এক টুকরো বিষ

গলার শুরুর অংশটা খুসখুস করছে। বুঝতে পারছি আবার কাশি শুরু হবে। ইচ্ছে করেই দিচ্ছিনা। ভাবে টান পড়তে পারে। এই বস্তুটার সাথে ভাবের সম্পর্ক। সেই কয়েকদিন আগে ভেজা স্যাঁতসেঁতে কড়ই গাছটার নিচে প্রথম টান দিয়েছিলাম। যতটুকু বাষ্প অবশিষ্ট থাকে তার একটুও অপচয় না করে পুরোটাই চালিয়ে দিয়েছিলাম আমার বুকের কার্বুরেটরে। অদ্ভুত এক কার্বুরেটর এই ফুসফুস টি। বিষবাষ্পে এটি জ্বলে পুড়ে যায় কিন্তু বাইরে থেকে সচল মনে হয়। বাষ্পের অত্যাচারে জ্বলুনি হল গলায়। মনে হল এই মাত্র গলায় কেউ অক্সিজেন এসিটিলিন শিখা জ্বালিয়ে দিল। গলার নিচ থেকে উপরে;উপরে থেকে নিচে। পাশে পাভেল বসে আছে। কাশতে দেখলে হাসাহাসি করতে পারে। কিন্তু সামলাতে না পেরে কাশতে লাগলাম। কাশির দমকে জীবনের প্রথম সুখটানের অনূভুতি বুঝতে পারলাম না। যদি বুঝতে পারতাম তাহলে তা দিয়ে একটা মহাকাব্য লিখতে পারতাম। দারুন লজ্জা নিয়ে ইফরাদের দিকে তাকালাম। হাসলো না। এমনটা হতেই পারে। ইফরাদ নিজেই বিরহের ব্যথা বুঝে। সেবার কাশতে কাশতে গলা দিয়ে রক্ত পড়েছিল। তাও বিষের টুকরাটিকে ছাড়িনি। স্বার্থকতা বোধয় তাতে ছিল খানিকটা। আমাদের ছাদের রেলিংয়ে মসের কার্পেটে বসে যখন আমি তার দিকে ধূসর ধোঁয়া টা ছাড়তাম,ভাবতাম কত বড় হয়ে গেছি। বাতাসে অদ্ভুত এক আলোড়ন হত। হ্যালুসিনেশনের মত। বাতাসের ঝাপটায় তার চুল গুলো মুখের উপর এসে পড়তো। সে সরিয়ে দিতে গেলেই তার হাতটা ধরতাম দুঃসহ তীব্রতায়। যেন তার হাতে সায়ানাইডের শিশি। এখনি ঘটে যেতে পারে অঘটন। সে খুব রাজকীয় ভাবে হাসতো। তার মসৃণ গালে গোলাপী টোল পড়তো। আর আকাশের চাঁদটা হঠাৎ করে পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি হয়ে আমার সামনে আবির্ভূত হত। যখন এই বাঞ্চিত কল্পনা অবাস্তবের পাঠ চুকিয়ে অসম্ভবের খাতায় যায়গা নিল তখন অন্য
কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করতাম। একগাল বিষ বাষ্প টেনে নিয়ে তার অধর আলিঙ্গন করা। কোনটা বেশি বিষাক্ত? তার ঠোঁটের তীব্রতা নাকি নিকোটিন?

দুটো বছর এই দুজনকে নিয়েই থাকবো ভেবেছি। আমার প্রিয়া এবং আমার নিকোটিন। বিষাক্ত দুইজন। দুটো বছর ষোড়শীর হৃদি সরসিজ প্রেম উদ্দামে আমি ধন্যি হয়েছিলাম। চিত-চুম্বন-চোর-কম্পনের আমি অবিভূত হয়েছিলাম কুমারীর প্রথম পরশে। তারপর কুমারীটি আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। তাকে বলেছিলাম “ফিরে আসবো।” কিন্তু সে বিশ্বাস রাখতে পারেনি আমার কথায়। ৩/৪ কিলোমিটার তার কাছে অনেক বড় দূরত্ব মনে হয়েছিলো। আমি অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম। ওয়ার্ম হোল কী ভালোবাসার চাইতে শক্তিশালী? কখনো হতে পারে? জানিনা। আমি তখন দেখতে পাচ্ছিলাম বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী ইলেকট্রনিক ট্রেনের বেগে আমি হাজির হয়েছিলাম তার সামনে। দাঁড়িয়ে আছি তার মুখোমুখি। পৃথিবীর আর প্রতিটা বস্তু যেন
কৃষ্ণগহব্বরে লীন হয়ে গেছে। আছে শুধু চোখ ধাঁধানো অন্ধকারের আলোকরেখা। আর একরাশ বিষাক্ততা; বায়বীয় ধূসর ধোঁয়াশা বিষাক্ততা। বাস্তবতা তার মাঝে অপ্রয়োজনীয় ও উহ্য।

আমার এক প্রিয়া আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। তবে আরেকজন রয়ে গিয়েছিলো। আমার দুই প্রিয়াই তাদের কুমারীত্ব বিসর্জন দিয়েছিলো। একজন আমারই কোনো অন্তরঙ্গের বাহুডোরে আরেকজন আমার ঠোঁটের মাঝে। সেদিন সার ঘরটা ধূসর ধোঁয়াতে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলাম। ধোঁয়ার রাজ্যে হাবুডুবু খেয়ে সেইদিন বুঝেছিলাম কষ্টের নিভু নিভু রংধনুর একরাশ বিষন্নতা। কীভাবে এইসব হয় তা জানিনা। তবে এইসব যে হয় সেটাই আমার ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট।

ঠিক কী কারনে জানিনা। ক্লাশ নাইন থেকেই ভালো ছাত্র হওয়ার উগ্র বাসনা আমায় গইলে খেয়েছিলো। ভালো ছাত্র হওয়ার স্বার্থে অনেক
কিছুই ছেড়ে দিয়েছিলাম। সেই সাথে পরী দেখার বাসনা। প্রথম দেখাতেই যে আমার জীবনে বনলতার মত আঁকড়ে ছিলো তাকে মমতাহীন রাবার দিয়ে মুছে দিয়েছিলাম মন থেকে। কী করে করেছিলাম ভাবলে আমি অবাক হই।

তবে তাকে ছেড়ে থাকতে পারিনি বেশি দিন। সে আবারো আমার জীবনে ফিরে এসেছিলো। কারণ ততদিনে ভালোছাত্র হওয়ার বাসনাকে আমি সুনিপুণ ভাবে গলাটিপে হত্যা করেছি। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী। কলেজে উঠে গেলাম গোল্ডেন নামক সোনার হরিণের বদৌলতে। সে চলে গেছে আরেকজনের হাতে। ফেইসবুকে ফিরিয়ে আনার শত চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে দিয়েছে একরাশ মলিন সম্ভাবনা। তাকে পাইনি আমি। তাই তার বদলে অন্য একপ্রিয়াকে এনে স্থান দিয়েছিলাম আমার দুই নষ্ট ঠোঁটের মাঝে। ভেবেছিলাম সে অনেক রাগ করবে। কিন্তু যান্ত্রিক হৃদয়ের চন্দ্রপরী একটুও আপত্তি করেনি। ভেবেছিলাম সে রাগ করলে হাঁটু
গেড়ে ক্ষমা চাইবো তার কাছে। কিছুই হয়নি অথবা সে হতে দেয়নি। তার সামনে দাঁড়াতেই সে বুঝে গিয়েছিলো তাকে ফিরে পাবার জন্য আমার ব্যাকুলতা। কিন্তু সে সাড়া দিলোনা। তার মায়াবী হাতের বদলে এখন নিকোটিনের বাষ্পীয় হাত আমায় জড়িয়ে ধরে পরম মমতায়।

ঠিক কতদিন পর আমার বেনসনে টান দেয়ার কথা ছিলো? উত্তরটা অজানা। সেই যেন কত যুগান্তর আগে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের
সামনে বিকালের তরল রোদে ভিজে জবজবে করতে করতে সেখানে তাকে দেখে প্রতিটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতাম। একটা কড়া লিকারের চায়ের সঙ্গে দীর্ঘ একটা টান। মুখটা খোলা রেখে অক্সিজেন আর নিকোটিনকে একসাথে শুষে নেয়ার অনুভূতি। C10H14N2 এর সাথে কী অক্সিজেন বিক্রিয়া করে? জানা নেই।
অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনটা আরেকটু ভালো করে পড়লেই হত। আমি তখন প্রিয়ার নিঃসৃত বিষাক্ত ধোঁয়াতে আচ্ছন্ন ছিলাম। সে ছিল আমার কাছে মুগ্ধ যন্ত্রনার মত। অনেকটা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মত। যন্ত্রনা দ্বারা যন্ত্রনা উপড়ে ফেলা।

তারপরও তাকে দূরে ঠেলে দিতে হয়েছে। সেদিন বিকাল থেকেই গলাটা খুসখুস করছিলো। রাত থেকে শুরু হল শুকনো কাশি চলল টানা এক সপ্তাহ। নিকোটিনের বিষটুকু টেনে নিলেই যেমন শুরু হয় অসহ্য জ্বলুনি।
বাধ্য হয়েই তার কাছে যাওয়া কমিয়ে দিলাম। সেকেন্ড ইয়ারে উঠেই এতদিনের জমানো অবাঞ্চিত আবেগের বুকে চাপাতি চালালাম। বুকের বাম পাশের অস্থিখাঁচায় দূর্বল চার প্রকোষ্ঠের যন্ত্রটি ‘ধুপ ধুপ’ শব্দে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় কর্মরত ছিলো।
প্রতিটি অঙ্গানু আমার অসাবধানতায় বিরক্ত হয়ে আমার ফুসফুসের অ্যালভিওলাইতে জমা করেছিলো হতাশার অতল সমুদ্র। বিকল্প হিসেবে বেছে নিলাম তার আরেক প্রতিস্থাপক ব্ল্যাক। ব্ল্যাকের ধোঁয়া গুলো হতাশার সমুদ্রে মুক্তো খুঁজে হতাশার গভীরতায় আরো নতুন
মাত্রা যোগ করে যাচ্ছিলো কেবল। এর বেশি কিছুনা। আমার ভিতরের সব ভেঙ্গে পড়তে শুরু করলো। আর ভাঙ্গনের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়লো আমার বন্ধু মহলে। সবাই শুনেছে। শুধু সে শুনেই। কারন শুধু কান থাকলে শোনা যায় না। প্রতি মুহূর্তে আমি মিস কঅরতাম তার অনুভূতি গুলোকে। তার মাঝে বিশেষ কী ছিলো তা আমার অজানা। ‘৩-(১-মিথাইল
পাইরিলিডিন-২-আইল)পাইরিডিন’ টা তো তার শুভ্র চাহনীতেও আছে। সেই একই বিষ আমি তার চাহনীতে হতে পান না করে ব্ল্যাকের নিকোটিন হতেই টেনে নিই! পার্থক্যটা কোথায়? খুঁজে দেখা হয়নি কোনো দিন,হবেও
না; হওয়ার দরকারও নেই।

ভেবেছিলাম কখনোই নিকোটিনকে আলিঙ্গন করবো না। কিন্তু আমি জানি আমার আর অন্য রাস্তা নেই। মানুষ ব্যর্থতায় পর্যবসিত। একের পর এক ব্যর্থতা যখন আমার যমালয়ের শয্যা স্থাপনে ব্যস্ত নিকোটিন না হয় সেটা একটু তাড়াতাড়ি করে দিক। ক্ষতির খাতা পূর্ণ থাক,কিন্তু সাময়িক লাভের আনন্দে আত্মভোলা হওয়ার নূন্যতম ইচ্ছা আমার আর নেই। সে কখনো বুঝে নি নিজের বিষাক্ততা। তাকে ভুলে থাকাই এখন আমার সেরা কর্তব্য। কিন্তু পারিনা। মানুষ যা ভাবে তা করতে পারেনা। পারা উচিৎ নয়। আমিও পারবো না। তার প্রতিটা কথা,প্রতিটা স্মৃতি,প্রতিটা শাসন,প্রতিটা আবদার,প্রতিটা অনুভূতি হারিয়ে যাক ব্ল্যাকের ধূসর ধোঁয়াতে। সে আমায় চায়নি কিন্তু নির্বাক বাষ্পীয় নিকোটিন আমায় প্রবল ভাবে কামনা করে। করতে চায় করুক। পাওয়ার মাঝে আনন্দ আছে। হোক সেটা প্রেয়সীর হৃদয় কিংবা এক টুকরো বিষ।………………

৬ thoughts on “এক টুকরো বিষ

  1. বাহ, চমৎকার বর্ননা। একটানে
    বাহ, চমৎকার বর্ননা। একটানে পড়ে ফেললাম। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  2. আচ্ছা আপনার কি আত্মহত্যা
    আচ্ছা আপনার কি আত্মহত্যা প্রবনতা আছে? সব পোস্টই দেখি সুইসাইড খাওয়া টাইপ। :অসুস্থ: :অসুস্থ: :অসুস্থ: :কল্কি: :কল্কি: :কল্কি: :কল্কি: :কল্কি: :কল্কি: :কল্কি: :কল্কি: :কল্কি: :কল্কি: :কল্কি: :কল্কি: :কল্কি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *