যদি থাকতেন তারা

-“দেখুন,অনেকদিন হয়ে গেল।প্রায় ৩০ বছর কেটে গেল।আপনারা এখনও আপনাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করেন নি।এমতাবস্থায় আমরা আপনাদের আর সহায়তা করব কি না,সে ব্যাপারটা ভেবে দেখতে হবে!যদি আপনারা দ্রুত পদক্ষেপ না নেন,তাহলে আমরা আর আপনাদের দেশে খাদ্য দ্রব্য রপ্তানি করব না।”
-“এত আগের কথা মনে রেখে কি হবে!৩০ বছর আগের কথা মনে রেখে আপনি কি আমাদের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে চান!”

-“দেখুন,অনেকদিন হয়ে গেল।প্রায় ৩০ বছর কেটে গেল।আপনারা এখনও আপনাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করেন নি।এমতাবস্থায় আমরা আপনাদের আর সহায়তা করব কি না,সে ব্যাপারটা ভেবে দেখতে হবে!যদি আপনারা দ্রুত পদক্ষেপ না নেন,তাহলে আমরা আর আপনাদের দেশে খাদ্য দ্রব্য রপ্তানি করব না।”
-“এত আগের কথা মনে রেখে কি হবে!৩০ বছর আগের কথা মনে রেখে আপনি কি আমাদের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে চান!”
-“এত আগের কথা মনে রেখে কি হবে?আমাদের দেশের ৩০ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যার জন্য যারা দায়ী,তাদের বিচার আপনারা করবেন না?তাহলে আমাকে ধরে নিতে হবে আপনাদের বর্তমান সরকার তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন করেন!যদি তাই হয়,তাহলে সেরকম কোন সরকারের আমলে অন্তত বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের কোন কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে না!আপনারা এখনও পর্যন্ত ক্ষমাও চান নি ’৭১ এর জন্য!তাই,আপনাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে,আপনারা কি করবেন!আর যদি নিজেরা বিচার করতে না পারেন,তাহলে তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিন।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার হবে!”
-“দেখুন,আমাদের একটু সময় দিন।এত বড় একটা বিষয়।৩০ বছর আগের অপরাধীদের বিচার করা মুখের কথা নয়!আমরা এ বিষয়ে আমাদের মন্ত্রিসভায় বৈঠক করে আমাদের অবস্থান জানাচ্ছি।”
-“যা করবার,তাড়াতাড়ি করুন!আপনাদের এক সপ্তাহ সময় দিচ্ছি!এরপর বাংলাদেশ সরকার বিবৃতি দেবে যে পাকিস্তান সরকার তাদের অঙ্গীকার পালন করে নি!আর তাই,বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হল!”
-“জি,বুঝতে পারছি।আশা করি,এরকম কিছু হবে না।আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি।”
-“ঠিক আছে।”
এরপর দুজন উঠে দাঁড়ালেন।তারা করমর্দন করলেন।এরপর দুইদলের সকলে সকলের সাথে করমর্দনের মাধ্যমে বৈঠক শেষ করলেন।পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন দলটি চলে গেল।

পররাষ্ট্রসচিব প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে জিজ্ঞেস করলেন,“স্যার,এত বেশি কঠোর হওয়া কি উচিত হল?একদম সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি!”
-“ওদের ভাগ্য ভালো যে এতদিন ওদের সাথে আমাদের সম্পর্ক বজায় ছিল!নাহলে ’৭১ সালে ওরা যা করেছিল,তারপর ওদের মুখ দর্শন করা আমাদের উচিত নয়!ভদ্রতার খাতিরেই কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় ছিল।আর সম্পর্ক না থাকলে আমাদের কোন অসুবিধা হবে না।বরং ওদেরই খাদ্য সংকটে পড়তে হবে!সেই আগেকার মত এখনও ওরা আমাদের উপরই নির্ভরশীল!আর বাংলাদেশের সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আল্লাহর রহমতে শেষ করতে পেরেছি,এবার পাকিস্তানিদের বিচার করতে পারলে দেশ কলঙ্কমুক্ত হবে।শহীদরা ন্যায়বিচার পাবে!”
-“তা অবশ্য ঠিকই বলেছেন,স্যার।”
-“হুম,আজকে আর কার কার সাথে বৈঠক রেখেছেন?”-“ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্বব্যাংকের পরিচালক।”
-“বৈঠকগুলো কখন?”
-“ভারতের প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বেন,আর আমেরিকার পররাষ্ট্রসচিবের সাথে বৈঠক বিকাল ৫ টায়।”

-“দেখুন,মি রায়,আপনাদের দেশের চ্যানেল দেখানোর অনুমতির ব্যাপারে কথা বলার জন্য আমি সঠিক লোক নই।আপনার উচিত আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাথে কথা বলা এসব বিষয়ে।তবে এটুকু আমি বলতে পারি,এই ব্যাপারগুলো দ্বিপাক্ষিক হওয়া উচিত।আপনারা যদি আমাদের দেশের চ্যানেলগুলো দেখান,তাহলেই আমাদের মধ্যে সুস্থ সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান সম্ভব,না হলে বিষয়টার লক্ষ্য অর্জিত হবে না!”
-“আপনাদের চ্যানেল দেখানোর জন্য ট্যাক্স দিতে হবে।”
-“তাহলে আপনারাও ট্যাক্স দেবেন!সমস্যা এখানেই মিটে যায়,তাই না!”
-“আমাদের কর মউকুফ করা….”
-“না,তা কি করে হয়!আমরা ট্যাক্স দেব আর আপনারা দেবেন না,ব্যাপারটা কেমন না!এই বিষয়ে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাই বসে চুক্তি করে ফেলতে পারবে।আমরা বরং অন্য বিষয় নিয়ে কথা বলি!ফারাক্কা বাঁধ থেকে নাকি প্রয়োজনমত পানি দেশে ঢুকছে না!অনেক কম পানি আসছে!চুক্তি এরকম ছিল না!”
-“দেখুন,আমাদের পানির অভাব রয়েছে।সবসময় তাই চুক্তি মানা সম্ভব নাও হতে পারে।আপনাদের কাছ থেকে এটুকু সহযোগিতা আমরা আশা করতেই পারি!আমরা ’৭১ এ আপনাদের সাহায্য না করলে আপনারা কোথায় থাকতেন!”
-“আপনাদের দেশে পানির অভাব থাকতে পারে,কিন্তু তার মানে এই নয় যে,আপনার গরমের সময় পানি সরবরাহ বন্ধ রাখবেন আর আমার কৃষকের পেটে লাথি মারবেন!আবার,যখন বর্ষা আসবে,তখন বাঁধ খুলে আমাদের দেশে বন্যার সৃষ্টি করবেন!’৭১-এ আপনাদের সাহায্যের কথা বাংলার মানুষ ভুলে নাই,ভুলবেও না।কিন্তু এরকমভাবে চলতে পারে না!আমরা ’৭১-এ স্বাধীন হয়েছি পাকিস্তানি অবিচারের হাত থেকে বাঁচার জন্য।বাংলার মানুষের উপর আর কোন অবিচার বরদাস্ত করা হবে না!আপনারা চুক্তি রক্ষা করুন!চুক্তি ভঙ্গ করা নিশ্চয়ই কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ভালো কোন দৃষ্টান্ত নয়!”
-“রাতারাতি কোন কিছু করা কঠিন,তবে আমরা বিষয়টি দেখছি।”
-“ধন্যবাদ।কথা কাজে পরিণত হলেই খুশি হব।আজ তাহলে বৈঠক এখানেই শেষ হোক!”
-“ঠিক আছে।আপনার আমন্ত্রণ রইল ভারতে আসবার!”
-“ধন্যবাদ।সময় পেলে অবশ্যই আসব।”
তারপর সকলে করমর্দনের মাধ্যমে বৈঠক শেষ করলেন।
প্রধানমন্ত্রীর পিএস তাকে জিজ্ঞেস করলেন,“স্যার,কাজটা কি ঠিক হল?ভারতের মত পরাশক্তির সাথে ঝামেলা করা!”
-“কোন পরাশক্তির পরোয়া বাঙালী করে না।সব অন্যায়ের প্রতিবাদ আমি তাদের প্রধানমন্ত্রী হয়ে করব!বাঙালীর অধিকারের প্রশ্নে কোন আপস হবে না!বুঝেছ?”
-“জি,স্যার।”
-“এখন আমার কি করার কথা?”
-“আওয়ামী লীগের একটা জনসভা আছে রেসকোর্সে।”
-“গাড়ি বের করতে বল।”
-“জি,স্যার।”

-“ভাইয়েরা এবং বোনেরা!আমাদের দেশের স্বাধীনতা এনেছি আমরা ৩০ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে!সেই দেশে কোন প্রকার সন্ত্রাস বরদাস্ত করা হবে না!ধর্মের নামে যারা সন্ত্রাস করে,বোমা হামলা করে,তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে!এই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ধর্ম নিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে!কোন প্রকারের উগ্র মৌলবাদ বরদাস্ত করা হবে না!সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে!আওয়ামী লীগও এদের প্রতিহত করবে!কিন্তু আপনাদেরও আমাদের সাথে থাকতে হবে!আমরা সবাই যদি একসাথে এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি,তাহলে এরা কোনমতেই বাংলার মাটিতে ঘাঁটি করতে পারবে না!”
হাজার কণ্ঠে ধ্বনিত হল,“জয় বাংলা!জয় বঙ্গবন্ধু!”
তাজউদ্দীন তন্ময় হয়ে তাকিয়েছিলেন,বঙ্গবন্ধু যখনই ভাষণ দেন,তখনই তিনি এভাবে তাকিয়ে থাকেন।তিনি বসে বসে ভাবছিলেন,“এই মানুষটার একটা আশ্চর্য ক্ষমতা রয়েছে।তিনি যখনই ভাষণ দেন,বাংলার মানুষ উজ্জীবিত হয়ে পড়ে,তাদের মধ্যে এক অদম্য সাহস জেগে ওঠে!৭ মার্চের ভাষণের পর বাংলার মানুষকে থামানো ছিল অসম্ভব।তার ফলশ্রুতিতেই এসেছিল স্বাধীনতা।আমিও এই মানুষটার কাছ থেকেই প্রেরণা পেয়েছিলাম!তার কাছে এক স্বাধীন দেশ ফিরিয়ে দেব,তাই ছিল আমার লক্ষ্য!লক্ষ্য পূর্ণ হয়েছিল।বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন!তারপর অনেক কিছু হল।মাঝে একবার আমার আর তার সম্পর্কে চক্রান্তকারীরা ফাটল ধরাল।আমিও দূরে সরে এলাম!কিন্তু মানুষটা খুব ভালো,একটু রগচটা আর একরোখা কিন্তু খুবই ভালো একজন মানুষ!হঠাৎ একদিন বাসায় হাজির!এসে বললেন,‘কি তাজউদ্দীন!তোমার দেখাই পাওয়া যায় না!বড় ভাইয়ের উপর রাগ করে থাকলে চলে!অনেক কথা তোমার সাথে!’সেদিন আমরা সারারাত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলাম।আমরা দুজন সময়মত নিজেদের সমস্যা মেটাতে না পারলে খুব বড় ক্ষতি হয়ে যেত!বঙ্গবন্ধুকে খুন করার পরিকল্পনা হয়েছিল!সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে আবার দুইজন মিলে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতি গঠনে মন দিলাম।আল্লাহর রহমতে তারপর সব সমস্যাই আমরা ভালোভাবে সামলাতে পেরেছি!দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ,দেশের সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ,অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে,এখন আর সেরকম ঋণের প্রয়োজন হয় না কোন প্রকল্প বাস্তবায়নে।এখনও অনেক সমস্যা আছে।তার মধ্যে জঙ্গিবাদ সবচেয়ে বেশি মাথাব্যাথার কারণ।তবে ইনশাআল্লাহ,এই সমস্যার সমাধানও হবে!”
-“এই তাজউদ্দীন,এদিকে আসো!তুমি না দেশের প্রধানমন্ত্রী!তুমি ভাষণ না দিলে কিভাবে হবে!” তাজউদ্দীন উঠে গিয়ে বললেন,“না,মুজিব ভাই!আপনিই দেন!আমার দেওয়া লাগবে না!”
-“বল কি!..”
ধুম!ধুম!ধুম!মঞ্চের কাছেই বোমা ফুটল,পরপর তিনটা!তাজউদ্দীন মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন,শেষবারের মত চোখ বন্ধ করার আগে দেখতে পেলেন বঙ্গবন্ধুর সারা শরীর রক্তে ভেজা।তিনি অস্ফুটে ডেকে উঠলেন,“মুজিব ভাই!”

-“হ্যালো।”
-“হ্যালো,তোমরা খুব ভালো কাজ করেছ।চালিয়ে যাও!তোমাদের প্রাপ্য তোমরা পাবে!”
-“ধন্যবাদ।ক্ষমতায় বসায় দেন আমাদের!দেখবেন,আপনারা যা চাবেন,তাই হবে!”
-“ধীরে,ধীরে!আস্তে আস্তে সব হবে!”
ফোন রেখে পার্টিতে যোগ দিলেন জনৈক ভারতীয়।মুজিব আর তাজউদ্দীনের মৃত্যুর খবর শুনে বিশ্বের কতিপয় স্থানে পার্টি হল।তারা হাফ ছেড়ে বাঁচল।কারণ,এবার বাংলাদেশকে ভালোমতো ঘোল খাওয়ানো যাবে!তাদের থামানোর আর কেউ নেই!

৪ thoughts on “যদি থাকতেন তারা

    1. জানি,তবুও লিখলাম!তারা বেঁচে
      জানি,তবুও লিখলাম!তারা বেঁচে থাকলে কি হত,তাই দেখানোর চেষ্টা।তাজউদ্দীনের জন্মদিন উপলক্ষে লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *