ছেঁড়া তার

ভার্সিটিতে পড়ার সময় ভালবেসে বাংলা ডিপার্টমেন্টের মেয়েটিকে এক দুপুরে গিয়ে বললাম, ‘মনোয়ারা মনো, তোমাকে যে ভালবাসি তা কি তুমি জান?’ মেয়েটি পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া জসিম স্যারকে ডাক দিল ক্রুর হেসে, ‘স্যার।’ আমি তৎক্ষনাৎ জোর কদমে ফিরে আসি। আর কখনো ওপথ মাড়াইনি। আমার চাকরির বয়স যখন এক বছর তখন ভাতের টেবিলে একদিন হুকুম জারি হল, ‘বিয়ে করতে হবে।’ আমি কপট অনীহা দেখালাম।

ভার্সিটিতে পড়ার সময় ভালবেসে বাংলা ডিপার্টমেন্টের মেয়েটিকে এক দুপুরে গিয়ে বললাম, ‘মনোয়ারা মনো, তোমাকে যে ভালবাসি তা কি তুমি জান?’ মেয়েটি পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া জসিম স্যারকে ডাক দিল ক্রুর হেসে, ‘স্যার।’ আমি তৎক্ষনাৎ জোর কদমে ফিরে আসি। আর কখনো ওপথ মাড়াইনি। আমার চাকরির বয়স যখন এক বছর তখন ভাতের টেবিলে একদিন হুকুম জারি হল, ‘বিয়ে করতে হবে।’ আমি কপট অনীহা দেখালাম।
মেঘে মেঘে পাঁচ ছ’টি কনে দেখা হয়ে গেছে। তবে ‘মনে ধরা’ যাকে বলে তেমনটি হয়নি এখনো। আরো কয়েকবার মার্কেটে, পার্কে, মিষ্টির দোকানে ঘুরতে ঘুরতে সত্যিই একটিকে মনে ধরে গেল। সত্যি বলছি আমি আজ পর্যন্ত প্রেমে পড়িনি। যা এক আধটু ভাল লেগেছিল তা নিতান্তই অগভীর। কিন্তু মিতুকে দেখার পর বুকের ভেতর আচমকা ঝাঁকি খেলাম। কথা বলার পর আরো বেশী কাহিল হয়ে পড়লাম। দু’জনের নামের মাঝে একটি ছন্দ থাকলেও স্বভাবটা ঠিক আমার উল্টো। আমি কিছুটা ঘোরেল টাইপ, আর মেয়েটা সহজ সরল। চুল গুলো তেমন ঘন নয়, মুখে সর্বদা একটি শান্তি শান্তি ভাব। দু’পক্ষের কথাবার্তা যখন পরিণতির দিকে এগুচ্ছিল তখন একরাতে ভাবী এসে একটি চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘মিতুকে ফোন করিস।’ আমি আকাশ থেকে পড়ার ভান করলাম, ‘কোন মিতু?’ ভাবী মুখ টিপে হেসে বলল, ‘ঢং করিস না।’
রাত বাড়ার সাথে সাথে আমার হৃদস্পন্দনটাও অনিয়মিত হয়ে উঠছিল। ফোন করব কি করব না করে করে যখন শেষ পর্যন্ত করলাম, তখন ঘড়িতে রাত দেড়টা। রিং পড়তে পড়তে মোবাইলটা ক্লান্ত হওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে সতেজ কন্ঠ ভেসে এল ওপার হতে,
-হ্যালো।
-(আমি চুপ)
-হ্যালোওওও..।
বুকের ভেতর শব্দ গুলো বাইরে থেকেই শোনা যাচ্ছে যেন। গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বললাম,
-ইয়ে আমি জিতু বলছি।
-জি.. কোন জিতু?
ভড়কে গেলাম, মেয়েটাও আকাশ থেকে পড়ল বলে মনে হল। বললাম,
-আপনি জিতু নামের কাউকে চেনেন?
যা ভেবেছিলাম তা নয়। মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,
-চিনিতো।
-কেমন আছ?
-কি সাহস!
-কেন?
-হুট করে তুমি বলে ফেললেন?
-ও সরি.. কেমন আছিস?
-হা হা হা হা হা… মজার তো!
ততক্ষণে আমার হৃদস্পন্দন স্বভাবিক হয়ে এসেছে। একটু রয়ে সয়ে বললাম,
-কি করছেন?
-ওমা, আবার আপনি কেন?
-ওই ইয়ে.. কি করছ?
-বই পড়ছি।
-কার বই?
-সঞ্জিব চট্টোপাধ্যায়।
আমি আর কথা খুঁজে পাচ্ছিনা। সে বলল,
-নাম্বারটা কোথায় পেলেন?
-ভাবী দিয়েছে। তো.. ইয়ে.. পরষ্পরকে জানার জন্য একটু ফোন করলাম আরকি।
-কি জানতে চান বলুন?
-না মানে এই আরকি..
-কি আরকি?
-আসলে ওসব জানাজানি ফানাফানি মুরুব্বিরা করবেন। আমরা একটু কথাবার্তা বলে ফ্রি হওয়া আরকি।
-খোঁজ খবর নিয়েছেন?
-কিসের?
-আমার?
-আহা বললাম না ওসব মুরুব্বিদের ব্যাপার। আপনার.. ইয়ে তোমার কথা বল.. পছন্দ কেমন?
-মানে?
-মানে কেমন ছেলে পছন্দ?
-(হেসে) আপনার মত।
বুকটা ধ্বক করে উঠল। এ মেয়ে তো সাংঘাতিক। হৃদস্পন্দন আবারো বেড়ে গেল। সুহাসিনী বলল,
-হ্যালো.. কথা বলছেন না কেন?
-না.. নাকের কাছে একটা মশা প্যাঁ করে উঠল, সরালাম।
-তা.. আপনার কেমন মেয়ে পছন্দ?
-তোমার মত।
-কেমন?
-শ্যামলা.. মুখে শান্তি শান্তি ভাব.. আর..
-আর?
-আর.. ফিগারটা..
লাইনটা কেটে গেল। নাকি কেটে দিল? আবার করলাম।
-লাইনটা কি কেটে দিয়েছিলে?
-জি না.. মনে হয় নেটওয়ার্কে সমস্যা।
-ও আচ্ছা।
আগড়ম বাগড়ম কথা চলতে লাগল কাকদের ভৈরবী গীত শুরু হওয়া পর্যন্ত। তারপর থেকে আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যেতে লাগল। ঘুনাক্ষরেও আড্ডায় বিষয়টি জানাইনি। সারা জীবন ওদের জ্বালিয়ে এসেছি। এসব জানালে ওরা কি আর আমাকে ছেড়ে কথা বলবে? ভাবী জিজ্ঞেস করছিল ফোন টোন করেছি কিনা। আমি ‘না’ বলে ধরা খেয়েছি। এদিন আর ফোন করিনি। ভাবলাম সে করে কিনা দেখি। কিন্তু করেনি। আমার ঘুম আসতে কষ্ট হয়েছিল। পরদিন ভেবে দেখলাম, এমন হতে পারে না যে তার মোবাইলে পর্যাপ্ত ব্যালেন্স ছিল না তাই করতে পারেনি। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে লজ্জার মাথা খেয়ে রাত দু’টায় ফোন করলাম। রিং অর্ধেক পড়তেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো,
-কেমন আছেন?
-জি ভাল.. আপনি?
-ওমা, আবার আপনি কেন?
-ও হ্যাঁ.. কেমন আছো?
-কাল ফোন করেন নি তো?
-ভাবীকে ফোনের কথা বলেছিলে কেন?
-ভাবী জিজ্ঞেস করলেনতো তাই বললাম।
-ও.. যাক, তো.. কি করছ?
-আমি? আমি..
মনে হচ্ছে হয়তো বলবে আমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করছে। আহ্ যদি বলে! আমতা আমতা করে বলল,
-ইয়ে.. বই পড়ছি।
-এত রাতে!
-দিনে সময় পাই না তো, তাই রাতে পড়ি।
-রাতে কি পড়?
-উপন্যাস।
-ও আমি ভাবলাম..
-কি?
-ভাবলাম ভারী জামা ছেড়ে হালকা কিছু পড়।
লাইনটা কেটে গেল। নেটওয়ার্কে যা সমস্যা করে না! আবার করলাম। ফোনটা ধরেছে কিন্তু কোন সাড়া নেই ওপাশে। আমি বললাম,
-হ্যালো..
-জি বলুন।
-এই রাতের বেলায়ও নেটওয়ার্কে..
-নেটওয়ার্ক না.. আমিই কেটে দিয়েছি।
-ক্ ক্ কেন?
-আপনি দেখছি শুধু ফাজিল না.. মহা ফাজিল।
-হা হা হা হা হা হা… হো হো হো হো হো..
ভেংচি দিয়ে সে আমার হাসিকে কেমন ভাবে যেন নকল করে করে খানিক হাসল। আমি ধীরে ধীরে ডুবে যেতে লাগলাম তার অথৈই গভীরে।
আজ অফিসে বসের কাছে ঝারি খেয়েছি। ক’দিন ধরে আমাকে নাকি খুবই অমনোযোগী দেখাচ্ছে। প্যান্টের পকেটে মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠল। ওপাশ থেকে মিতু বলল,
-ব্যস্ত?
-না.. বলো।
-কিছু জানেন?
-কি?
-এ্যাঁহ্ ন্যাকা।
-সত্যি জানিনা.. প্লিজ বলো..
-আর মাত্র একুশদিন।
-কিসের?
-(মিতু ফিসফিস করে বলল) বিয়ের, চৌদ্দ তারিখ।
-তুমি কি করে জানলে?
-একটু আগে ভাইয়া বলল।
হঠাৎ বস এসে বলল, ‘একটু কনফারেন্স রুমে আসেনতো।’ গলাটা খানিক চড়িয়ে মিতুকে বললাম, ‘ভাইয়াকে বিছানায় শুইয়ে রাখ, আমি এক্ষুণি আসছি।’ মিতু হ্যালো হ্যালো করছে, আমি ফোনটা কেটে দিয়েছি। এরপর বাটনে চাপ দিয়ে অফই করে দিয়েছি, মিতুটা নির্ঘাত এক্ষুনি আবার ফোন করবে। বস বললেন, ‘কি হয়েছে?’ আমি কান্নায় কাদা হয়ে বললাম, ‘ভাইয়া নাকি তিন তলার সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে পড়ে গেছে।’ তিনি হন্তদন্ত হয়ে বললেন, ‘যান যান তাড়াতাড়ি বাসায় যান, আর শোনেন নীচে ড্রাইভার আছে.. গাড়ীটা নিয়ে যান।’ আমি ড্রাইভারকে পাশ কাটিয়ে রাস্তায় নেমে মিতুকে ফোন দিলাম,
-হ্যালো, তুমি কি এখনই বের হতে পারবে?
-তখন কি বলছিলেন আবোল তাবোল.. ফোন অফ করে দিয়েছিলেন কেন?
-আহ্ পরে বলব.. এখন চল একটু দেখা করি।
-না.. প্লিজ…
-কেন?
-ভয় লাগে।
-আরে ধ্যাৎ.. দু’দিন পর বিয়ে, আর এখন..
-প্লিজ..
-তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
-প্লিজ অমন করে বলবেন না। তাছাড়া একবার তো দেখেছেন।
-আরে সে তো কনে দেখার জন্যে দেখা।
-বিয়ের পর ভালভাবে..
হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে একটি মাইক্রো এসে আমাকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেল। আমি ছিটকে পড়লাম একদিকে, মোবাইলটা অন্যদিকে। লোকজন ছুটে এলো হৈ হৈ করে। কিছুক্ষণ পর একটু ধাতস্ত হলাম। তেমন গুরুতর কিছু হয়নি। শুধু কব্জিতে আর হাঁটুতে একটু ছরে গেছে। বাম পায়ে খুব একটা জোর পাচ্ছি না। মোবাইলটা বন্ধ হয়ে গেছে। অন করে একটু আড়ালে গিয়ে মিতুকে ফোন করলাম। রিং পড়তে না পড়তেই মিতু বলল,
-হ্যালো তখন কি হয়েছিল?
-কোত্থেকে একটা মাইক্রো এসে ধাক্কা দিল।
-(প্রচন্ড উৎকন্ঠা নিয়ে) কোথাও লেগেছে?
-না না তেমন কিছু না, হাঁটুতে একটু ছরে গেছে।
-সত্যি বলছেন তো?
-হ্যাঁ হ্যাঁ সত্যি। আচ্ছা শোন.. এখন রাখছি, পরে কথা হবে।
ভাবী এক্সিডেন্টের কথা শোনার পর সংসারের কাজকর্ম ফেলে আমার সেবায় লেগে পড়ল। কিছুক্ষণ পর মিতুর ফোন আসল। ভাবী বলল, ‘তোকে ধরতে হবে না।’ তারপর কলটা রিসিভ করে লাউড স্পিকারে দিয়ে বলল, ‘কথা বল্।’ আমি কিছু বলার আগে মিতু বলে উঠল,
-প্লিজ সত্যি করে বলুন.. কোথাও লাগেনি তো?
ভাবী জোরে বলে উঠল,
-লেগেছে.. বুকটা ভেঙ্গে খান্ খান্ হয়ে গেছে। এ্যাই মেয়ে, তোমার কাছে খবরটা কি করে গেল?
-জি.. স্লামালেকুম ভাবী।
-ও এখন ঘুমের ঘোরে শুধু তোমার কথা বলছে, গাড়ী পাঠাচ্ছি তুমি এসে দেখে যাও। আর শোন ফোনটা তোমার মাকে দাও..
ভাবী সুযোগ করে দিয়ে গেছে। রুমে আর কেউ নেই। কি মেয়েরে বাবা! হাতটা ধরতে অনেক কষ্ট হয়েছে। দু’জনে পাশাপাশি বসা। কেউ কোন কথা বলছিলাম না। ও তাকিয়ে ছিল ওর কোলের দিকে। আর আমি ওর মুখের দিকে। হাতে হাতে যেন কথা কইছে ফিসফিস করে। আমি নিরবতা ভাঙ্গলাম, ‘এ্যাই মেয়ে.. তোমাকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি।’ ও অবাক হয়ে তাকাল,
-কি ভাবে!
-জানি না, তবে মনে হয় জনম জনম ধরে চিনি।
-অমন করে বলবেন না.. আমার কান্না আসে।
-‘তুমি’ করে বল প্লিজ।
-হাত ছাড়ুন।
-না।
-কেউ আসবে।
-আসবে না।
-প্লিজ..
আমি পায়ের ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলাম। মিতু বলল, ‘কি হল।’ আমি গাঢ় গলায় বললাম, ‘আরেকটু কাছে আসোতো।’ সে চট করে হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। নিজেকে বড় সুখী মনে হল।
আজ অফিসে যাই নি। সকাল সাড়ে দশটার দিকে মিতু ফোন করল। আমি রহস্য করে বললাম,
-আর মাত্র বিশদিন।
-দিন গুনলে দিন ফুরাবে না মিস্টার.. কি করছিলেন?
-তৃণাকে নিয়ে খেলছিলাম।
-পিচ্চিটা?
-হ্যাঁ.. পিচ্চি পাচ্চা আমার খুবই পছন্দ।
-আল্লা তাই? আমারো।
-ক’টা লাগবে?
-জি?
-তোমার ক’টা পিচ্চি লাগবে?
লাইনটা মনে হয় কেটে দিল। হাসতে হাসতে ফোন করলাম। মিতু ফোন ধরে চুপ করে আছে।
-কেটে দিলে কেন?
-কাটিনি তো.. সম্ভবত…
-ও হ্যাঁ.. আরে ধুর, নেটওয়ার্কের কথা আর বোলো না।
-নেটওয়ার্ক না, ছাই।
-মানে?
-আপনার মুখে…
-মুখে? দাও না, দাও…
-আবার!
আমি সশব্দে হাসতে লাগলাম। ওপারে শ্যামলা মেয়েটি রাঙা হয়ে উঠল বুঝি? আচ্ছা শ্যামলা রঙের কেউ লজ্জা পেলে তাদের গালও কি লাল হয়ে ওঠে?
আজ আকাশের চাঁদ ভরাযৌবনে। কাল বাসরে দু’জনে ভিজব জোছনায়। মিতুকে যখন ফোন করব ভাবছি তখন হঠাৎ ভাবী উঠে এল ছাদে। মুখটা থমথমে। ভাইয়া বকাঝকা করেছে বোধ হয়। ঈশ্ কাল আমার বিয়ে আর আজকে ভাইয়াটা..। ভাবী আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পাঞ্জাবীটা পড়ে দেখেছিস?’ আমি হেসে বললাম, ‘হ্যাঁ।’ ভাবী আমার বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। আরে এ কাঁদছে কেন? কি ভাবছে সে? বিয়ের পর আমি পর হয়ে যাব কিনা? আমারো কান্না পেয়ে গেল। বেচারা আমাকে এত ভালবাসে, মাঝে মাঝে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি পরম মমতায় আমার নিসন্তান ভাবীর মাথায় হাত রাখলাম। গেল বছর বাবার মৃত্যু হলে বিয়ের প্রায় পনের বছর পর ভাইয়া তৃণা নামের মেয়েটিকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসেছিল। তবু ভাবী একবার বলেছিল, ‘আমার তো ছেলে একটি রয়েছেই, আর কেন?’ কিছুক্ষণ দু’জনে একসাথে কাঁদলাম। বললাম, ‘আহা এভাবে কাঁদছ কেন?’ ভাবী যেমন হঠাৎ এসেছিল তেমনি হঠাৎ করে চলে গেল। মিনিট পাঁচেক পরেই আবার আসল। এখন তাকে বেশ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। আমাকে বলল,
-মিতুর সাথে কথা হয়েছে আজ?
-দুপুরে হয়েছিল।
-ওকে আর কখনো ফোন করিস না।
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। না এবার ভান করে নয়। সত্যি সত্যি। জিজ্ঞেস করলাম,
-কেন?
-উনাদেরকে কিছুক্ষণ আগে জানিয়ে দেয়া হয়েছে..
-কি?
-বিয়েটা হচ্ছে না।
বুকটা কেমন শূন্য মনে হল। আমি ভাবীর হাত ধরে বললাম, ‘কেন?’ ভাবী বলল, ‘পরে বলব।’ আমি আর থাকতে পারলাম না, ধমকে উঠলাম, ‘না এখনই বলো।’ ভাবীকে বেশ বিব্রত দেখাচ্ছে। আমি হাত জোর করে বললাম, ‘প্লিজ মা।’ ভাবী অন্য দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে বলল, ‘তোর ভাইয়া খবর পেয়েছে.. (কিছুক্ষণ চুপ) ..মিতু ক্লাস সেভেনে একবার রেপ্ড হয়েছিল।’ ভাবী আর দাঁড়াল না।
অনন্তকাল পর আমি বর্তমানে ফিরে এলাম। নীচে নেমে ভাবীকে বেডরুম থেকে ডেকে ড্রইং রুমে ডেকে আনলাম। বললাম,
-কথাটা মিথ্যেওতো হতে পারে।
-না, কথাটা একশত ভাগ সত্যি।
-আচ্ছা সত্যি হলে সত্যি, কিন্তু এখানে তো ওর কোন হাত ছিল না।
-তুই ভাল করেই জানিস, এই সংসারে তোর ভাইয়া যা বলে তা ই হয়। আমাকে ক্ষমা করিস ভাই।
ভাবী মুখে আঁচল চাপা দিয়ে চলে গেল। দুর্বল মানুষ দুর্বল পায়ে ফিরে এলাম ছাদে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে দেখি তার গালে কান্নার দাগ। ঠিক করলাম কিছু একটা করা দরকার। শরীরে কোন শক্তি পাচ্ছি না। মোবাইটা নিলাম। হাতটা কেন যেন কাঁপছে। মিতুকে ফোন করলাম। ওপাশ থেকে অপ্রত্যাশিত কন্ঠ ভেসে এল, ‘আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহুর্তে বন্ধ আছে..।’ সরু একটি তার যেন ছিঁড়ে গেল বুকের ভেতর কোথাও। মিতু বুঝি অপমানে লীন হতে হতে আরো একবার রেপ্ড হল আজ রাতে।

১৮ thoughts on “ছেঁড়া তার

  1. পুরো গল্পটা একটানে পড়লাম…
    পুরো গল্পটা একটানে পড়লাম… :মাথানষ্ট: আসলে মুল সমস্যাটা আমাদের সমাজের গঠনে আর এই সমাজের মানুষের মন- মানসিকতায়… :ক্ষেপছি: :ক্ষেপছি: :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: আর সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হল লোকলজ্জার… :মানেকি: :মানেকি: মানুষ কি বলবে সেটা নিয়ে আমাদের বড়ই চিন্তা… :মানেকি: :এখানেআয়: :এখানেআয়: বরাবরের মতই সেরাম লেখা হয়েছে নাসির সাব… :bow: :গোলাপ: কিপ ইট আপ… :ধইন্যাপাতা: :ফুল: 😀

  2. বলিবার মত ভাষা নাই বন্ধু
    বলিবার মত ভাষা নাই বন্ধু :salute: :salute: :salute: হিংসা করিবার অবকাশও নাই| ভয়াবহ হইয়াছে…..

  3. খুব ভাল গল্প লিখতে পারেন
    খুব ভাল গল্প লিখতে পারেন আপনি। খুব ভাল হয়েছে। তবে শেষের অংশটা সত্যিই আমাদের সমাজের একটি ব্যাধী…..

  4. আরে ভাইরে! কি সুন্দর যে
    :দীর্ঘশ্বাস:

    আরে ভাইরে! কি সুন্দর যে লিখেছেন!

    হয়তো আজ তোমার সময় হয়নি
    তারপরও আমি জানি
    তুমি আছো।
    নাহলে
    সদ্য ফোঁটা গোলাপ নিয়ে
    অপেক্ষায় থাকতো না বিষণ্ণ দুপুর,
    ক্লান্ত বিকেল।
    আকাশের ওই জঘন্য চাঁদটাকে
    লাথি দিয়ে উড়িয়ে দিতো কেউ,
    খুন হতো কত তারা।
    হয়তো আজো তোমার সময় হয়নি
    তারপরও আমি জানি
    তুমি আছো।

  5. ভাই অসাধারন ব্যাখ্যা করেন।
    ভাই অসাধারন ব্যাখ্যা করেন। মনটাই খারাপ হয়ে গেছে। আমাদের সমাজের অবস্থা নিয়ে ভাবলে খারাপই লাগে। সত্যই খারাপ লাগে। :ভাঙামন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *