শিল্প-সংস্কৃতি ও নগ্নতার লড়াই ; বাঙালীর দৌঁড় কতদূর?

 

সেন্সরবোর্ড বিষয়টাতে আমার আপত্তি আছে। এটা নিয়ে এর আগে অনেক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। সে বিষয়ে খানিকটা বলে লেখাটা শুরু করতে চাই।
ধরুন, সেন্সরবোর্ডে দশজন সদস্য। তারা দশজন দশ রকমের মতাদর্শ, চিন্তা-চেতনা লালন-পালন করেন। একটি সিনেমা তারা দশজন দশ রকমের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখবেন। পাঁচজনের সে সিনেমাটি ভালো লাগবে বাকি পাঁচজনের লাগবে না – এটা স্বাভাবিক বিষয়। এখন সে সিনেমায় কিছু দৃশ্য পাঁচজনের ভালো লাগলো বাকি পাঁচজনের লাগলো না। এক্ষেত্রে সেন্সরবোর্ড কি সিদ্ধান্ত নিবে? বলবেন কম্প্রোমাইজ করে একটি সিদ্ধান্তে আসতে? ঠিক আছে, ধরুন যে পাঁচজনের সিনেমার কিছু দৃশ্য ভালো লেগেছে তারা কম্প্রোমাইজ করলো এবং বাকি পাঁচজনের ইচ্ছানুসারে সে সকল দৃশ্য বাতিলের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিলো কিংবা যে পাঁচজনের ভালো লাগে নি তারা যে পাঁচজনের ভালো লেগেছে তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে দৃশ্য রাখার সিদ্ধান্ত নিলো। তাহলে কি ফেয়ার কোনো সিদ্ধান্ত আপনি পেলেন? আচ্ছা, এসব বাদ দেন। আপনি সিনেমা কি সেন্সরবোর্ডের মনোরঞ্জনের জন্য নির্মাণ করেছেন? এ প্রশ্নের জবাব নিয়ে যদি আপনি সন্তোষজন অবস্থায় বিরাজ করেন তাহলে সেন্সরবোর্ডে আপনি কখনোই আস্থা রাখতে পারেন না। তবে আমি আস্থা রাখি না এই ভেবে যে যাদের সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতির কোনো যোগাযোগ নাই তাদের কোনো যোগ্যতা নাই আমার শিল্পকর্মে নাক গলানোর। আমার সিনেমায় কোন দৃশ্য থাকবে, কোন দৃশ্য থাকবে না সেটা ঠিক করবো আমি – সেন্সরবোর্ডের কোনো চাকুরীজীবী কর্মকর্তা নয়।

এবার চলুন মূল বিষয়ে যাই। তার আগে লালন সাঁইজির একটি গানেট লাইন বলি –
‘জাত গেলো জাত গেলো বলে
একি আজব কারখানা?’
সম্প্রতি কয়েকটি ওয়েব সিরিজের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ উঠেছে। যেগুলো বন্ধের জন্যে আবার এক আইনজীবী আদালতের মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশও দিয়েছেন।
অশ্লীল-শ্লীল এ নিয়ে বেশ তর্ক-বিতর্ক করা যাবে। কিন্তু সেদিকে যাওয়ার কোনো উদ্দেশ্য আমার নেই। আমার আজকের বক্তব্য কেনো আমরা অশ্লীলতার তকমা দিয়ে দেই কোনো শিল্পকে!
এর মূলে রয়েছে কুসংস্কার এবং তা ভেঙে যাওয়ার তীব্র ভয়। ছোটবেলা থেকেই আমাদের মগজে সেঁদিয়ে দেয়া হয় নারী-পুরুষ আলাদা। তাদের বেশ কিছু অঙ্গ জুড়ে শ্লীল-অশ্লীলতা জড়িয়ে। এমনকি বেশ কিছু শব্দ আছে যার ব্যবহার ভদ্র সমাজে বাস করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। যুগ যুগ ধরে বয়ে আসা এ কুসংস্কার আজকে জগদলের কাঁটার মত আমাদের ঘাঁড়ে চেপে বসেছে। ফলে এ বিষয়গুলো ভেঙে ফেলার জন্য কেউ উদ্যোগী হলে আমরা নিজের অস্তিত্ব সংকটে ভুগি। কিন্তু আদতে এটা আমাদের পরিচয় সংকটের কারণে ঘটে। আমাদের নিজস্ব কোনো পরিচয় নেই, যার কারণে পরজীবীর মত আমরা আদিম কিছু সংস্কৃতি বা পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু যুগের সঙ্গে সে সংস্কৃতি আজ পরিণত হয়েছে কুসংস্কারে৷ আধুনিকতার এ যুগে দাঁড়িয়ে নারীকে ঘরবন্দি করে কিংবা লম্বা ঘোমটার আড়ালে রেখে আপনি আদিম সংস্কৃতি রক্ষা করে সন্তুষ্ট হতে পারবেন ঠিকই কিন্তু আপনি মান্দাতার আমলের এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন।
আদিম সংস্কৃতি ভাঙা নিয়ে আমি বেশ কয়েক বার শুনেছি, কি দরকার মানুষের আবেগে আঘাত করার? তাদের আবেগে আঘাত করলে তাদের অস্তিত্ব নিয়ে তারা ভয়ে থাকে। তখন অস্তিত্ব রক্ষায় তারা যে কিছু করতে পারে! কিন্তু এটাই যে মৌলবাদী আচরণ তা তাদের আমি বুঝাতে পারি নি।
ইসলামী ধর্মের সংস্কৃতি অনুযায়ী নারীরা বোরকা ছেড়ে শাড়ী পরলে যেমন সংস্কৃতির অবক্ষয় হয় তেমনই বাঙালী মেয়ে শাড়ী ছেড়ে জিন্স-শার্ট পরলে সংস্কৃতির অবক্ষয় হয়৷ এক্ষেত্রে দুটো আমার কাছে মামাতো-পিসতুতো ভাই। বোরকা ছাড়তে পারবে না যেমন আদিম ও মৌলবাদী বক্তব্য তেমনই শাড়ী ছাড়তে পারবে না এটাও আদিম ও মৌলবাদী বক্তব্য।

একটি স্বাধীন শিল্পসত্ত্বার কাছে শ্লীল-অশ্লীলতা পরিমেয় নয়। তাহলে অনেক আগেই খিস্তির কারণে অশ্লীলতার দোহাই দিয়ে নবারুণ ও তার কবিতাকে সাহিত্য থেকে বের করে দেয়া হতো। সুতরাং শিল্পী কি করবে না করবে তা আপনি আপনার যুগ যুগ আগের সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে সিদ্ধান্ত বাতলে দিতে পারেন না। কিংবা সেন্সরবোর্ডের মত একটি করাত দিয়ে চাইলেই পারেন না শিল্পীর কোন কর্মকে কর্তন করতে।
এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সময় এখন। শ্লীল-অশ্লীল তর্কে না জড়িয়ে আদিম সংস্কৃতি মগজে পুঁষে রাখা সমাজটাকে নাড়া দেয়ার সময় এটা। শিল্পীকে তার মত করে চলতে না দিলে প্রবলভাবে সে ধাক্কাটা আসবে। এবং তখন ‘অনুভূতিতে আঘাত করা ঠিক নয়/অস্তিত্ব সংকটে পড়ে আক্রমন করবে’ জাতীয় কথা ধোপে টিকবে না৷

 

রাত ভ’রে বৃষ্টি নাটকের একটি দৃশ্য

 

দ্বিতীয়ত যে বিষয়টি নিয়ে বলবো তাহলো, প্রাপ্তবয়স্ক ও মনস্কের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। প্রাপ্তবয়স্ক কারা তা আপনারা সকলেই জানেন৷ কিন্তু প্রাপ্তমনস্ক নিয়ে আপনাদের দৌঁড় কতটুকু তা আমার জানা হয়ে গেছে।
এই কয়েক মাস আগে। বাংলাদেশ মহিলা সমিতিতে আপস্টেজ-এর প্রথম প্রযোজনা ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ নাটকের পোস্টার নিয়ে অশ্লীলতার অভিযোগ উঠে। নাটকটি নিয়েও নাট্যাঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা কম হয় নি। এর পেছনে ওই আদিম সংস্কৃতির একটা ছাঁপ স্পষ্ট। কিন্তু আপস্টেজ স্পষ্ট করে জানিয়েছে নাটকটি প্রাপ্তমনস্কদের জন্য। বয়সে আপনি সাবালক হলেও মননে নাবালক থাকলে আপনার জন্য নাটকটি নয় এমন কথা থাকার পরেও যখন অশ্লীলতার অভিযোগে নাটকটি অভিযুক্ত হয়েছে তখন ভাববার অবকাশ নেই সমাজের মনস্তত্ত্ব সাবালক নয়। বয়সে দামড়া হলেই যে সাবালক হওয়া যায় না, খোঁড়া যুক্তি – মৌলবাদী সংস্কৃতি দাঁড় করিয়ে শ্লীল-অশ্লীল তর্ক জুড়ে দেয়া লোকগুলোকে সে বিষয়টা বুঝানোর জন্য লড়াইটা জরুরী। সুতরাং লড়াইটা হওয়া উচিত মগজের সঙ্গে মগজের, সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির। শিল্পী লড়াই করে তার কর্ম দিয়ে আর দামড়া সমাজ লড়াই করতে পারে না বলেই, অস্তিত্বের ভয়ে থাকে বলেই হামলা-মামলা করে। কিন্তু হামলা-মামলা করে কি ‘বিবর’, ‘প্রজাপতি’, ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ শেষ করা গিয়েছে? বরং বিপুল বিক্রমে এগিয়েছে, সমাজের মনস্তত্ত্ব গঠনে এগিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *