বিদেশের নয়, ইনি আমাদেরই প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা, ২৮ জুলাই: জুলাই মাসের ২৭ তারিখ। নানা কারণেই হয়ত বিশ্বজুড়ে এর মহাত্ম থাকতে পারে। তবে বাংলাদেশে ২০১৩ সালের এই তারিখটি অনন্য হয়েই থাকুক। এই দিনে একজন সরকার প্রধান বলয় ভেঙ্গেছেন আমলাতান্ত্রিকতার। এক শাড়িতে তাকে দেখা গেছে নানা রূপে। যেখানে কখনও তিনি স্বজন হারানোতে শোকাতুর মানুষের স্বান্তনা, কখনও অসহ্য যন্ত্রণার জীবন বয়ে চলা নারীর বন্ধু, কখনও আবার মমতাময়ী মা। এই সরকার প্রধান আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ তার এক শাড়িতে তিন গল্প।




ঢাকা, ২৮ জুলাই: জুলাই মাসের ২৭ তারিখ। নানা কারণেই হয়ত বিশ্বজুড়ে এর মহাত্ম থাকতে পারে। তবে বাংলাদেশে ২০১৩ সালের এই তারিখটি অনন্য হয়েই থাকুক। এই দিনে একজন সরকার প্রধান বলয় ভেঙ্গেছেন আমলাতান্ত্রিকতার। এক শাড়িতে তাকে দেখা গেছে নানা রূপে। যেখানে কখনও তিনি স্বজন হারানোতে শোকাতুর মানুষের স্বান্তনা, কখনও অসহ্য যন্ত্রণার জীবন বয়ে চলা নারীর বন্ধু, কখনও আবার মমতাময়ী মা। এই সরকার প্রধান আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ তার এক শাড়িতে তিন গল্প।

গল্প-১
রান্নাঘরে নারী রান্না করছেন, এমন দৃশ্যে আমরা অভ্যস্থ। এটা অতিমানবীয় কিছু নয়। হরহামেশাই আমরা আমাদের মা-বোন-স্ত্রীদের রান্না করতে দেখছি। কিন্তু একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী রান্না করছেন, এই দৃশ্যে আমরা কখনও অভ্যস্থ নই। এটা আমাদের জন্য বিস্ময়ের! আর সেই প্রধানমন্ত্রী যখন হন আমাদের, তখন দৃশ্যটি আবেগেরও বটে।
আজ ২৭ জুলাই ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র শেখ সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্মবার্ষিকী। পুত্রের জন্মদিনে মা শেখ হাসিনা রান্না করেছেন। সেই রান্নার ছবি প্রকাশ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। ছবিতে দেখা গেছে শ্বাশত বঙ্গললনার ভূমিকায় মাননীয় প্রধান মন্ত্রী। যেখানে তিনি একজন মমতাময়ী মা। রান্নাঘরে ব্যস্ত ছেলের জন্য পোলাও রান্নায়।
ছবিটি প্রকাশের পর থেকে শুরু হয়েছে আলোচনা। সমালোচনাও কম হয়নি। বাংলাদেশ একটি দেশ, যেখানে সব কিছুতেই রাজনীতি খোঁজা হয়, সমালোচনা খোঁজা হয়। বাদ যায়নি মা হাসিনার পোলাওয়ের পাতিল।
অথচ আজকের এই ছবিতে যদি বিদেশের কোন সরকার প্রধানকে দেখা যেত, তবে আবেগে ভেসে যেতাম বাঙ্গালী। দাবি করতাম, আমাদের দেশে এমন নেতা-নেত্রীর সন্ধাণ কোনদিন মিলবে না। ইরানের আহমেদনিজাদের ছেঁড়া শার্ট, মেঝে তে শুয়ে থাকা, রাস্তার পাশে নামাজ পড়ার ছবি মোটামুটি পূজা দেয়া হয়েছে। ইউরোপ এর এক প্রধানমন্ত্রী সাইকেল করে নিজ কার্যালয়ে যাবার পর তুলনা এসেছিলো, আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি পারবে এ ভাবে কার্যালয়ে যেতে। হুগো শ্যভেজ এর ফুটবল খেলা দেখা কিংবা ম্যারাডোনার সাথে আড্ডা দেবার ছবি দেখে আমরা তৃপ্তি পাই। বারাক ওবামার গ্যাংনাম স্টাইল আমাদের মজা দেয়। শুধু আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর রান্না করার ছবিই হয়ে যায় পলিটিক্যাল উদ্দেশ্যপ্রনোদিত।
এর কি কারণ তা আমার জানা নেই। তবে এটুকু বুঝি, প্রধানমন্ত্রীর রান্না করা নিয়েও যারা রাজনীতির মারপ্যাচ খেলেন তাদের মানসিক সুস্থতায় সন্দেহ থাকে।
ক’দিন আগেও দৈনিক মানবজমিন ভারতের এক মুখ্যমন্ত্রীর খবর ছেপেছিল। যিনি নাকি মুখ্যমন্ত্রী হয়েও সাধারণ জীবন যাপন করেন। কিন্তু মানবজমিন কোনদিন ছাপেনি আমাদের আহসানউল্লাহ মাস্টারের গল্প। কোনদিন ছাপেনি দিলীপ বড়ুয়াদের নেতা হয়ে উঠার গল্প। হয়ত ছাপার সুযোগ হবেওনা কোনদিন।
তবে শেখ হাসিনার রান্না নিয়ে দেশের জননন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের কাঠপেন্সিল বইটাতে একটা লেখা আছে। পাঠকদের জন্য সেটা হুবহু তুলে দিলম-
‘বর্তমানের এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ যখন মন্ত্রী ছিলেন না, তখন একরাতে আমার বাসায় আড্ডা দিতে এসেছিলেন। আড্ডায় রান্নার প্রসংগ উঠতেই তিনি মোটামুটি অভিভূত গলায় বললেন, হুমায়ূন ভাই, শেখ হাসিনা যে কত ভাল রাঁধতে পারেন তা কি আপনি জানেন?
আমি বললাম, জানিনা, জানার কোন সুযোগ নেই।
সৈয়দ আশরাফ বললেন, তাঁর রান্না যে শুধু অসাধারন তা-না। অসাধারণের অসাধারণ!
বঙ্গবন্ধু কন্যার এই গুণটির কথা কেউ মনে হয় জানেন না, সুযোগ পেয়ে জানিয়ে দিলাম।’

সবশেষে আলোচনা সমালোচনা যাই হোক, দিনের শেষে জয় শেখ হাসিনারই। জয় বাঙ্গালী নারীর, জয় মাতৃত্বের।

গল্প-২
গত ২৬ জুলাই শুক্রবার সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা গেছেন সরকার দলীয় এমপি গোলাম সবুর টুলু। দুর্ঘটনায় কারও হাত নেই, তাই রাজনীতি হলনা। রাষ্ট্রীয় সম্মানে বনানী কবরস্থানে সমাহিত হলেন আওয়ামী লীগের এই নেতা।
সরকারের কাজ সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষোনা করা, তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা। শেখ হাসিনার সরকার তা করেছে। গল্পটা ওখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু গল্পটা আরেকটু দীর্ঘ করেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা।
শেখ হাসিনা ছুটে গিয়েছেন গোলাম সবুর টুলুর শোকসন্তপ পরিবারে। চোখের পানি মুছতে মুছতে সান্তনা দিয়েছেন স্বজন হারানো মানুষগুলোকে। বুকে টেনে নিয়েছেন পরম প্রিয়জনের মত। স্বজন হারানোর দুঃখ কেমন, সেই যন্ত্রণার অভিজ্ঞতায় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন নতুন করে বেঁচে থাকার পথে।
গোলাম সবুর টুলুর স্বজনের কান্না মুছে দেয়া শেখ হাসিনা কোন প্রধানমন্ত্রী নন, দল প্রধান নন। তিনি মানুষ, একজন মমতাময়ী নারী। মানুষের কান্না যাকে কাঁদায়, মানুষের জন্য তিনি কাঁদেন।

গল্প-৩
বাংলাদেশের আনাচে কানাচে কত বিস্ময় নিয়ে বেঁচে আছে মানুষ! কত বিস্ময়কর গল্পই আমাদের অজানা। তেমনি এক বিস্ময় উম্মোচিত করা গল্পের নায়িকার নাম রমা চৌধুরী। যিনি ৪২টা বছর ধরে নীরবে নিভৃতে বয়ে চলেছেন অসহ্য যন্ত্রণার মহাসাগর। কারও হয়ত জানা ছিল, কিন্তু জানা ছিল না অনেকেরই। নারী স্বাধীনতার শিকল পড়া ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। ভাবা যায়, নারীর কত বড় সাফল্যের উদাহরণ রমা চৌধুরী!
একাত্তরে ধর্ষিতা হয়েছিলেন। হারিয়েছেন তিন পুত্রকে। যে মাটিতে তাঁর সন্তান ও মুক্তিযোদ্ধারা ঘুমিয়ে আছেন সে মাটির উপর দিয়ে তিনি জুতা পড়ে হাঁটতে পারেন না। তাই পায়ে জুতা পড়েন না রমা চৌধুরী। হতে পারে এটা তার নিজের জীবনের প্রতি অভিমান। অভিমান তার করারই কথা। কিন্তু সেই অভিমান ভাঙ্গাতে কেউ যায়নি তার কাছে। কেউ পাশে বসেনি সান্তনার হাত বাড়িয়ে।
মিডিয়ার কল্যাণ্যে আলোচনায় আসেন একাত্তরের বীরাঙ্গনা এই নারী। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিগোচর হলে তিনি রমা চৌধুরীকে আমন্ত্রণ জানাতে তার বিশেষ সহকারী (মিডিয়া) মাহবুবুল হক শাকিলকে নির্দেশ দেন।
আমন্ত্রণের সংবাদ শুনে রমা চৌধুরী প্রথমে অভিমান করলেও পরে তার মান ভাঙে। তাৎক্ষণিকভাবে এ নিয়ে তিনি পদ্যও লেখেন- ‘হাসিনা, বোন হাসিনা! দেখতে আমায় চাও, যদি ভালো আমায় বাসো/ বলবো তবে ঢাকা ছেড়ে চাঁটগায় চলে আসো।’
তারপর নিজেই এলেন, খালি পায়ে। সম্মানীত হলেন গণভবনে। একাত্তরের আরও একটি দায়শোধের তৃপ্তি পেল বাংলাদেশ। যার নেতৃত্ব দিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আমরা দেখলাম, সাদা চুলের দুই নারীর আলিঙ্গন। স্বজন হারানোর বেদনা ভাগাভাগির দৃশ্য। কে কতদিন তা মনে রাখবেন জানা নেই। তবে গণভবন এই স্মৃতি সহজে মুছে ফেলতে চাইবে না এটা হৃদয়ের বিশ্বাস।

১৪ thoughts on “বিদেশের নয়, ইনি আমাদেরই প্রধানমন্ত্রী

  1. ভাল লিখছেন
    তবে,”ঢাকা,২৮

    ভাল লিখছেন
    তবে,”ঢাকা,২৮ জুলাই:জুলাই মাসের ২৭ তারিখ” দেখে প্রথমে একটু ধাক্কা মত খেয়েছিলাম
    আর এই ভোররাতে সবাই আপনার লেখা পড়ার জন্য আদাজল খেয়ে লাগল কেন?কাহিনী কি?

    1. আমি লেখাটা পোস্ট করেছি ২৮
      আমি লেখাটা পোস্ট করেছি ২৮ জুলাই। আর লেখার কাহিনীগুলো ২৭ জুলাইয়ের। আশা করছি কাহিনী ক্লিয়ার। ধন্যবাদ…

  2. রমা চৌধুরী যে ৪২ বছর পরে এসে
    রমা চৌধুরী যে ৪২ বছর পরে এসে কিছুটা হলেও সম্মানিত হলেন – এটা জেনে আমার অনেক ভালো লাগছে । আর প্রধানমন্ত্রী একজন মানুষ । সাধারণ মানুষের মতোই তার সুখ – দুঃখের অনুভুতি । এটা নিয়ে রাজনীতি বা হই চৈ করার কিছু নেই । নিজের ছেলের জন্য ভালো মন্দ রান্না তিনি করতেই পারেন । এবং করা উচিৎ । জয়ের ও উচিৎ তার জানা রান্নার কোন ভালো আইটেম তার মাকে রেঁধে খাওয়ানো ।

  3. ইরানের আহমেদনিজাদের ছেঁড়া
    ইরানের আহমেদনিজাদের ছেঁড়া শার্ট, মেঝে তে শুয়ে থাকা, রাস্তার পাশে নামাজ পড়ার ছবি মোটামুটি পূজা দেয়া হয়েছে। ইউরোপ এর এক প্রধানমন্ত্রী সাইকেল করে নিজ কার্যালয়ে যাবার পর তুলনা এসেছিলো, আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি পারবে এ ভাবে কার্যালয়ে যেতে। হুগো শ্যভেজ এর ফুটবল খেলা দেখা কিংবা ম্যারাডোনার সাথে আড্ডা দেবার ছবি দেখে আমরা তৃপ্তি পাই। বারাক ওবামার গ্যাংনাম স্টাইল আমাদের মজা দেয়। শুধু আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর রান্না করার ছবিই হয়ে যায় পলিটিক্যাল উদ্দেশ্যপ্রনোদিত…
    খুবই বাস্তব কথা বলেছেন!! পড়ে খুব ভাল লাগল!!

    1. ধন্যবাদ। আর আমিও
      ধন্যবাদ। আর আমিও বলছি…সমাজের বুকে যত দুষ্ট ক্ষত,
      গাঁইতি শাবল চালিয়ে উড়াব সেথায় বিজয়ের রথ…

  4. প্রধানমন্ত্রীর রান্নাঘরের
    প্রধানমন্ত্রীর রান্নাঘরের ছবিটা যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণীত হয়,তাহলে খালেদা জিয়ার রোজা রাখা আর পাপী পাপিয়ার শফিকে ‘আলেম’ বলে স্বীকৃতি দেয়াও উদ্দেশ্যপ্রণীত বটেই :মাথানষ্ট:

  5. বাঙালি একটা টপিক পাইলে হইছে,
    বাঙালি একটা টপিক পাইলে হইছে, চিপে তিতা না করে শান্তি নাই। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর দুইটা ছবি আলোচনায় এসেছে। যেই ছবিটি নিয়ে বেশী আলোচনা হওয়া উচিৎ ছিল সেটি বাদ দিয়ে সবাই মোরগ পোলাও নিয়ে শুরু করছে।

  6. হুম… ভালো লাগলো।
    আসলে

    হুম… ভালো লাগলো।

    আসলে অসুস্থ রাজনীতি আমাদের মন এতোটাই বিষিয়ে দিয়েছে যে আমরা সব কিছুতেই রাজনীতির তেতো স্বাদ পাই…
    জ্বর মুখে সব কিছুই তিতকু লাগে- সেটা মুখের দোষ, খাবারের নয়!

    যাই হোক, এই একটা পোস্টে অন্তত শেখ হাসিনা “আওমীলীগ এর প্রতিক” না হয়ে আমাদের দেশের “প্রধান মন্ত্রী” হোক।
    :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *