এক সন্ধায়


১৯৯৯ সাল।দুপুর বেলা জ্বর নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছি।এমন সময় আমার ভাবি এসে খবর দিলো মনিষা এসেছে।আমি বল্লাম আমার রুমে পাঠিয়ে দিন।মনিষা আমার রুমে ঢুকেই বল্ল,কিরে তোর নাকি জ্বর?দেখি দেখি,কপালে হাত দিয়ে; ওরে বাবা তোর দেখি ঘোড়ার জ্বর এসেছে,নামেই জ্বর কামের না।ওষুধ খেয়েছিস? আমি বল্লাম, হুম।
-কবে থেকে?
-কালকে রাত্রে,আগেই অবশ্য বুঝতে পারছিলাম এমন কিছু হবে।শরীর দুদিন ধরেই জানান দিচ্ছিলো।তুই কি খবর পেয়েই এলি?


১৯৯৯ সাল।দুপুর বেলা জ্বর নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছি।এমন সময় আমার ভাবি এসে খবর দিলো মনিষা এসেছে।আমি বল্লাম আমার রুমে পাঠিয়ে দিন।মনিষা আমার রুমে ঢুকেই বল্ল,কিরে তোর নাকি জ্বর?দেখি দেখি,কপালে হাত দিয়ে; ওরে বাবা তোর দেখি ঘোড়ার জ্বর এসেছে,নামেই জ্বর কামের না।ওষুধ খেয়েছিস? আমি বল্লাম, হুম।
-কবে থেকে?
-কালকে রাত্রে,আগেই অবশ্য বুঝতে পারছিলাম এমন কিছু হবে।শরীর দুদিন ধরেই জানান দিচ্ছিলো।তুই কি খবর পেয়েই এলি?
-না,আমি এসেছি আজ তোকে নিয়ে একটা বাংলা ছবি দেখবো বলে।এসেই ভাবির কাছ থেকে শুনলাম তোর জ্বর।
-যা ভাগ বাংলা ছবি আমি দেখিনা।তাছাড়া আমার জ্বর।
-ও তাইনাকি? তবে থাক,হুমায়ুন আহমেদের শ্রাবন মেঘের দিন তাহলে আমাকে একা একাই দেখতে হবে।ভালোতো,একটা টিকেটের টাকা আমার বেঁচে যাবে।তুই কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাক।

হুমায়ুন আহমেদের শ্রাবন মেঘের দিন।আসলেইতো,এই ছবিটা দেখবো বলে সেই কবে থেকেইতো দিন গুনছিলাম।আর এমন সুযোগতো হাত ছাড়া করা যায়না,মনিষা আমাকে ছবিটা দেখাতে চাচ্ছে।আমি তরি ঘরি করে বিছানা থেকে উঠে বল্লাম,তুই দুই মিনিট বস,আমি রেডি হয়ে আসছি।

আমাদের রিকশা যখন মধুমিতা হলের সামনে এসে থমলো তখন ঘড়িতে তিনটা বেজে গেছে।কাউন্টার থেকে টিকেট নেয়া যাবেনা এটা জানা কথা।তাই ব্লাকারের কাছ থেকে ৫০০ টাকায় দুটি টিকেট নিতে হলো।দ্রুত দুজনে চলে এলাম দোতলায়।লাইট ম্যান আমাদের সিট দেখিয়ে দিলো।ততক্ষণ ছবি শুরু হয়ে গেছে।সমস্ত হল তখন কানায় কানায় পুর্ণ।
শ্রাবন মেঘের দিন।
“মতি” (জাহিদ হাসান) একজন গাতক (গায়ক) তাকে মনে মনে ভালবাসে ঐ গ্রামেরই একটি মেয়ে “কুসুম” (শাওন) তার গানের গলাও খুব ভাল, সে সব সময় ভাবে মতি মিয়াকে নিয়ে একটা গানের দল করে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবে। কিন্তু ঢাকা থেকে আসা ঐ গ্রামের জমিদার (গোলাম মোস্তফা) নাতনি “শাহানা”কে (মুক্তি) ভালবাসে মতি তবে জানেনা শাহানা তাকে একজন ভাল মানুষ হিসেবে মুল্যায়ন করে মাত্র। এদিকে কুসুমের বাবা উজান থেকে একটি ছেলে “সুরুজ”কে (মাহফুজ আহমেদ) নিয়ে আসে কুসুমের সাথে বিয়ে দেয়ার জন্য। ঐ গ্রামের বাসিন্দা “পরান” (ডাঃ এজাজ) এর স্ত্রী প্রসব বেদনায় ছটফট করছিল। জমিদারের নাতনি শাহানা একজন ডাক্তার এই ভেবে মতি মিয়া তাকে ডেকে আনে। শাহানা এসে বুঝতে পারে উনার পেটের বাচ্চা উল্টে আছে। সে বইতে পড়েছে এর চিকিৎসার ব্যাপারে কিন্তু বাস্তবে কখনো করেনি, তবুও কোন উপায় না দেখে সাহস করে সেই সন্তান সাভাবিক ভাবে ডেলিভারি করাতে সক্ষম হয়। এবং যেই জমিদারকে এলাকার সবাই ঘৃনার চোখে দেখত তারা সবাই এখন তাকে সম্মান করে। একদিকে কুসুমের বিয়ের আয়োজন চলছে এন্যদিকে জমিদারের নাতনিরা ঢাকায় ফিরে যাচ্ছে জমিদার সহ, জমিদার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারীদের বিভিন্ন ভাবে সহায়তা করেছিল তাই গ্রামের সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে তার জমিদার বাড়ি হাসপাতালের জন্য দান করে বিদায় নেয়, আর তাই গ্রামের প্রাই সবাই চলে আসে তাদের বিদায় জানাতে। কুসুম বাড়িতে একা মতিকে না পাওয়ার কষ্টে সে বিষ পান করে, কুসুমের মা টের পেয়ে সবাইকে ডাকে এবং তাকে নিয়ে মতি আর সুরুজ নৌকায় ছোটে ডাক্তার শাহানার কাছে, কিন্তু মাঝপথেই সোয়া চান পাখি চিরনিদ্রায় শায়ীত হয়।

–আর মতি গাতক গেয়ে উঠে শুয়া চান পাখি আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি…।

ছবিটা দেখছিলাম জ্বর নিয়ে,একটা ঘোরের মধ্যে।খানিকটা লজ্জার মধ্যেও ছিলাম,মনিষা নাকি আবার আমার চোখে পানি দেখে ফেলে।গোপনে চোখের পানি মুছতে যেয়ে দেখলাম মনিষা আমার একটি হাত খুব শক্ত করে ধরে আছে।মনিষা কাঁদছে।সেদিন হলের প্রতিটা দর্শকই কেঁদেছিলো।
হল থেকে বের হয়ে আসলাম,তখন সন্ধা হয়ে গেছে।মনিষা তখনো আমার একটি হাত ধরে আছে।আমি বল্লাম,
-তোকে বাসায় দিয়ে আসি।
-না আমি একাই যেতে পারবো।তোরতো জ্বর অনেক বেড়েছে।তুই একা বাসায় যেতে পারবি?
-হুম,আমার সমস্যা নেই।
-মনিষা আস্তে করে আমাকে বল্লো,তোকে অনেকদিন ধরেই একটা কথা বলবো ভাছিলাম।
-কি কথা।
-অনেক্ষন চুপ করে থেকে,না থাক।পরে বলবো,আরেকদিন।
এই বলেই মনিষা একটা রিকশা ঠিক করে তাতে উঠে বসলো।রিকশা চলা শুরু করেছে।
আমি সেখানেই দাড়িয়ে রইলাম।রাস্তার সোডিয়াম লাইটের আলোয় দেখলাম,রিকশা থেকে মনিষা আমার দিকে তাকিয়ে আছে,ওর চোখে পানি । আস্তে আস্তে রিকশাটা মিলিয়ে গেলো দুরে।
তার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেলো,মনিষার আর কোনো খবর নেই।খোঁজ নিয়ে জানলাম,ওরা যে বাসায় ভাড়া থাকতো সেটা ছেরে দিয়েছে। নতুন ঠিকানা কেউ জানেনা।একজন বল্লো, বিয়ের পর পরি ওদের ফেমিলি বাসাটা ছেড়ে দেয়।বিয়ের কথাটা শুনেই বুকে একটা ধাক্কার মত লাগলো। এত কাছের বন্ধু,অথচ বিয়ের কথাটা আমাকে জানালো না?

মনিষা কি যেনো সেদিন বলতে চেয়েছিলো। ওর নাবলা সেদিনের সেই কথাটি খুব শুনতে ইচ্ছে করে।প্রায় এক যুগ পর,আজো,কোনো এক সন্ধায়।

১২ thoughts on “এক সন্ধায়

  1. সুন্দর লিখেছেন। আর আপনি যে
    সুন্দর লিখেছেন। আর আপনি যে অনেক আগের কথা বলছেন তা তুলে ধরতে ভুল করেন নি।

    আমাদের রিকশা যখন মধুমিতা হলের সামনে এসে থমলো তখন ঘড়িতে তিনটা বেজে গেছে।কাউন্টার থেকে টিকেট নেয়া যাবেনা এটা জানা কথা।তাই ব্লাকারের কাছ থেকে ৫০০ টাকায় দুটি টিকেট নিতে হলো।দ্রুত দুজনে চলে এলাম দোতলায়।লাইট ম্যান আমাদের সিট দেখিয়ে দিলো।ততক্ষণ ছবি শুরু হয়ে গেছে।সমস্ত হল তখন কানায় কানায় পুর্ণ।

    আগে একসময় ছিল যখন নাকি সবাই সিনেমা হলে ছবি দেখতে যেত কিন্তু এখন !!!!!

    একদিক দিয়ে দুর্বল মনে হয়েছে আমার কাছে সেটা হল আপনি যে সময়কার কথা বলছেন সে সময়ে একটি ছেলের সাথে একটি মেয়ে ছবি দেখতে যাবে সেটা স্বাভাবিক ভাবে নেয়ার কথা না…

    যাই হোক ভাল লেগেছে। আর গানটা মনে পড়ে গেল

    শুয়া চান পাখি আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি…

  2. ১৯৯৯ সালের কথা।আমরা বন্ধুরা
    ১৯৯৯ সালের কথা।আমরা বন্ধুরা (ছেলে – মেয়ে) একসাথে অনেক মজা করেছি।ঘুরে বেড়িয়েছি।আপনি হয়তো অবাক হবেন আমরা চার বন্ধু আমি,আনোয়ার,শ্যামলী, আর মনিষা একি রিকশায় ঘুরে বেড়িয়েছি।আমার মেয়ে বন্ধুরা আমাদের বাসায় এলে আমার বাবাকে ঘিরে আড্ডায় মেতে উঠতো।কিছু কিছু সামাজিক প্রতিবন্ধকতা হয়তো ছিলো,কিন্তু এখনো কি তা থেকে সমাজ মুক্ত হতে পেরেছে?আজ আপনি যে স্বাধিনতা ভোগ করতে পারছেন,একযুগ পর হয়তো অন্য কেউ যে আজ বঞ্চিত হয়েছে সে প্রশ্ন তুলবে আপনার আজকের স্বাধিনতা নিয়ে। একটা আক্ষেপতো থেকেই যায় যখন আমার বড় ভাইয়েরা ৯৬তে বন্ধু বান্ধব মিলে ইন্ডিয়া টুরে গিয়েছিলেন।যা আমরা পারিনাই। ধন্যবাদ জয় দা কে।

  3. বাহ সিনেমার সাথে নিজের জীবনের
    বাহ সিনেমার সাথে নিজের জীবনের টুইস্ট !!!
    কিছু কথা থেকেই যায় কখনো বলা হয় না ।
    কিছু কথা থেকে যায় কখনো শুনা হয়না …

  4. দারুন লাগল লেখাটা। যে কথা মুখ
    দারুন লাগল লেখাটা। যে কথা মুখ ফুটে বলেনি, সেটার জন্য অপেক্ষা না করাই ভালো। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  5. আমরা কি বলতে চাই, কি বুঝাতে
    আমরা কি বলতে চাই, কি বুঝাতে চাই, মনিষারা খুব সহজেই বুঝে যায়। কিন্তু মনিষারা কি বুঝাতে চায়, তা আমরা বুঝতে পারি না। তাই মনিষাদেরকে টেনে নেওয়া রিক্সা আমাদের চোখের সামনে হাওয়ায় মিলে যায়।
    মানুষের ব্যক্তিগতকথন গুলো আমার কাছে খুব ভালো লাগে। সেই বিবেচনায় আমার কাছে লিখাটি চমৎকার লেগেছে।
    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

Leave a Reply to রাহাত মুস্তাফিজ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *