ইসকনি ব্রহ্মচর্য

প্রাচীন বৈদিক যুগে মানুষের জীবন যাপনের জন্য চারটি পর্যায় বা আশ্রমের কথা বলা হতো যথাক্রমে- ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বাণপ্রস্থ, সন্ন্যাস। এখন অনেকের মতে এই চারটি দশা বয়সের ভিত্তিতে নেওয়া হতো যেমন জন্মের পর থেকে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কালকে বলা হতো ব্রহ্মচর্যের সময়কাল যখন একজন ব্যক্তি কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করবে। ২৫ বছর থেকে ৫০ বছর বয়সের সময়কালকে বলা হয় গার্হস্থ্যের সময়কাল।  কোনো ব্যক্তি যদি তার কাম-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তাহলে সে বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে গার্হস্থ্য জীবনে পদার্পণ করবে।

এরপর সংসার জীবনের পর ৫০ থেকে ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কালকে বলা হয় বানপ্রস্থ। একজন ব্যক্তি ৫০ বছর বয়স অতিক্রান্ত হবার পর সে সংসার জীবন ত্যাগ করে বানপ্রস্থ জীবন গ্রহণ করবে অর্থাৎ তার সংসার জীবনের প্রতি কোনো টান থাকতে পারবে না। সে সংসার জীবন ত্যাগ করে মন্দির বাসী হবে। কি বিধান রে বাবা একটা মানুষকে সুকৌশলে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার বিধান হলো বেদের এই চারটি আশ্রমের বিধান।

যাইহোক এরপর সর্বশেষ হচ্ছে সন্ন্যাস। ৭৫ থেকে ১০০ বছর বা মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত সময়কালকে বলা হয় সন্ন্যাস জীবনের সময়কাল। সন্ন্যাস মানে হচ্ছে তাহার জীবনে নিজের বলে কিছু থাকবে না৷ সে ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করবে। কি ভংকর ব্যাপার ধর্ম মানুষকে ভিক্ষারী পর্যন্ত বানিয়ে দিতে পারে। এই চার আশ্রমের বিধান সকল শ্রেণীর মানুষ ধনী-গরীব সবার জন্য সমান। তার মানে একজন কোটীপতিকেও ভিক্ষারী বানিয়ে দিতে পারে সে যদি সঠিকভাবে ধর্মের বিধান অনুসরণ করে৷

এই সন্ন্যাস জীবন খুবই কঠোরতম অধ্যায়। এই অধ্যায়ে একজন ব্যক্তি সেলাই করা কাপড় পর্যন্ত পড়তে পারে না৷ না পারে পড়তে জুতা। সোজা কথায় মানুষ তাকে যা ভিক্ষা দিবে সেটা দিয়েই সে জীবনধারণ করবে। আর সবচাইতে অমানবিক যে নিয়মটা এই সন্ন্যাস জীবনের অধ্যায় সেটা হলো একজন সন্ন্যাসী কখোনই কোনো গৃহের ছায়াতলে থাকতে পারবে না। তাকে বনে জঙ্গলে ঘুরে জীবন কাটাতে হবে। আমি একটা জিনিস চিন্তা করতেছি একটা মানুষ জীবনের প্রান্তিক পর্যায়ে এসে কিভাবে এরকম একটা বর্বর নিয়মের বেড়াজালে বন্দী করবে৷ তাও কোন এক অলৌকিক কাল্পনিক জগতের আশায় কিংবা কল্পিত কোনো জিনিসের আশায়।

৭৫ বছর বয়স অতিক্রান্ত হলে একটা মানুষের জীবনে কিই বা অবশিষ্ট থাকে। বা তার শরীরে কতটুকুই বা স্টামিনা থাকে এই কঠোর জীবন গ্রহণ করার জন্য৷ যদিও আধুনিক যুগে এসব মানুষ মানতে একদমই নারাজ।আর বাংলাদেশে সন্ন্যাস ব্রত পালণ করতেছে এরকম ব্যক্তি খুবই অপ্রতুল। ভারতে মোটামুটি অনেক রয়েছে। বাংলাদেশে ইসকন নামক সংগঠনটি এই নিয়মকে পুনর্জাগরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আপনারা এই সন্ন্যাসীদের কাহিনী হিন্দুদের যেই ধর্মেগ্রন্থ আছে সেখানে যে রূপ কথার গল্পের মত সাজানো যে কাহিনী বর্ণনা করা আছে সেগুলোতে আছে। বাস্তবিকের নিরীক্ষে বর্তমান যুগে এগুলো খুঁজে পাওয়া খুবই দুস্কর তবুই একটা বিশেষ শ্রেণি সেই কাল্পনিক জিনিস বাস্তবিক রূপ দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷

যেহেতু টপিকের নাম দিয়েছি ইসকনি ব্রহ্মচর্য তাহলে আগে জেনে নেই ব্রহ্মচর্য জিনিসটা কি।

ব্রহ্মচর্য শব্দটির দুইটি অংশ। যথা: ব্রহ্ম ও চর্য

ব্রহ্ম শব্দটির অর্থ হল স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তা এবং চর্য শব্দটির অর্থ হল অনুসরনকৃত। অনেক সময় চর্য বলতে ধর্মীয় জীবন পদ্ধতিও বুঝায়। সুতরাং ব্রহ্মচর্য শব্দটি একটি ধর্মীয় বিধিসম্মত জীবনপদ্ধতি নির্দেশ করে।

প্রকৃতপক্ষে এই ব্রহ্মচর্যা বিধান পালণ করা সম্ভব হতো সেই প্রাচীন ভারতীয় আর্যদের সময়ে। কিন্তু বর্তমানে এই ব্রহ্মচর্য পালণ করা প্রায় অসম্ভব। তারপরেও এটাকে যেনতেনো ভাবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আর এই দুঃসাহসিক চেষ্টা চালাচ্ছেন ইসকন। এই ইসকনের ব্রহ্মচর্যের ভূত চাপিয়ে দেয়ার জন্য এরা টার্গেট করে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া স্টুডেন্টদের। মেধাবী শিক্ষার্থীরা এদের অগ্রাধিকারের দিক থেকে প্রথম সাড়িতে থাকে। এরা তাদের এই তত্ত্ব বলে কনভেন্স করে যে বহ্মচর্য হলো এটাই তুমি তোমার শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম ও লেখা পড়ার পাশাপাশি বৈদিক নিয়মে ধর্ম পালণ করবে৷ কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো। তাদের চাপিয়ে দেয়া এই কথিত ব্রহ্মচর্য পালণ করতে গিয়ে একজন শিক্ষার্থী তার পুরো শিক্ষাজীবনটাকে পর্যুদস্ত বানিয়ে ফেলে। ফলে শিক্ষা জীবনের যে উপভোগ্য কিছু সময় থাকে লেখাপড়ার পাশাপাশি বাহ্যিক কিছু শিক্ষা অর্জনের সেটাকে তারা বিসর্জন দিয়ে ফেলে এই ধর্ম পালণ করতে গিয়ে। শিক্ষা জীবনের সোনালি দিনগুলো বিসর্জন দিতে হয় তাদের এই নিয়মের বেড়াজালে পড়ে। কারণ তাদের এই নিয়মের মধ্যে অনেক কিছুই আছে যেগুলো ইসলামের মত হারাম বা নিষিদ্ধ।

এই ইসকনের একটা বই আছে নাম ব্রহ্মচর্য, বইটা পড়লে যে কারোরই মাথা খারাপ হয়ে যাবে। বইটা এমনভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা পড়লে আপনার মনে হবে এই জগতটাই মিথ্যে আর এই জগতের সকল কিছুই মিথ্যে। আর আপনার মনে হবে সকল কিছু ত্যাগ করে মন্দিরে উঠে কথিত ভগবানের সেবা পূজা করি। আর ইসকনের এই বইটা সবার কাছে অ্যাভেলএবেল না৷ কারণ এই বইটা পড়ার অধিকার তারাই রাখে। যারা সকল কিছু ত্যাগ করে মন্দিরগামী হয়েছে। সেই অলৌকিক ভগবানের পথ খুঁজে পাওয়ার উদ্দেশ্যে।

এরা যুব সম্প্রদায়ের মাথাকে এমনভাবে ব্রেইন ওয়াশ করে দেখা যাচ্ছে বিভাগের সর্বোচ্চ মেধাবী ছেলেটিও সকল কিছু ত্যাগ করে গেরুয়া পোশাক শরীরে জড়িয়ে মাথায় টিকি রেখে মন্দিরগামী হয়ে অনিশ্চিত অলৌকিক কাল্পনিক কোনো জগত প্রাপ্তির আশায় ছুটে চলছে।

ইসকনের মন্দির গুলোতে গেলে একটু খোঁজ নিয়ে দেখতে পাবেন৷ অনেক মেধাবী মেধাবী ছেলে যারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ রেজাল্টধারী স্টুডেন্ট তারা ইসকনের এই ব্রেইন ওয়াশের শিকার হয়ে পরিবার, সমাজ সকল কিছু ত্যাগ করে মন্দির বাসী হয়েছে। কল্পিত ভগবানের সেবা পূজার জন্য এবং তার সন্তুষ্টি বিধানে। অথচ তাদের এই মেধা দিয়ে কিন্তু জাতির জন্য, সমাজের জন্য, দেশের মানুষের জন্য অনেক বড় অবদান রাখতে পারতো। আর যখন একটা ছেলে আবেগের বশবর্তী হয়ে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করতে মন্দির বাসী হয়। তখন তার জীবনটা আরো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কেননা ইসকনের মন্দিরের নিয়ম কানুন আরো কঠোর৷

আরেকটা সবচাইতে বড় কথা সেটা হলো অনেক যুবক ব্রহ্মচর্য পালন করতে গিয়ে তার জীবনটা সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করে দেয়। এমনকি তারা বিবাহ করতে আগ্রহী না। যদিও নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত ব্রহ্মচর্য পালন করার পর একজন যুবক চাইলে সে সংসার জীবনে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু এই ছেলেগুলোকে এমনভাবে বিচলিত করে দেয়া হয় শাস্ত্রের ব্যাখ্যা দিয়ে যে সেই ছেলেগুলো বিবাহকে দায়বদ্ধতা মনে করে। তারা মনে করে বিয়ে করলে তাদের ভক্তিজীবন নষ্ট হয়ে যাবে।

অনেকেই বলে ইসকন নারীদের যথার্থই সম্মান প্রদর্শন করেছে৷ কারণ পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে, মন্দিরের কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে নারীদের তারাও বৈষম্যের শিকার করে দিয়েছে যদি সেটাই না হতো তাহলে তারাও পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও মন্দিরে থেকে ব্রহ্মচর্য পালন করার সুযোগ করে দিতো। তারা মনে করে নারীরা ঘরে থাকবে।  তাদের উপযুক্ত জায়গা ঘরেই। ঘরেই তারা ভগবানের সেবা পূজা করবে৷ তারাও মুসলমানদের মত নারীদের শস্যক্ষেতই মনে করে যারা শুধু বাচ্চা উৎপাদনের জন্যই পৃথিবীতে এসেছে।

তা না হলে নারীদের মন্দিরে থেকে ব্রহ্মচর্য পালন করা নিষেধ কেন। নাকি নারীরা মন্দিরে অবস্থান করলে ব্রহ্মচারীদের মনের ভিতর কামের উদয় হবে যার ফলে ব্রহ্মচারী থেকে পতিত হবার সম্ভাবনা থাকে। অবশ্য তাদের প্রশ্ন করলে কিন্তু তারা উত্তরে তারা এটাই বলে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *