মোড়ল ব্রাহ্মণ

ব্রাহ্মণ হিন্দুদের চতুর্বর্ণের প্রথম বর্ণ। ঋগ্বেদ-এর দশম মন্ডলে নববই সংখ্যক পুরুষসূক্তের বর্ণনা অনুসারে ব্রাহ্মণের জন্ম পুরুষের (স্রষ্টার) মুখ থেকে, ক্ষত্রিয়ের জন্ম সৃষ্টার বাহু থেকে, বৈশ্যের জন্ম সৃষ্টার উরু থেকে এবং শূদ্রের জন্ম সৃষ্টার পদ বা পা থেকে।

সৃষ্টা তার বানানো ধর্মের সৃষ্টির শুরুতেই ব্রাহ্মণকে হিন্দু সমাজের মোড়ল বানিয়ে রেখেছে৷ ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণদের মধ্যে নানা শ্রেণিভেদ আছে। কারও মতে এই শ্রেণির সংখ্যা দুহাজার। এক সারস্বত ব্রাহ্মণদের মধ্যেই ৪৬৯টি শাখা আছে। শ্রেণি অনুযায়ী ব্রাহ্মণদের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হয়। বাংলায় আচার্য বা গণক এবং শাকদীপি ব্রাহ্মণেরা পতিত বলে গণ্য হয়। নিম্নবর্ণের পৌরোহিত্য করে বলে বর্ণ ব্রাহ্মণরাও পতিত। তেমনি অগ্রদানী, ভাট ও পীরালি ব্রাহ্মণরাও সমাজে হীন।

বাংলার বাইরে মন্দিরের পূজারী হওয়ায় তামিল ও কর্ণাট ব্রাহ্মণরা সমাজে অপাঙক্তেয়। নাম্বুদ্রী ব্রাহ্মণরা সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। নৃতাত্ত্বিক বিচারে বাংলার ব্রাহ্মণদের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ব্রাহ্মণদের মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। তাদের খুব কম সংখ্যকই আর্য বংশোদ্ভূত। তারা চতুর্থ-ষষ্ঠ শতকে বাংলায় আগমন করে এবং ক্রমশ তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তবে পাল আমলে বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া এবং যাগ-যজ্ঞ ভুলে যাওয়ার ফলে তাদের পতিত ও শূদ্রে পরিণত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

সেনযুগে ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়।  মধ্যযুগীয় সমাজে ব্রাহ্মণরা সকল বর্ণ বা সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে জল গ্রহণ করত না। তিলি, তাঁতি, মালাকার প্রভৃতি মাত্র নয়টি সম্প্রদায়ের হাত থেকে জলগ্রহণের রীতি চালু ছিল। ধর্মশাস্ত্রে ব্রাহ্মণদের অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে: ১. ব্রাহ্মণ গুরু এবং সকলের কাছে শ্রদ্ধেয় ও প্রণম্য, ২. তারা অপর জাতির কর্তব্য নির্ধারণ করবে, ৩. রাজা সকলের প্রভু কিন্তু ব্রাহ্মণের প্রভু নয়, ৪. বেত্রাঘাত, বন্ধন, অর্থদন্ড, নির্বাসন, বাকদন্ড এবং পরিত্যাগ এই ছয় প্রকারের সাজা ব্রাহ্মণকে দেওয়া যাবে না, ৫. শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণরা করমুক্ত, ৬. তাদের ঘরে গুপ্তধন পাওয়া গেলেও রাজা তার সবটাই গ্রহণ করতে পারবে না, ৭. আগে যাওয়ার জন্য তাকে পথ ছেড়ে দিতে হবে, ৮. অন্য বর্ণের তুলনায় ব্রাহ্মণরা লঘুদন্ড পাবে, ৯. তাকে সাক্ষ্য দিতে ডাকা যাবে না, ১০. তারা মৃতাশৌচ পালন করবে দশদিন, ১১. তারা সুদ গ্রহণ করতে পারবে না, ১২. আপদকালে তারা বৈশ্যদের বৃত্তি গ্রহণ করতে পারবে, প্রভৃতি।

পূজার্চনাসহ হিন্দুদের যে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করা ব্রাহ্মণদের একটি সাধারণ পেশা। তবে শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, চাকরি ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তারা অন্যদের চেয়ে অগ্রগণ্য। সৃষ্টি কর্তা এদের সব দিক থেকে অগ্রাধিকার বেশি দিয়ে রাখছে যেহেতু তারা সৃষ্টিকর্তার মুখ থেকে উৎপত্তি তাই এদের সাথে সৃষ্টিকর্তার সাথে একটা ডিরেক্ট কমিউনিকেশন আছে। আর সুবাদে তারা যেভাবে পারছে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের অত্যাচার করে গেছে। এদের অত্যাচার আর নিপীড়নের স্বীকার হয়ে এই উপমহাদেশের অনেক হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে।

এই তথাকথিত ব্রাহ্মণদের অত্যাচার নিপীড়নের মাত্রা এমন ছিলো যে যদি কোনো নিম্নবর্ণের হিন্দু তাদের বাড়ির উপর দিয়ে যেত তাহলেও তাদের উপর অত্যাচার নিপীড়ন চালানো হতো। এই ব্রাহ্মণরা নিম্ন বর্ণের মানুষদের মানুষ বলে গণ্য করতো না। সে সময় নিম্ন বর্ণের ঘরের সন্তানরা শাস্ত্র অধ্যয়নের সুযোগ পেত না। কারণ নিম্ন বর্ণের শূদ্রদের শাস্ত্র অধ্যয়নের অধিকার নেই যেটা চর্তুবর্ণের নিয়ম অনুযায়ী তারা ব্যাখ্যা দিতো যে শাস্ত্র অধ্যয়নের অধিকার শুধুমাত্র ব্রাহ্মণদেরই।

মূলত এটা ছিলো তাদের কৌশল তারা ধর্মের এই ব্যাখ্যাটাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। ব্যাপারটা হলো শূদ্ররা যদি শাস্ত্র অধ্যয়ন শুরু করে তাহলে তো তারা জ্ঞান অর্জন শুরু করবে আর যখন নিম্ন বর্ণের মানুষগুলো  জ্ঞান অর্জন শুরু করবে তখন কথিত ব্রাহ্মণদের গুরুত্ব কমতে শুরু করবে। আর যদি ব্রাহ্মণদের গুরুত্ব কমে যায় তাহলে তারা হিন্দু সমাজের উপর কর্তৃত্ব খাটানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে এই ভয় তাদের তাড়া করে বেড়ায়। তারা তখন মনে করত যদি শূদ্ররা শাস্ত্রের জ্ঞান রপ্ত করা শুরু করে তাহলে ব্রাহ্মণ সমাজ হিন্দুদের উপর আধিপত্য বিস্তারের ক্ষমতা হারাবে। যার কারণেই এই ব্রাহ্মণরা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতো৷ তারা শাস্ত্রকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতো। তারা শিক্ষা থেকে অন্যদের বঞ্চিত রাখতো। যদিও কালক্রমে তাদের এই আধিপত্য বিস্তারের ঘৃণ্য সংস্কৃতি লোপ পেয়েছে। অনেকটাই পেয়েছে বলা চলে।

সেই স্মরণাতীত কাল থেকে বর্তমান অবধি এই ব্রাহ্মণ সমাজের যে ব্রাহ্মণি ব্রাহ্মণি অহংকার সেটা কিন্তু এখনও কমে নি। তারা গর্বের সহিত এখনও ব্রাহ্মণ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। তারা এখনও মনে করে তাদের ছাড়া হিন্দু সমাজের উদ্ধার নেই৷ কারণ পূজা পার্বণ ব্রাহ্মণ ব্যতীত সম্ভব না, বিয়েতে ব্রাহ্মণ ছাড়া সম্ভব না, এমনকি মৃত্যুর পর শেষ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও তাদের দরকার। তাই তারা মনে করে তাদের গুরুত্বটা হিন্দু সমাজে চিরস্থায়ী। তাই সেই অহমিকাটা ব্রাহ্মণরা সর্বদাই বহন করে চলে। তারা মনে মনে সর্বদাই হিন্দুদের অভিবাবক ভেবে চলে৷ কারণ হিন্দুরা ধর্মীয় কোনো আচার আচারণ বা রীতিনীতি জানতে চাইলেই দৌড়িয়ে ব্রাহ্মণের কাছে চলে যায়৷

কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই পূজা পার্বণ করতে কেন ব্রাহ্মণরেই প্রয়োজন পড়বে। শাস্ত্র অধ্যয়ন করার অধিকার সবার রয়েছে। আর ব্রাহ্মণের মুখে উচ্চারিত শব্দই শুধুমাত্র শুদ্ধ এবং পবিত্র হয় আর সেটা ভগবানের কাজে লাগে তাহলে ভগবান এক পাক্ষিক হয়ে গেল। আর ব্রাহ্মণ ব্যতীত পূজাই না হয় তাহলে সেই ভগবান তো পক্ষপাতিত্ব ভগবান। তাহলে আমার মতে ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য বর্ণের মানুষের পূজা পার্বণ বন্ধ করে দেয়া উচিত। কারণ যেহেতু ভগবান ব্রাহ্মণের হাতে পূজা ব্যতীত অন্য কারো হাতে পূজা গ্রহণ করে না। যেখানে শাস্ত্র বলতেছে যার মধ্যে ব্রহ্ম সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে, এই সমস্ত শাস্ত্র অধ্যয়নে পারদর্শী তাকেই ব্রাহ্মণ বলা হয়ে থাকে। তাহলে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ব্রাহ্মণরা কতটুকু শাস্ত্রীয় জ্ঞানে পারদর্শী৷ অনেক ব্রাহ্মণ তো ঠিক মতো মন্ত্র উচ্চারণও করতে পারে না৷ যদি কতিপয় কিছু শ্লোক মুখস্থ করে সেটা আবার পূজা পার্বণ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় বা বৈদিক অনুষ্ঠানে গিয়ে গর গর করে ঢেলে দিয়ে যদি ব্রাহ্মণত্ব ভাব দেখানো যায় তাহলে সেটা সব শ্রেণির মানুষের জন্যই প্রযোজ্য হওয়া উচিত৷ আর সর্বশেষ কথা হচ্ছে ভগবান যদি সার্বজনীন হন তাহলে পূজা পার্বণে ব্রাহ্মণের প্রয়োজন হওয়ার দরকার নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *