প্রতিক্রিয়াশীল এবং প্রগতিশীল সমাজের মধ্যে পার্থক্য

প্রতিক্রিয়াশীল এবং প্রগতিশীল সমাজের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায় জানেন তো ? প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ সব সময় চায় হাজার বছরের ঘুনে ধরা অচল অযোগ্য এবং বর্তমান সভ্যতায় যা বর্বর নিয়ম-কানুন বলে পরিচিত সেই নিয়ম কানুন কে বুকে করে আগলে ধরে রাখতে। আর প্রগতিশীল সমাজ হচ্ছে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা কে সাথে নিয়ে নতুন নতুন যুগোপযোগী সকল নিয়ম কানুন তৈরি করে একটি উন্নত সমাজ ব্যবস্থা গঠন করতে চাই। এবার নিচের ভিডিওটি একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করে দেখন। আমি যতদূর জানতে পেরেছি ভিডিওটিতে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি উন্নত জেলা শহর যশোর শহরের একটি মেয়ে তার গায়ে হলুদের দিন নিজেই বাইক চালিয়ে স্থানীয় একটি বিউটি পার্লার থেকে বাড়িতে যাবার দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলো। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফেসবুকের পাতায় হাজার হাজার এমনকি আমার চোখে পড়েনি তবে ধারনা প্রায় লক্ষ লক্ষ ফেসবুক আইডি থেকে এই মেয়েটিকে নানাভাবে কটু কথা বলা হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে সে একটি মেয়ে। কিন্তু তারা কেউ ভেবে দেখছে না মেয়ে হবার পূর্বে সে একজন মানুষ।

হ্যাঁ, আমি বলতে চাইছি প্রতিক্রিয়াশীল সমাজে একজন নারীকে মানুষ ভাবা হয় না, ভাবা হয় সে একটি পণ্য। তাকে পুরুষের তৈরি বাঁধাধরা কিছু নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে। এই হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ এবং প্রগতিশীল সমাজের মধ্যে পার্থক্য। আর আমার মতে এই পার্থক্যটি দূর করতে পারবে একমাত্র নারীরাই। যেমন এই বাইক চালিয়ে গায়ে হলুদের দিন বাড়িতে যাওয়ার ভিডিও সোস্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করে এই নারী তা প্রমাণ করে দেখালো। আমার মতে একমাত্র নারীরাই পারে হাজার বছরের ঘুনে ধরা এই অচল অযোগ্য সমাজব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে নতুন ও প্রগতিশীল একটি সমাজ ব্যবস্থা তৈরি করতে। যেখানে থাকবে না নারী-পুরুষের কোন বৈষম্য যেখানে থাকবে না নারী-পুরুষে ভেদাভেদ। যেখানে থাকবে না নারীদের জন্য এক নিয়ম এবং পুরুষের জন্য আরেক নিয়ম। যারা উক্ত ঘটনাকে মেনে নিতে পারছে না যারা এমন ঘটনা দেখার পরে মনের দুঃখে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন তাদেরকে একটু চিন্তা করে দেখতে বলবো আপনারা তাহলে কোন সমাজ চাইছেন ? আপনাদের চাওয়া সেই সমাজ ব্যবস্থা কি আমি একটু আপনাদেরকে কল্পনায় দেখাবো ? ঠিক আছে তাহলে চোখটা বন্ধ করে একটু কল্পনা করে দেখুন।

মনে করুন আপনি যে সমাজে বাস করেন সেই সমাজে চারিদিক সুনসান নীরবতা, কোথাও কোন গান-বাজনা আনন্দ হৈ-হুল্লোড় কিছুই নেই। প্রতিটি বাড়ি থেকে শুধু গুনগুন করে ভেসে আসছে কোরআন তেলাওয়াতের শব্দ। কোন বাড়িতে টেলিভিশন নেই, রেডিও নেই, ইন্টারনেট নেই, এমনকি কারো হাতে স্মার্টফোন পর্যন্ত নেই। নারীদের সবাই বোরকা পরে মাথা নিচু করে কোরআন পড়ছে। কোন নারী কোন পর পুরুষের সাথে কথা বলছেন না। একেকটি বাড়িতে দুইজন তিনজন অথবা চারজন করে একেক জন পুরুষের স্ত্রী। তাদের কন্যা সন্তানরা সম্পূর্ণ কালো পোশাক দ্বারা আবৃত হয়ে ২৪ ঘন্টা বাড়ির চার দেওয়ালের ভেতরেই সময় কাটাচ্ছেন। তাদের নেই কোন শিক্ষার ব্যবস্থা। তাদের নেই কোন খেলাধুলা করার সুযোগ। এভাবেই চলছে যুগের পর যুগ। এবার আমাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন এই ভিডিওর সাথে এগুলা তুলনা কেন করছেন বা এমন কথা আপনি কেন বলছেন ?

এবার শুনুন তাহলে, এগুলা কেন বলছি, কারণ প্রথম কথা হচ্ছে ইসলাম ধর্মে গান-বাজনা সম্পূর্ণ হারাম। মেয়েদের খেলাধুলা আনন্দ করা হৈ-হুল্লোড় করা সম্পূর্ণ হারাম। তাই প্রথমে বলেছিলাম শুনশান নিরবতা চারিদিকে। যেহেতু আমরা একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে বসবাস করি তাই আমি ইসলামের নিয়মগুলি এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। এরপরে বলেছিলাম মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা নেই তারা ২৪ ঘন্টা বাড়িতে কালো কাপড় দ্বারা আবৃত একটি পোশাক পরে কোরআন তেলাওয়াত করছেন। প্রতিটি বাড়ি থেকেই গুনগুন করে কোরান তেলাওতের শব্দ ভেসে আসছে। এর কারণ হচ্ছে ইসলাম ধর্মে বলা আছে “পৃথিবীতে একমাত্র কোরআন যা আল্লাহ প্রদত্ত আসমানী কিতাব বলে পরিচিত, সেই কুরআন ব্যতীত যত কিতাব বা বই রয়েছে তা সবই শয়তানি কিতাব। তাই এগুলো পড়া থেকে বিরত থাকুন এবং সম্ভব হলে এ সমস্ত কিতাব ধ্বংস করে ফেলুন। পৃথিবীতে শুধুমাত্র কুরআন প্রচলিত থাকবে। এ কারণেই তাদেরকে কোরআন পড়ার কথা বলেছি। এরপরে একজন নারীর ইসলামের বিধান মতে অপরিচিত বা পর পুরুষের সাথে কথা বলার কোন নিয়ম নেই তাই পরিবারের সদস্য ব্যতীত তারা পর পুরুষের সামনে পর্যন্ত যেতে পারে না।

হ্যাঁ, আমি কিন্তু সব সঠিক কথা লিখেছি এখানে, এমন কথাই কোরআনে উল্লেখ করা রয়েছে। অতএব একটি ইসলামিক রাষ্ট্র একজন নারীর পর পুরুষের সাথে কথা বলা সম্পূর্ণ নিষেধ। ইসলামিক রাষ্ট্র হবার কারণে তারা শুধু পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলতে পারবেন। কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের শফি হুজুর প্রায় ১০ লক্ষ মুসলমানের সামনে একটি মাহফিলে বলেছিলেন আপনাদের মেয়েদেরকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াবেন এখানেই ওয়াদা করুন। কারণ মেয়েদেরকে বেশি পড়ালেখা করা্নোর দরকার নেই এটা ইসলাম সম্মত নয়। তারা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়লেই স্বামীর টাকা-পয়সার হিসাব রাখতে পারবে। আর এটুকুই তাদের জন্য দরকার এর বেশি পড়াশোনা করানো ইসলামসম্মত নয়। আপনারা যদি মুসলমান হয়ে থাকেন আপনাদের কন্যাদের পঞ্চম শ্রেণীর বেশি পড়াবেন না এই ওয়াদা করে মাহফিল থেকে বাড়িতে যা্বেন। তিনি এরকম একটি ওয়াজে ১০ লক্ষ মুসলমান কে শপথ করিয়েছেন তাদের কন্যাদের পঞ্চম শ্রেণীর বেশি পড়াশোনা যাতে করতে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া না হয়।

তাহলে কন্যাশিশুরা তো বাড়িতেই থাকবে তাই না ? এবার কল্পনা থেকে একটু বাস্তবে আসুন। এবং নিচের ভিডিওটি দেখে চিন্তা করুন আপনি কি কল্পনার এই সমাজ ব্যবস্থা চান নাকি একটি মেয়ে তার নিজের বিয়েতে নিজের গায়ে হলুদে এভাবেই বাইক চালিয়ে এভাবে নিজে আনন্দ করছে এরকম একটি সমাজ ব্যবস্থা দেখতে চান। সেই হিসেবে আমি বাংলাদেশের যশোর জেলাকে অনেক উন্নত একটি জেলা শহর বলবো। কারণ এই জেলার মানুষগুলো যদি আজ প্রগতিশীল না হতো তাহলে ফেসবুকের হাজার হাজার স্ট্যাটাসে বাইক চালানোর অপরাধে এই মেয়েটিকে উদ্দেশ্যে করে যা বলা হচ্ছে তার পরিপ্রেক্ষিতে এবং এই মেয়েকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি ধর্ষণ করতে চাওয়া এবং অনেকেই হত্যা করার হুমকি দিয়ে যেসমস্ত স্ট্যাটাস দিচ্ছে, সেই সাথে এই মেয়ে বাইক চালিয়ে সমাজ নষ্ট করছে এরকম অভিযোগ এনে তার নামে স্ট্যাটাস নামে স্টাটাস দিচ্ছে যা দেখে আমার মনে হচ্ছে না যে যশোর জেলার মানুষ যদি প্রগতিশীল না হতো তাহলে একটি মেয়ে এভাবে নিজের গায়ে হলুদে বাইক চালিয়ে বিউটি পার্লার থেকে সম্পুর্ণ শহর ঘুরে তারপরে বাড়িতে আসতে পারতো। অবশ্যয় আমার মনে হয় এই জেলার মানুষগুলো প্রগতিশীল ধ্যান ধারনার।

তা না হলে কোন নারীর পক্ষে এমন ঘটনা ঘটানো এবং সেটাকে ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকের মত সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করার সাহস রাখতো না। এবার একটু চিন্তা করুন ঘটনাটি যদি বাংলাদেশের অন্য কোন ধর্মান্ধদের জেলায় ঘটে থাকতো তাহলে ? বিষয়টি কেমন হতো ? এতক্ষণ হয়তো শুনতে পারতাম যে এই মেয়েকে বাড়ীতে ঢুকে কিছু ধর্মান্ধ ব্যক্তিরা শারীরিক ভাবে অপমান অপদস্থ করেছে। অথবা যদি এদেশে শরিয়া আইন নামক বর্বর যুগের এমন কোন আইন চালু থাকত তাহলে হয়তো এতক্ষণ এই মেয়েকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হতো অথবা তাকে ধর্ষণ করে আইনের আওতায় এনে জেলে ভরে রাখা হতো। এটাই কি প্রগতিশীল এবং প্রতিক্রিয়াশীল সমাজের পার্থক্য নয় ? আমরা কি বলতে পারি না এই ধরনের ভিডিও দেখে বা এমন ঘটনা দেখে যারা এটুকু বলতে পারেনা “নারী তুমি এগিয়ে যাও, ভেঙ্গে ফেলো হাজার বছরের ঘুনে ধরা এসব অচল নিয়মকানুন, বদলে ফেলো সমাজ ব্যবস্থা। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে তুমিও পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তোমার যোগ্যতা প্রমাণ করো” তারা আর যাই হোক কখনই প্রগতিশীল হতে পারেনা।

একটা কথা কি জানেন পৃথিবীতে নারী জিনিয়াস বা বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা কম কেন ? কারণ হচ্ছে নারীদেরকে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে ? যদি প্রাচীনকাল থেকেই নারীদেরকে পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হতো তাহলে হয়তো আজ পুরুষের তুলনায় পৃথিবীতে নারী জিনিয়াসের সংখ্যার দিক থেকে নারীদেরই বেশি দেখা যেত। এই মেয়ের জন্য আমার পক্ষ থেকে রইল অনেক অনেক শুভকামনা। আমি চাই বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা থেকে একটি করে মেয়ে তার নিজের বিয়েতে তার নিজের গায়ে হলুদে এভাবেই বাইক চালিয়ে জানান দিক যে, আমরা মেয়েরা কোন অংশেই পুরুষদের থেকে কম নয় এবং আমরাও প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা লালন করতে পারি।
#Jessorein_Girls_Bike_Riding #যশোরে_বাইক_চালিয়ে_নিজের_গায়ে_হুলুদ_পালন

#যশোরের_ড্রিম_গার্ল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *