সংজ্ঞায়িত দূরত্ব

ফাঁকা রাস্তায় হাঁটছি। মেজাজ কিঞ্চিত খারাপ।ভর দুপুর, খিদেও লেগেছে প্রচণ্ড।ভুল হয়েছে,আম্মার সাথে ঝগড়া করে বাসা থেকে বেরোবার আগে খেয়ে নেওয়া উচিৎ ছিলো।পকেটে আছে মাত্র ১০ টাকা। বেকার মানুষ,চাকরি বাকরি নাই,যখন তখন বাসায় টাকাও চাওয়া যায়না।

পকেটে হাত দিয়ে দেখি,মোবাইলটাও রেখে এসেছি।ভালো হয়েছে,আজকে ফোন করে কারো আর পাওয়া লাগবে না আমাকে।এটা ভেবে একটু ভালো লাগছে।মাঝে মাঝেই ভাবি ডুব দিবো, কিন্তু হয়ে ওঠেনা।আজ একটা সুযোগ এসেছে।


ফাঁকা রাস্তায় হাঁটছি। মেজাজ কিঞ্চিত খারাপ।ভর দুপুর, খিদেও লেগেছে প্রচণ্ড।ভুল হয়েছে,আম্মার সাথে ঝগড়া করে বাসা থেকে বেরোবার আগে খেয়ে নেওয়া উচিৎ ছিলো।পকেটে আছে মাত্র ১০ টাকা। বেকার মানুষ,চাকরি বাকরি নাই,যখন তখন বাসায় টাকাও চাওয়া যায়না।

পকেটে হাত দিয়ে দেখি,মোবাইলটাও রেখে এসেছি।ভালো হয়েছে,আজকে ফোন করে কারো আর পাওয়া লাগবে না আমাকে।এটা ভেবে একটু ভালো লাগছে।মাঝে মাঝেই ভাবি ডুব দিবো, কিন্তু হয়ে ওঠেনা।আজ একটা সুযোগ এসেছে।

অবশ্য আমি জানি,কিছুক্ষন পরেই একজন আমাকে একটা গরু খোঁজা দিবে।দিলে দিক, আমার কি?তার যা খুশি করুক।দরকার হলে এফবিআই,আইএসআই,ডিবি সবকিছুতে একসাথে খবর দিক।আকাশ-পাতাল এক করে ফেলুক।বোন হিসেবে এটুকু তো করবেই,হে হে হে!

উফফ!কি রোদ রে বাবা!মাথার ঘেলু ফ্রাই হয়ে যাচ্ছে।ফাস্টফুডের দোকানে দেয়া যেতে পারে।পিজ্জা না কি যেন একটা খাবার;তার উপর তো ঘিলু টাইপ কিছু দেয়া থাকে!যাক গে ওসব।

সামনে একটা কোচিং,কিছুদিন ক্লাস নিয়েছিলাম।বলে কিনা একদিনে গোটা ভয়েস করাতে হবে!ওরে বেকুব,প্যাসিভ-একটিভ আলাদা করতেই তো দিন পার।মাথার চুল ছিঁড়বো কিনা বুঝলাম না।বন্ধুরা বললো তুই ওসব পারবি না,ছেড়ে দে।ব্যস ছেড়ে দিলাম।তবে বেকার অবস্থার চেয়ে ভালো ছিল।সামান্য হলেও টাকা পয়সা থাকতো।রাস্তা পাল্টে হাঁটতে হাঁটতে নতুন গজানো এক রেস্তোরার সামনে এসে পড়লাম।

কোচিং গজাচ্ছে ব্যাঙের ছাতার মত,আর রেস্তোরা গজাচ্ছে ব্যাঙের রেইন কোটের মত।এগুলো কোচিং ফাঁকি দেওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের তীর্থ।

নাহ,আমি কি সরকারি উপদেষ্টা নাকি?এসব নিয়ে আমার ভাবার কি আছে?রোদসীকে দেখছি কোন এক ছেলের সাথে বেরিয়ে যেতে।বাহ্,এসব মেয়ে পারেও বটে!এই সেদিন না শুভর সাথে ব্রেক আপ করলো!উহু এটা স্টিভ জবস্ আর বিল গেটসের যুগ।সবকিছুতেই গতি প্রয়োজন।অথচ আমার গতি প্রায় নাই হয়ে গেছে।মন চাইলো কোন এক রেস্তোরায় ঢুকি।নাহ,পকেটে হাত দিয়ে পাঁচ টাকার নোট দুটোকে আদর করতে করতে সে চিন্তা আপাতত ঝেড়ে ফেলি।হঠাৎই মনে পড়ছে একজনকে ফোন দেয়া দরকার।এতক্ষণে এফবিআই না হোক,গোটা বন্ধুমহলে তার কল্যাণে প্রচার হয়ে গেছে যে আমি নিখোঁজ।আর মুখে যতই হম্বিতম্বি করি না কেন,তার সামনে অফুরন্ত কৈফিয়ত দেবার চেয়ে ফোন করাই ভালো।পাশের দোকান থেকে মুখস্থ নম্বরটা ডায়াল করলাম।একটা রিং না হতেই রিসিভ,
-হ্যালো আপি!
-কোথায় তুই?
-ইয়ে মানে!
-তাড়াতাড়ি বাসায় আয়!
বলেই ফোন কেটে দিল আপু।মানুষটা তো কখনও এমন করে না।কি হলো?

পকেটে মাত্র আট টাকা,কিছু দূর হেঁটে তবেই রিকশা নিতে হবে।দুপুর গড়িয়ে এখন বিকেল।হেঁটে ফিরতে ভালো লাগছে না তবু পা চালাই জোরে।আপু এভাবে তো আগে কখনও কথা বলেনি।কয়েকবার ডাকাডাকির পর রিকশা পেয়েছি।রিকশাওয়ালারা তো ছেলেদের পাত্তাই দেয় না।শেষমেষ পাওয়া গেল।বাসায় এসে কয়েকবার ডাকাডাকি করলাম।আপু এসে গেট খুলে দিল।আপু কাঁদছে মনে হলো।ওহ,এ আর নতুন কি?কোন পাত্রপক্ষ হয়ত দেখতে এসেছে।ও গোঁয়ারের মত কেঁদেকেটে একাকার করবে।ওর একদাবি আমি চাকরি পেলেই ও বিয়ে করবে।কিন্তু চাকরি পাচ্ছি কই?বাসায় ঢুকে বেসিনে মুখ ধুচ্ছি।হঠাৎ আম্মুর কান্নার শব্দ কানে এলো।আম্মু কেন কাঁদবে?রুমে গিয়ে দেখি বাবা বিছানায় শুয়ে,পাশে মা আর আপু।দুপুরে আমি বের হবার পর স্ট্রোক করেছে।এমুলেন্স এখনও আসেনি,আমি কি করবো বুঝতে পারছি না।অসহ্য…

সন্ধ্যায় চুপচাপ বসে আছি হাসপাতালের করিডোরে,বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন মাত্র কিছুক্ষণ আগে!আমি বুঝতেই পারছি না কি করা উচিত।বাবার শিয়রে বসে মা আর আপু কেঁদে চলেছে একধারে,প্রলাপে ভারী বাতাস।ঝুম বৃষ্টি নেমেছে।

গোটা করিডোরে আলো আঁধারির খেলা।স্যুট পরা এক ভদ্রলোক এসে মার কাছে দাঁড়িয়েছে।মা আর আপু তার দিকে তাঁকায়নি।এর মধ্যে ছোট চাচা-চাচী এসেছেন।করিডোরের এক কোণায় মায়া মায়া চেহারার এক ছেলে তার মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সেই ভদ্রলোক তখনও দাঁড়িয়ে,চাচা কাছে গেছেন।আমাকে দেখিয়ে কীসব যেন বলছেন।কিছুসময় পর চাচা হাত ধরে উনাকে নিয়ে এসেছেন আমার কাছে।উনার চোখে পানি।

হঠাৎ বললেন,”শুভ্র,এটা তোর বড়ভাই নভ্র!”আমি আর আপু চমকে উঠে তাঁকাই,চোখ সরু করে চেষ্টা করছি ভালোমত দেখার।কেন এসেছেন উনি?ওহ,বাবার সম্পত্তির ভাগ নিতে?কিবা এমন রেখে গেছেন বাবা?বাড়িটা ছাড়া তো তেমন কিছুই নেই।ওটুকু যদি নিতে চায় তো নিক।

নভ্র;আমার বাবার প্রথমপক্ষের সন্তান।প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর পর আমাদের মাকে বিয়ে করেন বাবা।কিন্তু আমার মায়ের সংসারে তার জায়গা হয়নি।বলা যায় মা দেননি।আপু তখন খুব ছোট,আমি হইনি।তখন বাবা ওকে দূরে পাঠিয়ে দেয়।খোঁজ-খবর রাখতেন।কিন্তু ভাইয়া বুঝতে শেখার পর আর যোগাযোগ রাখেনি,খোঁজ নিত হ্য়ত।বাবা সচরাচর ওর কথা বলতেন না।প্রায় কখনই না।ভেতরে ভেতরে হয়ত পুড়তেন কষ্টের আগুনে।
বাবার দাফন-কাফন সব শেষ।নভ্র নামের মানুষটাই সব করেছে।আমি শুধু দেখছি।নিজের এতিম পরিচয়টা বুকে বাজছে।বাবার কবরে মাটি দেয়ার সময় মানুষটা পাশেই ছিল।এখন পাশেই আছে,মার মাথা কোলে নিয়ে বসে আছে মানুষটা।অনেকবার কথা বলতে চেয়েছে,আমি বলিনি।
তখন থেকে দেখছি,আপু আর ভাবী কেঁদেই চলেছে।এখন রাত চারটা।আত্মীয় স্বজনরা যারা এসেছিল তারা সবাই ঘুমিয়ে।আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে।

কতকিছু বদলে গেল এইটুকু সময়ে,ছোট ছেলেটার ডাকে ফিরে তাঁকাই।
-কাকু খাবে না?
হেসে বলি “হুম,তুমি খেয়েছো?”

ওকে কোলে নিয়ে বসে পড়ি এক কোণে।নভ্র নামের মানুষটা ভাতের প্লেট নিয়ে আসে।আমার মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে।অবাক হয়ে তাঁকিয়ে আছি আমি।বাবার মতই কোঁকড়া চুল,নাক,ঠোঁট।এতক্ষণ এতকিছু খেয়াল করিনি।হঠাৎই ভেতর থেকে কান্নার ভিসুভিয়াস উথলে ওঠে।ভাইয়া প্লেট পাশে রেখে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।আমি কাঁদতে থাকি।
-এই পাগল ছেলে,ভাইয়া আছি না??কাঁদিস কেন?
-নাহ্,তোমাকে আর দূরে যেতে দেব না ভাইয়া।তুমি অনেক কষ্ট পাও।ভাবী,বাবুকে নিয়ে আমাদের সাথে থাকবে।
-আমার কি এ দূরত্ব ভালো লাগে বল?গত চব্বিশ বছর তোদের ছেড়ে আছি।শুধু খোঁজ নিতাম কেমন আছিস।
-আর না ভাইয়া।

চাঁদের আলোয় এক হচ্ছে একটি পরিবার।কিছু হারিয়ে,কিছু পেয়ে।শেষ হচ্ছে দূরত্ব।

১০ thoughts on “সংজ্ঞায়িত দূরত্ব

  1. পড়ে ভালো লেগেছে| তবে কেন যেন
    পড়ে ভালো লেগেছে| তবে কেন যেন মনে হচ্ছে আরো একটু গুছিয়ে লেখা যেত|

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *