রাষ্ট্র ধর্ম

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল জাতীয় সংসদে গৃহীত হয় এবং একই বছরের ১৬ই ডিসেম্বর অর্থাৎ বাংলাদেশের বিজয় দিবসের প্রথম বার্ষিকী হতে এটি কার্যকর হয়।

১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রচিত সংবিধানের মূলনীতি ছিলো চারটি-ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট ঘাতকরা ধানমন্ডির ৩২ নাম্বার বাড়িতে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে ৷ এরপর সামরিক শাসনের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন৷ ১৯৭৯ সালে তিনি সংবিধানে পঞ্চম সংশোধনী এনে সংবিধানের মৌলিক চরিত্রই পরিবর্তন করে দেন৷ শুরু হয় ধর্ম নিয়ে রাজনীতির সুযোগ৷ বাদ পড়ে ধর্ম নিরপেক্ষতা৷ সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে যে বিষয়গুলো আনা হয়েছিল-

>অবৈধভাবে ক্ষমতা গ্রহণকে উৎসাহিত করা হয়।

>সংবিধানের প্রারম্ভে ‘ বিস্‌মিল্লাহির-রহ্‌মানির রহিম ‘ সংযোজন।

>বাঙালি জাতীয়তা বাদ দিয়ে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর সূচনা করা হয়।

>চার মূলনীতির ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজ তন্ত্রের পরিবর্তন আনা হয়। ধর্ম নিরপেক্ষতার পরিবর্তে ‘ মহান আল্লাহতালার প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ সংযোজন করা হয়।

>সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে ‘সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র’ প্রতিস্থাপন করা হয়।

>Indemnity Ordinance – কে বৈধতা দেওয়া হয়। যা পঞ্চম তফসিলের ১৮ নং অনুচ্ছেদে সংযুক্ত হয়েছিল।

>প্রধান বিচারপতি ও দুজন সিনিয়র বিচারপতি নিয়ে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠনের ব্যবস্থা করা হয়। বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত হয়। উল্লেখ্য যে চতুর্থ সংশোধনীতে বিচারপতি অভিশংসনের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যাস্ত করা হয়ে ছিল। আর মূল তথা বাহাত্তরের সংবিধানে তা সংসদের কাছে ছিল।

এ সংশোধনী ছিল সংবিধানের মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন

এরপর ক্ষমতার পালাবদলে সামরিক অভ্যুথ্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী এইচএম এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। এরপর ১৯৮৮ সালের ৭ই জুন স্বৈরাচারী এরশাদ সংবিধানে ৮ম সংশোধনী আনে। যেটার মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে অর্ন্তভুক্ত করা হয়৷

সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম অর্ন্তভুক্তি করার মাধ্যমে একটি বিশেষ ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে সংবিধানের মূলধারাকে ক্ষুন্ন করা হয়। সংবিধানের মূলধারায় ধর্ম নিরপেক্ষতা রেখে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম রাখা একটা আরেকটার মুখাপেক্ষী করা দেয়া হয়েছে। সংবিধানের রাষ্ট্র ধর্ম এবং ধর্ম নিরপেক্ষতা একটা আরেকটার সাথে সাংঘর্ষিক। এই নির্দিষ্ট একটা ধর্মকে রাষ্ট্র ধর্ম বানিয়ে ভিন্নধর্মাবলম্বীদের এক ধরনের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে।

যে বছর ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে সেই বছরই স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে রাষ্ট্রধর্মের ওই বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন দেশের ১৫ জন বরেণ্য ব্যক্তি।

তাঁদের মধ্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন, বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, বিচারপতি কে এম সোবহান, কবি সুফিয়া কামাল, অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, শিল্পী কলিম শরাফী, অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন ও সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ মারা গেছেন আবেদনকারীদের মধ্যে জীবিত পাঁচজন হলেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সেক্টর কমান্ডার সি আর দত্ত, লেখক বদরুদ্দীন উমর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

তাঁদের ওই আবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে নানা ধর্মবিশ্বাসের মানুষ বাস করে। এটি সংবিধানের মূল স্তম্ভে বলা হয়েছে। এখানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে অন্যান্য ধর্মকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি বাংলাদেশের অভিন্ন জাতীয় চরিত্রের প্রতি ধ্বংসাত্মক।

রিট আবেদনের ২৩ বছর পর ২০১১ সালের ৮ জুন বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল দেন। ওই দিনই অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ১৪ জন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে দুজন ড. এম জহির ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম মারা গেছেন।

বাকি ১২ জন হলেন টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, রফিক-উল হক, এম আমীর-উল ইসলাম, এ এফ হাসান আরিফ, রোকনউদ্দিন মাহমুদ, আখতার ইমাম, ফিদা এম কামাল, আজমালুল হোসেন কিউসি, আবদুল মতিন খসরু, ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ও আ ফ ম মেজবাহ উদ্দিন।

সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ রিটের উপর কোনো শুনানি না করেই হাইকোর্ট সরাসরি রিটটি খারিজ করে দেন। এবং আদালত সেই রায়ে বলেন যারা নাকি রিট দায়ের করেছেন তাদের নাকি এই বিষয়ের উপর মামলা করার অধিকার নেই। রায়ের মধ্য দিয়ে একটা বিষয় নিশ্চিত হচ্ছে যে এবার সরকারি দল বিরোধী দলের পাশাপাশি দেশের উচ্চ আদালতও ঈমানী দ্বায়িত্ব পালন করা শুরু  করেছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *