তিলা ঘুঘু

বাংলাদেশে অনেক প্রজাতির ঘুঘু রয়েছে। ঘুঘু তো আমরা দেখিই- ফাঁদও দেখতে আর কিছু বোধহয় বাকি নেই। বাংলাদেশের কিছু পাখি নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছে ছিল- প্রথম পোস্ট এখানে এ পাতি সবুজ তাউড়া পাখি নিয়ে বলেছিলাম। এবার আসেন অতি চেনা একটি পাখি তিলা ঘুঘু নিয়ে গ্যাজাই!


বাংলাদেশে অনেক প্রজাতির ঘুঘু রয়েছে। ঘুঘু তো আমরা দেখিই- ফাঁদও দেখতে আর কিছু বোধহয় বাকি নেই। বাংলাদেশের কিছু পাখি নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছে ছিল- প্রথম পোস্ট এখানে এ পাতি সবুজ তাউড়া পাখি নিয়ে বলেছিলাম। এবার আসেন অতি চেনা একটি পাখি তিলা ঘুঘু নিয়ে গ্যাজাই!

চোত মাসে যখন চারদিক খাখা করতো, আর পশ্চিমে ছাড়াবাড়িটাতে বুক ভরে কাঁদতে শুরু করতো ধূসর ঘুঘুটি, আমার বুকে হাহাকার শুরু হতো। কামারগাঁয়ে ঘুঘুর কান্না ছিলো আরো করুণ। চোত-বোশেখের রোদে কামারগাঁয়ে বাঁশবন ঝা ঝা করতো, উদাস শব্দ উঠতে থাকতো ডালপালার মর্মর থেকে ; আর তখন কেঁদে উঠতো শোকাকুল ঘুঘু। ‘ঘুঘু…. ঘু’ যেনো চোতের বিষন্ন সুর। একটা গল্প শুনেছিলাম ছেলেবেলায়; – ঘুঘু নাকি কেঁদে কেঁদে নিজের পুত্রের মৃত্যুর কাহিনী বলে। বিলাপ করে। ঘুঘু ছিলো রূপসী সতী- ঝড় আর প্লাবন থেকে বাঁচার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো নদীতে। বুকে নিয়ছিলো নিজের প্রিয় সন্তানকে, আর পিঠে নিয়েছিলো সতীনের সন্তানকে। নিজের সন্তানকে তো বুকে নেবেই সবাই, কিন্তু ওই নারী জানতো না বানের স্রোতে ভেসে যাবে বুকের সন্তান, আর বেঁচে থাকবে পিঠে-ভর-করা সতীনের সন্তান। শোকভারাতুর নারী জন্মায় ঘুঘু হয়ে, কিন্তু জন্ম জন্মান্তর ধরে বুকে পুষে রাখে আগুনের মতো শোক। ঘুঘু কেঁদে কেঁদে বিলাপ করে। তার ধূসর রঙ, চোতের হাহাকার, বাতাসের বিলাপ সব মিলে ঘুঘু বুকের বেদনার মতো পাখি হয়ে আছে।- ড. হুমায়ুন আজাদ


থাকুক তোমার একটু স্মৃতি থাকুক
একলা থাকার খুব দুপুরে
একটি ঘুঘু ডাকুক
-রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

তিলা ঘুঘু- প্রথম দেখেছি বোধহয় গ্রামে। ঝিনাইদহের শান্ত ছোট্ট চাঞ্চল্যহীন গ্রামে। ছেলেবেলায়।স্কুলের পরীক্ষা শেষে প্রায় একমাস সময় পেতাম গ্রামে কাদায় গড়াগড়ি খাওয়ার। পোলো দিয়ে মাছ ধরার। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট প্রায় মরা নদী- এককালে যেটায় সদাগরী মালার নৌকা ভিড়ত- সেই নদীকে মর মর অবস্থায় টিকে যেতে দেখছি সেই সময় থেকেই। গ্রামের ছায়াঘেরা দুপুরে অধিকাংশ দিনই একলা একলা কাটত। কারণ সকাল আর বিকেলেই গ্রামের ছেলেমেয়েদের যত দস্যিপনা চলত- আর দুপুরে ভাতঘুম। তাই একলা চলা ছাড়া গতি ছিল না। তখনই এই পাখির বিলাপ মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল এক বিষন্ন দুপুরে।পুকুর পাড়ে একলা বসে পেছনের হানাবাড়ির জঙ্গল (আসলে আগাছা আর কিছু ফলের গাছে ভরা বাগান, সেই সময়ে সবকিছুই বেশি বেশি লাগত) থেকে ভেসে আসা সেই বিলাপের মত ডাক শুনে সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম। কারণ আমাকে একলা পুকুরের ঘাটলায় যেতে দেখে আমার দাদী পুকুরে বাস করা এক রূপসী মেয়ের গল্প শুনিয়ে দিয়েছিলেন।সে নাকি বিভিন্ন ভাবে মায়ায় ভুলিয়ে ছোট ছোট ছেলেদের পানির তলার কোন এক দেশে বন্দী করে রাখে! সেই সময়েই হঠাৎ উড়াল দিতে দেখি আরেকটি পাখিকে। গিয়ে হানাবাড়ির কাছের একটি ডালে বসল- তখনই দেখলাম আগের বিলাপ করার মত ডাকের অধিকারীকে। জালালী পায়রার আকারের একটি পাখি- একটু ছোট আর রোগাটে। দেখতেও আলাদা।একটু পর মাটিতে নামল দু’জনেই। ঘাসের উপর নেমে খুটে খুটে কিছু একটা খাওয়ার চেষ্টা করছিল। ঘাসের মধ্যে কখনো দৌড়ে চলছে আবার কখনো আস্তে।

এখানে ঘুঘুর ডাকে অপরাহ্নে শান্তি আসে মানুষের মনে;
এখানে সবুজ শাখা আঁকাবাঁকা হলুদ পাখিরে রাখে ঢেকে;
জামের আড়ালে সেই বউকথাকওটিরে যদি ফেল দেখে
একবার — একবার দু’পহর অপরাহ্নে যদি এই ঘুঘুর গুঞ্জনে
ধরা দাও — তাহলে অনন্তকাল থাকিতে যে হবে এই বনে;
মৌরির গন্ধমাখা ঘাসের শরীরে ক্লান্ত দেহটিরে রেখে
আশ্বিনের ক্ষেতঝরা কচি কচি শ্যামা পোকাদের কাছে ডেকে
রব আমি চকোরীর সাথে যেন চকোরের মতন মিলনে;
-জীবনানন্দ দাশ

সেই পাখির নাম ঘুঘু। আরেকটু বড় হয়ে- মানে পাখি দেখার নেশা যখন পেয়ে বসল, তখন জানলাম এই পাখির নাম তিলা ঘুঘু- ইংরেজিতে Spotted Dove, আর বৈজ্ঞানিক নাম- Streptopelia chinensis অর্থ চীনের কন্ঠী ঘুঘু। এই পাখির আবার তিনটি উপপ্রজাতি রয়েছে যার কেবল একটি বাংলাদেশে রয়েছে- Streptopelia chinensis tigrina.
ঘুঘুর মাথার চাঁদি ও কানঢাকনি ধূসর। ঘাড়ের পিছনের উপরের অংশ পাটকিলে, ঘাড়ের পিছনের নিচের ভাগ ও ঘাড়ের পাশ সাদা-কালো তিলার পট্টি। বাদামি রঙের পিঠ আর ডানায় পিত রঙের তিলা রয়েছে। শরীরের নিচের দিক আঙুরে লাল রং, গলা ও বুক ফিকে এবং বাকি অংশ সাদাটে। চোখ লালচে বাদামি, চোখের পাতা ও চোখের গোলকের মুক্ত পট্টি অনুজ্জ্বল গাঢ় লাল; ঠোঁট কালচে, পা আর পায়ের পাতা নীল লালে মেশানো।স্ত্রী পাখি আর পুরুষ পাখি দেখতে ও আকারে অভিন্ন।


পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;
পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে;
পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দু;জনার মনে;
আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে আকাশে।
-জীবনানন্দ দাশ

তিলাঘুঘুর পছন্দের খাবার খাদ্যশস্য আর বীজ। মূলত ছেলেরাই ডাকাডাকি করে। এপ্রিল জুলাই মাসে এই ডাক কোমল হয়ে যায়- প্রজনন ঋতু বলে। স্ত্রী পাখির পাশে বসে অবিরাম গান শোনায়- ক্রুক-ক্রুউক-ক্রুকু-ক্রু-কো …. শব্দে। কাঁটাওয়ালা ঝোপ, বাঁশঝাড়, খেজুর ও অন্যান্য ছোট গাছে কাঠি দিয়ে দায়সারা গোছের বাসা বানায়।সাদা রঙের ২-৩টি ডিম পাড়ে ঘুঘু। ডিমগুলো ১৩দিনে ফোটে।
তিলা ঘুঘু বাংলাদেশের সব জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়। চীন, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, ভারতবর্ষসহ এশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে এদের দেখা যায়।

৫ thoughts on “তিলা ঘুঘু

  1. চমৎকার। ছবি এবং লেখা দুইই
    চমৎকার। ছবি এবং লেখা দুইই চমৎকার। চলুক আপনার এই পক্ষী সিরিজ। বাংলাদেশের পাখি নিয়ে আপনার এই ফটো ব্লগ একটা আর্কাইভ হিসেবে থাকবে। :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:

  2. পক্ষী ব্লগ চলতে থাকুক তাঁর
    পক্ষী ব্লগ চলতে থাকুক তাঁর আপন গতিতে। আমি দিয়ে যাব একের পর এক অরন্য নিয়ে ব্লগ। পাবলিক কই যাইব? :শয়তান:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *