Pareeksha : শিক্ষার ভগ্ন শরীরের হাঁড়-হাড্ডির দলিল

কোনো কিছুই রাজনীতির বাইরে নয়। তেমনই শ্রেণি বিভক্ত সমাজকে আপনি চাইলেই ফু দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারবেন না৷

ফলে শিল্প-সাহিত্য কপচিয়ে যতই বেড়ান রাজনৈতিক সচেতনতা না থাকলে আপনার চোখে ঠুলি পড়া ; প্রমাণিত। ‘আমি রাজনীতি পছন্দ করি না’ এটাও বড় ধরণের রাজনীতি এবং মানুষের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার মত রাজনীতি। ফলে আপনি রাজনীতি কোনো না কোনোভাবে করছেন৷ কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতা নেই। যেটা থাকা জরুরী।
শিল্প-সাহিত্য নিয়ে জ্ঞানী-গুনীরা অনেক কথা বলেছেন, তত্ত্ব দিয়েছেন ; তা তাদের মত করে। আমার জন্য সে সব বেদ বাক্য বা কোরানের বাণী নয়। ওগুলো স্রেফ পথ প্রদর্শক বৈ আর কিছু নয়। নিজের দেমাগ দিয়ে ভাবি, সিনেমার ভাষা বুঝি নিজের ভাবনার জগৎ দিয়ে। সত্যজিৎ রায় তার ভাবনার জগৎ দিয়ে, তার সমাজ বাস্তবতায় সিনেমাকে তার মত করে দেখেছেন৷ আমার ভাবনার জগৎ আর সত্যজিৎ রায়ের ভাবনার জগৎ এক নয় এমন কি তার সমাজ বাস্তবতা আমার বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় অতীত। ফলে আমি সে অতীতের অভিজ্ঞতা জানতে পারি এবং সে অনুযায়ী নতুন পথ বাতলে নিতে পারি। সুতরাং আমার সিনেমা, শিল্প-সাহিত্যের দর্শন ভিন্ন ; আমার মত।

Pareeksha সিনেমার একটি দৃশ্য

এত কথা বলার কারণ সম্প্রতি প্রকাশ ঝাঁ পরিচালিত সিনেমা Pareeksha. ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি ফাইভে সিনেমাটি মুক্তি দেয়া হয়৷
সিনেমায় গল্পটিই নায়ক। একটি সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমাটি নির্মাণে উৎসাহিত হন প্রকাশ ঝাঁ। বিহারের প্রাক্তন ডিজিপি অভয়ানন্দ আইপিএস অফিসারের পদে থাকা অবস্থায় শিক্ষাবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সে সময় তিনি মাওবাদী এলাকায় গ্রামের বাচ্চাদের সংস্পর্শে আসেন যারা খুবই মেধাবী। ওদের দেখে তিনি এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে নিজের উদ্যোগে তাদের আইআইটি ভর্তির জন্যে কোচিং দেওয়া শুরু করেন। একটা সময় ওদের সাফল্য সে অঞ্চলে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে। আর এ ঘটনাকেই উপজীব্য করে Pareeksha-র চিত্রনাট্য গড়ে উঠে। আম্বিদাকর বস্তিতে স্ত্রী, সন্তান সহ বাস করা রিক্সা চালক বুচ্চি ও তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন এবং সে স্বপ্ন পূরণের কাহিনী Pareeksha সিনেমায় বলেছেন প্রকাশ বাবু। আমাদের সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থা, তা লাভ করতে গিয়ে নিম্নবিত্তদের কোন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয় এবং এই নিম্নবিত্ত অবস্থানকে উপজীব্য করে বুলবুল কুমার তার মেধাকে কাজে লাগিয়ে সমাজের টাকাওয়ালাদের – যাদের শিক্ষা পাওয়া অর্থগত অধিকার সে সব উচু তলার প্রাণীদের ঠিকঠাক জবাব দেন। তার এই কাজে সাহায্য করেন এএসপি কৌলাস আনন্দ।
সব মিলিয়ে পাতি-বুর্জোয়া মানসিকতায় একজন নিম্নবিত্ত আয়ের মানুষের ‘দারিদ্রতা’ থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বপ্নই উহ্যভাবে এ সিনেমায় প্রকাশ পেয়েছে।
তবে গল্পের ভাব সাধারণ হলেও এই গল্পটাই সিনেমার ভিত্তি। তাতে প্রাণ হয়ে ধরা দিয়েছেন আদিল হুসেন-এর অনবদ্য ও দূর্দান্ত অভিনয়। একজন গরীব রিক্সা চালক, পরিশ্রমী, স্বপ্নবাজ, গরীবীয় নরক থেকে বের হওয়া মানসিকতার একটি মিশেল গোটা শরীরে নিয়ে আদিল হুসেন এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন। হাঁটা, কথা বলা, আচরণ এতটা নিখুঁতভাবে একজন রিক্সাওয়ালা বুচ্চিকে আদিল হুসেনের শরীরে জন্ম দিয়ে লালন করেছেন যে চোখ তৃপ্তি পেতে থাকবে সিনেমার শুরু থেকেই।

গোটা সিনেমা জুড়ে এক প্রকার আদিল হুসেনের আদিপত্য। তবে তাকে পুরোটা সময় সাপোর্ট দিয়েছেন তার স্ত্রী রাধিকা চরিত্রে অভিনয় করা প্রিয়াংকা বোস।
অল্প সময়ের স্ক্রীনে বাড়তি অভিনয় দেখানোর কোনো চেষ্টাই করেন নি। একইভাবে বুলবুল চরিত্রে শুভম ঝাঁ একেবারেই ভিন্ন রকম। যেটা বেশ প্রয়োজন ছিলো ওই চরিত্রের মনস্তত্ত্বের জন্য। বিশেষ করে অল্প সংলাপে এক্সপ্রেশন দিয়ে নিজের অবস্থান, পরিস্থিতি প্রকাশ করার বিষয়টি বেশ ভালো ছিলো। অন্যান্য চরিত্রগুলোও নিজ নিজ জায়গায় ঠিকঠাক ছিলো।
নির্মাতা হিসেবে প্রকাশ ঝাঁ বরাবরই রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বেছে নিয়েছেন সিনেমার জন্য।
এবারের সিনেমায় তিনি আমাদের এই উপমহাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা ও তার সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষ এবং ‘একটু ভালো’ থাকতে চাওয়ার পাতি-বুর্জোয়া অবস্থানের এক চিরায়ত দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। সিনেমার জন্য গল্প, চরিত্রগুলোর অভিনয়ের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য ছিলো টানটান উপস্থাপন। কোনো দৃশ্য কোথাও গিয়ে ঝুঁলে যায় নি। এরপর কি এরপর কি? জিজ্ঞাসা নিয়ে ১ ঘন্টা ২০ মিনিট কখন যে কেটে যাবে!

শেষ কথায় বলা যায় বিনোদনই মূখ্য নয়। সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়েই শিল্প-সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়। কাতুকুতু দেয়া ভাঁড়ামো নিছক সময়ের চাহিদা। মগজের প্রশান্তি, সমাজের অনৈতিকতা দূর করতে সিনেমায়, কবিতায়, গানে, চিত্রে সহ শিল্পের বিভিন্ন শাখায় সামাজিক, রাজনৈতিক শুদ্ধ চেতনার যুগল লড়াই প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *