আমার জীবনের ১০-টি অকথিত ঘটনা!

নানাবিধ বিষয়ে সারাক্ষণ চিন্তা করি আমি। সম্ভবত নিজের বোধের চেয়ে বেশি চিন্তা আমায় আচ্ছন্ন রাখে। মনে হয় এতো চিন্তা না করলেও পারতাম। মাঝে মাঝে নিজেকে হাস্যকর প্যাগান গড মনে হয় আমার। আমার জীবনে ঘটে যাওয়া ১০-টি ঘটনা ভাবলে সত্যিই নিজেকে ঐসব প্যাগান গডের সমপর্যায়ে ভাবি আমি।
:
ঘটনা : ১
======
২৫ তারিখ ঈদের দিন কথা ছিল খুব সকালে কোলকাতার চিৎপুর স্টেশন থেকে হাজার দুয়ারি এক্সপ্রেস ট্রেনটি ধরবো ৬.৫্৫-এ বহরমপুর যাবো এক ফেসবুক বন্ধুর সাথে ঈদ করতে। ৫-টায় এলার্ম দিয়ে রাখলাম ঘড়িতে। কিন্তু ঘড়ি প্রতারণা করলো। ঘুম ভাঙলে দেখি ৬.৩০। কোন ক্রমেই আর চিৎপুর গিয়ে হাজার দুয়ারিতে ওঠা যাবেনা চিন্তা করে কোননগরে নৌকোতে গঙ্গা পার হয়ে সোদপুর স্টেশনে উঠলাম একটা লোকালে, যেটা যাবে আবার ব্যারাকপুর পর্যন্ত। প্লাটফর্মে চা খাচ্ছি মাসিমার হাতে। বললেন, সরে দাঁড়াও দাদা, হাজার দুয়ারি ঝড়ের বেগে পার হবে এ স্টেশন। দাঁড়ায় না কখনো এখানে। আমি কাধে ব্যাগ আর মাটির চায়ের কাপ হাতে তাকিয়ে রইলাম হাজার দুয়ারির দিকে। কি বিস্ময়কর ১০-সেকেন্ডের জন্য ট্রেনটা দাঁড়িয়েই আবার সবুজ বাতি দেখে চলতে শুরু করলো। হাতের কাপ ছুড়ে ফেলে এক লাফে উঠলাম হাজার দুয়ারিতে। ৫-টাকার চায়ের জন্যে মাসিমাকে ১০ টাকা ছুড়ে দিলাম দরজা থেকে। কেন যেন মনে হচ্ছিল ট্রেনটা থামবে এখানে আমার জন্যে। কারণ এটাতে আমার যাওয়ার কথা ছিল আজ।
:
ঘটনা : ২
======
তখন আমার বরিশাল পোস্টিং ছিল। আপন বোন যাবে তার গ্রামের বাড়ি লঞ্চযোগে। লঞ্চের সময় দুপর ২টা। দেড়টায় সে কতগুলো জরুরি কাগজ বের করলো যা সত্যায়িত (Attested) করতে হবে এখনই। সব সত্যায়িত করলাম আমি। সিল বের করলাম অফিসিয়াল ব্যাগ থেকে। কিন্তু ওমা ব্যাগে কোন “সিলপ্যাড” নেই। সবার কলম বলপেন আর জেলপেন। তাই কালি্ও নেই কোথাও্। লঞ্চের টাইম হয়ে গেছে। শুক্রবার তাই আ্শেপাশের সব দোকান বন্ধ। কোথাও প্যাড পাবোনা এখন। বোনের মুখ কালো। বললাল, চল লঞ্চঘাটে যাই, দেখি কোন সিলপ্যাড সেখানে পাইকিনা। দরজা খুলে বাইরে চোখ রাখতেই দেখি আমার বাড়ির সামনে দিয়ে হেটে যাচ্ছে এক তরুণ। হাতে তার একটা নতুন সিলপ্যাড। দৌঁড়ে গিয়ে ধরলাম তাকে। সিলপ্যাডটা কিভাবে চলে আসলো, আমার কাছে আজো তা একটা রহস্য।
:
ঘটনা : ৩
======
কিশোর বয়সে গাঁয়ের খালে একবার মাছ ধরার প্রতিযোগিতা হলো। যে সবচেয়ে বেশি বা বড় মাছ পাবে, তাকে একটা সাদাকালো টিভি উপহার দেবেন চেয়ারম্যান সাহেব। তখন গ্রামে খুব টিভি ছিলনা, শহরে টিভি দেখতে যেতাম আমরা। খুব সখ ছিল টিভি জিতে তা দেখবো আমি। অনেক অভিজ্ঞ জেলে বড় বড় মাছ ধরলো পলো দিয়ে, পলো চালাতে অদক্ষ ছিলাম আমি। তাই সব মাছ ফাঁক দিয়ে চলে গেল। টিভি হারানোর দুখে উঠে এলাম খাল থেকে। বাড়ি ফেরার পথে আশ্বিণের ধানক্ষেতে অল্প পানিতে নড়াচড়া আর শব্দ শুনে এগিয়ে দেখি, আমার চেয়েও সম্ভবত বড় সাইজের এক কোরাল জোয়ারের পানি নেমে যাওয়ার কারণে আটকে পড়েছে ধানক্ষেতে। অল্প পানিতে তাই ডানা ঝাপটাচ্ছে। কলাগাছের শুকনো পাতার রশি দিয়ে বেধে তা টেনে নামালাম প্রতিযোগিতার খালে। অবশেষে বিচারে টিভিটা আমিই পেলাম। সেই থেকে টিভি দেখা আমার শুরু।
:
ঘটনা : ৪
======
২০০৫ সনে একটা প্রশিক্ষণে গিয়েছিলাম নি্উজিল্যান্ডের সাউথ আয়ল্যা্ন্ডেেের খ্রাইস্ট চার্চে। আমাদের থাকা খাওয়া সব ফ্রি ছিল ওখানে। সামান্য কিছু পকেট মানিও পেতাম। টিভি আর পত্রিকায় বিজ্ঞাপনে দেখলাম, প্রতি রোববার সাউথ পোলে (Antarctica) হ্যালিকপ্টারে ভ্রমণ করা যায়। নামতে হয় প্যারাসুট দিয়ে ক্যা্প্টেন কুক যেখানে নেমেছিলেন সেখানে। পেঙ্গুইনদের ঘরে ছবি তোলার খুব সখ হলো আমার। কিন্তু লাগবে ৪০০০ ডলার একদিনের ভ্রমণে, যা ছিলনা আমার কাছে তখন। দেশ থেকে চেষ্টা করলাম টাকা নিতে, তারও কোন বৈধ পথ পেলাম না। ৪ মাসের কোর্সের ২-মাস শেষ হলো, ঘুণপোকারা ঘুমোতে দেয়না আমায় সাউথপোল যেতে পারেনি বলে। এক রোববার ছুটি ছিল বলে সমুদ্র সৈকতে হাঁটছি একাকি। দুপুরে প্রায় শূন্য সৈকতে সমুদ্র ফেনার মাঝে একটা প্লাস্টিকের বলের মত পেলাম, তাতে স্পানিশ ভাষায় কি সব লেখা। আগ্রহ নিয়ে মুখ খুলে তাতে কিছু কাগজ পেলাম, যার ভেতরে একটা ছোট প্লাটিকের ভেতরে ১০,০০০ ডলার। কি করবো চিন্তা না করে কাগজপত্রসহ চলে এলাম ডরমেটরিতে। কাউকে কিছু বললাম না। শেষে দশ হাজার ডলারের কিসসা ফাঁস হয়। চার হাজার ডলারে গেলাম দক্ষিণ গোলার্ধে। আর বাকি টাকায় টোঙ্গা, সলোমন আয়ল্যান্ড আর তাসমানিয়া ঘুরলাম একাকি মন ভরে।
:
ঘটনা : ৫
======
মেঘনাপাড়ে একটা দ্বীপের মানুষ আমি। একবার থমথমে ঝড়ো বাতাসে জরুরি কাজ থাকাতে মেঘনা পাড়ি দিলাম একটা ৫-সিটের ছোট ট্রলারে। অল্প ঝড়ো বাতাসে নদী পার হতে সাথী হলো শহর থেকে আসা ৫-বুড়ো। আর বিদেশে জন্ম নেয়া, বিদেশে অবস্থানকারী আমার মেঝ ভাইর একমাত্র সাঁতার না জানা মেয়েটি। যখন মাঝ নদীতে আমরা। তখন প্রবল বাতাস আর অন্ধকার মেঘেরা একসাথে জলঘুর্ণন শুরু করলো মেঘনাতে। পাহাড়ের মত বড় বড় ঢেউ গ্রাস করতে চাইছিল ছোট ট্রলারটি। নিজের জীবনের জন্যে একটুও মায়া হলোনা আমার। কেবল চিন্তা হলো, কাকুর হাত ধরে যে বিদেশি মেয়েটি গাঁয়ে এসেছে বেড়াতে দাদার বাড়ি, তাকে কিভাবে রক্ষা করবো আমি? ভাই আর ভাবীকে কি জবাব দেবো এ জলরাক্ষসদের মাঝে মেয়েটিকে হারিয়ে? আ্মি কি তাকে কাঁধে করে সাঁতরাতে পারবো। বেঁচে থাকবে সে? না হলে আমি বেঁচে কিভাবে ভাইর সামনে দাঁড়াবো?
:
বিশাল একটা ঢেউ ট্রলারটাকে ঢেকে দিলে প্রায় পুরো ঘোলা জল দিয়ে। আমি শক্ত করে হাত ধরে রাখলাম আমার ভাইঝির। বিস্ময়করভাবে বিশাল ঢেউটি একটা জাহাজের বড় বয়া (লাইফবয়া) ভাসিয়ে একদম আমার হাতের কাছে নিয়ে এলো। যাতে লেখা ছিল “COPIA PO VAL PARAISO” সম্ভবত কোন বিদেশি জাহাজের বয়া ভেসে এসেছিল ঝড়ো বাতাসে। মুহূর্তে বয়াটি গলার ভেতর মালার মত পড়িয়ে দিলাম ভাইঝির। বললাম, ভয়ে পেওনা একটুও, তুমি ভেসে থেকো এর মাঝে। ট্রলারটি ডুবে হারিয়ে গেলে। বয়ার মাঝে শরীর ঢুকিয়ে সাঁতার না জানা মেয়েটি ভেসে রইলে পাখির মত। আমি বয়ার পাশে পাশে সাঁতরাতে থাকলাম, যেন সে ভেসে না যায় সমুদ্রের দিকে। বড় জেলে নৌকা ঘন্টা খানেকের মাঝে তুলে নিলো আমাদের তাদের বোটে। হারিয়ে গেলে দুজন বয়স্ক মানুষ। উদ্ধার শেষে সাঁতার না জানা ভাইঝি বললো, সে একটুও ভয় পায়নি, খুব এঞ্জয় করেছে পুরো ব্যাপারটি। টেনশনে লাল টকটকে চোখে কান্নার মাঝেও হেসে উঠলাম ভাইঝিকে জড়িয়ে আমি। কিভাবে, কে, কোন বিদেশি জাহাজের এ লাইফ বয়াটি এনে দিলো আমার হাতে, তা আজো রহস্য আমার কাছে। বয়াটি এখনো আমার গ্রামের বাড়িতে সংরক্ষিত আছে।
:
ঘটনা : ৬
======
কৈশোরে একবার ঢাকা যাব বলে অনেক দূরের লঞ্চঘাটে পৌঁছলাম ঢাকার লঞ্চ ধরতে মাকে নিয়ে। অনেক দেরী করে একটা লঞ্চ এলো কানায় কানায় ভর্তি হয়ে। আমাদের সাথের প্রায় শ’খানেক যাত্রী হুড়াহুড়ি করে লঞ্চে উঠলো। কে যেন আমায় মনে মনে বললো, একটু পর লঞ্চটা ডুবে যাবে। মার হাত টেনে ধরে বললাম – মা এ লঞ্চে উঠবো না, এটা ডুবে যাবে। মাকে টেনে ধরাতে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। ১০/১৫ মিনিট পরই দেখলাম লঞ্চটা প্রচন্ড ঢেউ্রর মাঝে ডুবে যাচ্ছে। অন্তত একশ মানুষ মারা গিয়েছিল বিকেলে ডোবা ঐ লঞ্চে!
:
ঘটনা : ৭
======
জেদ্দা লোহিত সাগর তীরে একটা বোতল পেয়েছিলাম আমি। তাতে একটা পারিবারিক ছবি এবং ১/৭/১৯৫৩ সনে লেখা একটা চিরকুট ছিল। চিরকুটে লেখা ডেনমার্কের ঠিকানায় বোতল পাওয়ার সংবাদ জানিয়ে একটা পত্র দিলে, ৩ মাস পর অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেরত পত্র আসে যে, বোতলটির ছবির ছোট্ট মেয়েটি এখন ৮৪ বছরের বৃদ্ধা এবং সে অস্ট্রেলিয়া থাকে। পরবর্তীকে যোগাযোগ ও দেখা হয়েছিল ঐ নারীর সাথে সিডনিতে।
:
ঘটনা : ৮
======
ইন্টার ফাইনাল পরীক্ষার সময় বাংলাদেশের মানচিত্র নকল করে ট্রেস করবো বলে যেইনা খাতার মধ্যে ঢুকালাম, তখনই পাশের ছেলের কথা বলার কারণে আমাদের ২ জনের খাতা নিয়ে গেল হল পরীক্ষক। তিনি টেবিলে বসে বসে আমাদের ২ জনের খাতা পড়তে থাকলেন। ৩ পৃষ্ঠা পড়ার পর ৪র্থ পৃষ্ঠায় মানচিত্রের আলাদা কাগজটি ভেতরে থাকলেও আকস্মিক তিনি আমাদের খাতা দুটো ফেরত দেন। বেঁচে যাই মহাবিপদ থেকে।
:
ঘটনা : ৯
======
কৈশোরে একবার স্কুল থেকে ফেরার পথে প্রচন্ড কালবৈশাখি ঝড় শুরু হলে আমরা একটা বড় গাছের নিচে দাঁড়াই। কি কারণে যেন মনে হলো গাছটি বা এর ডাল ভেঙে পড়তে পারে, এ চিন্তা করে দৌঁড় দিয়ে পাশের বাড়িতে ঢুকতেই দেখি গাছটি ভেঙে পড়েছে মাঝ বরাবর এবং তার নিচে দুজন লোক চাপা পড়েছে। একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও, অপরজন মারা যান।
:
ঘটনা : ১০
======
ডাব পারার জন্য বড় নারকেল গাছে ওঠার কথা ছিল আমার। কিন্তু আকস্মিক আমার মন বাঁধা দিলো বড় গাছটিতে উঠতে। বললাম – মা আজ আমাকে গাছে উঠতে নিষেধ করেছে তাই আমি উঠবো না। দুতিন জনে ঠেলতে থাকলো আমাকে গাছে উঠতে কিন্তু বার বার প্রত্যাখ্যান করলাম আমি। শেষে প্রতিবেশি জামাল এক লাফে গাছে উঠেই, যেইনা নারিকেলে হাত দিলো অমনি গাছে থাকা বিষাক্ত সাপে ছোবল দিলো তাকে। সাপের ছোবল খেয়ে তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে গাছের মাঝখান থেকে পড়ে গেল সে নিচে। তাতে তার পা ভাঙলো। স্থানীয় ওঝার চিকিৎসাতে সাপের বিষ নামলেও, পা ভাঙার কারণে প্রায় দুমাস ঘরে বসে থাকতে হলো তাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *