেশাই দেখা যেতো। সেই সময়টা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাত বাড়ালেই পাইপ গান, সিঙ্গেল শুটার, শাটার গান, এলজি’র দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যেতো। অনেক কথা বলে ফেললাম। লেখার পরিধি বড় হয়ে গেলো। মূল প্রসঙ্গে যাই।

দেশের শুধুমাত্র একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পেশী শক্তি নির্ভর ছাত্র রাজনীতির দিকে দৃষ্টি দিলেই বুঝা যাবে আমি কেন বলছি বর্তমান সময়ে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ অতীতের যে কোন সময়ের থেকে অনেক ভালো। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত, বাংলাদেশের সকল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে ঢাবি ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের অন্তত ৬০ নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। সরকার বিরোধী আন্দোলন, ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজির টাকা ভাগবাটোয়ারা করা নিয়ে মুখোমুখি বন্দুক যুদ্ধে এবং কিছু ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। শুধু শিক্ষার্থীই নয় খুন হয়েছে একাধিক কর্মচারী ও বহিরাগতও।

সদ্য স্বাধীন দেশে অনেকের কাছেই আগ্নেয়াস্ত্র থাকা স্বত্বেও সত্তুরের দশকের এর ব্যবহার খুব একটা দেখা যায়নি ঢাবি ক্যাম্পাসে। তবে পচাত্তরের পট পরিবর্তন এবং সামরিক শাসক জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বৃদ্ধি পেতে অস্ত্রের অব্যবহার। বিশেষ করে আশির দশকে ছাত্রদলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ পেশী শক্তি নির্ভর ছাত্র রাজনীতির একটা ধারার সৃষ্টি হয়। দেশব্যাপী প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তারে ব্যাপকহারে শুরু হয় অস্ত্রের ব্যবহার। শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধেই নয় নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেও অস্ত্রের ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।

সে সময় “সন্ত্রাস যদি শিল্প হয়, আমি সেই শিল্পের সার্থক শিল্পী” উক্তি করে সন্ত্রাস নির্ভর ছাত্র রাজনীতির মডেল বনে যাওয়া ঢাবির কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোলাম ফারুক অভি, সানাউল হক নীরু ও নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ থেকে ছাত্রদলে আসা ইলিয়াস আলীর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অভি-নীরু গ্রুপ এবং ইলিয়াস গ্রুপ নামে পরস্পর বিরোধী দুটি গ্রুপের উত্থান ঘটে।

উভয় গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংঘর্ষ ঘটেছে বহুবার। নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সন্ত্রাসীদের এনে হলে তোলে উভয় গ্রুপই। এই সময়েই ক্যাম্পাসে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়। ইলিয়াস গ্রুপ ও অভি-নীরু গ্রুপের বন্দুক যুদ্ধ, সংঘর্ষ, বোমাবাজি রীতিমতো নিয়মিত ব্যাপার হয়ে যায়। ঘটতে থাকে একের পর এক হত্যাকাণ্ড।

ক্যাম্পাসে মোট চারটি সংগঠনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার জন্য অভিযুক্ত করা যায় নিঃসন্দেহে। ছাত্রদল, জাসদ ছাত্রলীগ, নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ এবং আওয়ামী ছাত্রলীগ। অবশ্য আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এরশাদ নতুন বাংলা ছাত্র সমাজকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে।

বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এসময়। একেকটা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটা করে তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়িত্ব শেষ করেছে, আজ পর্যন্ত সেসব তদন্ত কমিটির কোন প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। সেখানে বিচার হওয়া তো অনেক দূরের কথা। অবশ্য একটা হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছিল এবং ১৯৮৭ সালে এক ছাত্র সংঘর্ষের জের ধরে ঢাবি কর্তৃপক্ষ জাসদ ছাত্রলীগ এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ১২ জন নেতা কর্মীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছে।

১৯৭২ সালের ডাকসু নির্বাচন এবং ছাত্রলীগ বিভক্ত হওয়ার পূর্বে এবং পরে একাধিকবার ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ঢাবিতে প্রথম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ১৯৭৪ সালে। এবারে দেখা যাক ঢাবি ক্যাম্পাসে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত ঘটা হত্যাকাণ্ডের কিছু বিবরণ –

সেভেন মার্ডার, ৪ এপ্রিল ১৯৭৪ : ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল প্রথম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এদিন সংঘটিত হয় এক নির্মম হত্যাকাণ্ড। যা ঢাবির ইতিহাসে কুখ্যাত সেভেন মার্ডার নামে খ্যাত। সেদিন অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে মুজিববাদী ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলমসহ প্রায় ১৫ জনের একটি সশস্ত্র গ্রুপ রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে সূর্যসেন হলের ৬৪৫ ও ৬৪৮ নম্বর কক্ষ থেকে ৭ জন ছাত্রকে তুলে নিয়ে যায় মুহসীন হলে। পরে মুহসীন হলের টিভি রুমের সামনের করিডোরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হয় তাদের। সেদিন যারা নিহত হয়েছেন তারা হলেন –

১। রেজওয়ানুর রব (প্রথম বর্ষ, সমাজবিজ্ঞান) ২। সৈয়দ মাসুদ মাহমুদ (প্রথম বর্ষ, সমাজবিজ্ঞান) ৩। এবাদ খান (প্রথম বর্ষ, সমাজবিজ্ঞান) ৪। নাজমুল হক (সমাজবিজ্ঞান) ৫। আবুল হোসেন (প্রথম পর্ব, সমাজবিজ্ঞান) ৬। মোহাম্মদ ইদ্রিস (এমকম, প্রথম পর্ব) এবং ৭। বশিরুদ্দিন আহমদ জিন্নাহ (প্রথম পর্ব, এমকম)।

সরকার প্রধানের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে মুজিববাদী ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধানসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয় শফিউল আলম প্রধানকে। এই দীর্ঘ সময়ে এতোগুলো হত্যাকাণ্ডের মধ্যে শুধুমাত্র এই একটি হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হয়েছে। তবে পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পরে জিয়া ক্ষমতায় আসলে মুক্তি পেয়ে যান তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সৈনিক হিসেবে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটিতেই নির্বিঘ্নেই রাজনীতি করে যাচ্ছেন ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) প্রধান শফিউল আলম প্রধান।

১২ এপ্রিল, ১৯৭৮ : রোকেয়া হলের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ও তাদের সমর্থক ছাত্রীদের সঙ্গে অপর ছাত্রীদের মতবিরোধের জের ধরে কর্তৃপক্ষ তিন ছাত্রীর সিট বাতিল করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরস্পরবিরোধী দুই পক্ষ ক্যাম্পাসে মিছিলের প্রস্তুতি চালানোর সময় সংঘর্ষ বাধে। এ ঘটনার জের ধরে রেজিস্টার বিল্ডিংয়ের ১২৭ নম্বর কক্ষে এক ছাত্র নিহত হয়। নিহত এই ছাত্রের নাম প্রকাশ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, সম্ভবত সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়।

১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৩ : ১৯৭৭ সাল থেকে একাত্তরে স্বাধীনতা বিরোধী মূল দল জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ নাম পরিবর্তন করে শিবির নাম ধারণ করে এবং রাজনীতি করার সুযোগ পায় তৎকালীন সেনা সরকারের ছত্র ছায়ায়। শিবিরের ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তারা একটি র‍্যালী বের করার চেষ্টা করে। কিন্তু র‍্যালীটি কলা ভবনের পশ্চিম গেট এলাকায় আসা মাত্র সাধারণ শিক্ষার্থী এবং মধুর ক্যান্টিনে অবস্থানরত সংগ্রাম পরিষদের নেতা কর্মীরা সেই মিছিলে হামলা করে। এতে এক জনের মৃত্যু (নাম প্রকাশিত হয়নি) হয়। এই ঘটনার পরে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সরকারী এক প্রেসনোটের মাধ্যমে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা ও সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়।

১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৩ : সকল প্রকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারী করা হলেও পরদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি কুখ্যাত মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিলের দাবীতে ১৪টি ছাত্র সংগঠন নিয়ে গড়ে ওঠা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের পূর্ব নির্ধারিত সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদানের জন্য ক্যাম্পাস থেকে হাজারো ছাত্র ছাত্রীর একটা মিছিল নিয়ে সচিবালয় অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। মিছিলটি হাইকোর্ট এলাকায় পৌঁছলে মিছিলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পেটোয়া পুলিশ বাহিনী। নিরস্ত্র ছাত্র ছাত্রীদের ওপর পুলিশ লাঠি, টিয়ারগ্যাস, জল কামান ব্যবহার করেই ক্ষান্ত হয়নি, গুলিও চালায়। গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়। একসময় শিশু একাডেমীতে শিশুদের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিলো। পুলিশ সেখানেও হামলে পরে। কোমল মতি শিশুরাও সেদিন রক্ষা পায়নি এরশাদের পেটোয়া বাহিনীর হাত থেকে। প্রায় সারা দিনব্যাপী এই অসম সংঘর্ষে জাফর, জয়নাল, দীপালী সাহা, আইয়ুব, ফারুক, কাঞ্চন প্রমুখ নিহত হন। দশ জনের মৃত্যুর কথা দাবী করে সংগ্রাম পরিষদ। কিন্তু সরকারি প্রেসনোটে বলা হয় ১ জনের নিহত হয়েছে।

তবে পুলিশ দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি, ব্যাপক ছাত্র গণআন্দোলনের মুখে ১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে এরশাদ বলতে বাধ্য হয় যে- “জনগণের রায় ছাড়া শিক্ষা সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।” জাফর, জয়নাল, দীপালী সাহা, আইয়ুব, ফারুক, কাঞ্চনদের তাজা রক্তে রচিত হয় মধ্য ফেব্রুয়ারীর ইতিহাস। তখন থেকেই ছাত্র সমাজ ১৪ ফেব্রুয়ারী স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করে আছে।

১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৫ : ১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী রাত এগারোটার দিকে “মধ্যই ফেব্রুয়ারি” (১৪ ফেব্রুয়ারী স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস) পালনের প্রস্তুতি হিসেবে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের একটি মিছিল সূর্যসেন হল, মহসীন হল হয়ে জহুরুল হক হল ও এফ রহমান হলের মধ্যবর্তী সড়কে ওঠার মূহুর্তেই এফ রহমান হল থেকে মিছিলে কাটা রাইফেলের গুলিবর্ষণ করে সরকার সমর্থক ‘নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ’র সন্ত্রাসীরা। এসময় বাকশাল সমর্থিত জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক, সমাজবিজ্ঞান শেষ বর্ষের ছাত্র রাউফুন বসুনিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনা, বেগম জিয়া এবং জাসদের কাজী আরেফ আহমেদ সরকারি মদদপুষ্ট পেটোয়া বাহিনীকে দায়ী করেন। তবে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্রদল সরাসরি দায়ী করে নতুন বাংলা ছাত্র সমাজকে। রাউফুন বসুনীয় শহীদ হওয়ার পর থেকেই ক্যাম্পাস বিশেষ করে এফ রহমান হল থেকে বিতাড়িত হয় নতুন বাংলা। সরকার দলীয় নতুন বাংলার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হলে এরশাদ নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের বিলুপ্ত ঘোষণা করে।

এর প্রতিবাদে এবং হত্যাকারীদের বিচারের দাবীতে ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগরীতে অর্ধদিবস হরতাল আহ্বান করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এখন কি এমন চিন্তা করা যায়? মারা গেলেন বাকশাল সমর্থিত জাতীয় ছাত্রলীগ নেতা আর তাঁর হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবী করে হরতাল আহ্বান করলো ছাত্রদল!!

২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬ : একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে বঙ্গবন্ধু, কর্নেল তাহের এবং জিয়াউর রহমানের ছবি টানানো নিয়ে মুজিববাদী ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ব্যাপক গোলাগুলির এক পর্যায়ে বুলেটবিদ্ধ হয়ে মারা যান সোহরাব হোসেন নামের একজন। নিহত সোহরাবের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলায় আসামী করা হয় ছাত্রদলের নেতা কর্মীদের। উল্লেখ্য, ঐ সময়টাতে প্রায় প্রতিটি জাতীয় দিবসে সবার উপরে নিজ সংগঠনের নেতার ছবি টানানো নিয়ে এই তিন সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতো।

৩১ মার্চ, ১৯৮৬ : ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে যায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। আওয়ামীলীগ, বাকশাল, শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বাধীন জাসদ, সিপিবিসহ আটটি দল এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গেলে ১৫ দল থেকে কাজী আরেফ আহমেদ ও হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদসহ পাঁচটি দল বেরিয়ে এসে পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে এবং নির্বাচন বর্জন করে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দলীয় জোটও নির্বাচন বর্জন করে। পাঁচ দল এবং সাত দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠনগুলো নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। এমনই এক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ৩১ মার্চ নির্বাচনের সমর্থনে ক্যাম্পাসে মিছিল বের করে ছাত্র ইউনিয়ন। মিছিলটি জগন্নাথ হল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির সামনে দিয়ে কলা ভবন প্রদক্ষিণ করে লেকচার থিয়েটারের পশ্চিম গেটে পৌঁছলে সূর্যসেন হল থেকে মিছিলের উপরে সশস্ত্র হামলা চালায় ছাত্রদল, জাসদ ছাত্রলীগ সহ নির্বাচন বয়কটপন্থিরা। এতে ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী আসলাম মাথায় গুলিবিদ্ধ হন, রাইফেলের গুলিতে তাঁর মাথার খুলি উড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলের নিহত হন তিনি।

৮ ও ৯ মার্চ, ১৯৮৭ : এদিন দুপুরের দিকে হাজী মুহসীন হলের ৪২৬ নম্বর কক্ষে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়ে উঠে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন ছাত্রদলের তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা মাহবুবুল হক বাবলু ও তার দুই সহযোগী মইন উদ্দিন এবং নূর মোহাম্মদ। গুরুতর আহত বাবলুকে হাসপাতালে নেয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। অপর দিকে পিজিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মইনউদ্দিন ও নূর মুহাম্মদও মারা যান পরের দিন ০৯ মার্চ। উল্লেখ্য, নিহত বাবলু ছাত্রদলের অপর প্রভাবশালী নেতা সানাউল হক নীরুর আপন সহোদর ছিলেন।

১৪, ১৫ ও ১৯ জুলাই, ১৯৮৭ : আধিপত্য বিস্তার ও সূর্যসেন হলের একটা রুমের দখল নেয়াকে কেন্দ্র করে ১৯৮৭ সালের ১৪ জুলাই ভয়াবহ সংঘর্ষে লিপ্ত হয় ছাত্রদল ও জাসদ ছাত্রলীগের কর্মীরা। দুই পক্ষের বন্দুক যুদ্ধে সূর্যসেন হলের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছাত্রদল কর্মী আবদুল হালিম। এই ঘটনার জের ধরে পরের দিন অর্থাৎ ১৫ জুলাই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। ছাত্রদল ও জাসদ ছাত্রলীগের কর্মীদের মধ্যে মারাত্মক এই বন্দুক যুদ্ধে কয়েকশত রাউন্ড গুলি বিনিময় হয় উভয় পক্ষের মধ্যে। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয় ঢাবি ক্যাম্পাস। এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষই চাইনিজ রাইফেল, জি থ্রি রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। এতে পথচারী কামরুল হাসান এবং রিকশাচালক আব্দুর রহিম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন ভূতত্ত্ব ও খনিজ বিদ্যা বিভাগের ছাত্র শহীদুল্লাহ হলের জাসদ ছাত্রলীগ নেতা আসাদ আহমেদ মুন্না। তিন দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ১৯ জুলাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এসএসসি ও এইচএসসিতে স্ট্যান্ড করা মেধাবী ছাত্র মুন্না।

ভয়াবহ এই সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রদলের নয় জন এবং জাসদ ছাত্রলীগের তিনজন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে সেপ্টেম্বর মাসে। বহিষ্কৃতদের মধ্যে কয়েক জন হচ্ছেন – গোলাম ফারুক অভি, সানাউল হক নীরু, বজলুর রশিদ শহীদ ওরফে পাগলা শহীদ, প্রায় এক বছর ধরে নিখোঁজ বিএনপির সাবেক সাংসদ ও ঢাবির কুখ্যাত ছাত্রদল নেতা এম ইলিয়াস আলী এবং জাসদ ছাত্রলীগের আবু হাসান মুরাদ, আকরাম ও শিপন। বহিষ্কৃতদের মধ্যে ছাত্রদলের পাগলা শহীদ (১৯৮৮) এবং জাসদ ছাত্রলীগের আবু হাসান মুরাদ পরে (১৯৯৩) প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন।

১১ ডিসেম্বর, ১৯৮৮ : ক্যাম্পাসে বিএনপি নেত্রীর উপস্থিতি ১১ ডিসেম্বর রাতে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে মুহসীন হলের ৩৫৭ নং কক্ষে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন পাঁচ মাস আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত ছাত্রদলের অন্যতম নেতা বজলুর রহমান শহীদ ওরফে পাগলা শহীদ। বুলেটবিদ্ধ পাগলা শহীদকে পিজি হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। উল্লেখ্য, যখন এই ঘটনা ঘটে তখন বেগম জিয়া জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের জিয়া হল শাখার সম্মেলনে বক্তব্য রাখছিলেন। রাত ৯ টায় শহীদের গুলি বিদ্ধ হওয়ার সংবাদে দ্রুত বক্তব্য শেষ করে সাড়ে ৯টার দিকে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বেগম জিয়া। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে ইলিয়াস আলীর সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯ : ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সুলতান মনসুর-মুশতাক হোসেন-নাসিরুদ্দোজা প্যানেল জয়ী হলে ৯ ফেব্রুয়ারী ক্যাম্পাসে বিজয় মিছিল বের করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। কিন্তু নির্বাচনে পরাজিত ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা ঐ মিছিলে হামলা করলে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মী ও জাসদ ছাত্রলীগের নেতা কফিল উদ্দিন কনক নিহত হন। আহত হন জাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী ও রোকেয়া হলের তৎকালীন ভিপি সামসুন্নাহারসহ অনেকে। ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা এদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে থাকা ছাত্রীদের বেধড়ক মারধোর করে। এ ঘটনায় সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় ৭ দিনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

২৯ ডিসেম্বর, ১৯৮৯ : ২৯ ডিসেম্বর ফিন্যান্সের মেধাবী ছাত্র আরিফ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন আরিফ। কোন দলীয় সমর্থক না হলেও তাঁকে জীবন দিতে হয়। এস এম হলের ছাত্র আরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী পেয়েছিলেন। এরশাদ শাসনামলের শেষ পর্যায়ে ঢাবি ক্যাম্পাসে বেশ কয়েকটা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সাথে সরকারের বিশেষ বাহিনীর হাত ছিল বলেও অনেকে বলে থাকেন। এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কেও সরকারের বিশেষ বাহিনীর নাম আসে। এসময় কমপক্ষে দুইটি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে এমন অভিযোগ তোলেন সেই সময়ের ছাত্র নেতৃবৃন্দ। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনকে ডাইভারট করতেই এমন করা হয় বলে মনে করেন ছাত্রনেতাদের অনেকেই।

২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯০ : এই দিন অর্থাৎ নব্বই সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সূর্য সেন হলে আলমগীর কবীর নামে একজনের মৃত্যু হয়।

২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯০ : ১৯৯০ সালে একুশের প্রথম প্রহরে খালেদা জিয়া র‍্যালী নিয়ে পুষ্পমাল্য অর্পণের জন্য শহীদ মিনার যাওয়ার পথে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত জহুরুল হক হল এলাকা থেকে র‍্যালীতে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি চালানো হয়। বিএনপি এবং ছাত্রদল এই ঘটনার জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করে। খালেদা জিয়ার র‍্যালীতে গুলির ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ছাত্রদলের নেতা কর্মীরা। পর পর কয়েক দিন ক্যাম্পাসে এবং মুহসীন হল, সূর্যসেন হল ও জহুরুল হক হল এলাকায় সশস্ত্র অবস্থান নেন ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল। চতুর্থ দিনের দিন ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ মধুর ক্যান্টিনে মুখোমুখি হলে ছাত্রদলের কর্মীরা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ উভয় পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করতে চাইলে শুরু হয় পুলিশ ছাত্রদল এবং ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ। এসময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব ভবনের পাশে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান জহুরুল হক হল ছাত্র সংসদের ভিপি শহীদুল ইসলাম চুন্নু। সেই সময়ে ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ছিলেন চুন্নু। মূলত তাঁকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো আওয়ামী ছাত্রলীগের প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি।

এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ছাত্রদলকে দায়ী করা হলেও তৎকালীন ছাত্রনেতাদের অনেকেই এই ঘটনার পিছনে সরকারের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার অদৃশ্য হাতের প্রতি ইঙ্গিত করেন। ওইদিনই এফএইচ হলে শাহীন নামে আরেক ছাত্রের লাশ উদ্ধার হয়। বরাবরের মতো এই ঘটনা তদন্তেও কমিটি গঠন করা হয় সিন্ডিকেট সভায়। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি এরশাদের সভাপতিত্বে একটি সভায় সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারকের ওপর বিচার বিভাগীয় তদন্ত পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। বলাই বাহুল্য কোন তদন্ত কমিটির রিপোর্টই আজ পর্যন্ত জানা যায়নি।

২৬ নভেম্বর, ১৯৯০ : এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে বিশেষ করে ১৯ নভেম্বর তিন জোটের রূপরেখা ঘোষিত হওয়ার পরে সর্ব দলীয় ছাত্র ঐক্যে ফাটল ধরানোর কৌশলের অংশ হিসেবে দীর্ঘ দিন ধরে কারাবন্দী অস্ত্রসহ গ্রেফতার হওয়া সানাউল হক নীরু ও গোলাম ফারুক অভিকে মুক্তি দেয় সরকার। সরকারের উদ্দেশ্য যে সর্ব দলীয় ছাত্র ঐক্যে বিভক্তি সৃষ্টি করা তা বুঝতে পেরে ২৩ নভেম্বর সানাউল হক নীরুসহ পাঁচ জন ছাত্রদল নেতাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। এই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবীতে ছাত্রদলের অভি সমর্থকরা বিক্ষোভ করে এবং ডাকসু ভবনে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। ডাকসুর তৎকালীন ভিপি আমানুল্লাহ আমান এবং খায়রুল কবীর খোকনকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে অভি নীরুর সমর্থকরা। এদিন ছাত্রদলের একটা মিছিলে গুলি বর্ষণ করে অভি-নীরু গ্রুপ। পরের দিন অর্থাৎ ২৪ নভেম্বর মূল ধারা ছাত্রদল এবং ছাত্রদলের অভি-নীরু গ্রুপের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ঢাবি ক্যাম্পাস। সংঘর্ষ ছড়িয়ে পরে হলে হলে। অনেক রুম ভাংচুর করা হয় উভয় পক্ষ থেকে। পরদিন ২৫ নভেম্বর একটা সাদা এ্যাম্বুলেন্সে করে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে অভি-নীরু গ্রুপ। এদিন তারা সর্ব দলীয় ছাত্র ঐক্যের মিছিলে গুলি বর্ষণ করলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক কর্মচারীসহ ছাত্র ঐক্য। অবশেষ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সূর্য সেন হলের নিয়ন্ত্রণে নেয় ছাত্র ঐক্য এবং ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয় অভি-নীরু গ্রুপ। এদিন অভিসহ আরও পাঁচ জনকে বহিষ্কার করে ছাত্রদল। পরদিন ২৬ নভেম্বর আবারও এ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কৃত অভি-নীরু গ্রুপ শহীদুল্লাহ হল ও ফজলুল হক হলে অবস্থান নিয়ে ছাত্র ঐক্যের নেতা কর্মীদের উপরে গুলি বর্ষণ করে। শুরু হয় ভয়াবহ বন্দুক যুদ্ধ। এসময় ক্যাম্পাসের চা দোকানদার নিমাই বুলেটবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।

২৭ নভেম্বর, ১৯৯০ : এদিন সারা দেশে রাজপথ রেল পথ অবরোধ কর্মসূচী পালন করে ২২ দল। এদিকে টানা চতুর্থ দিনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে বহিষ্কৃত অভি নীরু গ্রুপ ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধ শুরু হয়। এসময় ঢাকা মেডিকেল থেকে রিক্সায় করে পিজি যাওয়ার পথে উভয় পক্ষের মাঝে পরে গুলিবিদ্ধ হন বিএমএ’র যুগ্ম মহাসচিব ডঃ শামসুল আলম খান মিলন। রিক্সায় তাঁর সাথে বসা ছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। ঐ রিক্সাতেই তাঁকে পিজিতে নেয়ার পথে মারা যান তিনি। এই হত্যাকাণ্ডই এরশাদের পতন ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়।

লেখাটা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে তাই আজ শুধুমাত্র সত্তর ও আশির দশকে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো তুলে ধরা হলো। লেখা শেষ পর্যন্ত পড়ে হয়তো আমার মতো আরও অনেকের মনে হতে পারে এখন শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক ভালো। অন্তত লাশের মিছিলের দিক দিয়ে। পরের পর্বে সমাপ্ত।

(এ ছাড়া ১৯৭৭ সালে হনু ও গোপা নামে দুইজনের মৃত্যু হয়। তারিখ জানতে পারিনি। তাছাড়া সূত্র হিসেবে কোন পত্র পত্রিকার রেফারেন্সও দিতে পারছি না। এই দুই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তথ্য সংগৃহীত হয়েছে ঐ সময়কার একজন জাতীয় ছাত্রলীগ নেতার কাছ থেকে। যেহেতু নির্দিষ্ট রেফারেন্স দিতে পারছি না তাই এই দুই হত্যাকাণ্ড মূল পোষ্টের সাথে এ্যাড করলাম না। হয়তো আমার জানাটা ভুলও হতে পারে। তেমন হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন সবাই এমনই প্রত্যাশা করছি। )

কৃতজ্ঞতা : আবু ই মনসুর, মিনহাজ ভূঁইয়া, জামিউল হাসান শোভন, তৌফিক।

তথ্য সূত্র : বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে পাওয়া তথ্য এবং নিজের স্মৃতির খাতা থেকে।

২২ thoughts on “সন্ত্রাস নির্ভর ছাত্র রাজনীতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাশের মিছিল – ০১

  1. একের পর এক অসাধারণ পোস্ট দিয়ে
    একের পর এক অসাধারণ পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন।

    ছাত্র রাজনীতির এই বেহাল দসা আজ সকলের জানা কারণ মিডিয়ার ভুমিকা। এর জন্য অবশ্য অনেক টা কমেছে।

  2. উত্তর বাংলা ভাই, আপনি একটা
    উত্তর বাংলা ভাই, আপনি একটা চিজ!
    আপনার দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি :স্যালুট:

  3. আমরা যখন প্রেম পিরিতি আর একে
    আমরা যখন প্রেম পিরিতি আর একে অন্যের বিরুদ্ধে কাঁদা ছুড়াছুড়িতে ব্যস্ত ঠিক তখনই কাজের কাজটি করে যাচ্ছেন আপনি ও আপনার মত গুটিকয়েকজন অনলাইন এক্টিভিস্ট ।
    স্যালুট আপনাকে।

    লিখাটি স্টিকি করার দাবী জানাই।

  4. শফিউল আলম প্রধান যে
    শফিউল আলম প্রধান যে ছাত্ররাজনীতির কলংকিত অধ্যায়ের প্রতিষ্টাতা তা আগে জানা ছিল না ।
    সেভেন মার্ডারস মামলাটি পুনর্বিচারের মাধ্যমে খুনি শফিউলের শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি দাবী জানাই ।

  5. এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম।
    এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম। অসাধারণ লেখা। খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে ছাত্র হাত্যার এই ঘটনা জানা ছিল না। অনেক কিছু জানা ছিল না। আপনার জন্য শুভকামনা।

  6. অনেক তথ্যবহুল।পড়ে ভালো
    অনেক তথ্যবহুল।পড়ে ভালো লাগলো।আমি মনে করি ছাত্র রাজনীতিকে মূলত কলুষিত করেছে দলীয় ক্ষমতা।ছাত্র সংঘগুলো যদি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত না থাকতো এবং প্রতিটি ছাত্র সংঘই একে অপরের প্রতি কোঅপারেট থাকতো তবে হয়তো বেশ হত।তারা নিজেদের মাঝে হিংসাবিদ্বেশ ভুলে যদি রাজনৈতিক দলগুলোর সব কুকর্ম,দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতো;নিজেদেরকে সংযত রাখতো তাহলে হয়তো দেশটা অন্যরকম হত।

    1. ধন্যবাদ কবিতা ভাই। আসলে ছাত্র
      ধন্যবাদ কবিতা ভাই। আসলে ছাত্র রাজনীতি কলুষিত হওয়ার পিছনে এই দলীয় লেজুরবৃত্তিটার ভুমিকাই বেশী। এছাড়াও আরও কিছু কারণ রয়েছে। পাশাপাশি আমাদের মানসিকতা ও নৈতিকতার পতন তো আছেই। সুষ্ঠু ছাত্র রাজনীতি ফিরে আসবে এটা নিয়ে আর খুব বেশী আশাবাদী হওয়া যায় না। পতনের যে ধারা চলছে তাতে এক সময় তলিয়েই যাবে হয়তো।

      দুই প্রধান দল এবং তাদের নেতৃত্ব তো পাল্লা দিয়ে কলুষিত করছে দেশের রাজনীতিকে। ছাত্র রাজনীতিও তেমন। ১৯৯০ সালের ঐ রকম একটা গণ অভ্যুত্থানের মাত্র মাস তিনেকের মাথায় এম কে আনোয়ার এর মতো চিহ্নিত গণ দুশমনকে দলে আশ্রয় দিল বিএনপি। মাত্র ছয় মাসে যে সন্ত্রাসী অভি ডাঃ মিলনকে হত্যা করলো, ছাত্র ঐক্যের মিছিলে গুলি করলো তাকে কি না ফুল দিয়ে ছাত্রলীগে বরণ করে নিলো আওয়ামী ছাত্রলীগ। এই হচ্ছে অবস্থা।

  7. হুম।সহমত।আমাদের মানসিকতা তো
    হুম।সহমত।আমাদের মানসিকতা তো অবশ্যই দায়ী রাজনীতির এমন প্রেক্ষাপটের জন্য।

  8. দারুণ তথ্যবহুল পোস্ট। অনেক
    দারুণ তথ্যবহুল পোস্ট। অনেক ধন্যবাদ উত্তর বাংলা। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।

  9. ইতিহাসের দলীল হয়ে থাকবে আপনার
    ইতিহাসের দলীল হয়ে থাকবে আপনার এই লেখাগুলো। আশা করি সিরিজ আকারে ধীরে ধীরে এই বিষয়ক পুরো ইতিহাস তুলে ধরবেন।
    সেদিন আওরংগ মারা যাবার পর ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের একটা লেখা পড়লাম। মনে হচ্ছিল বলিউডের কোন গ্যাংস্টার টাইপ মুভির কাহিনী। কিভাবে নষ্ট রাজনীতি মেধাবী ছাত্রদের খুনিতে পরিণত করে আবার জানলাম।

    1. ধন্যবাদ। হ্যাঁ ঐ লেখাটা
      ধন্যবাদ। হ্যাঁ ঐ লেখাটা পড়েছি। নব্বই ও গত দশকের মানে ঢাবির সর্ব শেষ হত্যাকাণ্ড ২০১০ সালে ছাত্রলীগ নেতা আবু বকর সিদ্দিক পর্যন্ত লেখাটা রেডি আছে। আজকে ইচ্ছা করেই দিলাম না। কালকে দিবো। ভালো লাগলো আপনার মন্তব্য পেয়ে। ঈদ মোবারক।

  10. বহুল তথ্য সমৃদ্ধ পোস্ট। এরুপ
    বহুল তথ্য সমৃদ্ধ পোস্ট। এরুপ ঘটনা ধারাবাহিকভাবে আরও লেখার আহবান জানাচ্ছি। পোস্টটি পড়ে ভাল লাগলো। শফিউল আলমের ঘটনাটা আমারও জানা ছিল না। আপনার পোস্টের কল্যাণে জানতে পারলাম। আশা করছি ভবিষ্যতে আরও অনেক অজানা তথ্য জানার সুযোগ করে দিবেন….পোস্টের জন্য আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি….

    1. ধন্যবাদ মুকুল ভাই। এই লেখার
      ধন্যবাদ মুকুল ভাই। এই লেখার পরের ব্লগ পোস্টটা দিলাম মাত্র। সরি ব্লগ পোস্ট কি বলা যায় এসব তথ্য সংগ্রহ করে লেখাকে? নিজের থেকে তো কিছু লিখছি না। তথ্য কালেক্ট করে সাজিয়ে জোড়া দিয়ে যাচ্ছি শুধু। নিজের কোন ক্রেডিট নাই। ক্রেডিট গোজ টু জার্নালিজম। ইচ্ছা আছে এর পরে রংপুর কারমাইকেল কলেজে শিবিরের উত্থান পর্ব নিয়ে একটা ব্লগ পোস্ট দেয়ার। দেখা যাক। ভালো থাকুন।

  11. এই লেখাকে কেন ব্লগ পোস্ট বলা
    এই লেখাকে কেন ব্লগ পোস্ট বলা যাবে না? অবশ্যই ব্লগ পোস্ট বলা যায়। সুত্র ছাড়া কি কোন পোস্ট লেখা যায় ? ব্লগাররা কি সবাই নিজে লেখক? অবশ্যই না। এসব অজানা তথ্য একত্রিত করে সবার জানার জন্য উপস্থাপনকে অবশ্যই ব্লগ পোস্ট বলা যায়। আপনি এসব তথ্য বহুল উপস্থাপনা করতে থাকুন, সকলে জানতে পারলেই আমাদের উদ্যোগ সফল হবে। এটাই একজন মডারেটরের প্রথম কাজ….

  12. আমার আংকেল ছাত্র ইউনিয়নের
    আমার আংকেল ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলেন ঢাবির। ওনার কাছে অনেক শুনছি এই সব ঘটনার কথা। এক সময় আমার ধারণা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মানেই প্রতিদিন গোলাগুলি হয়া,মারামারি হওয়া। এমনকি ৯৭ সালে এইচ এস সি পাশ করে যখন ঢাবিতে যাই ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করার জন্য তখন সামান্য শব্দ হলেই ভয় পেয়ে যেতাম। খুব ভালো একটা কাজ করছেন বড় ভাই। শেয়ার দিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *