বাবা, তোমাকে নিয়ে লিখতে বসলাম!

অনেকবারই চেষ্টা করেছি, দু’চার লাইন যে লিখিনি তাও নয়! কিন্তু সবথেকে বেশী ভালোবাসার মানুষদের জন্য লিখতে বসার অবসর এর অভাব যতটা তার থেকে অনেক বেশী অভাব হয় সাহসের! হ্যাঁ, আমার হাত কাঁপতে শুরু করে, আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে চোখ। ছলছল করে ওঠে, অকারণেই অশ্রু জমে চোখের কোনে। আর কোন কারণেই এভাবে অকারণ কাঁদতে পারি না আমি, কাঁদি না। কিন্তু তোমার কথা ভাবতে গেলে, তোমার বিষয়ে লিখতে গেলে, কিছু বলতে গেলে, আর পারিনা! সব এলোমেলো হয়ে যায়। তবু তোমাকে কিছু কথা আমার বলতেই হতো। সে কথাগুলো, যা কোনদিন তোমাকে বলতে পারিনি। রক্ত-মাংসের তোমাকে যা আর কোনদিন বলাও সম্ভব নয়।


অনেকবারই চেষ্টা করেছি, দু’চার লাইন যে লিখিনি তাও নয়! কিন্তু সবথেকে বেশী ভালোবাসার মানুষদের জন্য লিখতে বসার অবসর এর অভাব যতটা তার থেকে অনেক বেশী অভাব হয় সাহসের! হ্যাঁ, আমার হাত কাঁপতে শুরু করে, আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে চোখ। ছলছল করে ওঠে, অকারণেই অশ্রু জমে চোখের কোনে। আর কোন কারণেই এভাবে অকারণ কাঁদতে পারি না আমি, কাঁদি না। কিন্তু তোমার কথা ভাবতে গেলে, তোমার বিষয়ে লিখতে গেলে, কিছু বলতে গেলে, আর পারিনা! সব এলোমেলো হয়ে যায়। তবু তোমাকে কিছু কথা আমার বলতেই হতো। সে কথাগুলো, যা কোনদিন তোমাকে বলতে পারিনি। রক্ত-মাংসের তোমাকে যা আর কোনদিন বলাও সম্ভব নয়।

আমার মনে পড়েনা, কোনদিন বলেছি, তোমাকে অনেক ভালোবাসি বাবা! সেদিন বাসতাম যেদিন আদরে ধন্য করেছো অথচ খেয়ালই করিনি, আর সেদিনও যেদিন অনেক বকা দিয়ে মন খারাপ করিয়ে দিয়েছিলে, প্রচণ্ড শাসনে অভিমানী করেছিলে… আজও, যখন তোমার অস্তিত্ব পৃথিবীর কোথাও বাস করা কোন হৃদপিন্ডেই শুধু বিদ্যমান। যেদিন অনুধাবন করেছি, আর কোনদিন বলা হবে না এই শব্দগুলো তোমাকে, সেদিন থেকে আফসোসের প্রচন্ডতায় পুড়েছি ভেতরে ভেতরে। যেদিন স্বপ্নময় জীবন থেকে দুঃস্বপ্নে জেগে উঠেছি, আচমকা অনেক কথা জমা হতে থাকে সেদিন থেকেই। অথচ তোমার সামনে একটি শব্দ বলতেও বাঁধত! মেপে মেপে কথা বলতে গিয়ে কখন যে স্নেহ-ভালোবাসার নিক্তিটাতেই মাপের গড়মিল করে ফেলেছি আমার জানাও ছিল না। কিন্তু আমার আবার তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হতো, হয়। ইচ্ছে হয় তোমার হাতটা ধরি! আমার এখনও মনে আছে, হাত ধরে কি করে রাস্তা পার করাতে। বলে দিতে কি করে রাস্তা পার হতে হয়! আজ প্রতিটা পথ পার হবার সময় কৃতজ্ঞচিত্তে তোমাকে স্মরণ করিনা সত্য, কিন্তু অলীক হলেও তুমি থাকো আমার সাথেই!

তোমার কন্ট্যাক্ট নম্বরটা এখন একটিভ নেই আর। কিন্তু জানো বাবা, আমার ফোনে নাম্বারটা আগের মতো সেইভ করা আছে, Abbu নামে! ফোনের পরে ফোন বদলেছে, কিন্তু কি করে যেন ওই ‘অপ্রয়োজনীয়’ নাম্বারটা হারিয়ে যায় নি! ওই নাম্বারটা ছিল জাদুর নম্বর! শুধু ডায়াল করলেই জীবনের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যেত! আজ যখন আমার প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে, তোমার কথা মনে হচ্ছে, সে নাম্বারটায় ডায়াল করতে চাইলে সে কী আমার অপরাধ হবে বাবা? আমার যে তোমার রাশভারী কণ্ঠ শুনতে ইচ্ছে করছে! ফোন করে তোমার বলা কোন দরকারী কাজে যাবার বিষয়ে আবার আপত্তি করতে ইচ্ছে করছে! অজুহাত খুঁজে তোমাকে বলতে ইচ্ছে করছে কেন মাঝরাতেও আমার ঘরের লাইট জ্বালানো! তোমাকে উত্তর দিতে ইচ্ছে করছে, কেন এখনও ঘুমাইনি। একসময় অসীম শূন্যতায় স্তব্ধ মূঢ় হয়ে পড়তাম এসব ভেবে! জীবনের একটি অংশ হঠাতই কি করে শিফট ডিলেট হয়ে যায়! অনাকাংখিত!

তবে, এখন আমি অনেক ভালো আছি বাবা! তোমাকে প্রায় ভুলতেই বসেছি। এখন আমাকে আর নামায পড়তে বলে কেউ ‘জ্বালাতন’ করে না। সময়ের খাওয়া সময়ে না খেলে কেউ বকাবকি করে না! কেউ রাত করে বাসায় ফেরার অপরাধে দন্ডাদেশ করেনা নির্ধারণ! আমি স্বাধীন – মুক্ত হয়ে গেছি। কিন্তু মাঝে মাঝে এসবকেই বড্ড বন্দিত্ব লাগে কেন ঠিক জানিনা। দূরত্বের কারণে তোমার কবরটা ছুঁয়ে দু’মিনিট নিঃশব্দে বাঁচার প্রেরনা খোঁজাও আমার হয়ে ওঠে না। আমাকে অকৃতজ্ঞ, স্বার্থপর তুমি বলতেই পারো বাবা, আমার প্রতিবাদ করার মতোও শক্তি নেই। আমি আমার অযোগ্যতার অতলে প্রতিনিয়ত ডুবেছি, তোমাকে ধরে রাখতে না পারার অযোগ্যতায়, আর কিছু বেশী সময় তোমার পাশে না থাকতে পারার, আরও বেশী কিছু শব্দ তোমার মুখ থেকে শুনতে না পারার অযোগ্যতা … যা আমাকে কোনদিন ক্ষমা করবে না হয়ত। আমি তাই তোমার কাছেও ক্ষমা চাইবার অধিকার রাখিনা।

ভাবতে ভালো লাগে দূর আকাশের তারা হয়ে হয়ত দেখছো আমাকে। কিংবা ছায়ামানব হয়ে আমাকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছো প্রতিক্ষণে! কিন্তু আমি সে সবেরও অযোগ্য হয়ত! তাই দূর থেকে শুধু ভাবি তোমাকে। চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া মুহূর্ত! তুমি ছিলে বাবা, কতোটা কাছে ছিলে, সে সব সাক্ষ্য দেয়া সে মুহূর্তগুলোকে আমি সরাতে পারিনা মন থেকে। জেমস এর গান আমি পছন্দ করি না তেমন, সত্যি বলতে ওর গাওয়া ‘বাবা’ গানটাও আমার পছন্দের নয়। কিন্তু বারবার চেয়েও কেন যে ফাইলটা কোথাও থেকে ডিলেট করতে পারিনা জানিনা! আর মন থেকে…? মন থেকে কি করে মুছি এই শব্দগুলো বাবা?

“বাবা কতদিন কতদিন দেখিনা তোমায়,
কেউ বলেনা তোমার মত কোথায় খোকা ওরে বুকে আয়
বাবা কতো রাত কতো রাত দেখিনা তোমায়,
কেউ বলেনা মানিক কোথায় আমার ওরে বুকে আয়॥”

এ কথাগুলো যে আমারই! একান্ত আমার! প্রতিটি স্পন্দনে অন্তর্নিহিত অথচ অদৃশ্য! গোপনে রেখে দেই ওদের, অতীব যত্নে। নিজেও জানতে পারিনা কোথায়। শুধু বের হয়ে আসে কান্নাধ্বনি হয়ে গানটার সূরের সাথে।

হাত বাড়ালে তোমাকে আর ছোঁয়া যাবে না, ঈদের সকালে পা ছুঁয়ে সালাম করা যাবে না, একসাথে নামাযে যাওয়া যাবে না, জোড় করে নিজের কাছে ডেকে নেবে না আর, দেবে না বকা আমার অনিয়ম –অপরাধে, আদর করবে না, খুশী হবে না আমার সাফল্যে। কিন্তু এসবই তো আমার চাওয়া ছিল বাবা। আমায় বঞ্চিত করার এ নিয়মের নিষ্ঠুরতা কেন! এ নিষ্ঠুরতার দায়ও তোমার নয়… হয়ত আমার! সৃষ্টিকর্তা আমায় এভাবেই হয়ত দেখতে চেয়েছেন।

আর একটা কথা ছিল বাবা, তোমার কাছে যেতে বড্ড ইচ্ছে হয়! সব নিয়ম ভেঙে! যদি পারতাম!!

১৩ thoughts on “বাবা, তোমাকে নিয়ে লিখতে বসলাম!

  1. আপনার লেখার প্রতিটা ওয়ার্ড এত
    আপনার লেখার প্রতিটা ওয়ার্ড এত আবেগ দিয়ে ভরা,এত ভালবাসার আলিঙ্গনে মাখা,যাদের বাবা নেই তারাতো অবশ্যই,যাদের আছে তাদেরও চোখে জল এসে গেল।আমারও বাবা নেই।হয়তো নেই দেখেই এমন ভাবে অনুভব করতে পারছি।আপনার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা রইলো আর অপেক্ষায় থাকলাম আপনার বাবা কে নিয়ে আরো চমত্কার কিছু লেখার।

    1. বাবা কে নিয়ে লেখা কঠিন। যে
      বাবা কে নিয়ে লেখা কঠিন। যে জীবনে থাকে সে মানবীকে লেখা সহজতর, যে নেই তাকে কল্পনা করে লেখা আরও সহজ! কিন্তু যে হৃদয়ের অন্তঃস্থলে থাকে, তাকে নিয়ে লেখা, বলা কঠিন। অনেক সাহস করে, বুক চেপে ধরে, চোখে বাঁধ দিয়ে এটি লিখতে পেরেছি। আপনার বাবা নেই জেনে খারাপ লাগলো। কারণ এই অনুভূতির কষ্ট আমি জানি। সব পেয়েও অপূর্ণ লাগাটা বড্ড বেদনাদায়ক। এ এমন এক ছায়া যা সরে না গেলে রোদের তীব্রতা আর ছায়ার মমতা কোনটাই ধরা যায় না।

      অনেক অনেক ভালো থাকবেন সব সময়, শুভকামনা আপনার প্রতি।

  2. হৃদয় ছুঁয়ে গেল। আমার আব্বু এই
    হৃদয় ছুঁয়ে গেল। আমার আব্বু এই মূহুর্তে হাসপাতালে ভর্তি আছে। দোয়া করিয়েন।

    1. আল্লাহ্‌ তাকে সুস্থ করে দিক,
      আল্লাহ্‌ তাকে সুস্থ করে দিক, সব সময় তার পাশে থাকুন প্লীজ। আমরা সন্তানেরা যেমন বলতে পারিনা, বাবা মায়েরাও বলতে পারেন না কতোটা দেখতে ইচ্ছে করে তাদের। এ এক আজব সম্পর্ক! সংযোগ … আজকাল বুঝতে পারি।

  3. জগতের সকল বাবারাই ভাল থাকুন
    জগতের সকল বাবারাই ভাল থাকুন ।

    মারাত্মক আবেগঘন একটি অসাধারন পোস্ট ।ভাল লাগল ।

    1. জগতের সকল বাবারাই ভাল থাকুন

      জগতের সকল বাবারাই ভাল থাকুন ।

      আশা করি। আর সন্তানেরা থাকুক হাঁসি মুখ নিয়ে, তাদের পাশে, আমৃত্যু।

  4. রাব্বির হাম হুমা কাম রাব্বা
    রাব্বির হাম হুমা কাম রাব্বা ঈয়ানি সগিরা।

    অনেক আবেগ দিয়ে লিখাটি লিখেছেন। ভালোভাবেই আবেগতাড়িত হয়েছি।

  5. সৌভাগ্য আমার বাবা-মা উভয়ই
    সৌভাগ্য আমার বাবা-মা উভয়ই এখনও জীবিত আছেন। কিন্তু বয়সের কারণে ‍উবয়ই অসুস্থ্য। এই কদিন আগেও দেখলাম তাঁদের শরীর স্বাস্থ্য কত সুন্দর ছিল। জানিনা সময়ের মারপেঁচে কখন যে তাঁরা বৃদ্ধ-বৃদ্ধা হয়ে গেলেন। সকলে আমার পিতা-মাতার জন্য দোয়া করেন। তাঁরা যেন আরও কিছুদিন সুস্থ্য থাকেন আর আমি প্রাণ ভরে তাঁদের জন্য কিছু করতে পারি। আপনার লেখা প্রাণ ছুঁয়ে গেল। অনেক আবেগ ভরা ভাষায় লিখেছেন, খুব ভাল লাগলো আপনার লেখা… ধন্যবাদ আপনাকে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *