বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ শাসনের ইতিহাস [১৯৭৫-২০২০] ! পর্ব : ১০

[১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু মারা না গিয়ে বেঁচে উঠলে কিভাবে চালাতেন তিনি আজকের বাংলাদেশ! বহুদলীয় শাসনে বাংলাদেশ কি ভাল আছে এখন! একদলীয় শাসনের চীনের থেকে? তার রূপক গল্প হচ্ছে এটি! বড় বিধায় প্রত্যহ রাত ৮-টায় ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করা হবে জীবন চিন্তনের এ গল্প!]

:

বিগত ১০-বছরে বস্ত্তবাদী চিন্তাচেতনার কারণে বৃদ্ধদের অবহেলা ও পরিত্যাগ করার একটা খারাপ রীতি চালু হয়ে গিয়েছিল পচাত্তর পরবর্তী ভোগবাদী বাঙালি সমাজে। জাতিকে বঙ্গবন্ধুর সঠিক দিক নির্দেশনা, বয়ষ্কদের জন্য ফ্রি যাতায়াত ব্যবস্থা, বিনোদন কেন্দ্র ও যৌথ পরিবারে বয়স্ক পিতা-মাতা, দাদা-দাদীর অধিকার সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারী হওয়াতে এখন অধিকাংশ ‘সিনিয়র সিটিজেন’রা তাদের বয়সের ক্রান্তিকালে আগের চেয়ে অনেক ভাল অবস্থানে আছে। ইতোমধ্যেই সরকার আগারগাঁয়ে ৫০-তলা বিশিষ্ট ৫০,০০০ অসহায় বয়স্কের থাকার ব্যবস্থা করেছে। সরকারের প্রচারের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠিত সন্তান তাদের বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিজ পরিবারে ফিরিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে বাঙালির সামাজিক বন্ধনের দৃঢ়তা বিশ্ব সমাজের স্বীকৃতি ও ব্যাপক প্রশংসা লাভ করেছে বঙ্গবন্ধুর অক্লান্ত শ্রম ও দেশপ্রেমিক সৎ নেতা হিসেবে তাঁর নেতৃত্বদানের কারণে।

:

জন্মের পর থেকেই বাঙালি জাতির জন্যে ধারাবাহিক জেল-যুলুম সহ্যের পর একাত্তরে পাকিস্তানী কারান্তরালে থাকাকালীন দেশটি স্বাধীন হয় বঙ্গবন্ধুই নেতৃত্ব আর নির্দেশনায়। পচাত্তরে একাত্তরের পরাজিত শত্রম্ন ও দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা চেয়েছিল, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক, অযোগ্য, অদৃষ্টবাদী, মেধাহীন, হানাহানিপূর্ণ, অদূরদর্শী, ভোগবাদী, ঘুষ আর দুর্নীতি-নির্ভর সন্ত্রাসী ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করে একটি সম্ভাবনাময় জাতিকে জন্মের ৪-বছরের মাথায়ই ধ্বংস করে দেবে। যাতে বাঙালি জাতির মর্যাদা বিশ্বে পদে পদে লাঞ্ছিত হয় এবং দেশের জনগণ জাতির দক্ষ সম্পদে পরিণত হওয়ার পরিবর্তে, দেশের জন্য বোঝা হিসেবে পরিগণিত হয়। তাদের সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা দেশের শাসন ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিসর্জন দেবে। পরবর্তীতে দেশের মধ্যে তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে একাত্তরের পরাজিত ও দুর্নীতিবাজ, নীতি-আদর্শভ্রষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নিষিদ্ধ জামায়াতসহ কট্টর দেশ বিরোধী ব্যক্তিদের নিয়ে নানাবিধ রাজনৈতিক দল গঠন করবে। ঐসব দলের অর্থ ও ছত্রছায়ায় বাঙালি জাতি সপ্তপদী গ্রম্নপে বিভক্ত হয়ে, নিজেরা নিজেদের মধ্যে হানাহানি করতে থাকবে, যাতে দেশটি কখনো নিজ পায়ে দাঁড়াতে না পারে। রাজনৈতিক ভিন্নতা, দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারায় ঘরে ঘরে ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তারক্তি ও খুনোখুনি শুরু হবে।

:

শিক্ষাক্ষেত্রে চরম অরাজগতা সৃষ্টি করা হবে পরিকল্পিত উপায়ে, যাতে বিদেশে এদেশের শিক্ষার মান ও কোন গ্রহণযোগ্যতা না থাকে। নানামুখী শিক্ষার কারণে একই ঘরে কওমী মাদ্রাসা শিক্ষিত ভাই, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আপন ভাইকে ‘কাফের-মুরতাদ’ বলে হত্যা করতে চাইবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে মেধাবীদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হবে, যাতে দুর্নীতিবাজ মেধাহীনেরা দেশ শাসন করে দেশকে চরম নৈরাজ্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে। বিদেশী শক্তির মদদে দেশকে একটি ক্রমবর্ধমান দুষ্টচক্রের মধ্যে নিমজ্জিত রাখা হবে, যাতে ঐ চক্র থেকে সহজে দেশ ও এর জনগণ বের হতে না পারে। দুর্নীতি নির্ভর সরকারগুলোর অদূরদর্শিতার কারণে পচাত্তরের ৮-কোটি জনসংখ্যা বেড়ে কয়েক বছরের মধ্যে দ্বিগুণ তথা ১৬-কোটিতে পরিণত হবে, যাতে বিপুল জনভারে বাংলাদেশ ন্যুজ হয়ে পড়ে এবং বিভ্রান্ত বিপুল কর্মহীন কোটি কোটি তরুণ-তরুণীকে নিজেদের স্বার্থে হানাহানি আর ধ্বংসাত্মক কাজে লাগানো যায়। এ সুযোগে স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সন্ত্রাস-নির্ভর সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে, যাকে তারা ক্ষমতা আরোহণের অন্যতম সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করবে। সমাজের সর্বত্র রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অপচয়, দুর্নীতি, ভোগবাদকে উৎসাহিত করা হবে, যে কারণে সৎ মানুষেরাও অনন্যপায় হয়ে সংক্রামক ব্যধির মতো ক্রমান্বয়ে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হবে। ফলশ্রম্নতিতে বাঙালি জাতিটি পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের মধ্যেও দাঁড়াতে অক্ষম হয়ে, বিশ্বে একটি অযোগ্য-অপদার্থ, দুর্নীতি-নির্ভর, জালজালিয়াতিবাজ জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়ে নিজ দেশের মধ্যে হাজারো সমস্যায় হাবুডুবু খেতে থাকবে। এভাবে হাজার বছরের ইতিহাসে অসাম্প্রদায়িক জাতি হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পাওয়া বাঙালির মেরুদণ্ড ভেঙে তাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হবে, বিশ্বের অন্যান্য সভ্য দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাঙালির উপর নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা আরোপিত থাকবে জালিয়াত, প্রতারক, সাম্প্রদায়িক, দুর্নীতিবাজ দেশের নাগরিক হিসেবে।

:

কিন্তু নীলনকশা আর ষড়যন্ত্রকারীদের সকল পরিকল্পনা পন্ড হয়ে যায় মৃত্যুর গহিন গহবর থেকে বঙ্গবন্ধুর সশরীরে সজাতির মধ্যে ফিরে এসে আবার দৃঢ় প্রত্যয়ে হাল ধরার মাধ্যমে। ১৭ আগস্ট পচাত্তরে হাসপাতালে বুক ভরে প্রথম শ্বাস নেয়ার পর এবার বঙ্গবন্ধু শুধু ২য় জন্মই নেননি বরং প্রতিজ্ঞা করেছেন অবশ্যই এ জাতিকে প্রতিষ্ঠা করে যাবেন তিনি। ছিন্ন করবেন ষড়যন্ত্রের সকল জাল, আর ভেঙে দেবে ওদের বিষাক্ত বিষদাঁত, যাতে আর ছোবল না মারতে পারে এ জাতির হৃদপিণ্ড! যে কারণে প্রথমে পচাত্তরের ঘাতকদের হত্যার পরই, নিধন করা হয় একাত্তরের ঘাতকদের এবং এর ধারাবাহিকতায় দুর্নীতিবাজদেরও। ফলশ্রম্নতিতে দেশ এখন পরিণত হয়েছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে, এগিয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে তার কাঙ্খিত গন্তব্যে অব্যাহতভাবে। যদি পরিকল্পনা মোতাবেক পচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারতো ঘাতকচক্র, আর যদি বেঁচে না উঠতেন বঙ্গবন্ধু আমাদের সবার মাঝে, তবে অবশ্যই তারা তাদের বর্ণিত নীলনকশা বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশকে পরিণত করতো জনসংখ্যা ভারাক্রান্ত একটি হানাহানির ব্যর্থ রাষ্ট্রে, যা চিন্তা করলেও আমাদের এখন গা শিউরে ওঠে।

:

[১১তম (শেষ) পর্ব পোস্ট করা হবে আগামিকাল রাত ৮:০০ টায়]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *