মুক্তির বিলাপ


আজকের আকাশটা দেখে যে কারো মন ভালো হয়ে যেতে বাধ্য। অনেক সময় মেঘলা আকাশও মন ভালো করে দেয়। মানূষের মন বড়ই বিচিত্র। গোধূলী বেলার আকাশের মতই তা ক্ষনে ক্ষনে রং বদলায়। কখনো হাসি, কখনো কান্না এই সব মিলিয়েই এই রঙ্গশালা। আর প্রতিটি মানুষই রঙ্গশালার একেকজন অভিনেতা।
নিজেকে একজন পাকা অভিনেতা ভেবে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠে আসাদের মুখে। সে হাতঘড়ির দিকে তাকায়। সাড়ে আটটা বাজে। নয়টার মধ্যে তাকে পৌছাতে হবে। রিকসার ড্রাইভারকে তাড়া দেয় আসাদ। ‘ও ভাই একটু জলদি চলুন।’


আজকের আকাশটা দেখে যে কারো মন ভালো হয়ে যেতে বাধ্য। অনেক সময় মেঘলা আকাশও মন ভালো করে দেয়। মানূষের মন বড়ই বিচিত্র। গোধূলী বেলার আকাশের মতই তা ক্ষনে ক্ষনে রং বদলায়। কখনো হাসি, কখনো কান্না এই সব মিলিয়েই এই রঙ্গশালা। আর প্রতিটি মানুষই রঙ্গশালার একেকজন অভিনেতা।
নিজেকে একজন পাকা অভিনেতা ভেবে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠে আসাদের মুখে। সে হাতঘড়ির দিকে তাকায়। সাড়ে আটটা বাজে। নয়টার মধ্যে তাকে পৌছাতে হবে। রিকসার ড্রাইভারকে তাড়া দেয় আসাদ। ‘ও ভাই একটু জলদি চলুন।’
কথার কোন জবাব না দিয়ে রিকসার গতি বাড়ায় ড্রাইভার।
শুক্রবার। তাই ঢাকার রাস্তায় ততটা জ্যাম নেই। চারপাশে নিয়ন আলোর অপূর্ব দ্যোতনা। মেঘলা আকাশের বুকে চুমু দিয়ে যে বাতাস ফিরে এসে গায়ে লাগে সে বাতাস বড় মধুর! উদাস ভাব চলে আসে মনে। রিকসা পূর্ব রাজাবাজারের মসজিদ ক্রস করে। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে আসাদ।
আরেক পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঠের পায় ম্যাচ আনা হয়নি। রিকসার ড্রাইভারের কাছে ম্যাচ চাইল সে।
‘কোথায় থাকেন ভাই?’
‘কাজী পাড়া’-মাথা ঘুড়িয়ে আসাদের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয় ড্রাইভার।
‘আপনার কাছে ম্যাচ হবে নাকি? সিগারেট ধরাব।’
পকেট থেকে ম্যাচ বের করে আসাদের দিকে বাড়ায় ড্রাইভার। আসাদ সিগারেট ধরায়। আহা! কি শান্তি! মেঘলা দিনে সিগারেট টানার সুখই আলাদা। পায়ের উপর পা তুলে আয়েশি ভঙ্গিতে সিগারেট টানতে থাকে সে।
চেষ্টা করছে নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখতে। অবশ্য বড় কোন ঘটনার দিনে আসাদের মন তুলনামূলক অনেক বেশিই শান্ত থাকে। এটা তার বিরাট গুণ। আজ আসাদের অনেক বড় ঘটনার দিন। রিকসা খামারবাড়ি মোড় ক্রস করেছে। আসাদ আকাশের দিকে তাকায়। আষাঢ় মাস। ওর বাবার খুব প্রিয় মাস।
আসাদের স্পষ্ট মনে পড়ে আষাঢ় মাস এলেই বাবা মাছ শিকারের নানা যন্ত্র কিনে আনতেন। বড়শি, জাল, কুইচ ইত্যাদি। বাবার ছিল মাছ মারার নেশা। সারাদিন স্কুল পড়িয়ে বাসায় ফিরেই ব্যস্ত হয়ে পড়তেন মাছ মারার আয়োজন নিয়ে।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে আসাদের বুকের গভীর থেকে। অনেক দিন বাবার মাছ ধরা দেখা হয় না! নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে আসাদ। নিয়ন্ত্রণ হারানো যাবে না।
আসলে স্মৃতি খুব খারাপ জিনিস। মানুষ না চাইলেও তাকে স্মৃতির পাতা খুলতে হয়। হঠাৎ খেয়াল হল রিকসা থেমে আছে। চন্দ্রিমা উদ্যানের সামনে চার রাস্তার মোড়ে জ্যামে আটকে আছে আসাদের রিকসা। তার প্রচন্ড বিরক্ত লাগল। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে পৌনে নয়টা বাজে। আরেকটা সিগারেট ধরায় সে।
ধোঁয়া ছাড়ে উদাসী ভাব নিয়ে। আসাদের চোখে জল! সে চমকে উঠে। এমন হবার কথা নয়। কান্নাকাটি করার মানুষ সে না। তাছাড়া বাসা থেকে বের হবার সময় নীরাকে কথা দিয়ে এসেছে কোন কান্নাকাটি করবে না। কিন্তু তার চোখে জল চলে এসেছে। ব্যাপারটা নীরা জানতে পারলে কেলেংকারী বেধে যাবে। ছেলেমানুষি নীরার একদম পছন্দ না।
জ্যামে বসে আছে সে। প্রচুর গাড়ী রাস্তায়। এতক্ষণ বোঝা যায়নি। চার রাস্তার মোড়ে এসে ঢাকা শহর চেনা গেল। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না আসাদ। অনেকটা পথ। হেঁটে যাওয়ার শক্তি নেই। সারাদিন অফিসে অনেক খাটুনি গেছে। বাসায় ফিরে কাপড় ছাড়তে না ছাড়তেই খবরটা এল।
শুনেই বেরিয়ে এসেছে ও। নীরা অবশ্য বলছিল ফ্রেশ হয়ে কিছু মুখে দিয়ে বেরুতে। কিন্তু সময় ছিল না। ওরা জানিয়েছে নয়টার মধ্যেই লাশ আঞ্জুমানে দিয়ে দেওয়া হবে। আসাদ অবশ্য চেয়েছিল লাশ বাসায় আনতে, নীরার আপত্তিতে তা সম্ভব হয়নি।
নীরা বলেছে লাশ বাড়িতে নিয়ে গেলে ঝামেলা হবে। অমি ও মীরা ভয় পাবে। খামাকা বাড়তি ঝামেলার কি দরকার! আসাদ তাই কোন ঝামেলাতে যায়নি।
ফোন বেজে উঠে আসাদের। রিসভ করতেই ওপাশে গলা ভেসে আসে-‘আপনি কি আসছেন?’ ‘জ্বি, আমি রাস্তায় জ্যামে আটকে আছি। প্লীজ আরেকটু অপেক্ষা করুন। এইত চলে এসেছি। আর দশ মিনিট লাগবে। একটু অপেক্ষা করুন প্লীজ।’ গলাটা চিনতে পেরে একদমে কথাগুলো শেষ করে আসাদ।
‘সরি মিস্টার আসাদ। লাশ চলে গেছে। আপনার আসার দরকার নেই। দাফন-কাফনের ব্যাপারতো। তাই ওরা সময় দিতে চায়নি।’
কথাগুলো বজ্রপাতের মত লাগল। শরীরটা কেমন অবশ লাগছে আসাদের।
‘শুনছেন মিস্টার আসাদ?’
‘হু’
‘আসলে আমাদের কিছু করার ছিল না। আমরা চেষ্টা করেছিলাম যাতে শেষ দেখাটা আপনি দেখতে পারেন। কিন্তু…’
‘হু’
‘মিস্টার আসাদ, আমাদের কিছু বিল বকেয়া ছিল। আজকে না মিটালেও চলবে। আপনার মনের অবস্থা আমরা বুঝতে পারছি।’
‘হু’
‘আপনি কি কাল একবার আসবেন আসাদ সাহেব?’
‘জ্বি!’-ওপাশে নিজের নাম শুনে সম্বিত ফিরে আসাদের।
‘বলছিলাম, আমাদের কিছু বিল বকেয়া ছিল। কাল যদি একবার আসতেন…’
‘ও। আচ্ছা ঠিক আছে।’
‘থ্যাংক ইয়্যু। মন খারাপ করবেন না। অনেক করেছেন আপনি। মিস্টার রহমান আপনার জন্য অনেক আশীর্বাদ রেখে গেছেন। যান, বাসায় ফিরে যান।’
‘একটা কথা বলবেন প্লীজ?’ জানতে চায় আসাদ।
‘জ্বি, বলুন।’
‘কোথায় দাফন করা হবে জানেন?’
‘সঠিক বলতে পারছি না। সরি।’
‘ইটস ওকে।’ ফোন কেটে দেয় আসাদ।
তাকে উদভ্রান্তের মত দেখাচ্ছে। শত চেষ্টাতেও নিজেকে শান্ত রাখতে পারছে সে। রিকসা থেকে নেমে পকেট থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে ড্রাইভারকে দেয়। ফেরত দিল ম্যাচটাও। পাগল সন্দেহে বিস্ময় নিয়ে আসাদের দিকে তাকিয়ে আছে ড্রাইভার।
বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টিতে ভিজে বিজয়সরণীর মোড় দিয়ে ফার্মগেটের দিকে হাঁটছে আসাদ। বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করছে না।
সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ সারা রাত বাইরে থাকবে। সিগারেট খাবে আর কাঁদবে। নীরা যাতে ফোন দিতে না পারে সে জন্য মোবাইল অফ করে রেখেছে আসাদ। চারপাশে ব্যস্ত মানুষেরা বাসায় ফিরছে। গাড়ির পোঁ পোঁ আওয়াজ করুন কান্নার সুরের মত এসে কানে বিঁধছে।
বৃষ্টির গতি বাড়ল। ভীষন অশান্ত হয়ে উঠল আসাদের মন। বুক ভেঙে তার কান্না আসছে। না!
আজ আর সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে না। কোন ভয় নেই তার। বৃষ্টির জলে মিশে যাবে কান্নার জল। নীরা ঠের পাবে না। কোন নিয়ন্ত্রণ নেই কান্নার।
চিৎকার করে কাঁদছে আসাদ। এই কান্না যতটা না হারানোর যন্ত্রণায়, তারও বেশি মুক্তির আনন্দে। বিকলাঙ্গ দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তির। স্ত্রীর কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার হাত থেকে মুক্তির।
সন্তানের কাছে মিথ্যে বলা থেকে মুক্তির। সমাজের বাঁকা চোখ থেকে মুক্তির। মুক্তি জীবনের সাথে অভিনয় থেকেও…
দীর্ঘ চার বছর বৃদ্ধাশ্রমে নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়ে আজ মারা গেছেন আসাদের বাবা মমীনুর রহমান। আসাদ কাঁদছে। আকাশ ভরা মেঘ। কান্নার শেষ বহুদূর। আসাদের কান্নায় সঙ্গী হল বাবার প্রিয় আষাঢ় মাসের আকাশ…

৬ thoughts on “মুক্তির বিলাপ

  1. পুরা পোস্টের লেখা এভাবে বোল্ড
    পুরা পোস্টের লেখা এভাবে বোল্ড করে দিয়েছেন কেন? বিশ্রী লাগছে। চেঞ্জ করেন প্লীজ। :মানেকি:

  2. লেখাটা পড়ে যতটুকু বুঝলাম
    লেখাটা পড়ে যতটুকু বুঝলাম বাবার লাশ আঞ্জুমান এ দিয়ে দিয়েছে, সেটা ভাল হলো বা সুন্দর হলো কিভাবে আমার বোধগম্য হলো না………

    1. এখানে কিছুই ভাল নয়। পুরোটাই
      এখানে কিছুই ভাল নয়। পুরোটাই সন্তান হিসেবে অপমানের। বাবার লাশ নিজের হাতে কবর দিতে না পারার অপমানটাই বেশি…কান্নাটাও তাই বেশি। এখানে মূল বিষয় সকল অপমান থেকে মুক্তি। বাবার জন্য আর কারও সাথে অপমান সইতে হবে না মিথ্যে বলতে হবে না দুর্বল আসাদকে…
      ধন্যবাদ…

Leave a Reply to মুকুল Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *