লাইটার

আমার এই নোংরা, অগোছালো (আম্মুর ভাষায়- ‘কাকের বাসা’) ঘরটার দিকে তাকিয়ে আমি নিজেই মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই। দু’চোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে ভাবি- এটা আমার ঘর! এই ঘরেই আমি রাতে ঘুমাই! চিৎ হয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ি!
প্রতিবারই ভাবি- আজই এর একটা ব্যবস্থা করবো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই করা হয় না। আমার ঘরটা ‘কাকের বাসা’ হয়েই থাকে। আর আমি মাঝে মাঝে শুধু রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকি।
আজ সকালে হঠাৎ করেই প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম- যে ভাবেই হোক, আজ এর একটা বিহিত করবই। রোজ রোজ একরাশ বিস্ময় নিয়ে কাকের বাসায় ঘুমানো যায় না। আমি তো আর কাক না!

আমার এই নোংরা, অগোছালো (আম্মুর ভাষায়- ‘কাকের বাসা’) ঘরটার দিকে তাকিয়ে আমি নিজেই মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই। দু’চোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে ভাবি- এটা আমার ঘর! এই ঘরেই আমি রাতে ঘুমাই! চিৎ হয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ি!
প্রতিবারই ভাবি- আজই এর একটা ব্যবস্থা করবো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই করা হয় না। আমার ঘরটা ‘কাকের বাসা’ হয়েই থাকে। আর আমি মাঝে মাঝে শুধু রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকি।
আজ সকালে হঠাৎ করেই প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম- যে ভাবেই হোক, আজ এর একটা বিহিত করবই। রোজ রোজ একরাশ বিস্ময় নিয়ে কাকের বাসায় ঘুমানো যায় না। আমি তো আর কাক না!
আমার অধিকাংশ প্রতিজ্ঞাই শেষ পর্যন্ত ভেঙ্গে যায়। কিছু দিন আগে একবার প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম- মিথ্যা বলা ছেড়ে দেব। দুই দিন কাটিয়ে দিলাম মিথ্যা না বলে। নিজেকে সে সময় কেমন যেন মহাপুরুষ মনে হচ্ছিলো। কিন্তু তৃতীয় দিনই কেন যেন দম বন্ধ হয়ে এলো। মিথ্যাও যে অক্সিজেনের চেয়ে কোন অংশে কম নয় তা আমার আগে জানা ছিলো না। মহাপুরুষরা মিথ্যা না বলে কিভাবে যে থাকতেন তা তারাই জানেন। আমি মহাপুরুষ না, কাজেই শেষ পর্যন্ত এই প্রতিজ্ঞাটাও টিকলো না। একমাত্র ‘সিগারেট খাব না’ বলে যে ছোট বেলায় প্রতিজ্ঞা করেছিলাম সেটাই কেবল এখনও টিকে আছে। টিকে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ- সিগারেট খেতে টাকা লাগে। আমি অতো টাকা পাব কোথায়?
তবে এই প্রতিজ্ঞাটা কিভাবে যেন টিকে গেল। শুরুতে অবশ্য একটু দোটানায় পড়েছিলাম। ছুটির দিনের সকাল বেলাতেই ঘর গোছানোর মত জঘন্য একটা কাজ করবো? কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লার নাম নিয়ে লুঙ্গি কাছা দিয়ে নেমে পড়লাম। কোন দিক থেকে শুরু করবো তাই ভাবছি।
খাটের চাদরটা মেঝেতে পড়ে আছে। বই কিছু খাটের ওপড়, কিছু খাটের নিচে। বুকসেলফ্ বোঝাই হয়ে আছে দুনিয়ার হাবিজাবিতে। টেবিলটা দিয়েই শুরু করলাম। চেয়ার আর টেবিলের ওপড় রাখা সার্ট-প্যান্টগুলো আপাতত খাটের ওপড় রাখলাম। ড্রয়ারটা খুলতেই আমার চোখ কপালে উঠে গেল। সু জুতা জোড়ার একটা ড্রয়ারে ভরলো কে? আমি ভরেছি বলে তো মনে পড়ছে না! মনে পড়ার কথাও না। টেবিলের ড্রয়ার বই-খাতা-কলম রাখার জন্য, জুতা রাখার জন্য না। তাহলে এটা এখানে এলো কিভাবে? পায়ে দেয়ার জুতারও আবার পা গজালো নাকি? অবশ্য শুধু পা গজালেও এটা ড্রয়ারে যাবার কথা না। ড্রয়ার খুলতে হলে এটার হাতও গজাতে হবে। জুতার হাত-পা নিশ্চয়ই গজায়নি!
সে যাগ্গে। আমি জুতাটি বের করে খাটের নিচে তার সঙ্গীর কাছে পাঠিয়ে দিলাম। ড্রয়ারে কিছু কাগজ-পত্র এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। সেগুলো বের করার জন্য টান দিতেই পায়ের ওপড় খুট করে আধমন ওজনের কি যেন একটা পড়লো। আমি ‘বাবাগো’ বলে চিৎকার করে উঠতে গিয়েও থেমে গেলাম। জিনিসটা মোটেই আধমন ওজনের কিছু নয়। বড়জোর আধ পোয়া ওজন হবে ওটার। উপুর হয়ে জিনিসটা হাতে নিলাম। কারুকাজ করা ছোট একটা লাইটার। বেশ খানিকক্ষণ লাগলো সেটাকে চিনতে। এটা আমার টেবিলে কোত্থেকে এলো?
হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল বেশ কিছুদিন আগের কথা। কলেজ জীবনের বন্ধু রাকিবের কথা। গোট্টা গাট্টা চেহারার বিশাল ভুড়িওয়ালা রাকিব। সব সময় ‘সাধু-সাধু’ ভাব করে থাকতো। অনেকে ওকে ‘পীর-ফকির টাইপ’ কিছু একটা ভাবতো। অদ্ভুদ ভঙ্গিতে কথা বলতো রাকিব। মাঝে মাঝে অদ্ভুদ সব বিশেষণ ব্যবহার করতো কথার মধ্যে।
সেদিন কলেজে এসেই রাকিব তার স্বভাব মত আমাকে দেখে চোখ বড় বড় করে বলল: আরে তুই! তুই আজ কলেজে এসেছিস? আমি ভেবেছিলাম তুই আজ আসবি না।
আমি ওর কথায় অবাক না হয়ে বললাম: কেন? না আসার মত কিছু হয়েছে নাকি?
রাকিব বলল: না, এমনি বললাম। হঠাৎ মনে হলো তুই আজ আসবি না। আমার বেশির ভাগ কথাই আবার ফলে যায় কিনা! বাই দ্যা বাই- হ্যাপি বার্থ ডে টু ইয়্যু।
আমি নিরস কণ্ঠে জবাব দিলাম: কোন গিফট্ ছাড়া খালি মুখে ‘হ্যাপি বার্থ ডে’ জানালি?
: ব্যাটা তোকে ‘হ্যাপি বার্থ ডে’ জানিয়েছি তুই থ্যাঙ্কস্ জানাবি। তা-না, ছোটলোকের মত বলছিস গিফট্ কই?
আমি বিরাট একটা হাই তুলে বললাম: শুধু কথায় চিঁড়া ভিজে না।
রাকিব বলল: আগে শোন কি হয়েছে। কাল রাতে ভাত খাব, এমন সময় হঠাৎ মনে পড়লো আজ তোর জন্মদিন। কি আর করি, খাওয়া বাদ দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম তোর জন্যে গিফট্ কিনতে। দোকান-পাট সবই প্রায় বন্ধ। কস্মেটিকস্ এর দোকানে গিয়ে এই লাইটারটা চোখে পড়লো; কিনে ফেললাম। নে ধর ছোটলোক, এটাই তোর জন্মদিনের গিফট্। রেপিং করার সময় নাই, এমনিই দিলাম।
এই সেই লাইটার। আমি লাইটারটা হাতে নিয়ে বলেছিলাম: এটা দিয়ে আমি কী করবো! আমি কি সিগারেট খাই নাকি?
: আজ খাস না কাল খাবি!
নাক কুচকে বললাম: কোন দিনই খাব না।
রাকিব বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল: প্রথম প্রথম ওরকম সবাই বলে। তাছাড়া সিগারেট না খাস মোম জ্বালাবি, মশার কয়েল জ্বালাবি। গিফট্ দিয়েছি, এখন এটা দিয়ে কি করবি তাও বলে দিতে হবে?
আমি বললাম: আচ্ছা ঠিক আছে, থ্যাঙ্কস্। মেনি, মেনি থ্যাঙ্কস্।
রাকিব আমার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিয়ে বলল: শুধু কথায় চিঁড়া ভিজে না। কি খাওয়াবি খাওয়া। তোর জন্য গিফট্ কিনতে গিয়ে হাতের টাকা সব শেষ। সকালের নাস্তা পর্যন্ত করতে পারিনি। এই মাসে সকালের নাস্তা তুই খাওয়াবি। আর লাইটারটা কোন কাজে না লাগলে মোরব্বা বানিয়ে খাস।
রাকিবের যা কথা, লাইটার দিয়ে মোরব্বা হয় নাকি!
আমার অবশ্য লাইটারটা বেশ কাজে লেগেছিলো। ওটা দিয়ে আগুন জ্বালালেই সুন্দর একটা মিউজিক বাজতো। আগুনটা দেখতেও খুব সুন্দর ছিল। ছোট নীল একটা শিখা জ্বলতো।
রাতে ঘরের বাতি নিভিয়ে শুয়ে শুয়ে আমি লাইটারটা দিয়ে খেলতাম। আস্তে আস্তে ওটার গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। ভেতরে বোধহয় ব্যাটারিও ছিলো; সেটাও শেষ হয়ে গেছে। শেষের দিকে কোন মিউজিক হতো না। অনেকক্ষণ উপুড় করে রাখলে কয়েক সেকেন্ড জ্বলতো। তারপর এক সময় পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায় ওটা।
রাকিবও ততদিনে অনেক দূরে চলে গেছে। কলেজ জীবনের বেষ্ট ফ্রেন্ডের স্মৃতিটুকু লাইটারটির সাথেই চাপা পড়ে ছিলো দুনিয়ার হাবিজাবি আর কাগজ-পত্রের নিচে; বলাই বাহুল্য আমার ‘হাত-পা গজানো’ জুতাটিরও নিচে। আজ এতো দিন পর লাইটারটা দেখে কত কিছু মনে পড়ছে। কে জানে রাকিব আজ কোথায় আছে? সেও কি আমার মতই সবকিছু ভুলে গেছে?
আমি লাইটারটা উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগলাম। আগে খুব চকচকে ছিলো জিনিসটা। এখন একটু একটু মরিচা পড়ে গেছে। আনমনেই ওটার ট্রিগারে বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে জ্বলে উঠলো লাইটারটির নীল শিখা। সেই সাথে খুব আস্তে আস্তে বেজে উঠলো খুব পরিচিত একটা মিউজিক। কেন যেন আমার চোখে পানি এসে গেল।
ঘরটা আজ আর গোছানো হলো না। থাকুক অগোছালো হয়ে। ‘কাকের বাসা’ এতো গোছগাছ করার দরকার কী?
লাইটারের নীল আলোয় আমার কেন যেন বারবার দুইটি অতি প্রিয় লাইন মনে পড়ছে। প্রিয় লেখক ড.মুহাম্মদ জাফর ইকবাল এর দু’টি লাইন- ‘জোছনার কোমল আলো এমনিতে চোখে পড়ে না, সেটা চোখে পড়ে যখন সব আলো নিভে যায় তখন।’
———-০———-

– সফিক এহসান
(২৪ মে ২০০৬ইং)

২২ thoughts on “লাইটার

    1. শুকরিয়া!
      শেষ অংশটা আমার

      শুকরিয়া!
      শেষ অংশটা আমার নিজেরও ভিষণ প্রিয়…
      আমি কোন গল্প-উপন্যাস পড়লে প্রায়ই এমন হয় যে- গল্পটা মনে আছে, কিন্তু গল্পের নামটা ভুলে যাই!
      এই লাইন দু’টো আমার এতো প্রিয় যে গল্পটার নাম সহ মনে রেখেছি… মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প- “চা”… ঐ গল্পটারও শেষ দুইটি লাইন ছিল এটা! 😀

      :ফুল:

    1. এইসব ফাকিবাজি টাইপ কমেন্টে
      এইসব ফাকিবাজি টাইপ কমেন্টে এখন থেকে আর প্রত্যুত্তর দেবো না!

      আপনি বলবেন- ভালো লাগল। :থাম্বসআপ:
      আমি বলব- শুকরিয়া/ধন্যবাদ :ফুল:

      কোন মানে হয়? :ক্ষেপছি:

      :হাসি: :হাসি: :হাসি:

  1. নিজেকে সে সময় কেমন যেন

    নিজেকে সে সময় কেমন যেন মহাপুরুষ মনে হচ্ছিলো।

    — এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে হবে :ভাবতেছি:

  2. অসাধারন ।স্মৃতিচারনটা ভিষন
    অসাধারন ।স্মৃতিচারনটা ভিষন ভাল লেগেছে।

    আমারও একটা সহপাঠি বন্ধু আছে যে কিনা বর্তমানে UAE তে আছে ।আপনার পোস্টটি পড়ে ওকে খুব মিস করছি।

  3. লেখাটা পড়ে নিজের অনেক স্মৃতি
    লেখাটা পড়ে নিজের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল। ভবিষ্যতে নিজের স্মৃতি নিয়ে লেখার ইচ্ছা আছে। দেখা যাক কতদিনে লিখতে পারি…………

  4. নস্টালজিক করে দিলেন। আমার
    নস্টালজিক করে দিলেন। আমার ডেস্কেও হয়তো পড়ে আছে কিছু নিঃশেষিত স্মৃতি। খুঁজতে ইচ্ছে করে না। পড়ে থাক সেগুলো নিজের মত।

    1. “…আমার ডেস্কেও হয়তো পড়ে আছে
      “…আমার ডেস্কেও হয়তো পড়ে আছে কিছু নিঃশেষিত স্মৃতি। খুঁজতে ইচ্ছে করে না। পড়ে থাক সেগুলো নিজের মত…”

      তিন লাইনেই তো একটা দারুন গল্প লিখে ফেললেন!
      😀

  5. কিছু স্মৃতি মানুষকে আনন্দ দেয়
    কিছু স্মৃতি মানুষকে আনন্দ দেয় আবার কিছু স্মৃতি মানুষেকে বড়ই পীড়া দেয়….সুতরাং স্মৃতিচারণে ভাল এবং মন্দ উভয়ই বিদ্যমান…..

    1. ভাই, আপনি কি এই মন্তব্যটা
      ভাই, আপনি কি এই মন্তব্যটা কোথাও সেভ করে রেখেছেন? ওখান থেকে শুধু কপি-পেস্ট মারেন?
      দেখে তো তাই মনে হয়! 😛

      যাকগে- মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ… এই কপি পেস্টটুকুই কষ্ট করে কয়জন করে?
      😀

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *