-ঈদ বকশিশ-

আবুল সাহেব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।ভাল পদের পাশাপাশি বেতনের ওজন মোটামুটি ভারি ই বলা যায়।অফিসার বলে কথা।কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারে ভালভাবে চলতে গেলে পুরো টাকাটাই খরচ হয়ে যেতে চায়।ভবিষ্যতে জমিয়ে রাখার জন্য বাঁচে সামান্য কিছু অর্থ।


আবুল সাহেব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।ভাল পদের পাশাপাশি বেতনের ওজন মোটামুটি ভারি ই বলা যায়।অফিসার বলে কথা।কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারে ভালভাবে চলতে গেলে পুরো টাকাটাই খরচ হয়ে যেতে চায়।ভবিষ্যতে জমিয়ে রাখার জন্য বাঁচে সামান্য কিছু অর্থ।

আবুল সাহেবের বস তাকে প্রচুর খাটান।বেতনের পুরো টাকাটাই সুধে আসলে উশুল করে নেন।শুয়ে বসে আরাম করে কি আর বেতনের দেখা পাওয়া যায়?মাসে মাসে বেতনের চাঁদমুখ দেখতে হলে প্রতিদিন কাজের ঠ্যালা সামলাতে হয়।বস আবুল সাহেবকে একটু বেশি ই পছন্দ করেন।কারণ তিনি নেই কোনো ফাঁকিবাজিতে।তিনি কর্মঠ এবং কাজের প্রতি খুব আগ্রহ দেখান।যত কাজের চাপ পড়ুক তিনি চুপ করে সম্পাদন করেন।আড়ালে আবডালেও টু শব্দটি করেন না।তাই বস তার কিছু ব্যাক্তিগত কাজেও আবুল সাহেবের প্রতি নির্ভর করতে পছন্দ করেন।তবে সেজন্য তাকে নিজের পকেট থেকে আলাদা বোনাস দেন তিনি।

মাস দুয়েক আগে কোম্পানির দ্বাবিংশ বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।বিরাট ভোজ হয়ে গেল।সেই ঝামেলা শেষ হতে না হতেই এবার শুরু হতে যাচ্ছে ইফতার পার্টি।সব দেখাশোনার দায়িত্ব পড়লো আবুল সাহেবের ওপর।ঈদের আর মাত্র দশদিন বাকি।যথারীতি বেতনের সাথে ঈদ বোনাসটাও তার একাউন্টে জমা হয়েছে।

এদিকে আবুল সাহেবের স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা কেনাকাটা করতে নিয়ে যাওয়ার বায়না ধরেছেন।তিনি অফিসের কাজে বেশ ব্যস্ত।পরিবারের জন্য সময় বের করা মুশকিল হয়ে পড়েছে।নৈশ ভোজে খাবার টেবিলে বসে ছেলেমেয়েরা তাকে কেনাকাটার কথা বলতেই তিনি তাদের কথা দিলেন শীঘ্রই কেনাকাটা করবেন তারা।
তার স্ত্রী রেগেমেগে পুড়ে কয়লা।
-কি হলো?গাল ফুলিয়ে আছ কেন?
-জানোনা তুমি?
-আমি জানি।তুমি আমাকে একটু বুঝতে চেষ্টা কর।
-আর কত বুঝবো বল?আমি না হয় বুঝলাম।বাচ্চাদের কি বোঝাব বল?আর মাত্র ক’টা দিন হাতে আছে।ওরা চায় নতুন জামা,নতুন জুতা,আরও কত কি।ওদের শখ বলেও একটা কথা আছে।কত কিছু কিনবে!ম্যাচিংয়েরও একটা ব্যাপার আছে।আমার ইচ্ছে না হয় হাওয়ায় উড়িয়ে দিলাম।
-আমি সব বুঝি।টাকা তোমাদের জন্যই রোজগার করছি।একটু অপেক্ষা কর তোমরা।
-আচ্ছা।যা দেখতে পাচ্ছি ওটাই করতে হবে আজীবন।এখন আমাকে কিছু টাকা দাও।বুয়া বকশিশ চাইছে।ওর বেতন আমার কাছে আছে।বকশিশের টাকা নাই।
-হুম।ঈদ এসেছে।এখন তো বকশিশের ছড়াছড়ি হবে।এইজনকে দাও ঐজনকে দাও।
-হুম।কি আর করা।তুমি তো দিতে বাধ্য!!
আবুল সাহেব এক হাজার টাকার একটা কচকচে নোট বের করে দিলেন।

সেহরীর পর ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হলেন।রিকশা অফিসের কাছে থামতেই শুরু হল রিকশাওয়ালার বকশিশ চাওয়া।তাকে বকশিশ দিয়ে তিনি অফিসে ঢুকলেন।অতিরিক্ত টেনশানে বসের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।উল্টা পাল্টা বকতে শুরু করেছেন সবাইকে।তিনিও সকাল সকাল বসের ঝাড়ি খেয়েছেন।তার মেজাজ কিছুটা গরম।এমন সময় তার অফিসের নিচু পদে চাকরিরত এক লোক তার ছেলের কলেজে ভর্তির জন্য টাকা চাইছে।ঈদের বকশিশ হিসেবে টাকাটা চায় সে।তিনি উদার মনের মানুষ।মানুষের জন্য যতটুকু পারেন করেন।তার বিশ্বাস এই পর্যন্ত তিনি এসব মানুষের দোয়ার ফলেই এসেছেন।তিনি লোকটাকে দুই হাজার টাকা দিয়ে দিলেন।
লোকটা খুশি হল।এক চিলতে হাসি মুখে ফিরে গেল।

অফিস শেষে বাড়ি ফিরেছেন আবুল সাহেব।ইফতার করে বিশ্রাম করছেন।তার স্ত্রী তাকে বলেন ছেলেমেয়েরা যেই হুজুরের কাছে আরবি শিখে সেই হুজুর বেতনসহ বকশিশ চেয়েছেন।পাশাপাশি এতিমখানার জন্য চেয়েছেন অনুদান।আবুল সাহেব স্ত্রীকে সব টাকা বুঝিয়ে দেন।

অফিসে ইফতার পার্টি।নানান ঝামেলায় কাটে দিন।রাত করে বাড়ি ফিরেছেন তিনি।ছেলেমেয়েরা বাবার অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে।
-তোমার ব্যস্ততার কি শেষ নেই?
-আছে।কাল তোমাদের নিয়ে কেনাকাটা করতে বেরুবো।অফিসে আর কাজের চাপ নেই।
-বাচ্চারা আজও খুব জ্বালিয়েছে আমাকে।ওদের সব বন্ধুরা জামা জুতো কিনে ফেলেছে।ওরা এখনও কিনেনি।আজ প্রায় কান্না করার মত অবস্থা ছিল।ছোট বাচ্চাগুলোর দিকে একটু তাকাও।
-আমি জানি ওদের মনের অবস্থা।এইতো কাল তোমরা ইচ্ছেমত কেনাকাটা করো।যা যা লাগবে আমি সব কিনে দেব।
-দেখি কাল কি করো।এখন আমাকে আরও কিছু টাকা দাও।ফিতরার টাকা আমি ভিক্ষুকদের মাঝে বন্টন করেছি।এবার বাচ্চাদের স্কুলের গাড়ির ড্রাইভার ওদের কাছে বকশিশ চেয়েছে।ওটাও তো দিতে হবে।
-হুম।দিতে থাকো।

সকাল হতে না হতেই বসের ফোন এসেছে।এক্ষুনই অফিসে যেতে হবে।আবুল সাহেবের স্ত্রী রাগে গজগজ করছেন কিন্তু বসের কথা রাখতে তিনি অফিসে যান।কেনাকাটা করতে যাওয়া আর হলনা।
এদিকে অফিসের খুব নিম্নপদে যারা চাকরি করে তারা সবাই তাদের আবুল স্যারের কাছে ঈদের বকশিশ চেয়েছে।তিনি একে একে পনের জনকে বকশিশ দিলেন।
বেতনের অনেকখানি টাকা খরচ হয়ে গেছে।গ্রামের বাড়িতে তার বাবা-মা,ভাই-বোনের জন্য টাকা পাঠিয়েছিলেন।তারা টাকাটা পেয়ে কেনাকাটাও শুরু করেছে।তিনি জেনে আনন্দিত হলেন।ঈদে কেনাকাটার জন্য তার শালা-শালিদেরকেও টাকা পাঠান তিনি।হঠাৎ ছেলেমেয়ের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় তার খুব মন খারাপ হয়।

বাসায় ফেরার পর থেকেই সবার অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করছেন তিনি।ঘরের পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে এবার আর নিস্তার নেই।ঈদের মাত্র তিনদিন বাকি।তার বস কিছুই বোঝেনা।আবুল সাহেবের ব্যক্তিগত কাজ এবং পরিবার আছে।তাদের জন্য তার অনেক কিছু করণীয় আছে।বস শুধু বোঝে কিভাবে তাকে কাজের মাঝে ডুবিয়ে রাখা যায়।এদিকে অফিসে ঈদের ছুটি।সবাই মিলে গ্রামের বাড়ি যাবে ঈদ উদযাপন করতে।কিন্তু এখন পর্যন্ত কেনাকাটা করা হলনা।
আবুল সাহেবের পাশের বাড়িতে তার দূর সম্পর্কের এক চাচা থাকেন।তার চাচা বাড়িতে এসে হাঁউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে তার দুঃখের কথা বর্ণনা করেন।কিছুদিন আগে মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন তিনি।অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে।আর্থিক অবস্থা ততটা উন্নত নয় তার।এখন পর্যন্ত মেয়ের শ্বশুরবাড়ি ইফতার পাঠাতে পারেন নি।মান-ইজ্জত মনে হয় বাঁচবেনা।সময় নেই বললেই চলে।মেয়েটার নানান কথা শুনতে হবে শ্বশুরবাড়িতে।এসব বলে তিনি আবুল সাহেবের কাছে আর্থিক সাহায্য চাইলেন।যদিও এসব মানুষের মনগড়া প্রথা তবুও তিনি ঐ চাচাকে দুই হাজার টাকা দেন।চাচা অনেক খুশি হন।

অবশেষে তারা বের হলেন কেনাকাটা করতে।এদিকে ঈদের অজুহাত দেখিয়ে কাপড় ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে।ঈদ এসে পড়েছে তাই সবকিছুর দাম চারগুণ বেড়েছে।লোকের ভীড়ে দোকানগুলো গিজগিজ করছে।তার ছেলেমেয়েরা বেশি দামের জামা পছন্দ করছে।এত টাকা ফেলে কি হবে!শেষের দিকে এসে পকেটের অবস্থাও বেশি ভালনা।এভাবে ওভাবে খরচ হয়ে গেছে অনেক টাকা।তিনি আরও নিচে নামতে চাইছেন।অনেক দোকানে ঘুরে দর কষাকষির পর মোটামুটি ভাল জামা কিনেন।
আবুল সাহেবের অবস্থা দেখে তার স্ত্রী ব্যাপারটা কিছুটা আন্দাজ করেছেন।তিনি ভারি দামের শাড়ি দেখছেন না।তার কেনাকাটার জন্য মনে মনে যেই বাজেট তৈরি করেছেন তারচে মোটামুটি অল্প দামের মধ্যে একটা শাড়ি কিনেছেন।
আবুল সাহেব একটু অবাক হলেন এবং মনে মনে খুশি হলেন।তাদের কেনাকাটা শেষে তিনি নিজের জন্য শুধু একটা লুঙ্গি ছাড়া আর কিছু কিনলেন না।শার্ট,প্যান্ট,পাজামা,পাঞ্জাবী অনেক আছে।লুঙ্গি তেমন পরা হয়না।তাই ভাল লুঙ্গি খুব একটা নেই।ছিড়ে গেছে।একটা লুঙ্গির প্রয়োজন ছিল।ওটাও হয়ে গেল।এই কি বেশি না?
তিনি আরও পাঁচটা লুঙ্গি এবং স্বল্প দামের দুইটা পাঞ্জাবী কিনেছেন।তার গ্রামের কয়েকজন গরিব মুরুব্বীদের উপহার দিবেন।তিনি জানেন তারা তার আশায় চেয়ে আছে।তার দেয়া লুঙ্গি-পাঞ্জাবী পরে তারা ঈদের নামাজ পড়বে,তাদের মুখে হাসি থাকবে এবং অবশ্যই তারা দুহাত তুলে আবুল সাহেবের জন্য দোয়া করবে।

কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরেছে তারা।আগামীকাল সকালের ট্রেনে তারা গ্রামে যাবে ঈদের খুশি উপভোগ করতে।যেই দিনটির জন্য এক বছর ধরে অপেক্ষা করেছে সবাই।
আবুল সাহেবে স্ত্রী শুধু একটা কথাই বলেছেন,’সবাইকে নিয়ে ভাবার আগে তোমার পরিবারের কথা আগে ভেবো।
এটা তোমার প্রথম কর্তব্য।ভুলে যেওনা।তোমার উপর যাকাত ফরজ হয়নি।ভেবে-চিন্তে দান করো।’
আবুল সাহেব মৃদু হেসে বিড়বিড় করে বলছেন,’প্রতিবার তোমাদের কথাই ভেবে এসেছি।এদের নিয়ে আজ না ভাবলে কবে ভাববো?এরা আমার দিকে চেয়ে থাকে।ঈদ বকশিশ ওদের প্রাপ্য।ওদের জন্য সামান্য কিছু করার সাধ্য অর্জন করেছি।তাই আমাকে ভাবতে হয়।’
তার স্ত্রী চলে গেছে।তিনি হয়ত কথাগুলো শুনতে পাননি।নয়ত নতুন তর্কে জড়িয়ে যেতেন।

আবুল সাহেবের চোখে মুখে সন্তুষ্টির আনাগোনা।মুখে সুখময় হাসি লেগে আছে।এখন শুধু তার অপেক্ষা সবাইকে সাথে নিয়ে খুশির ঈদে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার।

১৫ thoughts on “-ঈদ বকশিশ-

  1. বাস্তবতা নামক কঠিন সত্য নিয়ে
    বাস্তবতা নামক কঠিন সত্য নিয়ে বেঁচে আছে এক একটি মধ্যবিত্ত পরিবার। তারা অপরের জন্য কাজ করে প্রশান্তি পায়। এইটাই বড়!

    এই কি বেশী না?

  2. এক দুই হাজার টাকা করে বখশিশ
    এক দুই হাজার টাকা করে বখশিশ সবাইকে দিচ্ছে ওইতা শুনেই তো আমার মুখ হা হয়ে গেল বাকি কি প​ড়ব​!! আমার ১ টাকা হারায়ে গেলেও মাথা খারাপ হয়ে যায়।প​য়সা কি গাছে ধরে নাকি?!

  3. সত্য ঘটনা অবলম্বনে গল্পটি
    সত্য ঘটনা অবলম্বনে গল্পটি রচিত।নিজের দেখা।বাড়িয়ে বলার অবকাশ নেই।হয়ত আপনার মত হারকিপ্টের মুখ হা হয়।হওয়াটা স্বাভাবিক।(পি)
    কারণ এক টাকা আর হাজার টাকায় অনেক তফাৎ,নইলে চারটা শূণ্য লাগাতে হতনা হাজারের বেলায়। (পি)
    এবং যারা উদার মনের মানুষ,তারা প্রাণ খুলেই দান করে।এদের টাকা গাছে ধরেনা।আকাশ থেকে আসে অসহায় মানুষদের দোয়ার ফলে।

  4. গল্প টা সুন্দর হয়েছে।
    গল্প টা সুন্দর হয়েছে। মধ্যবিত্তের জীবণ এমনই পরিবারের জন্য করতে গিয়ে পরিবারের কর্তাদের ভাগ্যে কিছু থাকে না। আসলে পরিবারের সুখের মাঝেই তো তাদের সুখ।

    গল্পের একটা দুর্বলতা রয়ে গেছে। এত মানুষ কে বকশিস দিল্,তাও আবার ভাল অংকের পরিবারের জন্য শপিং করলো,গ্রামে টাকা দিল,আরো অনেক কে দিল। তাহলে তো তার বেতন কম না। ইনি মধ্যবিত্ত হয় কি করে??

  5. নিম্ন মধ্যবিত্ত আর উচ্চ
    নিম্ন মধ্যবিত্ত আর উচ্চ মধ্যবিত্তের মধ্যেও একটা ব্যবধান আছে।তাই তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে পড়ে কারণ তিনি বিত্তবান না।তার উপর যাকাত ফরয হয়নি এবং ট্যাক্সের ঝামেলাও পোহাতে হয়না।আমি ওটা বুঝাতে গল্পের শুরু এবং শেষে কিছু যুক্ত করেছি।

    আপনার সুন্দর মতামতের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

    1. ও তাও কথা। তবে যে হারে দান
      ও তাও কথা। তবে যে হারে দান করেছে তাতে মনে হচ্ছে অনেক বেতন

      আর আপনার কথায় যুক্তিটা খুজে পেলাম :খুশি:

  6. অনেক ভালো লেগেছে আমার মনে হয়
    অনেক ভালো লেগেছে আমার মনে হয় আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে এইটা একটা ছোট্ট ঈদ উপহার…………… ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *