ধোয়াটে স্বপ্ন

স্মকিং করতে আসিফের বেশ ভালো লাগে। আসিফ এর মনে হয় যে সে তার সকল অপ্রাপ্তি গুলো কে ধোয়ার মাধ্যমে বাতাসে মিলিয়ে দিচ্ছে। আর দশ টা ছেলের মত আসিফ এর স্মকিং শুরু করার পেছনে বড় কোন অপ্রাপ্তি হয়তো ছিল। তবে তা হয়তো তার দুর্বল মানসিকতার পরিচয় তুলে ধরে।তেমন কিছু ই না। শুধু মাত্র একটি মেয়ে এর জন্য তার স্মকিং করার সূচনা। আসিফ বেশ সিধে সাধা আর লাজুক ছিল। তার পরিবর্তন টাও এসেছে সেই মেয়ের হাত ধরেই। মেয়ে টা তাকে অনেক কিছু ই শিখিয়েছে। মেয়ে টা তাকে ভাবতে শিখিয়েছে। মেয়ে টা তার অনুভূতি গুলো কে চেপে না রেখে প্রকাশ করতে শিখিয়েছে।মেয়ে টা তাকে ভালোবাসার অনুভূতি বুঝতে শিখিয়েছে। মেয়ে টা তার মধ্যে সাহস জাগিয়েছিল। মেয়ে টা আসিফ এর আত্মবিশ্বাস কে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে। মোট কথা আসিফ কে পরিপূর্ণ সামাজিক মানুষ হতে সাহায্য করেছিল মেয়ে টি, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা শিখিয়েছিল। অনেক বেশি ই দিয়েছিল মেয়ে টা তাকে। কিন্তু আসিফ! কিছুই দিতে পারেনি তার বিনিময়ে।
সামান্য ভাল বেসেছিল(সামান্যই হবে,প্রমাণ করতে পারেনি যে আসিফ, তার ভালবাসা কতটা বিশাল ছিল।আজকাল আবার প্রমাণ ছাড়া কেউ কিছু বিশ্বাস করে নাকি।আসিফ আবার বোকা। সে জানেনা ভালবাসতে।মেয়ে টা তাকে যতই ভালবাসতে শেখাক না কেন! আসিফ তো মেয়ে টিকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।),আর তার পুরোটা সত্ত্বা জুড়ে মেয়ে টিকে জড়িয়ে নিয়েছিল, নিজের অজান্তে। মেয়ে টা যতদিন তার পাশে ছিল জগৎ টা অনেক বেশি স্বপ্নময় হয়ে উঠেছিল আসিফ এর। সে জীবন টাকে গুরুত্ব দিতে শিখেছিল। জীবন এর মূল্য হঠাৎ করেই বেরে গিয়েছিল বহুগুণে, সেই মেয়ে তার কল্যাণে।সেই মেয়ে, সেই মেয়ে করতে ভাল লাগছে না। একটা নাম দিলেই হয়। কি নাম দেওয়া যায়!
-অবন্তী।
-নাহ।
-বৃষ্টি।
-নাহ।
-মেঘলা।
-হুম, এটা মানায়।
মেঘলা! মেয়ে টা মেঘ এর মত শুভ্র ছিল। তার অনুভূতি গুলো ছিল শুভ্র মেঘ এর মত। খোলা আকাশে ইচ্ছে মত ঘুরে বেড়াত। সেই শুভ্র মেঘ এর আড়ালে ছিল এক মুঠো ধূসর মেঘ। শুভ্রতা দিয়ে যেই ধূসরতা কে ঢেকে রাখত মেঘলা। আসিফ কখনও বুঝতে পারেনি মেঘলার ধূসর মেঘ গুলো কে।নিজের দুঃখ গুলো চেপে রাখতে পটু ছিল মেয়ে টি। ঠোঁট এ সবসময় হাসি লেগেই থাকতো।মেঘলা… একটা গান এর কথা মনে পরে গেলো আসিফ এর।
ও মেঘলা মেয়ে যাস নে চলে…
এখনও দেখা শেষ হয়নি তোকে…
ছোট বেলা থেকেই আসিফ এর sad romantic type গান গুলো বেশি ভাল লাগতো। যেমন তার যখন মোটামুটি ১০/১১ বছর বয়স ছিল। এলো.আর.বি এর সেই তুমি গান টা ওর প্রায় মুখস্থ ছিল। ছোট একটা ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল তার। সেটায় সুযোগ পেলেই এই গান টা শুনত। আচ্ছা, ছোট বেলা থেকেই এরকম অনুভূতির ছোঁয়াতে হারিয়ে যেতে ভাল লাগতো বলেই কি আজ সত্যি সত্যি এই অনুভূতির মাঝে এভাবে বন্দি হয়ে পরেছে সে! না পাওয়ার বেদনা কে আগে যে আসিফ কল্পনা করে অনুভব করতো। আজ এ পর্যায়ে এসে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে না পাওয়ার অনুভূতি নিয়ে এগুনো এই জীবন টা আজ এতটা বিতৃষ্ণা মাখা!
একটার পর একটা ভুল সিদ্ধান্ত আজ আসিফ কে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। একটা ঘর এ সারাক্ষণ এভাবে পরে পরে ধোয়ার রাজ্য গড়ে তুলেছে আসিফ। মাঝে সাঁঝে ডাইরি লিখতে বসে। যা ইচ্ছে লিখে যায়, এলোমেলো ভাবনায়।মা ও আজ আর কিছু বলে না। শুধু মাত্র খাবার সময় একটু আধটু কথা হয়। মাঝে মাঝে জীবন নিয়ে বেশ লম্বা বক্তব্য ও দেয়। আসিফ এর কানে ঢোকে না কথা গুলো। আসিফ তো হারিয়ে গিয়েছে। ধোয়াটে ধূসর মেঘ এর আড়ালে।জীবন তার কাছে আজ অর্থহীন। যত শুভ্র অনুভূতি আছে, সব আসিফ হারিয়ে ফেলেছে, আজ তার আকাশ জুড়ে শুধুই ধূসর মেঘ এর বিচরণ। মাঝে মাঝে হয়তো আনমনে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরে।ভিজিয়ে দেয় আসিফ এর কল্পলোক। সেই বৃষ্টি তে ভিজে কিছু টা স্বস্তি ছিনিয়ে নেয় আসিফ। ধীরে ধীরে আবারও ধূসর মেঘ জমতে থাকে আকাশ এ। ঢেকে দেয় আসিফ এর শুভ্রতা গুলোকে।ধূসরতার আড়ালে বন্দি হয়ে রয় আসিফ।এভাবেই যাচ্ছে আসিফ এর জীবন।
হাতে একটা 9mm আসিফ এর। ভেতরে গুলি ভরা আছে। ওর এক বড় ভাই ছাত্র রাজনীতি করে। আসিফ যখন বিশ্ববিদ্যালয় এ পড়তো তখন এই ভাই এর সাথে তার বেশ সখ্যতা ছিল। অনেক বলে কয়ে এটা নিতে পেরেছে আসিফ। কোনভাবেই দিতে রাজি ছিল না ভাই টা। শেষমেশ ইমোশনাল ব্ল্যাক-মেইল করতে হয়েছিল। তারপর ই না দিয়েছি। টাও প্রায় এক মাস সময় নিয়ে। একটা মাস অবশ্য খারাপ কাটেনি আসিফ এর।ওর কিছু প্রিয় মুহূর্ত গুলো কে বেশ ভালভাবেই অনুভব করতে পেরেছে। চাঁদপুর এ মেঘনা-ঘাট এ যেয়ে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বসে থেকেছে, লাকসাম যেয়ে রেল লাইন ধরে আনমনে হেঁটেছে। কক্সবাজার যেয়ে বীচ এ বসে রাত কাটিয়েছে,মাতাল হয়ে বীচ এ হেঁটেছে।যমুনা নদীতে চর এ গিয়ে বালু দিয়ে খালি পায়ে হেঁটেছে। ওর যত প্রিয় মুহূর্ত আছে, স্বপ্নময় মুহূর্ত আছে। সব পূরণ করেছে একে একে,যতগুলো সম্ভব ছিল।এখন আর তেমন আফসোস কাজ করছে না। এক মাস সময় পেয়ে ভালই হয়েছিল। সমুদ্রের ঢেউ এর গর্জন শুনছে আর ভাবছে, আর তো তেমন কোন ইচ্ছে পূরণ করা বাকি নেই। যেগুলো সম্ভব ছিল,করেছে।ফোন বের করে দেখল তিন টা বেজে ঊনত্রিশ মিনিট। ফোন টা থেকে মেঘলার টেক্সট গুলো সব বসে বসে পরেছে একটু আগেই।সংরক্ষিত করা সব নাম্বার ডিলিট করলো, মেঘলার মেসেজ গুলো ডিলিট করতে গিয়েও থেমে গেল,থাক না এগুলো। সমুদ্রের মাঝে ফোন এর সাথে সাথে এগুলো হারিয়ে যাবে। মিশে যাবে জলের সাথে।আসিফ উঠে দাড়িয়ে সমুদ্রের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।হাঁটু সমান পানিতে গিয়ে ফোন টা গায়ের সমস্ত শক্তি এক করে ডান হাত দিয়ে ছুঁড়ে ফেলল সমুদ্রে।বাম হাতের 9mm টা হাত বদল করে ডান হাতে নিলো। তাহলে কি এখানেই শেষ হয়ে যাবে সবকিছু!
স্বপ্নময়তা,কল্পনা,বাস্তবতা এ তিন মিলে আসিফ কে যা দিয়েছে, তা বেদনা ছাড়া আর কিছু দিয়ে আখ্যায়িত করা যাবে না। ওর সব ইচ্ছে গুলো, স্বপ্ন গুলো তিল তিল করে চেপে ধরে মেরে ফেলা হয়েছে। ওর জীবনের শুভ্রতা গুলো কে তিল তিল করে ধূসরতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। পাওয়া না পাওয়ার হিসেব কশতে গিয়ে ফলাফল শূন্যই আসে প্রতিটি বার।ক্লান্ত হয়ে পরেছিল আসিফ। হিসেব কশতে কশতে বড্ড বেশি ক্লান্ত হয়ে পরেছে সে। হতাশা, শূন্যতা আর অপ্রাপ্তি নিয়ে আর কত বেঁচে থাকা যায়?
আজ আসিফ এর আকাশ জুড়ে বৃষ্টি, তার আকাশের ধূসর মেঘ গুলো আজ ভিজিয়ে দিচ্ছে তার কল্পলোক। আজ সে ভিজছে মুক্তির আনন্দে। উফ, কি আনন্দ। কতদিন এমন আনন্দঘন মুহূর্ত দেখেনি আসিফ। শেষ কবে যেন দেখেছিল। হুম, মনে পরেছে। ওর জন্মদিন এ। মেঘলা ওকে বড্ড বেশি সুখ দিয়ে ফেলেছিল। আসলেই কিছু কিছু মানুষ দুনিয়াতে আসে শুধু মাত্র ধূসরতায় হারাতে।শুভ্রতা তাদের জন্য নয়।যতবার আসিফ শুভ্রতা পেয়েছে, প্রতিবার তার চেয়ে বেশি ধূসরতা তাঁকে গ্রাস করে নিয়েছে।মুক্তির আনন্দে আসিফ এর আকাশ এর বৃষ্টি ওর দুচোখ দিয়েও জানিয়ে দিচ্ছে, আজ তোমার মুক্ত হবার দিন।ওর কল্পলোক এর সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ বৃষ্টির জল এ ভিজে কর্দমাক্ত, সেই কাদায় দাড়িয়ে আসিফ আজ মাটির ঘ্রাণ নিচ্ছে। আর তার মৌন আঁধার ঘেরা জগৎ হতে আঁধার এর কান্নার স্বর ভেসে আসছে। কারণ আজ সেই আঁধার কে আলো দিয়ে ভরিয়ে দিবে আসিফ। আজ সেই আঁধার এর মরবার পালা এসেছে। তাই সে কাঁদছে। আসিফ হেসে বলে উঠলো, কেঁদে নেও। আজ তোমার কান্না করার দিন। আর আজ আমার কষ্ট ভোলার দিন।তার মিইয়ে পরা শুভ্রতা গুলো আজ স্বর ফিরে পেয়েছে, নীরবতা ভুলে আজ তারা চিৎকার করে বলছে, আজ তুমি মুক্ত আসিফ। আজ তুমি মুক্ত।
মুখ দিয়ে 9mm এর নল ঢুকিয়ে ট্রিগার এ আঙ্গুল দিল আসিফ। এই ট্রিগার চেপে দিলে তার মুক্তি হয়ে যাবে আজ।জানেনা মরে গেলে কি হয়। যাই হোক। নতুন কিছু তো হবে?
নতুন অভিজ্ঞতা পাবার লোভ কি সহজে সামলাতে পারে মানুষ!
এভাবে সুযোগ পেয়ে ছাড়া তা কি বোকামি না!
অবশ্যই বোকামি। আসিফ আর বোকামি করতে চায় না।বাবা মা এর কত স্বপ্ন ছিল তাকে নিয়ে। কিচ্ছু পারেনি সে, কিচ্ছু না। না পেরেছে নিজের জন্য কিছু করতে না। না পেরেছে বাবা-মার স্বপ্ন পূরণ করতে। বোকা ছেলে আসিফ। কিচ্ছু পারে না।
এবার আসিফ ভুল করতে চায় না। এতো ভেবে কি বা হবে! জীবন টা তো ভাবতে ভাবতে চলে যাবে না। তার চেয়ে একটা নতুন অভিজ্ঞতা হোক। আসিফ এর বেশ ভাল লাগছে। আনন্দে আসিফ এর দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে।
-আর দেরি নয়। তাড়াতাড়ি করো আসিফ।
তার শুভ্রতা গুলো উন্মুক্ত হয়ে উড়ে বেড়াবে বলে উন্মুখ হয়ে আছে, তারা তাকে তাড়া দিচ্ছে।
-বিদায় সমাজ।বিদায় সামাজিক মানুষেরা।বিদায় বাবা-মা।বিদায় মেঘলা। বিদায়…
আলতো করে ট্রিগার চেপে দিল আসিফ।

৬ thoughts on “ধোয়াটে স্বপ্ন

  1. আত্মহত্যা খুব খারাপ প্রবণতা।
    আত্মহত্যা খুব খারাপ প্রবণতা। জীবনে ঘাত প্রতিঘাত আসবেই। সেটাকে সামলে নিয়ে পথচলাই মানুষের কাজ। এর থেকে পালিয়ে বেড়ানো নয়।

    1. ধন্যবাদ। অসাধারণ করার ইচ্ছেও
      ধন্যবাদ। অসাধারণ করার ইচ্ছেও ছিল না। একজন হতাশাগ্রস্থ মানুষ এর শেষ পরিণতি নিয়ে লিখেছি শুধু। তার কিছু অনুভূতি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।

  2. সুনীল বলেছিলেন, “আত্মহত্যার
    সুনীল বলেছিলেন, “আত্মহত্যার একটা বাজে দিক হল ইহা বার বার করা যায় না “।
    ঠিক তাই ।মরে গেলে আপনি কাপুরুষ না বীর সেটা প্রমান করার সুযোগই নাই ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *