নির্বাসিত তসলিমা নাসরিন

তসলিমা নাসরিন নামটি শুনলেই অনেকের মনে অকপটেই চলে আসে ঘৃণা, হিংসা ও বিদ্বেষ, আবার অনেকের মনে চলে আসে অকৃত্রিম ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা। ধার্মিকদের কাছে তো নামক তসলিমা নাসরিন নামক শব্দটাই বিঁষের মত। কেননা তসলিমা নাসরিন ইসলাম ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করেছে। আর ইসলাম নিয়ে সমালোচনা করা মানে হচ্ছে সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত, আর কাফেরদের হত্যা করা ইসলামে ফরজ কাজ।

যাই হোক তসলিমা নাসরিন ইসলামের কোনদিক গুলো সমালোচনা করেছে সেটা হয়তবা কাটমোল্লারা কখনও বুঝতেও চেষ্টা করে নি, আর করবেই বা না কেন তাহারা তো তাদের কামাতুর নিষ্কলঙ্ক নবীর শ্রেষ্ঠ উম্মত। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে যখন কোনো নারী তসলিমা নাসরিনকে ঘৃণা করে বা হিংসা করে। যে নারী তারা জীবনের অধিকাংশ সময় নারী মুক্তি আন্দোলনের জন্য লেখালিখি করে গেছে, যে নারী তার লেখায় সর্বদা নারী ক্ষমতায়নের জন্য কলম চালিয়েছে, যে নারী নারীর অধিকার আদায়ের জন্য কলম চালিয়েছে সেই নারীই যখন আরেক নারী কর্তৃক ঘৃণিত হোণ তখন সত্যিই অবাক লাগে।

বেশিরভাগ নারী তসলিমা নাসরিনকে না জেনেই তার প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় মুমিন নারীরা তসলিমা নাসরিনকে চিনেও না, তার লেখা কখনও পড়েও নি অথচ কোনো একজন বলেছে যে তসলিমা নাসরিন ইসলামের বিরুদ্ধে লেখালিখি করে এটা শুনেই তসলিমা নাসরিনকে ঘৃণা করা শুরু করে দেয়। অথচ সেই মুমিমা নারীরা কখনও তসলিমা নাসরিনের কোনো লেখা পড়ে বোঝার চেষ্টা করবে না যে সে কি নিয়ে লেখালিখি করছে কিংবা তসলিমা নাসরিন যদি ইসলাম নিয়ে লেখালিখি করেও থাকে তাহলে সে ইসলামের কোন বিষয়গুলো নিয়ে লেখালিখি করেছে সেটা নিয়ে মুমিন আপারা যাচাই বাছাই করবে না। শুধু শুনবে কোনো কারো মুখে যে তসলিমা নাসরিন ইসলাম নিয়ে সমালোচনা করে লেখালিখি করে তাহলেই শুরু হয়ে যাবে মুমিনা নারীদের তসলিমা নাসরিনের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন।

আমি একদিন একজন মাদ্রাসা স্টুডেন্টকে সে আবার তসলিমা নাসরিনকে ভীষণভাবে ঘৃণা করে, উঠতে বসতে তসলিমা নাসরিনকে গালি দেয়, আমি তাকে একদিন একান্তে জিজ্ঞেস করলাম তুমি যে তসলিমা নাসরিনকে এত অপছন্দ করো আচ্ছা তুমি কি তসলিমা নাসরিন কে ঠিকভাবে চিনো, উত্তর আসলো না। তারপর জিজ্ঞেস করলাম ছেলেটিকে যে তুমি কি কখনও তসলিমা নাসরিনের কোনো লেখা কিংবা বই পড়েছো, এবারও ছেলেটি যথারীতি উত্তর দিলো না। এরপর আমি জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা তাহলে তুমি তসলিমা নাসরিনকে এত ঘৃণা করো কেন। ছেলেটি উত্তরে বলল হুজুর আমাকে বলেছে যে তসলিমা নাসরিন একজন খারাপ মহিলা, সে ইসলামের বিরুদ্ধে লেখালিখি করে। এরকম হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষ আছে যারা তসলিমা নাসরিনকে চিনে না জানে না, তসলিমা নাসরিনের লেখা কিংবা বই পড়া তো দূরে থাক শুধুমাত্র কোনো হুজুর কিংবা বুজুর্গের কথায় তসলিমা নাসরিনের ফাঁসির দাবিতে কিংবা কল্লা কাটতে লাফ দিয়ে মাঠে নেমে পড়ে।

তসলিমা ইসলাম ধর্মের বিরোধীতা কিংবা সমালোচনা করেন নি, সমালোচনা করেছেন শুধুমাত্র ইসলামের কঠোরতম দিকগুলো নিয়ে। আর ইসলাম মানতে হলে ইসলামের সকল কিছু আপনার মানতে হবে তা না হলে আপনি খাঁটি মুসলমান না এই ধারণা থেকে যারা বের হতে পারে নি তারাই কেবল মাত্র তসলিমা নাসরিনের ফাঁসী চায়। আর বাংলাদেশে এরকম মানুষের অভাব নেই।

যে তসলিমা নাসরিনকে আমার লেখা সে তসলিমা নাসরিন সম্পর্কে আসুন একটু জেনে নেই।

তসলিমা নাসরিন (জন্ম: ২৫ আগস্ট ১৯৬২) বাংলাদেশের একজন সাহিত্যিক ও চিকিৎসক। বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে একজন উদীয়মান কবি হিসেবে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করে তসলিমা এই শতকের শেষের দিকে নারীবাদী ও ধর্মীয় সমালোচনামূলক রচনার কারণে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন। তিনি তার রচনা ও ভাষণের মাধ্যমে লিঙ্গসমতা, মুক্তচিন্তা, নাস্তিক্যবাদ এবং ধর্মবিরোধী মতবাদ প্রচার করায় ইসলামপন্থীদের রোষানলে পড়েন ও তাদের নিকট হতে হত্যার হুমকি পেতে থাকায় ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ ত্যাগ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করতে বাধ্য হন। তিনি কিছুকাল যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছেন। এরপর তিনি ভারত সরকার কর্তৃক ভারতে অজ্ঞাতবাসে অবস্থানের সুযোগ পান।

বর্তমানে তিনি দিল্লিতে বসবাস করছেন।১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইসলামি ধর্মীয় আইন শরিয়া অবলুপ্তির মাধ্যমে কুরআন সংশোধনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এর ফলে ইসলামপন্থীরা তার ফাঁসির দাবি জানাতে শুরু করে। তিন লাখ ইসলামপন্থীদের একটি জমায়েতে তাকে ইসলামের অবমাননাকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দালালরূপে অভিহিত করে। দেশ জুড়ে তার শাস্তির দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। হাবিবুর রহমান সিলেটে একটি সমাবেশে তার মাথার দাম ৫০ লাখ টাকা ঘোষণা করে।বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে জনগণের ধর্মীয় ভাবনাকে আঘাত করার অভিযোগে মামলা রুজু করা হয় এবং জামিন-অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

সেসময় আলোকচিত্রী শহিদুল আলম সহ বিভিন্ন জনের আশ্রয়ে তিনি দুই মাস লুকিয়ে থাকার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে তার জামিন মঞ্জুর করা হয় এবং তসলিমা বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর তিনি ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে সুুুইডেনে ও ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত জার্মানিতে বসবাস করেন। ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সুইডেন ফিরে গেলে রাজনৈতিক নির্বাসিত হিসেবে  জাতিসংঘ ভ্রমণ  নথি লাভ করেন। এই সময় তিনি সুইডেনের নাগরিকত্ব লাভ করেন ও সুইডিশ কর্তৃপক্ষের নিকট তার বাংলাদেশের পাসপোর্ট জমা দেন।

১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। এই সময় তার মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বাংলাদেশ সরকারের নিকট দেশে ফেরার অনুমতি চেয়ে ব্যর্থ হলে তিনি জাতিসংঘের ভ্রমণ নথি ত্যাগ করে সুইডিশ কর্তৃপক্ষের নিকট হতে তার বাংলাদেশের পাসপোর্ট ফেরত পান ও বিনা অনুমতিতে বাংলাদেশ প্রবেশ করেন। বাংলাদেশ তার বিরুদ্ধে পুনরায় জামিন-অযোগ্য গ্রেপ্তারী পরোয়ানা রুজু হলে তিনি পুনরায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

১৯৯৯ থেকে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ফ্রান্সে বসবাস করেন। দীর্ঘ ছয় বছর অপেক্ষার পর ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ভারতে প্রবেশ করার ভিসা সংগ্রহ করতে সমর্থ হলে তিনি কলকাতা যাত্রা করেন। ঐ বছর মার্চ মাসে তিনি শোধ নামক তার একটি উপন্যাসের মারাঠি ভাষায় অনুবাদকর্মের প্রচারে মুম্বাই শহরে পৌঁছানোর সময় ইসলামপন্থীরা তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুমকি দেন।

২০০২ খ্রিষ্টাব্দে তসলিমার পিতা মৃত্যুশয্যায় শায়িত হলে তসলিমার বাংলাদেশ প্রবেশে অনুরোধ করে ব্যর্থ হন। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাকে অস্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হলে তসলিমা কলকাতা শহরে বসবাস শুরু করেন।

২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম  সৈয়দ নূরুর রহমান বরকতি নাসরিনের মুখে কালিলেপন করলে পুরস্কৃত করার কথা ঘোষণা করেন। ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল বোর্ড নামক একটি সংগঠন তার মুন্ডচ্ছেদের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ঘোষণা করেন। ঐ বছর ৯ই আগস্ট তিনি শোধ উপন্যাসের তেলেগু ভাষায় অনুবাদকর্মের প্রচারে হায়দ্রাবাদ শহরে গেলে অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন নামক একটি রাজনৈতিক দলের প্ররোচনায় উত্তেজিত জনতা তাকে আক্রমণ করে। ১৭ই আগস্ট কলকাতা শহরের মুসলিম নেতারা তসলিমাকে হত্যা করার জন্য বিপুল অর্থ পুরস্কার দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। ২১শে নভেম্বর অল ইন্ডিয়া মাইনোরিটি ফোরাম নামক একটি ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী কলকাতা শহরে তাণ্ডব শুরু করলে সেনাবাহিনীকে আইন ও শান্তিরক্ষার জন্য মোতায়েন করা হয়। এই দাঙ্গার পর নাসরিনকে কলকাতা থেকে জয়পুর হয়ে নিউ দিল্লি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ভারত সরকার তাকে পরবর্তী সাত মাস একটি অজ্ঞাত স্থানে গৃহবন্দি করে রাখে ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে তাকে সিমন দ্য বেভোয়ার পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হলেও তিনি ভারতে প্রবেশে অনুমতি না পাওয়ার আশঙ্কায় ফ্রান্স যাত্রা করে পুরস্কার নিতে অসম্মত হন। এই সময় তিনি নেই কিছু নেই নামক তার আত্মজীবনীর ষষ্ঠ ভাগ প্রকাশ বাতিল করেন ও কলকাতার দাঙ্গার জন্য দায়ী দ্বিখণ্ডিত নামক তার বিতর্কিত বইটির কিছু অংশ অপসারণ করতে বাধ্য হন। ভারতের প্রাক্তন বিদেশসচিব মুচকন্দ দুবে মানবাধিকার সংগঠন  অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একটি পত্রে ভারত সরকারকে চাপ দিয়ে তসলিমার গৃহবন্দী অবস্থার মুক্তির জন্য অনুরোধ করেন। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে মার্চ তসলিমা ভারত ছাড়তে বাধ্য হন।

২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ইসলামপন্থীরা তার প্রাণনাশের হুমকি দিলে সেন্টার ফর ইনক্যুয়ারি  তাকে ঐ বছর ২৭শে মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেতে সহায়তা করে এবং তার খাদ্য, বাসস্থান নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। নির্বাসিত হওয়ার পর তসলিমা নাসরিন ভারতে থাকাকালীন সময়ে প্রথম বাংলাদেশী হিসাবে জনপ্রিয় টেলিভিশন শো বিগ বস -এ আমন্ত্রণ পান। কিন্তু তিনি এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করেন।

একটা জিনিস চিন্তা করলে অবাক লাগে এতো লাঞ্চনা, বঞ্চনার শিকার হয়েও একজন নারী কখনও অসত্যের কাছে মাথা নোয়ায় নি। বীরের বেশে সে তার কলম চালিয়ে গেছে । উগ্রপন্থীরা তাকে বার বার থামাতে চেষ্টা করেছে কিন্তু যতবার চেষ্টা করেছে ততবারই ব্যর্থ হয়েছে, ষড়যন্ত্রকারীরা যতবার ষড়যন্ত্র করেছে ততবার তসলিমা নাসরিনের কলম সেই ষড়যন্ত্র ভেদ করে সামনের দিকে দূর্বার গতিতে এগিয়ে গেছে৷

আজকের দিনে তথাকথিত যে শিক্ষীতা মুমিন আপারা বড় বড় জোর গলায় তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ায় তাদের প্রতি আমার সত্যিই আফসোস হয়। কেননা আজকে যে মুমিন আপুরা মাথা উঁচু করে কথা বলতেছে, বাহিরে এসে শিক্ষা গ্রহণ করতেছে এগুলো যুগে যুগে চলে আসা বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এবং তসলিমা নাসরিনদের মত নারীদের জন্যই। তারা যদি নারী মুক্তির আন্দোলনের জন্য মুখ না খুলতেন তাহলে আজকের দিনেও ঐ হুজুর বুজুর্গরা ফতোয়া জারি করে ঘরের ভিতর প্যাকেট বন্দী করে রেখে দিতো। কারণ ইসলাম মানে হচ্ছে নারী ঘরবন্দী তার স্বামীর সেবা করবে। যে নারীবাদী লেখকদের আন্দোলনের কারণে আজ আপনারা শিক্ষা দীক্ষা অর্জন করার সুযোগ পেয়েছেন, বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে আপনারা প্রবেশ করছেন পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে, আপনারা সেই নারীবাদী, নারীর মুক্তির আন্দোলনকারীদেরই ইসলামের ঝান্ডা তুলে বিদ্রুপ করেছেন।

মুমিন আপাদের বলতে চাই তসলিমা নাসরিন হয়তবা নির্বাসিত কিন্তু এরকম হাজারো তসলিম বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে। হয়তবা কোনোদিন সম্ভব কিনা জানিনা তবুও আমরা মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি যে তসলিমা নাসরিন আবারো একদিন তার নিজের দেশে ফিরবে সেই প্রত্যাশাই রাখি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *