প্রহর শেষের আলো

পাহাড়ের বড্ড মন খারাপ। তার একান্ত আপন কেউ নেই। এই বাতাসের সাথে কুশল বিনিময় হয়, মাঝে মাঝে ঘুরে বেড়ানো মেঘ এসে থমকে দাঁড়িয়ে একটু জিরিয়ে নেয়, পাখির গুঞ্জন ভেসে আসে ভুল ভবিশ্যত। এই এতোটুকুই! দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আর ভাবে- ইস তার বুকের উঠান জুড়ে মুখে কথার খই ফুটিয়ে খলবল করে দাপিয়ে বেড়ানোর যদি কেউ থাকতো। পাহাড়ের বিস্নতায় মেঘের মন খারাপ হয়। মেঘ মুখ ভার করে থাকে। এক সময় মন খারাপ রূপ নেয় রাগে। মেঘ রাগে তর্জন গর্জন করতে করতে বর্ষে যায়। বৃষ্টির জলের ধারা ধুয়ে নিয়ে যায় পাহাড়ের মন খারাপ। বৃষ্টি বিধৌত পাহাড়ের মনে ভালবাসার বাস্প ঘনীভূত হয়ে উঠে মেঘের প্রতি, মেঘের ঠোটে চুমু আঁকতে উন্মাতাল হয়ে ওঠে পাহাড়। মেঘ ভেজা পাহাড়ের প্রেমে পড়ে। কুন্তল যৌবনা মেঘের ভাব জমে পাহাড়ের সাথে। মেঘ পাহাড়ের সংসারের গৃহ প্রবেশের নিমন্ত্রণ পেয়েছে পাহাড়ে নির্বাসিত রাজকন্যা ময়নামতি ছদ্মবেশী বীথিকা। বীথিকার মুখ জুড়ে বিস্বাদের কালো ছায়া। মেঘ পাহাড়ের নিমন্ত্রণে কে হবে তার সঙ্গী? সে কি রাখাল বালক’কে তার সাথি করে নিবে?

পাহাড়ের নীল চূড়ায় সাদা মেঘের ভেলায় ভাসার নিমন্ত্রণে তুমি কি আমার সাথী হবে? মেঘদল আদরে গাল ছুয়ে গেলে তুমি কি ঈশ্বরের মত হিংসুক কামুক হয়ে কামনা করবে- শুধু আমার হাতের স্পর্শের রক্তিম হবে বদন তোমার! মেঘের জল বাষ্পে বাষ্পে আমার কবরী ভরে দিবে শত শত মুক্তদানায়, তখন কি আমাকে তোমার ইন্দ্রানি মনে হবে? কনেদেখা আলোয় রাঙা মুখের পানে চেয়ে মনের মায়ার জল তোলপাড় করলে হাত বাড়িয়ে তোমার বুকে টেনে নিবে? শীতল বাতাসে মৃদু কাঁপনে উষ্ণতা দেবে কি? চুষে নিবে কি আমার কাঁপা কাঁপা ভেজা ঠোঁটের নুনতা নির্যাস? নীল শাড়িতে নীলাম্বরী হয়ে আকাশ নীলার নীলে মিলিয়ে গেলে, ঘাসের বুকে মাথা রেখে রাতের তারায় কি কখনো খুঁজবে আমায়। বুকের মাঝে হু হু করে আউলা বাতাস ছাড়লে চোখের কোণের একফোঁটা জল ঝড়ে পড়বে শিশির হয়ে ঘাসের বুকে?

নির্বাসিত রাজকন্যা বীথিকার ডাকে সাড়া দেয় রাখাল বালক। বাঁশির ঝোলা নিয়ে আল পথ মাড়িয়ে, জংগলা, টিলা পেড়িয়ে গোধূলির শেষ লগ্নে পাহাড়ের পাদদেশে শালবনে পথের বাঁকে প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে বসে। সন্ধ্যার কোলে ঢলে পরে দিনের আলো। অন্ধকার হামাগুড়ি দিয়ে আসে রাতের বুকে তবু বীথিকা আসে না। ভোরের নরম আলো চোখ মুখে পড়তে অপেক্ষার ক্লান্তিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া চোখ মেলে তাকায় রাখাল বালক। শ্রান্ত দেহে ক্লান্ত মনে হাজার দুশ্চিন্তা উঁকি দেয় মাথায়। তবে কি বীথিকার কোন বিপদ হলো! কায়মনে প্রার্থনা করে- বীথিকা ভাল থাকুক। শান্ত সকালের নির্মল আলো বিষণ্ণতার ধুসর চাদরে ঢেকে যায়। বীথিকার শুন্য পরিত্যক্ত বাড়ির চারপাশে আধো বদনে ঘুরতে থাকে সে। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুরের আলো শেষে, গোধূলির লাজে রাঙা রঙে রাঙায়ে আলো ছায়া খেলায় মত্ত হয়ে দিন যায়, রাত আসে ঘুরে ঘুরে মাস যায়, বীথিকার দেখা মেলে না। মাস ফুরায় বছর ফুরায় অপেক্ষা ফুরায় না শুধু বুকের পাঁজর জুড়ে শূন্যতা বাড়ায় । অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে কখন যেনো নিজের অজান্তে আজীবনে প্রতীক্ষায় ডালি সাজায়ে বসে। কখনো পথের ধারে, কখনো মাঠের শেষ প্রান্তে আবার মাঝে মাঝে বীথিকার শুন্য বাড়ির চারপাশে বিরহে কাতর রাখাল বিক্ষিপ্ত মনে প্রতীক্ষা করে বীথিকার। কখনো মাঝ দুপুরে আবার মাঝে মাঝে পড়ন্ত বিকেলে বাঁশিতে সুর তোলে, পথের বাঁকে, পাহাড়ি ঝর্ণার ধারে অথবা তমালের নিচে বসে টান দেয় সেই পুরানো সুর যে সুরের মাদকতায় ছুটে আসতো বীথিকা বারে বারে তার কাছে।

রাখাল বালক হয়তো কোনদিন জানবে না- বীথিকা ভিখারিনীর মেয়ে ছদ্মবেশে নির্বাসিত রাজকন্যা ময়নামতি । ময়নামতির নির্বাসনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া সে ফিরে গেছে রাজপ্রাসাদে। আর কোন দিন বীথিকা তার বাঁশির সুরের টানে ছুটে আসবে না পাহাড়ি ঝর্ণার মতো। রাখালের ছোট জগতে শুধু দীর্ঘ হয় প্রতীক্ষার প্রহর।

১৯ thoughts on “প্রহর শেষের আলো

  1. খুভ ভাল লাগল! পড়া শেষে একটা
    খুভ ভাল লাগল! পড়া শেষে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম, সচরাচর থেকে একটু বেশিই লম্বা !
    এখন বাতাসে কার্বনডাইঅক্সাইড এর পরিমান বেড়ে গেল বলে যদি কেউ প্রশ্ন তুলে এর জন্য কিন্তু আপ্নিই দায়ী !

  2. অনেক সুন্দর লেখা। আহ এমন
    অনেক সুন্দর লেখা। আহ এমন যদিলিখতে পারতাম।
    শেষের লাইন গুলো ভাল লেগেছে রাখালের সেই বিস্বাশ,প্রতিক্ষার প্রহর আর কি শেষ হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *