বাঙ্গালির আকাশে আগস্ট কলঙ্কের মাঝে চাঁদ


সমাজে মানুষ অপয়া হয়। অলুক্ষুনে হয়। ছোটবেলায় শুনতাম সপ্তাহের দু’একটা দিনও অপয়া হয়। তার মধ্যে শনিবার, মঙ্গলবার, বুধবার উল্লেখযোগ্য।




সমাজে মানুষ অপয়া হয়। অলুক্ষুনে হয়। ছোটবেলায় শুনতাম সপ্তাহের দু’একটা দিনও অপয়া হয়। তার মধ্যে শনিবার, মঙ্গলবার, বুধবার উল্লেখযোগ্য। শনিবারে সাবধাণে থাকতে হয়, নইলে শনি লাগতে পারে। সন্ধ্যার পরে মঙ্গলাবার দিন বাইরে থাকা ভাল না। মঙ্গলবার নাকি ভুত-প্রেতের বার। এদিন তারা মানুষ, কুকুরসহ নানা প্রাণীর বেশ নিয়ে চলাফেরা করে। সফর, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বুধবার মন্দ দিন।
এইদিনে কোন শুভকাজ শুরু করতে নেই, শুভযাত্রাও করতে নেই। এমনকি এই দিনগুলোতে মানুষকে ছোটবেলায় বিয়ে করা থেকেও দূরে থাকতে দেখেছি। ইত্যাদি ইত্যাদি আরও কত কল্প-কাহিনী। বড় হবারা সাথে সাথে সেইসব কাহিনী আজ কৌতুকের বিরাট খোরাক যোগায়।
তবে বড় হবার সাথে সাথে অনুধাবণ করেছি, বৃটিশ শাসনের দিয়ে যাওয়া ইংরেজী ১২ মাসের একটি মাস সত্যি অপয়া। অন্তত বাঙ্গালি জাতির জন্য। নইলে এই দিন এলেই কেন সকল পত্রিকা-টেলিভিশনে শিরোনাম হয়-এলো শোকের মাস আগস্ট?
হিসেব করে দেখলাম, কথা মিথ্যে নয়। বাঙ্গালি জীবনে আগস্ট অনেক হারানোর বেদনা নিয়ে আসে। অনেক শোক আর যন্ত্রণার স্মৃতির পসারা সাজিয়ে আসে আগস্ট। শুরু করা যেতে পারে ৭ ই আগষ্ট দিয়ে। এই দিন বাংলা ও বাঙ্গালির বিস্ময় পুরুষ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়ান দিবস।
যে কবি তার সাহিত্যের আলোতে আলোকিত করে গেছেন হাজার বছরের বাঙ্গালির মন ও মননশীলতা, সেই কবির চলে যাওয়া দিন এই আগস্টের ৭ তারিখ। বলা বাহুল্য, এপার-ওপার দুই বাংলাতেই চলে রবি ঠাকুরের স্মরণে শোকের মাতম, শ্রদ্ধাঞ্জলির মহড়া।
তারপরই বলা যায় ১১ ই আগস্টের কথা। এই দিনে একদল ধর্মান্ধ, ভীরু, কাপুরুষের জগন্য হামলায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের আরেক শক্তিমান লেখক হুমায়ুন আজাদ। তিনি থাকলে জাতির কতটা উপকার হতো জানিনা, তবে তার না থাকা জুড়ে যে কত শূন্যতার জন্ম হয়েছে তা সচেতন আর মুক্তমনা বাঙ্গালি মাত্রই উপলব্দি করছে।
১১ তারিখের ক্ষত শেষ না হতেই সামনে এসে দাঁড়াবে আরেক শোকের দিন ১৩ ই আগষ্ট। এই দিনে নতুন সিনেমার জন্য লোকেশন দেখতে গিয়ে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নন্দিত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ। তার সাথে সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক মিশুক মনির। দুই দিগন্তের এই দুই দিকপালের মৃত্যবার্ষিকী মানেই বাংলাদেশির জন্য যন্তণাময় স্মৃতির দিন।
আর ১৫ ই আগস্টের পরিচয় বাঙ্গালিকে নতুন করে দেয়ার কিছু নেই। এই দিনে ক্ষমতালোভী কিছু পাষন্ড, বর্বর, অসভ্য, জানোয়ার সেনা অফিসারের হাতে স্বপরিবারে নিহত হয়েছিলেন বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
প্রতিবছরের এই দিনটি বাংলাদেশের জন্য জাতীয় শোকের দিন। বাংলার ইতিহাসে এমন ভয়াবহ কলঙ্কিত ইতিহাসের দিন আর কখনো আসেনি, বোধ করি আসবেও না। ১৫ আগস্টের ভোররাতে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালিকে হারানোর ক্ষতি আজীবন এই জাতিকে বহন করতে হবে।
নাগরিক কবি বলা হয় কবি সামসুর রহমানকে। ১৭ আগস্ট তার মৃত্যু বার্ষিকী। নিঃসন্দেহে বরাবরের মত এবারেও এই দিনটি খুঁচিয়ে যাবে প্রিয় মানুষ্টিকে হারানোর বেদনাকে।
তবে এই দিনটি আরো একটি কারণে চিরকাল বাঙ্গালির কাছে অপয়া হয়ে থাকবে। কারণ, তৎকালীন ১৮ দলীয় জোট সরকার আমলে ২০০৫ সালের ১৭ ই আগস্ট সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলা চালিয়েছিল ভন্ড কিছু ধর্মান্ধ জঙ্গি সন্ত্রাস। এই হামলায় ঝরে গেছে অনেক প্রাণ। তবে তার চাইতেও বড় ক্ষতিটা হয়েছে আন্ততর্জাতিক অঙ্গনে। বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছিল জঙ্গিবাদের রাষ্ট্র হিসেবে। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশের জন্য এর চাইতে অলুক্ষুনে, অপয়া আর কোন দিন হতে পারে?
১৭ পেরিয়েই আসে ২১ শে আগস্ট। তৎকালীন ১৮ দলীয় জোট সরকার আমলে সরকারের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা জঙ্গি সঙ্গগঠনের সন্ত্রাসীরা ২০০৪ সালের এই দিনে শেখ হাসিনা কে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল। হামলায় তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা সহ প্রায় ৩০০ লোক আহত হয়। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড।
এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন এবং পরে হাসপাতালে আরও ১২ জন নিহত হন। হাসপাতালে নিহত হওয়া সেই ১২ জনের একজন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নারী নেত্রী মিসেস আইভী রহমান। যিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী। একজন নির্লোভ, সাহসী, সৎ নেত্রী হিসেবে আইভি রহমানের মৃত্যু দিবস ২৪ শে আগস্ট আরেকটি শোকের দিন।
অবশ্য তারও আগে এই দিন বাঙ্গালির কাছে অপয়া হয়ে আছে ইয়াসমীন হত্যার দিন হিসেবে। ১৯৯৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরে একদল পুলিশ সদস্যের হাতে তরুণী ইয়াসমিন নিমর্মভাবে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দিনাজপুরের আমজনতা। প্রতিবাদী মানুষকে লক্ষ্য করে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে সাতজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ।
সবশেষে একেবারে মাসটির শেষের দিকে লেগে আছে আরেক শোকের দাগ। তা হল ২৮ শে আগস্ট জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু বার্ষিকী। এই দিনের শোক নিয়ে কিছু বলব না। কেবল হৃদয়ের বেদনা ভাগ করে নিতে চাইব একটা অভিমত দিয়ে। বাঙ্গলি হয়ত আর কোনদিনই নজরুলের মত মহা মানবের দেখা পাবে না।
এই হল আগস্ট। জানা নেই, চলতি বছরের আগস্ট নতুন কোন শোকের আয়োজন নিয়ে আসছে। অপেক্ষায় রুইলাম-আবার কোন বেদনায় কাঁদব বলে
তবে শেষবেলায় একটা কথা না বললেই নয়। আগস্ট বোধ হয় তার অপয়া স্বভাবে নিজেই বিরক্ত, ক্ষুব্দ। তাই চেষ্টা করছে বাঙ্গালির কাছে লক্ষি সাজবার। বাংলাদেশ বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, মানবতাবিরোধী বিশ্ব ইতিহাসের কুখ্যাত নরপশু গো আজমদের দল জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক নিবন্ধন বাতিলের আদেশ দিয়ে রায় প্রকাশ হল আজ, ১ আগস্ট-২০১৩ তারিখে।
ত্রিশ লাখ শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে, তাদের আত্মত্যাগের দায় শোধের প্রতিদান হিসেবে বাঙ্গালি এই দিনটাকে সহজে ভুলে যেতে চাইবে না। তাই এখন থেকে হয়ত প্রতি বছর শোকের মাস আগস্ট আসবে আনন্দের লাল গালিচায়।
চাঁদেরও তো কলঙ্ক হয়। ১ আগস্টের মহাত্ম নিয়ে শোকের মাস আগস্ট না হয় কলঙ্কের মাঝেই চাঁদ হয়ে রইল…

৭ thoughts on “বাঙ্গালির আকাশে আগস্ট কলঙ্কের মাঝে চাঁদ

  1. আপনি যদি প্রত্যেক টি ঘটনার
    আপনি যদি প্রত্যেক টি ঘটনার লিঙ্ক দিতেন পোস্ট টা আরো ভাল হত।

    এখন ও ভাল অনেক কিছু আছে আপনার পোস্টে জানবার মত।

    1. আসলে প্রতিটি ঘটনাই আমদের
      আসলে প্রতিটি ঘটনাই আমদের জানা। তাই লিঙ্ক দেয়ার সাহস করিনি। কেবল পুরোনো বিষয়গুলো নতুন করে মনে করিয়ে দিলাম…
      ধন্যবাদ…

  2. শোকাবহ আগস্টে জামাত নিষিদ্ধের
    শোকাবহ আগস্টে জামাত নিষিদ্ধের রায় চিরকালের শোক কে আরেকবার শক্তিতে রুপান্তরিত করুক এই কামনাই করি ।
    জয় বাংলা ।
    জয়বঙ্গবন্ধু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *