বর্ণাশ্রম ভাইরাস

সনাতন ধর্ম কিংবা হিন্দু সম্প্রদায়ের যুগের পর যুগ প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে আসা একটি ভাইরাসের নাম বর্ণাশ্রম ভাইরাস। চির বহমান এই বর্ণাশ্রম ভাইরাস পৃথিবীর বুকে ঘটে যাওয়া মহামারী থেকে অতি মহামারীর চাইতেও ভয়ংকরভাবে বাসা বেঁধে আছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই অত্যাধুনিক যুগে এসেও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ গুলো বের হতে পারেনি মানবতাবিরোধী, মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি কারি এই বর্ণাশ্রম ভাইরাসের শিকলের বন্ধন থেকে। এমনকি বর্তমান হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ গুলোরও মনোবৃত্তি দেখলে মনে হয় যেন এই বর্ণাশ্রম ভাইরাস তাদের মনের অন্তরালে বাসা বেঁধে ধীরে ধীরে তাদের মানবসত্তাকে ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে ঠিক যেমন HIV এইডস মানুষের শরীরের ভিতরকার কোষগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট করে। এই ভয়ঙ্কর ভাইরাস যেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতিটি শিরায় উপশিরায় রন্ধ্রে রন্ধ্রে  মিশে আছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ গুলোর মধ্যে অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত শ্রেণীর মানুষগুলো এই ভাইরাসের কবলে পড়ে বেশি প্রভাবিত হয়, কিন্তু শিক্ষিত, উচ্চ শিক্ষিত মানুষ গুলোও এই ভয়ঙ্কর বর্ণাশ্রম ভাইরাসের প্রভাব থেকে মুক্ত নন। এই বর্ণাশ্রম ভাইরাসের প্রভাব প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয় যখন একটি হিন্দু ছেলে কিংবা মেয়ে বিয়ে করতে উদ্ধুদ্ধ হয়। বিয়ের ক্ষেত্রে এই ভাইরাসের প্রভাব কতটা প্রকট সেই বিষয়টা একটু পরে আলোচনা করছি। আপাতত চলুন দেখে নেয়া যাক এই ভাইরাস সম্বন্ধে তাদের ধর্মগ্রন্থ গুলো কি বলে। প্রাচীন বৈদিক সমাজে বহুল প্রচলিত ব্রাহ্মণ , ক্ষত্রিয় , বৈশ্য , শূদ্র বর্তমান হিন্দু সমাজে এক সুপরিচিত শ্রেণিবিভাগ । এই এক একটি শ্রেণিকে বর্ণ বলে । জন্মসূত্রে এক একজন এক এক বর্ণের হয় – শতাব্দী প্রাচীন এই প্রথাকে বলা হয় বর্ণ প্রথা। কালের পরিবর্তনে বর্ণাশ্রম হয়ে গেছে বর্ণ প্রথা। প্রথমেই নামের বিষয়টা খেয়াল করা যাক । মূল এবং সঠিক নামটি হচ্ছে ‘বর্ণাশ্রম’।

এখানে ‘বর্ণ’ শব্দটি এসেছে ‘Vrn’

root থেকে যার অর্থ ‘To choose

বা পছন্দ করা অর্থাৎ পছন্দ অনুযায়ী আশ্রম বা পেশা নির্ধারন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে হিন্দু সমাজে একে জন্মসূত্রে বিবেচনা করা হয়। ভট্ট্যাচার্য, চট্ট্যোপাধ্যায় নামের পাশে থাকলেই ব্রাহ্মন অথবা দাস,রায় থাকলেই শূদ্র এরকম হাস্যকর কিছু অযৌক্তিক কিছু ধারণা প্রচলিত রয়েছে। চলুন দেখা যাক বেদ এই ব্যাপারে কি বলে।

 

  • ঋগবেদ ১.১১৩.৬

“একজন জ্ঞানের উচ্চ

পথে (ব্রাহ্মন) ,অপরজন বীরত্বের

গৌরবে (ক্ষত্রিয়) , একজন তার

নির্দিষ্ট লক্ষ্যে (পেশাভিত্তিক),

আরেকজন সেবার পরিশ্রমে (শূদ্র)।

সকলেই তার ইচ্ছামাফিক

পেশায়, সকলের জন্যই ঈশ্বর জাগ্রত।

 

  • ঋগবেদ ৯.১১২.১

একেকজনের কর্মক্ষমতা ও

আধ্যাত্মিকতা একেক রকম আর

সে অনুসারে কেউ ব্রাহ্মন, কেউ

ক্ষত্রিয়, কেউ বেশ্য, কেউ শূদ্র।

 

ব্রাহ্মন কে ?

 

  • ঋগবেদ ৭.১০৩.৮

যে ঈশ্বরের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত,

অহিংস, সত্য, নিষ্ঠাবান, সুশৃঙ্খল, বেদ

প্রচারকারী, বেদ জ্ঞানী সে ব্রাহ্মন।

 

ক্ষত্রিয় কে ?

 

  • ঋগবেদ ১০.৬৬.৮

দৃড়ভাবে আচার পালনকারী, সৎকর্মের

দ্বারা শূদ্ধ, রাজনৈতিক জ্ঞান

সম্পন্ন, অহিংস, ঈশ্বর সাধক,

সত্যের ধারক, ন্যায়পরায়ন,

বিদ্বেষমুক্ত, ধর্মযোদ্ধা, অসৎ এর

বিনাশকারী সে ক্ষত্রিয়।

 

বৈশ্য কে ?

 

  • অথর্ববেদ ৩.১৫.১

দক্ষ ব্যবসায়ী, কৃষক,গোরক্ষক, দানশীল, চাকুরীরত

এবং চাকুরী প্রদানকারী ।

 

শূদ্র কে ?

 

  • ঋগবেদ ১০.৯৪.১১

যে অদম্য, পরিশ্রমী, অক্লান্ত,

জরা যাকে সহজে গ্রাস করতে পারেনা, লোভমুক্ত কষ্টসহিষ্ণু সেই শূদ্র ।

 

উপরোক্ত জিনিসগুলো দেখে আমার মনে হচ্ছে বেদ যেন সার্টিফিকেট প্রদানকারী কোনো সংস্থা। আপাতদৃষ্টিতে বর্ণাশ্রম সম্পর্কে বেদের কথাগুলো যুক্তিযুক্তই ধরে নিলাম কিন্তু অদ্যবধি কাল থেকে শুরু করে বর্তমান হিন্দু সমাজ কি বেদের এই অনুশাসন মেনে চলে। তথাকথিত ব্রাহ্মণরা এই বেদকে নিজেদের স্বার্থে যেভাবে পারছে সেভাবেই ব্যবহার করেছে। হিন্দুদের অনেকেই মনে করেন বেদ ভগবানের নিঃশ্বাস থেকে সৃষ্টি বা ভগবান থেকেই সৃষ্টি। তাহলে আমার মনে হয় সেই ভগবান এই চার্ত্যুবর্ণের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পেরেছিলো না যে এটার ভয়াবহতা কি হতে পারে৷ যদি সে বর্ণাশ্রম প্রথার ভবিষ্যত পরিস্থিতি তখন উপলব্ধি করতে পারতো তাহলে সে নিজেও বিভ্রান্তিতে পড়তো এই প্রথার প্রচলনের ব্যপারে। আর যদি সেই ভগবান বর্তমান সময়ে ফিজিক্যালি অ্যাপিয়ারেন্স থাকতো তাহলে আমি এই বর্ণাশ্রম নামক ভাইরাস প্রথার বাতিলের দাবিতে সেই ভগবানের বিরুদ্ধে আন্দলোন শুরু করতাম। অবশ্য এখানে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে যে ভগবান কি বলেছেন যে এই প্রথার অপব্যবহার করতে। ওকে ঠিক আছে মেনে নিলাম এক্ষেত্রে আপনাদের সেই ভগবানের কোনো দোষ নেই কিন্তু উনিতো ভগবান তাহলে একটা প্রথার ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে সে বিষয়ে ওনার অবগত হওয়া উচিত ছিলো না যে তার বানানো প্রথারই প্রথম শ্রেণীর সমাজের মানুষগুলো মানে ব্রাহ্মণরা এটাকে কিভাবে নিজ স্বার্থ হাসিলে অপব্যবহার করতে পারে। যাইহোক ভগবানের দোষত্রুটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনায় যাবো না তাহলে আপনারা আবার মনঃক্ষুণ্ন হতে পারেন। ভগবান তো ভগবানের কাজটি করেছেন। কিন্তু আমাদের এই চিরা চিরায়িত অচলায়তন প্রথা থেকে কিভাবে বের হতে হবে সে ব্যপারে ভাবার সময় এসেছে। আমরা যদি এই বর্ণাশ্রম প্রথাটাকে একটা পিরামিড হিসেবে কল্পণা করি তাহলে দেখা যাচ্ছে সবার উপরে রয়েছে ব্রাহ্মণ তারপর ক্ষত্রিয় তারপর বৈশ্য সর্বশেষ শুদ্র। দেখুন এক্ষেত্রে পুরো প্রেশারটা কিন্তু এসে সেই নিম্নস্তরের শুদ্রদের উপর পড়ছে। বেদের ভাষ্যনুযায়ী এরাই বেশী প্ররিশ্রমী এবং বেদের পুরুষ সুক্তে এদের ঘোষনা দিয়েছে মানব সভ্যতার কাঠামো হিসেবে, সমাজে এদের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। কিন্তু তথাকথিত ব্রাহ্মণরা এদেরকে নিম্নবর্গের মানুষ  আখ্যা দিয়ে সৃষ্টি করে দিয়েছে বিভাজন, সৃষ্ঠি করেছে বৈষম্য।যেন ফতোয়াবাজ মোল্লাদের মতোই ফতোয়া দেয়া। যাই হোক তথাকথিত ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের কথা শুরু করলে বলে শেষ করা যাবে না। এদের কথা লিখতে গেলে মহাকাব্য সৃষ্টি হয়ে যাবে। ব্রাহ্মণদের অত্যাচার নিয়ে আরেকদিন বলা যাবে। সমাজে প্রত্যেক শ্রেণীর মানুুুুষেরই প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিটা কর্মের মানুষই অন্য আরেকটি শ্রেণীর কর্মের মানুষের উপর নির্ভরশীল। তাই কর্মানুসারে এই বর্ণাশ্রম প্রথার প্রচলন থাকা উচিত বলে আমি মনে করি না। কারণ বেদের যে মৌলিক ভাষ্য বর্ণাশ্রম প্রথার ব্যপারে সেটা থেকে ব্রাহ্মণ সমাজ অনেকটা দূরে। বরং রীতিমতো এই প্রথাকে ব্রাহ্মণরা নিজেদের স্বার্থে অপব্যবহারই করে গেছে এবং করছে। শুধু যে ব্রাহ্মণরা করেছে তা নয় হিন্দু সমাজের সকলেই এটাকে যে যেভাবে পেরেছে সেভাবে ব্যবহার করেছে। মানুষ যুগে যুগে প্রয়োজনের তাগিদে অনেক কিছুই ত্যাগ করেছে অনেক কিছুই গ্রহণ করেছে এবং অনেক কিছুই রিফরম করেছে। তাই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে হিন্দুদের উচিত এই প্রথা থেকে বের হয়ে আসা। বলেছিলাম বিয়ের ব্যপারে এই প্রথার প্রভাব কতটা প্রকট সেই ব্যপারে। বর্ণাশ্রম প্রথার মধ্যে যে শুধু ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্র এই চার শ্রেণীতে বিভক্ত এমন নয় এই চার শ্রেণী যে আবার কত শ্রেণীতে বিভক্ত তাহার হিসেব বলে শেষ করে যাবে না। কিছু উদাহরণ তুলে ধরলাম ব্যানার্জি, চ্যাটার্জি, মুখার্জি, ভট্টাচার্য, চক্রবর্তী, কুন্ড, বনিক, ঘোষ, মন্ডল, সরকার, বসাক, রায়, শীল, মিত্র, দত্ত অধিকারী, বর্মন ইত্যাদি ইত্যাদি এরকম বলতে গেলে আরো অনেক আছে। এইগুলোকে বলা হয় পদবী। বলতে পারেন এইগুলোতো অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও আছে হ্যাঁ আছে কিন্তু তাদের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে এই বর্ণ কিংবা পদ পদবির প্রভাব কম। হিন্দুদের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে একই বর্ণ একই পদবীর মানুষ না হলে ছেলে মেয়েরা বিয়ে করতে পারবে না। চিন্তা করতে পারেন কতটা বিভাজন কতটা বৈষম্য। আমি আবারো বলছি এইসব কুসংস্কার থেকে মানুষ ধীরে ধীরে বের হতে চলেছে, কিন্তু বৃহৎ অংশ এখনো নিমজ্জিত হয়ে আছে এই অন্ধকারে। আর সেই অন্ধকারচ্ছন্ন মানুষগুলোকেই জাগাতে হবে। হিন্দু সমাজে এখনো দেখা যায় একজন যোগ্যতাসম্পন্ন ব্রাহ্মণ মেয়ে কিংবা ছেলে আরেকজন যোগ্যতাসম্পন্ন ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে কিংবা ছেলে না হলে বিয়ে করতে পারবে না। যদি তার বিয়ের বয়স পারও হয়ে যায় তারপরও তাকে অপেক্ষা করতে হয় কোনো একটা ব্রাহ্মণ ঘরের ছেলে কিংবা মেয়ের জন্য৷ ঠিক অন্যান্য বর্ণ এবং পদবীর মানুষগুলোর মনোভাব ঠিক একই। যেমন শীলের ঘরের ছেলের জন্য শীলের মেয়েই লাগবে। পালের ঘরের মেয়ের জন্য পালের ঘরের ছেলেই লাগবে। কতশত পদবীর পসরা সাজিয়ে বসেছে এরা। অথচ বর্তমানে দেখা যাচ্ছে একজন মুচির ঘরের ছেলেও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজ পরিশ্রমের দ্বারা ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,জজ,ব্যারিষ্টার কিংবা ম্যাজিষ্ট্রেট হচ্ছে। বর্তমানে যোগ্যতার কাছে এই সকল বর্ণ পদ পদবী মার খাচ্ছে। ডাক্তারের এর ছেলে যেমন ডাক্তার হবেই এমন কোন কথা নেই। ডাক্তার এর ঘরে জন্ম নিলেই এম.বি.বি.এস এর সার্টিফিকেট যেমন পাওয়া যায়না ঠিক তেমন ব্রাহ্মন এর ঘরে জন্ম নিলেই ব্রাহ্মন হওয়া যায়না। বর্তমান সমাজে দেখা যাচ্ছে একজন দলিত (যারা বর্তমান হিন্দু সমাজে এখনো বৈষম্যের শিকার) ঘরের সন্তানও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে পক্ষান্তরে একজন ব্রাহ্মণ কিংবা ক্ষত্রিয়ের ছেলেও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। আমার মতে বিয়ের ক্ষেত্রে বর্ণপ্রথা তো দূরে থাক কোনো জাতি বিভেদ থাকা উচিত না। মানবসভ্যতার সবচাইতে বড় বিভাজনকারী প্রথা হলো ধর্ম। এটার মাধ্যমেই সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদি  এরকম হাজারো জাতি। এই ধর্ম না থাকলে হয়তবা এইসব প্রথা, জাতি, বর্ণ সৃষ্টি হতো না। হতো  না  মানুষে মানুষে এত বিভাজন। বিয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হতো না কে কোন জাতি। আর বিয়েতো একটা আত্মিক মেল বন্ধন সে ক্ষেত্রে এইসব জাতপাতকে দূূূূরে ঠেলে  রাখাই সমীচীন। মানুষ হইয়া আমাদের মানুষ চিনতে হইবে। মানুষ হইয়া যদি আমরা মানুষই না চিনিলাম তাহলে কেমন মানুষই বা হইলাম।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *