বেকারের ফরিয়াদ……

পেশায় আমি বেকার। সমাজে কোন আকার নেই, তার মানে এই নয় যে আমার কোন স্ট্যাটাস নেই। আমার একটা স্ট্যাটাস আছে, ইজ্জত আছে। আফটার অল আমি এদেশের প্রথম শ্রেণীর একজন নাগরিক।




পেশায় আমি বেকার। সমাজে কোন আকার নেই, তার মানে এই নয় যে আমার কোন স্ট্যাটাস নেই। আমার একটা স্ট্যাটাস আছে, ইজ্জত আছে। আফটার অল আমি এদেশের প্রথম শ্রেণীর একজন নাগরিক। বেকার হলেও সেটার একটা টাইটেল আছে-গ্রাজুয়েট বেকার। এদেশে ভাততো দূরের কথা একটু ছাইপাশ খেয়ে যে বেকারগুলো বেঁচে থাকবে সে উপায় নেই। চালের দাম না হয় ৫০ টাকা মানছি, কিন্তু বলি একটা গোল্ডলিফ সিগারেটের দাম কেন ৫ টাকা হবে? অবাক হই। রোজ কম করে হলেও অমন ১০খানা সিগারেট লাগে আমার। মাঝে সাঝে বন্ধুদের সাথে চায়ের বিলটাও শোধ করতে হয়। ৩ খানা চা ভাগ করে ৬ কাপে নিয়ে দোকানদারের আড়ালে আষ্টজনে খাই। ওই যে, স্ট্যাটাসের ব্যাপার। তারপর হপ্তায় হপ্তায় চুল দাড়ি কাটা। ফুটপাতের মার্কেট থেকে অন্যের ব্যবহৃত কাপড় নতুন করে কিনে পড়া। লজ্জাতো ঢাকতে হবে তাইনা? নইলে তো আবার মামলা ঠুকে দিবেন সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে মানবতা লঙ্ঘন করার অভিযোগে। যাই হোক, হঠাৎ সঠাৎ শরীররটা মেজমেজ করলে কিছু অসুখওতো চাই। আর সবচাইতে বড় খাতের ব্যায় ইন্টারভিউ। আপনাদেরও যেমন মর্জি! সরকারি চাকরির আবেদন করতে গেলেই ৫০-১০০ টাকার পোষ্টাল অর্ডার করে আপনাদের উপহার দিতে হয়। তো মাসে অমন দশ-বিশখানা ইন্টারভিউ থেকেই যায়। খরচতো আর কম নয়। অর্থের যোগানদাতা তো একটাই। দ্যা স্টেট ব্যাংক অব আব্বু‘স পকেট। ওয়ে অব মারিং কাটিং। জগতে কয়টা অপদার্থ বেকার বন্ধু ছাড়া আপন বা কাছের বলে কেউ নেই। বাবা দেখলে নাক সিঁটকায়। মায়ের চোখ সর্বনাশা পদ্মার মতো হয়ে গেছে, এত্তো পড়ালেখা করেও ছেলের কোন গতি হয়নি দেখে। ছোট ভাইয়ের চোখে আমি অবিবেচক, নিজে বিয়ে করে তাকে শিডিউল দিচ্ছিনা। আচ্ছা এটা কি আমার দোষ বাবা! তাকে কে বোঝাবে আর দশজনের মতো আমাদের মামা, খালু বা কাকারা কেউ অত ক্ষমতাবান নয়। বোন আমার লক্ষী, লাখে এক। মুখ বা চোখের ভাষায় কিছু বলেনা ঠিকই। কিন্তু তার মনের ভাষাটা পড়তে কষ্ট হয়না আমার। তার কোন বায়না মিটাতে পারি না বলে আমি তার কাছে অক্ষম। আর এলাকাবাসী কিংবা আত্মীয়দের চোখে আমি একটা উচ্ছিষ্ট। কতোবার বাবাকে তারা পরামর্শ দিয়েছে আমায় ঘর থেকে বের করে দিতে। খামাকা কেন বাড়তি খরচ করা। তাও ভালো, প্রেমিকাটার বিয়ে হয়ে গেছে। নইলে তার মতো হাতি পোষার খরচ আমি কই পেতাম? প্রেমিকা মানেইতো মোবাইল নাও। তারপর কথা বল। যাও, দেখা কর। রিকশায় ঘুরতে হবে। একটু ছুঁতে গেলেই বায়না ধরবে এটা সেটার। ধন্যবাদ মেট্রিক পাশ আর্মি সোলায়মানকে। ও এসে এভাবে আমার প্রেমিকাটাকে বিয়ে না করলে এই খরচটা কমতো না। ও আমাকে উদ্ধার করেছে আবার গ্রাজুয়েট প্রেমিকারও একটা গতি করেছে। বাহ! বাহ! কি মহত তুমি। সমাজ উদ্ধারে তোমার কত্তো দায়! ধন্যি তোমায় সোলায়মান। তবে পিঠটা এখন একেবারেই দেয়ালে ঠেকে গেছে। বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, হয় মরে যাই, নয়তো চাকরী চাই। তাই মাননীয় মান্যবর মিনিষ্টার মশাই, সকল দরজায় কড়া নাড়া পূর্ণ করে আজ আপনার দরবারে ফরিয়াদ নিয়ে এসেছি। আপনি তো দেশের মা-বাপ। কতো কুকুর-বিড়াল আপনার পা ছেটে খাচ্ছে। কতো সভা সেমিনারে অযথাই আনলিমিটেড অ্যামাউন্টের টাকা খরচ হচ্ছে। সরকারি সফরে যাচ্ছেন-বৌ-বাচ্চা-বাবুর্চি-দারোয়ান আর হাজারজন পাইক-পেয়াদা নিয়ে। কতো বুলি শুনি আপনার মুখে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। একবার আমার দিকেও চোখ তুলে তাকান না দয়া করে। বেকার হলেও তো আপনাকে ভোট দেই। সেই সূত্রে আপনার কাছে আমারও কিছু চাইবার আছে। তাই চাচ্ছি। মিনিষ্টার মশাই একটা চাকরি দিন। মুক্তি দিন এই বেকারকে। তা না হলে বেকারদের আত্মহত্যা-এই মর্মে আগামী অধিবেশনে একটা আইন পাশ করুন। তারপর ঘোষনা করুন আমরা অসহায়। আমরা বেকারের কোন গতি করতে পারছি না। বেকাররা চাইলে নিজেই নিজেদের গতি করে নিতে আত্মহত্যা করতে পারে। আমরা তাদের স্মরণে মনুমেন্ট গড়ে দেব, একটা দিবস পালনের ব্যবস্থা করবো। প্রতিবছরের একটি দিন এই জাতি অমর বেকারদের আত্ম প্রাণ বিসর্জনের বীরত্বগাঁথা বিনয় এবং কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে। দেশকে বেকারমুক্ত করতে, দেশে মানুষের বোঝা কমাতে, দেশকে শতভাগ কর্মজীবির দেশ হিসেবে পরিণত করতে বেকারদের এই বিসর্জন কালজয়ী হয়ে থাকবে সোনার বাংলার ইতিহাসের সোনার পাতায় পাতায়। কথা দিলাম রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের আইনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখিয়ে বিদায় নেব সবক’টি বেকার। তবু দেশ ভালো থাকুক। নাক সিঁটকানো বন্ধ হোক বাবাদের। সাগর শুকিয়ে মায়েদের চোখে সবুজ আসুক। শিডিউল নিয়ে ছোট ভাইয়েরা জীবন পাতুক শান্তির ছায়াতলে। লক্ষী বোনটা মুক্তি পাক অক্ষম ভাইয়ের পরিচয় দেয়া থেকে। ইতিহাস ধন্য হোক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ একখানা অমর কাহিনী নিয়ে। আমরা চলে যাব…

১১ thoughts on “বেকারের ফরিয়াদ……

  1. যুদ্ধ… যুদ্ধ… যুদ্ধ…
    যুদ্ধ… যুদ্ধ… যুদ্ধ… জীবন মানেই যুদ্ধ কারো জন্য। আর যারা সোনার চামচ মুখে নিয়ে ঘাড়ে ডজন খানেক মামা-চাচা নিয়ে জন্মায় তাদের জন্য জীবন এক ফুলশয্যা। :মাথাঠুকি:

    আপনার লেখার স্টাইল চমৎকার। তবে লেখায় একটু প্যারা করে করে লিখলে দেখতেও ভালো লাগে, পড়েও আরাম।

    1. ‘আপনার লেখার স্টাইল চমৎকার।
      ‘আপনার লেখার স্টাইল চমৎকার। তবে লেখায় একটু প্যারা করে করে লিখলে দেখতেও ভালো লাগে, পড়েও আরাম’ একমত ডাঃ

  2. স্বাভাবিক জীবন আর বেকার
    স্বাভাবিক জীবন আর বেকার জীবনের মাঝে কতটুকু পার্থক্য তা একজন বেকার ছাড়া অন্য কারোর জন্য অনুধাবন করাটাই কষ্টকর ।

  3. আমি
    এইটা কি নিছকই

    আমি :চিন্তায়আছি: :চিন্তায়আছি: :চিন্তায়আছি: :চিন্তায়আছি: :চিন্তায়আছি:
    এইটা কি নিছকই একটা গল্প নাকি ব্যক্তিগত কথাকাব্য…
    সর‍্যি এমন বিব্রতকর প্রশ্নের জন্যে! তবে আপনি লিখেন চমৎকার,
    এক কথায় অনবদ্য ভাষার একটা ব্যক্তিগত উপলব্ধি পড়লাম…
    লিখতে থাকুন;আর একবুক :দীর্ঘশ্বাস: :দীর্ঘশ্বাস: :দীর্ঘশ্বাস: :দীর্ঘশ্বাস: :দীর্ঘশ্বাস: :দীর্ঘশ্বাস:

    1. ধন্যবাদ…সাথে
      ধন্যবাদ…সাথে থাকবেন…
      সমাজের বুকে যত দুষ্ট ক্ষত,
      গাঁইতি শাবল চালিয়ে উড়াব সেথায় বিজয়ের রথ…

  4. লেখার হাত ভালো ।
    ধন্যবাদ

    লেখার হাত ভালো ।

    ধন্যবাদ মেট্রিক পাশ আর্মি সোলায়মানকে

    কথাটা খুব সহজে বলে দিলেন …আসলেই কি সহজ ছিল ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *