ঈশ্বর কল্পনা প্রসূত একটি ধারনা মাত্র

সনাতন পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ধর্ম এটা সবাই অকপটে স্বীকার করে কিন্তু হিন্দুরা এটা মানতে চায় না যে এই বহুল প্রচলিত পুরাতন ধর্মটি পুরোটাই Mythology এর উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারা এটা মানবে যে তাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ গুলোর মধ্যে ১৮ খানা পুরাণ অন্যতম যেগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন মহর্ষি ব্যাসদেব যাকে বেদব্যাস বলা হয়। হিন্দুদের যত দেবদেবীর বর্ণনা করা হয়েছে তা ঐ পুরাণেই। এক এক পুরাণে এক এক দেব দেবীর কথা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন বিষ্ণু পুরাণে বিষ্ণুর কাহিনী, শিব পুরাণে শিবের কাহিনী ইত্যাদি। এই পুরাণে ব্যাসদেব ধ্যানের মাধ্যমে ঈশ্বর সম্পর্কিত ধারণার কাল্পনিক রূপরেখা পুরাণের মাধ্যমে দিয়ে গেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে মানুষ সেই কাল্পনিক রূপকে বাস্তবিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করেছে সেই স্মরণাতীত কাল থেকে বর্তমান অবধি পর্যন্ত।

হিন্দুরা পুরাণের সেই কল্প কাহিনীগুলো মানলেও বুঝতে চেষ্টা করে না যে সেটা পুরাণিক কাহিনী মাত্র সেটার বাস্তবিক রূপ প্রদান করতে গিয়ে মানুষে মানুষে কলহ বিবাদ সৃষ্টি করতেছে। মাঝেই মাঝেই দেখা যায় একদল আরেক দল অমুক দেবতার ভক্ত তমুক দেবতার ভক্ত, অমুক দেবতা বড় নাকি তমুক দেবতা বড় এগুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ লাগিয়ে দেয়৷ আর এই বাস্তবিক রূপ রেখা দিতে গিয়ে কত হাজার হাজার অর্থ জলাঞ্জলি দিয়ে থাকে সেটা হিন্দুদের আচার অনুষ্ঠানগুলো দেখলেই বোঝা যায়। আর হিন্দুরা যদি মনে করে বেদব্যাসও ভুল তাহলে হিন্দুরা নিজেরাও জানে না যে তারাই নিজেরাই ভুল।

মহর্ষি ব্যাসদেব যিনি ভাগবতেরও রচয়িতা। মহর্ষি ব্যাসদেব পুরাণে বলেছেন-

অষ্টাদশ পুরাণেষু, ব্যাসেষ্য বচনদ্বয়ম,
পরোপকারপুন্যায় পাপায়পরপ্রিণাম।

আমি আঠারো খানা পুরাণ রচনা করেছি শুধু মাত্র দুটি কথা বোঝানোর জন্য। পরের উপকার করলে তোমার পুণ্য হবে এবং অপরকে অত্যাচার নিপিড়ন করলে তোমার পাপ হবে। এবং মহর্ষি ব্যাসদেব তার মৃত্যুর পূর্বে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন উনি তিনটি ভুল করেছিলেন সেজন্য ঈশ্বর তাকে যেন ক্ষমা করে দেন।

” রূপং রূপবিবর্জিতস্য, ধ্যানধঃ যতকল্পিতং,
সত্যনির্বাচনিত্বখিলগুরুকৃৎ জন্মায়।।”

” ব্যাপ্তিংচ নিরকৃৎং যৎতীর্থ যাত্রাদিনাম,
ক্ষন্তব্যং জগদীশ্ব দোষত্রং মৎকৃৎং।”

 

ব্যাসদেব বলেছেন হে ঈশ্বর আমি এই ১৮ খানা পুরাণ রচনা করে তিনটি ভুল করেছি। আমাকে তুমি সেই ভুলের জন্য ক্ষমা করে দিও।

ভুল তিনটা হলো ” রূপং রূপবিবর্জিতস্য, অর্থাৎ তোমার কোন রূপ নেই, ধ্যানধঃ যতকল্পিতং- আমি ধ্যানে তোমার রূপ কল্পনা করে ফেলেছি, নিরাকার ঈশ্বরকে আমি ধ্যানে কল্পনা করে একটি রূপ দিয়ে ফেলেছি। এই হলো প্রথম অপরাধ।

” সত্যনির্বাচনিত্বখিলগুরুকৃৎ জন্মায়- পৃথিবীর সমস্ত জলকে যদি কালি করে দেয়া হয়, এই পৃথিবীর সমস্ত বৃক্ষকে যদি কলমও বানিয়ে দেয়া হয় তবুও তোমার প্রশাংসা লিখে শেষ করার নয়। তারপরেও আমি কিছু স্তবস্তুতি দিয়ে তোমাকে ছোট করে ফেলেছি। এটা হলো দ্বিতীয় অপরাধ।

ব্যাপ্তিংচ নিরকৃৎং- তুমি নিরাকারভাবে সর্বব্যাপি বিরাজমান, যৎতীর্থযাত্রাদিনাম- আমি তীর্থে তীর্থে তোমাকে বেঁধে দিয়ে গেছি। এই যে বিভিন্ন ছোট ছোট জায়গায় আমি তোমাকে বেঁধে দিয়ে গেলাম এটি আমার আরেকটি অপরাধ।

পরিশেষে মহর্ষি ব্যাসদেব বললেন ক্ষন্ত্যবং জগদীশ দোষত্রং মৎকৃৎং- আমাকে এই তিনটি দোষের জন্য ক্ষমা করো প্রভু।

এখানে মহর্ষি ব্যাসদেব এটাই প্রতীয়মান করছে যে ঈশ্বর একটা কল্পনাপ্রসূত ধারণামাত্র। যেটাকে প্রাচীন মুনি ঋষিরা কাল্পনিক রূপ রেখা দিয়েছে ধর্মগ্রন্থগুলোতে বিভিন্ন কাহিনী ও উপাখ্যানের মাধ্যমে।

হিন্দুরা যে পূজা পার্বণে করতে গিয়ে এত অর্থ ব্যয় করে বড় বড় প্রতিমা তৈরি করে সেটা হল প্রাচীন মুনি ঋষিদের কাল্পনিক প্রতিচ্ছবি মাত্র। তাই এই মাটির প্রতিমা বা কাল্পনিক প্রতিচ্ছবির পিছনে পুণ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে এত এত অর্থ ব্যয় না করে যদি ক্ষুধার্থ নিপীড়িত মানুষের জন্য কিছু অর্থ ব্যয় করে তাদের ন্যূনতম সহযোগিতা করে তাদের পাশে দাঁড়ানো যায় সেটাতে আরো বেশি পুণ্যার্জিত হবে। আর আপনি সেটাতে বেশি আনন্দও পাবেন।

আমি বলছি না যে আপনারা আপনাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে দিন। শুধুমাত্র নিবেদন আপনাদের কাছে এই টুকুই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করতে গিয়ে আপনারা অনেক অপচয় ও অপব্যয় করে থাকেন। আপনারা চাইলে সেই অর্থের অংশটুকু অসহায় দুঃস্থ গরিব মানুষের সহায়তার জন্য কাজে লাগাতে পারেন।

অপব্যয় যে করেন সেটার একটি উৎকৃষ্টতর উদাহরণ দেই সেটা হলো দুর্গাপূজার সময় আপনারা অনেকেই আপনাদের একটি বৃহৎ অংশের অর্থ  মদ  খাওয়ার পিছনে ব্যয় করে ফেলেন শুধুমাত্র সামান্য সাময়িক আনন্দ উল্লাসের জন্য। যেটা কিনা কোনো ধর্মীয় আচারের মধ্যেও পড়ে না।

অথচ আপনারা চাইলেই সে মদ খেয়ে আনন্দ উল্লাস করার টাকাটা ক্ষুধার্থ, অসহায়, নিপীড়িত মানুষের সেবার জন্য উৎসর্গ করে দিতে পারেন।

সবশেষে একটিই কথা পৃথিবীতে সবাই মানবিক হোক, জয় হোক মানবতার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *