উগ্র মৌলবাদী মতাদর্শের উত্‍খাত : বাংলাদেশে করনীয়

আমরা যারা ইতিহাস সচেতন তারা প্রায় সবাই জানি একটি সাম্প্রদায়িক মতবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিলো। মুসলিম লীগ সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর দ্বিজাতি তত্ত্বই ভবিষ্যত পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারন করে দিয়েছিলো। ধর্মের ভিত্তিতে পৃথক আবাসস্থলের নীতি দীর্ঘদিনের প্রতিবেশীদের মধ্যে ফারাক তৈরি করে দেয়। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলা ভাষাভাষী ভিন্ন সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠীকে ভৌগলিক অবস্থান উপেক্ষা করে পাকিস্তান রাষ্ট্রে অন্তভূক্ত করে দেওয়া হয়! ভাষা, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, খাদ্যাভাস, পোশাক ও দৈহিক গঠনের পার্থক্য বিদ্যমান থাকার পরও শুধুমাত্র ধর্মীয় সাদৃশ্যকে ভিত্তি করে এটা করা হয়। ধর্মকেই শাসন, শোষন এবং একত্রে রাখার একমাত্র উপায় ভেবে প্রথমেই আমাদের ভাষা নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করা হয়েছিলো। বাংলা হিন্দুদের ভাষা ফতোয়া দিয়ে পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মতাদর্শ ছড়িয়ে দেয়। যখন তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, উসকানি উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উম্মেষ ঘটায়। এই উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের ভিত্তিতেই বাঙালীদের ন্যায্য দাবীর বিপরীতে ৭১-এ অন্যায় যুদ্ধ ছাপিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। এই যুদ্ধের গতিপ্রকতি, সহিংসতা, মৃত্যু, ধ্বংস ইত্যাদি বিবেচনায় অন্য যে কোন যুদ্ধের চেয়ে এর ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা যায়। ৭১-এ যুদ্ধের বর্বরতায় যে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে তাতে শুধুমাত্র পাকিস্তান সেনাবাহিনী, জামাত-মুসলিম লীগ বা তাদের দোসররা অবদান রেখেছে বলে অনেকেই মনে করেন। আদতে বিষয়টি কিন্তু তা নয়। এক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রেখেছে উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ।

যে কোন উগ্র মতাদর্শ হচ্ছে ঐ মতবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তি উত্‍পাদনের কারখানা। ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে কিন্তু এই মতাদর্শের চেয়ার কখনো শূন্য থাকেনা। মিউজিক্যাল চেয়ারে মানুষ পরিবর্তন হলেও মতাদর্শগত কারনে নবাগতদের উদ্দেশ্য-আদর্শ চলমান থাকে পূর্বসূরীদের পদাঙ্ক অনুসরন করে। বিক্ষিপ্ত ভাবে আমরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক অপরাধীদের পেছনে সময় ব্যয় করলেও মতাদর্শের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা এদেশে গৃহিত হয়নি। যার ফলে স্বাধীনতা বিরোধী ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীর নানান আকারে ও প্রকারে উত্থান হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করা, রাজনৈতিক ভাবে পূনর্বাসন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশ ইত্যাদি নানাবিধ কারনে স্বাধীনতাবিরোধী মতাদর্শ সংকুচিত না হয়ে বিকশিত হয়েছে হাজার গুনে!

২য় বিশ্বযুদ্ধের পরে নাত্‍সী সরকারের যুদ্ধাপরাধীদের যেমন বিচার হয়েছিলো তেমনি নাত্‍সীবাদকেও নিষিদ্ধ করা হয় জার্মানীতে। একই ভাবে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদও আইনানুগ নিয়ন্ত্রনে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। জার্মানীর জনগন তাদের সংবিধানের Basic law grandgesetz এর মাধ্যমে নাত্‍সীজম এবং হিটলারের নাত্‍সীবাদী দল National Socialist German Workers (NSDAP) কে নিষিদ্ধ করে। শুধু সাংবিধানিক ভাবে নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি জার্মান জনগন বরং জার্মানীতে উগ্র নাত্‍সীবাদের ভবিষ্যত পুনুরুত্থানের সম্ভাবনা দূর করার জন্য দেশব্যাপি নাত্‍সীমুক্তকরন (Denazification) কর্মসূচি গ্রহন করা হয়। নাজি মতাদর্শে বিশ্বাসীদের প্রশাসন, বিচার বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও গনমাধ্যম ইত্যাদি থেকে অপসারন করা হয়। নাত্‍সী সমর্থক ৬টি রেডিও স্টেশন এবং ৩৭টি সংবাদপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়। নাত্‍সীদের প্রচারনার ৩০০০০ বই নিষিদ্ধ করা হয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে শিক্ষার্থীদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প পরিদর্শনে নেওয়া হতো। মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিলো। উগ্র মতাদর্শের বিরুদ্ধে নাগরিকদের সচেতনার কারনে নাত্‍সীবাদ বা ফ্যাসিবাদ পুনর্গঠিত হতে পারেনি।

১৯৭২ সালে প্রনীত সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। কিন্তু জার্মানী যেভাবে সফলভাবে Denazification করেছিলো আমরা আমাদের রাজনীতি ও সমাজে অসাম্প্রদায়িকীকরন (Decommunalization) করতে পারিনি। এদেশের মানুষ সুবিদাবাদী রাজনীতির কারনে ইতিহাস সংবেদনশীল না হয়ে ইতিহাস বিমুখ থেকেছে বেশির ভাগ সময়। যার ফলে বিভ্রান্ত প্রজন্ম বেড়ে উঠছে, ছড়িয়ে পড়ছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে কোষে কোষে। শুধুমাত্র গোলাম আজম, নিজামী, সাঈদী বা জামায়াতকে বিচার বা নিষিদ্ধ করে এই উগ্র ধর্মীয় রাজনৈতিক মতাদর্শের উত্‍পাদন বন্ধ করা যাবেনা।

যুদ্ধাপরাধ বা স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক মতাদর্শীয় সমস্যার টেকসই সমাধানে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের যে কোন রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য আমাদের সামনে জার্মানী, ইটালী, মিসর এবং তুরস্কের উদাহরন বিদ্যমান। জার্মানী-ইটালীতে মতাদর্শের বিরুদ্ধে জনগনের ঐক্য নাত্‍সীজম ও ফ্যাসিজমকে পরাজিত করেছে। অন্যদিকে মিসর-তুরস্কে মতাদর্শের বিরুদ্ধে নির্লিপ্ততা প্রতিবিপ্লবীদের ক্ষমতায়িত করেছে!

সিদ্ধান্ত আমাদের। আমরা নির্লিপ্ত থাকবো? না উগ্র মতাদর্শের বিকাশের বিরুদ্ধে নিজেরা প্রতিরোধ করবো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধে সহযোগী হবো?

২৫ thoughts on “উগ্র মৌলবাদী মতাদর্শের উত্‍খাত : বাংলাদেশে করনীয়

  1. সিদ্ধান্ত আমাদের। আমরা

    সিদ্ধান্ত আমাদের। আমরা নির্লিপ্ত থাকবো? না উগ্র মতাদর্শের বিকাশের বিরুদ্ধে নিজেরা প্রতিরোধ করবো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধে সহযোগী হবো?

    সঠিক সিদ্ধান্ত ঠিক ই নেয়া হবে কিন্তু সময় পেরুবার পর।

    ব্রহ্মপুত্র ভাই অনেক দিন পর পোস্ট দিলেন…চালিয়ে যান। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    1. সময় পেরুবার পর সিদ্ধান্ত নিয়ে
      সময় পেরুবার পর সিদ্ধান্ত নিয়ে কি হবে…?
      সময়ের এক ফোড়, অসময়ের দশ ফোড়…

      1. এই কথাটা আমরা সবাই মুখে বলি
        এই কথাটা আমরা সবাই মুখে বলি কিন্তু কেঊ কাজে লাগাই না, যদি এই কথাটা কাজে লাগাতাম তবে আজ বাঙালি জাতি উন্নতির সুউচ্চ শিখরে পৌছাতে পারতো

  2. সুন্দর ও যথার্ত বিশ্লেষন
    সুন্দর ও যথার্ত বিশ্লেষন করেছেন ।জামাতকে নিষিদ্ধ না করে নিশ্চিহ্ন করার দাবী জানাই ।

    1. নিশ্চিহ্ন কিভাবে
      নিশ্চিহ্ন কিভাবে করবেন…?
      কাটা কাটি করে…?
      ৭১ এর হিসাব ৭১ এ ফয়সালা হয়ে গেছে… ১৩ এর হিসাব দায় মিটানোর…

      1. এদের নিশ্চিহ্ন করার চিন্তা
        এদের নিশ্চিহ্ন করার চিন্তা আমাদের মত আমজনতা ছাড়া আর কেউ করেনা। রাজনীতিবিদরা এদের লালন-পালন করেই লাভবান হচ্ছে। তাই জামায়াতের মত এই ক্ষত যতদিন টিকিয়ে রাখা যাবে রাজনীতিবিদদের অর্থনৈতিক ধান্ধা ততদিন চলবে।

  3. মৌলবাদ এখন বাংলাদেশের
    মৌলবাদ এখন বাংলাদেশের পলিটিক্সের বড় নিয়ামক এবং ট্র্যাম্প কার্ড। যে যেভাবে পারছে ইউজ করছে। ফ্রাংকেনস্টাইনের মতো এরাই যে একসময় এদের ঘাড় মটকে দেবে সেই চিন্তা কারো নাই। পাবলিকও ধর্মের নেশায় বুদ হয়ে আছে। এখনই সময় এদের মূলে আঘাত হানার। এর জন্য প্রয়োজন আমাদের ঐক্য, যেটার বড় অভাব। ভালো লিখেছেন। আপনার কাছ থেকে নিয়মিত লেখা চাই। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  4. নিশ্চিহ্ন করার পদ্ধতি
    নিশ্চিহ্ন করার পদ্ধতি সম্পর্কে আনিস রায়হানের একটি লিখায় মন্তব্য অংশে আলোচিত হয়েছে ।চাইলে দেখতে পারেন ।লিখাটি বর্তমানে স্টিকি করায় মুল পাতার প্রথমেই আছে ।

  5. যে কোন উগ্র মতাদর্শ হচ্ছে ঐ

    যে কোন উগ্র মতাদর্শ হচ্ছে ঐ মতবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তি উত্‍পাদনের কারখানা। ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে কিন্তু এই মতাদর্শের চেয়ার কখনো শূন্য থাকেনা। মিউজিক্যাল চেয়ারে মানুষ পরিবর্তন হলেও মতাদর্শগত কারনে নবাগতদের উদ্দেশ্য-আদর্শ চলমান থাকে পূর্বসূরীদের পদাঙ্ক অনুসরন করে। বিক্ষিপ্ত ভাবে আমরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক অপরাধীদের পেছনে সময় ব্যয় করলেও মতাদর্শের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা এদেশে গৃহিত হয়নি। যার ফলে স্বাধীনতা বিরোধী ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীর নানান আকারে ও প্রকারে উত্থান হয়েছে।

    —– ব্রহ্মপুত্রের লেখার চুম্বক অংশ আমার কাছে মনে হয়েছে উপরের লেখাটুকু ।
    গণজাগরণ মঞ্চ শুরুতে ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি ও এর আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধের দাবী তুলেছিল । ইমরান এইচ সরকারের সাথে আমরা একসাথে শ্লোগান তুলেছিলাম ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের । কিন্তু পরবর্তীতে সেখান থেকে সরে এসে শুধুমাত্র জামাত নিষিদ্ধের দাবীতে সমঝোতা করা হল এই বলে যে আপাতত জামাত নিষিদ্ধ হোক তারপর ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া যাবে । এটি ছিল মঞ্চের বিরাট ভুল যাত্রা । আখেরে কী লাভ হল, না হল জামাত নিষিদ্ধ উপরন্তু আমরা খেলাম নাস্তিক ট্যাগ !
    — তাই বলি, ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে ৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোন বিকল্প নেই ।
    — ব্রহ্মপুত্রের এই পোস্টটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এটি আরও বেশি পঠিত এবং শেয়ার হওয়া উচিৎ ছিল ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *